, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ১০:৫৪ অপরাহ্ণ



তুমি কাউকে কথা দিয়েছো, পছন্দ করো, কিংবা ভালোবাসো; খুব ভালো কথা। কিন্তু খেয়াল রাখবে, তুমি যেন তোমার প্রিয় মানুষটির মানবিক সীমাবদ্ধতা, নির্বুদ্ধিতা, ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা কিংবা অসংযত আবেগের কাছে নিজেকে জিম্মি করে না ফেলো। মনে রাখবে, being emotional hostage of someone, is the worst kind of hostage situation.

‘না’ বলার ক্যাপাসিটি কখনো কখনো আমাদেরকে শোচনীয় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে। কখন এনগেইজ হতে হবে এবং কখন নিজেকে উইথড্র করে নিতে হবে, এই কান্ডজ্ঞানটুকু থাকা চাই। সম্পর্ককে সুস্থ রাখার একমাত্র পদ্ধতি হলো সম্পর্কের সীমাকে মেনে চলা।

মনে রাখতে হবে, সম্পর্ক মাত্রই হচ্ছে একটা ‘গিভ অ্যান্ড টেইক’ এর ব্যাপার। কিছু কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠা সৌভাগ্যের ব্যাপার। একই সাথে, কিছু কিছু সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়াটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার।

এসব কথা আমি যত্রতত্র, অহরহ এবং বারে বারে বলি। এবং ফর দা রেস্ট অফ মাই লাইফ বলতেই থাকবো। কেননা, এগুলো হলো আমার এবং যে কোনো বোধসম্পন্ন মানুষের জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সার নির্যাস।

তুমি বা কেউ চাইলেই নিজের জীবনকে নতুন আঙ্গিকে নতুন করে সাজাতে পারবে না। মানুষের যে দীর্ঘ ইতিহাস তারই আলোকে, আমাদের গঠনগত যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা, সেইটার সাথে সংগতিপূর্ণ করেই যদি তুমি জীবনযাপন করতে পারো তাহলেই কেবল তুমি সুখী হতে পারবে।

আমার এই কথাটা বিশ্বাস করো, নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আত্মত্যাগ করার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। অন্য কারো জন্য তুমি ততটুকুই করবে যতটুকুর ভার তুমি স্বাচ্ছন্দে বইতে পারবে। এই ‘অন্য কারো’ মানে তুমি ছাড়া অন্য যে কেউ।

নিজেকে এমন একদিনের জন্য প্রস্তুত করো যেদিন কারো সুপারিশ কাজে লাগবে না এবং যেদিন নিজেকে ছাড়া অন্য কারো কথা কেউ ভাবতেই পারবে না। হ্যাঁ, সেই দিনটা হলো ইয়াওমুল আখেরাহ বা কিয়ামতের ময়দান।

আল কোরআনের এই আয়াতটা যখন আমি পড়ি তখন আমার কাছে মনে হয়, ইসলামের চেয়ে বেশি অস্তিত্ববাদী কোনো তত্ত্ব বা মতবাদ হতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতালা বলছেন,
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ اَخِيْهِۙ

وَاُمِّهٖ وَاَبِيْهِۙ

وَصَاحِبَتِهٖ وَبَنِيْهِؕ

لِكُلِّ امْرِیءٍ مِّنْهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ شَاْنٌ يُّغْنِيْهِؕ

সেই দিন মানুষ পলায়ন করিবে তাহার ভ্রাতা হইতে, এবং তাহার মাতা, তাহার পিতা, তাহার পত্নী ও তাহার সন্তান হইতে। সেই দিন উহাদের প্রত্যেকের হইবে এমন গুরুতর অবস্থা যাহা তাহাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখিবে।

(সূরা আবাসা, আয়াত নম্বরঃ ৩৪-৩৭)

ইতোমধ্যেই যদি তুমি সেরকম কোনো ট্রাপের মধ্যে পড়ে থাকো তাহলে যে কোনো মূল্যে এট দা ভেরি ফাস্ট চান্স সেটা থেকে বের হয়ে আসো। মনে রেখো, কোনো ক্ষতি জীবনের চেয়ে বড় কোনো ক্ষতি নয়। এবং যে কোনো ক্ষতি একটা পর্যায়ে মানুষের পুষিয়ে যায়, যে কোনো কষ্ট, তা যত বড় বলে তোমার এই মুহূর্তে মনে হোক না কেন, এক সময় তা তুমি ঠিকই ভুলে যাবে।

জগতের সেরা মানুষটি বলেছেন, তোমাদের ভাইকে তোমরা সহযোগিতা করো হোক সে মজলুম অথবা সে জালেম। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, যে মজলুম তাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে হবে সেটা তো আমরা বুঝলাম। কিন্তু যে কিনা অত্যাচারী বা জালেম তাকে আমরা কীভাবে সহযোগিতা করব? তখন তিনি বললেন, অত্যাচারীকে তার অত্যাচার থেকে বিরত রাখাই হচ্ছে তাকে সহযোগিতা করা।

