, ২০ জুন ২০২১; ৫:১১ অপরাহ্ণ


আগামী দিনে বেচে থাকতে হলে জানতে হবে, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এর মতো আরও অনেক নতুন নতুন রোগ থেকে বাচার কৌশল।

কেন বলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস? বাঁ ব্লাক ফাঙ্গাস কি 

এটি একটি ছত্রাক-জনিত রোগ। মিউকোর নামে একটি ছত্রাকের সংস্পর্শে এলে এই সংক্রমণ হয়। এই শক্তিশালী ছত্রাকগুলো ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখতে মনে হবে কি সুন্দর লতানো ফুলের বাগান, ফুলটা দেখতে কালো। আপনার শরীরে আক্রান্ত এলাকায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে কাল হয়ে যায়, তাই একে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বলা হয়। শরীরের যে কোন স্থানে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণ হতে পারে। তবেনাকের আশে পাশে, চোখে সংক্রমণ বেশি হয়। চোখে সংক্রমণ হলে তা দ্রুত মস্তিষ্কে ছড়িয়ে যায়। 

US Centers for Disease Control and Prevention এর মতে, ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৫৪ শতাংশ মৃত্যুবরন করে।

কোথায় থাকে ব্লাক ফাঙ্গাসঃ

বিশেষজ্ঞেরা বলেন, মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সর্বত্র বিরাজমান। আমাদের চারপাশেই এটি আছে। বেশি সময় ধরে ঘরে রাখা আমাদের জুতাতেও এ ছত্রাক থাকতে পারে, দীর্ঘক্ষণ রাখা রুটিতেও এটি সৃষ্টি হতে পারে। মাটি, গাছপালা, সার বা পচনশীল ফল ও সবজির মধ্যে এটি থাকতে পারে। এটি কোনো বিরল কিছু না।

উপসর্গঃ 

নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক থেকে রক্ত পড়া, চোখে ব্যথা এবং চোখ ফুলে যাওয়া, চোখের পাতা ঝুলে পড়া, চোখে ঝাপসা দেখা, যার থেকে পরে দৃষ্টিশক্তি চলে যায়, নাকের চামড়ার চারপাশে কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেয়া ইত্যাদি লক্ষন দেখে সনাক্ত করা যায় ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। 

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে নয়। এটি নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকাটা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, এটা ছত্রাকবাহিত রোগ বাংলাদেশে আগেও হয়েছে। এ ছত্রাক প্রকৃতির সর্বত্র আছে। তবে আক্রান্ত হলে এতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস

প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত ৯০০০ জন এই ফাঙ্গাসে সংক্রমিত হয়েছেন।

ভারতের চিকিৎসকেরা বিবিসিকে বলেন, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার ১২ থেকে ১৮ দিনের মধ্যে এর সংক্রমণ দেখা দেয়। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি গুজরাট ও মহারাষ্ট্র রাজ্যে। ভারতে মোট সংক্রমিত রোগীর অর্ধেক রয়েছে এই দুই রাজ্যে। এ ছাড়া আরও ১৫ রাজ্যে এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। 

ভারতীয় বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বাঁ মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৫০ ভাগ মৃত্যুবরন করছে। যা খুব ভীতিকর। অনেকে প্রানে বাঁচলেও, হারাচ্ছেন চির জীবনের জন্য দৃষ্টিশক্তি। তারা আরও বলছেন, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, ক্যান্সার, ক্যান্সারথেরাপি নিচ্ছেন, ডায়াবেটিস, এইডস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত তাদের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বাঁ মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হবার হার বেশি। হাসপাতালে ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার, ন্যাজাল ক্যানুলা বাঁ অক্সিজেন ফেস মাস্কের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। 

ভারতীয় বিশেষজ্ঞেরা আরও বলছেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এর পাশাপাশী হোয়াইট ও ইয়লো ফাঙ্গাস নামে আরও দুটি রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা বলছেন।  এই তিনটি ফাঙ্গাস এর মধ্যে ইয়লো ফাঙ্গাস বেশি ভয়ঙ্কর। ইতিমধ্যে ইয়লো ফাঙ্গাস এ আক্রান্ত হয়ে ভারতে মারা গেছে কয়েকজন। একের পর এক নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব, পৃথিবীতে মানুষের সুন্দর সাজানো জীবন ফিরে পাবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্খা দেখা দিয়েছে।  

কাদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাস হওয়ার আশঙ্কা থাকে?

যে মানুষগুলোর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম, তারা এতে আক্রান্ত হতে পারে। ক্যানসার, এইডসে আক্রান্ত রোগীদের এতে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ডায়াবেটিস, ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর রেডিও থেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছে, তারা খুব ঝুঁকিতে আছে। বংশ বা জন্মগতভাবে কেউ কেউ কম প্রতিরোধক্ষমতার অধিকারী। ঝুঁকি তাদেরও আছে। তাদের জন্য বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে করে প্রকৃতি থেকে না আসে। যেসব রোগী স্টেরয়েড পেয়েছে, তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম থাকে। তাদেরও সাবধানে থাকতে হবে।

কিভাবে ছড়ায়

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যগত জটিল সমস্যায় থাকা ব্যক্তি বা চিকিৎসায় স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহারের ফলে প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া ব্যক্তিদের এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতিতে থাকা এ ছত্রাক নাক দিয়ে শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে সাইনাসে এবং ফুসফুসে ঢুকতে পারে। প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তির শরীরের কাটাছেঁড়া জায়গা, পোড়া জায়গা বা চর্মের কোনো ক্ষত থাকলে সেখানেও আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ এটি মানুষে থেকে মানুষে ছড়ায় না বটে, তবে এটি ভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। যেমন রোগীর চিকিৎসা-বর্জ্য হিসেবে এটি প্রকৃতিতে গেলে সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি নিরাপদ না থাকেন বা তাঁদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস

তিন দিন আগে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে একজন রোগীর মৃত্যু হয়। আজ মঙ্গলবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ওই রোগী অন্যান্য রোগের পাশাপাশি মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত একজন রোগী এখনো বারডেম হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শনাক্ত হওয়া আরেকজন রোগী অন্য হাসপাতালে চলে গেছেন। সম্প্রীতি সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বারডেম হাসপাতালে রোগীর স্যাম্পল সংগ্রহ করেছে। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানাবেন। ফলে মানুষের উদ্বেক বেড়েছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় ইনজেকসান এম্পোটারিসন বি ও ভরিকোনাজোল। একজন পূর্ণ বয়স্ক বাক্তির ওজন অনুযায়ী প্রায় ১০-১৫ ভায়াল এম্পোটারিসন বিইনজেকশান দরকার, যার এক ডোজের দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার।ফলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য নির্ভর করবে, বিনামূল্য সরকারী হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের উপর। এখন পর্যন্ত এই ব্ল্যাকফাঙ্গাসে দেশে ১ জন মারা গিয়েছে ও আক্রান্ত আছে ৩ জন।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস থেকে সুরক্ষার উপায়

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বলছে, যেসব জায়গায় ছত্রাকের উপস্থিতি আছে সেসব জায়গা এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন।তবে ব্যক্তিপর্যায়ে বেশি সতর্ক হওয়া এবং করোনাকালে যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হয়েছে, আক্রান্ত হওয়ার পরও তাদের এসব পালন করতে হবে। যেমন মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়ার বিধি মানতে হবে। বিশেষ করে বাইরে থেকে এসে হাত অবশ্যই ধুতে হবে।ডেন