এ কথার মানে হল, যে যেটার জন্য যোগ্য নয়, তার জন্য সেটা অনুমোদন করবে না। কেউ যদি রেড লাইন ক্রস করে তাকে তুমি প্রতিহত করবে। অথবা প্রতিবাদ করবে। তাও যদি করতে না পারো তাহলে কীভাবে এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যায় সেটার জন্য সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করা, নিজেকে অক্ষম মনে করা, নিজেকে কারো অসংগত আবেগ আর অন্যায় আবদারের কাছে সমর্পণ করে দেওয়া, এগুলো হলো নিজেকে নিজে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়ার শামিল। নিজেকে বিক্রয় করে দেওয়া আর আত্মহত্যা করা, দুইটার মাসাআলা একই। দুটাই অন্যায়। দুটাই নাজায়েয ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ।

তাই ঘুরে দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে। এটি হচ্ছে আমার গুরু জর্ডান পিটারসনের 12 rules for lifeএর ১লা নম্বর কথা। একই সাথে এটি হচ্ছে কোরআন হাদিসের কথা। সর্বোপরি, এটাই হচ্ছে আমার একান্ত উপলব্ধি।

এই প্রসঙ্গে পুরনো একটা লেখা শেয়ার করছি। ১১ এপ্রিল ২০১৯ এটি লিখেছিলাম‌। এ পর্যন্ত পড়ে যদি ভাল লাগে, তাহলে এটাও পড়তে পারো।

কাউকে অতিরিক্ত বিনয় বা ভালোবাসা দেখাতে যাবেন না

অতিরিক্ত বিনয় ভালো নয়। বিনয়। থাকলে ভালো। বিনয়ী। হতে পারলে ভালো। কিন্তু, কৃত্রিম বিনয় কোনো ক্রমেই কাম্য নয়। এ ধরনের ভদ্রতাসুলভ বিনয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই বা একপর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। এর পরে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ভদ্রলোক কিম্বা ভদ্রমহিলার আসল চেহারা। কপট বিনয়ের পরিণতি হলো, কোনো না কোনো ধরনের উগ্রতা বা একদেশদর্শিতা।

যাকে আপনি অন্তর থেকে সম্মান করতে পারছেন না, তাকে অসম্মান না করলেই চলে। আপনার ভেতরে সম্মানবোধ না থাকা সত্ত্বেও জোর করে কাউকে সম্মান দেখাতে যাবেন না। যদি তা করেন, তাহলে আপনার এই আরোপিত ধৈর্যের দেয়াল ভেঙ্গে পড়বে। নিজেকে আপনি একপর্যায়ে আর সামলাতে পারবেন না। যাকে আপনি কৃত্রিমভাবে সম্মান দেখাচ্ছেন, তাকেই আপনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অপমানিত করবেন। এটি নির্ঘাত ঘটবে। এধরনের অনিচ্ছাকৃত প্রতিশোধস্পৃহা থেকে আপনি নিজেকে কখনোই সংযত রাখতে পারবেন না। মানব চরিত্রের সম্পর্কে আমাদের বিশ্লেষণ এমনটাই বলে।

যে কোনো মানবিক অনুভূতি ভিতর থেকে আসা উচিত। হোক সেটা ভালোবাসা কিংবা ঘৃণা। হোক সেটা সম্মান কিংবা অসম্মান। বহু বছর আগে কোথায় যেন লিখেছিলাম,

love grows,
it cannot be made.
when it is gone,
nothing can back it again.

কারো জন্য যদি আপনার কোনো ইতিবাচক অনুভূতি না থাকে, সে ক্ষেত্রে সম্পর্কসীমার ভিতর থেকে যতটুকু করা দরকার, ততটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন। অতিরিক্ত কিছু করতে যাবেন না। অতিরিক্ত বিনয় দেখাতে যাবেন না। অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখাতে যাবেন না। অতিরিক্ত সম্মান দেখাতে যাবেন না।

কেননা, জানেনই তো, অতিরিক্ত কোনোই কিছু ভালো না। জোর করে অতিরিক্ত কোনো কিছু যখন আমরা কারো জন্য করতে যাই, তখন তা একপর্যায়ে ব্যাকফায়ার করে। এটি অনিবার্য। এ ধরনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যবস্থাকে আমরা কখনো অকার্যকর করে রাখতে পারি না। আবেগের জোরে বা বিশেষ কোনো স্বার্থের বশবর্তী হয়ে প্রাকৃতিকভাবে নির্ধারিত সম্পর্কসীমাকে যতই আপনি খানিকটা এদিক ওদিক করে নতুন বিন্যাসে সাজাতে চান না কেন, এক পর্যায়ে সেটি মূল প্রাকৃতিক সেট-আপ অনুসারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিসেট হয়ে যাবে।

তাই, প্রকৃতিকে মেনে চলুন। প্রাকৃতিক জীবন যাপন করুন। প্রকৃতির সাথে, স্বভাবের সাথে, বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া মানে পরাজয় অনিবার্য। প্রকৃতির নিয়মগুলো সরল ও সহজবোধ্য। যা কপট, কৃত্রিম, বানোয়াট কিংবা আরোপিত, তা কখনো টেকসই হয় না।

প্রকৃতি আমাদেরকে নির্ধারণ করে দিয়েছে, কে, কতটুকু, কখন, কীভাবে, কী পাবে। এই প্রাকৃতিক বণ্টন বা নির্ধারণ ব্যবস্থার নামই হচ্ছে শরীয়ত। হাঁ, শরীয়ত হচ্ছে প্রাকৃতিক জীবনব্যবস্থা। বিশেষ করে ইসলামী শরীয়তের ক্ষেত্রে এ কথাটা আমি হলফ করে বলতে পারি। যা কিছু আমাদেরকে করণীয় ও কর্তব্য হিসেবে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে, ব্যক্তিগত থেকে সমষ্টিগত, তা প্রকৃতিসম্মত জীবন ব্যবস্থারই নামান্তর। প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোনো বিধি, দায়িত্ব ও কর্তব্য কিংবা অধিকার কায়েমযোগ্য নয়। হোক সেটা ধর্মের বা সমাজের বা রাষ্ট্রের কিংবা কোনো আদর্শের নামে আরোপিত।

প্রকৃতির মধ্যে নাই কৃত্রিমতা, অভিনয় বা বাহুল্য বিনয়। প্রকৃতিতে যার যার অবস্থা ও অবস্থান, দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত। তাই আসুন, যেকোনো ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রকৃতি প্রদত্ত সীমানাগুলোকে মেনে চলি। কাউকে আগামীকাল বা পরশু অপমানিত করার চেয়ে আজকে তাকে অতিরিক্ত সম্মান না করাই ভালো। এমনকি সে নিজেও যদি এমন কৃত্রিম বিনয়, সম্মান বা ভালবাসার আশা করে। পরবর্তী তিক্ততার চেয়ে বর্তমানের তিক্ততা শ্রেয়তর বটে।

যে কোনো সময়ে, যে কারো সাথে, যে কোনো পরিস্থিতিতে স্বীয় ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন। সাথে, ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমার সংজ্ঞাটিও মনে রাখতে পারেন, ‘ব্যক্তিত্ব হচ্ছে সীমিত মাত্রার বেয়াদবি। personality is audacity within limit.’

যেকোনো অতিরিক্ত মাখামাখি সম্পর্কের পরিণতি হচ্ছে তিক্ততা, ছাড়াছাড়ি, বিচ্ছেদ ও বিরোধিতা। সম্পর্ক মাত্রেই তাই থাকা উচিত প্রপার একজিট প্ল্যান। সম্পর্কটা কীভাবে শেষ হতে পারে, সেটা পক্ষসমূহের জানা থাকা উচিত। দিন শেষে, সম্পর্ক মাত্রই, এমনকি ‘রক্তের সম্পর্ক’ ধরনের স্থায়ী সম্পর্কগুলোও, কোনো না কোনো ধরনের সামাজিক সম্পর্ক। ‘জীবনে মরণে সম্পর্ক’ বলে কোনো সম্পর্ক শুধুমাত্র কল্পনাতেই থাকতে পারে। এ ধরনের অবাস্তব সম্পর্কের অলীক বাস্তবতা নিয়ে রচিত হতে পারে সাহিত্য, গল্প, উপন্যাস ও কবিতা। কিন্তু বাস্তবজীবনে চিরস্থায়ী সম্পর্ক বলে কোনো জিনিসের অস্তিত্ব নাই। ছিলো না কোনো কালে।

রক্তের সম্পর্কের বাইরে কেউ কারো সাথে এ ধরনের স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করলে, সেটা কখনোই সুন্দর ও সুখের হবে না, নিশ্চিত বলা যায়। অবশ‍্য, সম্পর্কচ্ছেদের সম্মত ব্যবস্থা থাকা মানে এই নয় যে সেই সম্পর্কটি হবে ঠুনকো বা অস্থায়ী। বরং সম্পর্কচ্ছেদের সুসম্মত ব‍্যবস্থা থাকার মাধ্যমে অযাচিত সম্পর্কের অসহনীয় দায় ও সীমাহীন তিক্ততা থেকে আমরা আত্মরক্ষা করতে পারি।

বারবার যে কথাটা বলি, এ প্রসঙ্গে সেটি আবারও বলছি। সম্পর্ক করেন। কিন্তু মনে রাখবেন, সম্পর্ক মাত্রই হচ্ছে দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক। সম্পর্ক মানেই হলো, সুনির্দিষ্ট কিছু অধিকার আদায় আর সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্বপালনের ব্যাপার।

এই কথাটুকু যদি মনে রাখেন, তাহলে যে কারো সাথে আপনার সম্পর্ক থাকবে সুস্থ ও স্বাভাবিক। আপনার সম্পর্কটি হতে পারে ব্যক্তিগত, সামাজিক, পেশাগত কিংবা আদর্শিক। হতে পারে সেই সম্পর্ক ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক। সম্পর্কটি যে ধরনেরই হোক না কেন, প্রকৃতিসম্মত সম্পর্কসূত্রকে মেনে চলার কারণে, বলা যায়, জীবনে আপনি সুখী হবেন। সফল হবেন। একজন বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ চরিত্র ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে আপনাকে জানাই সালাম, শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন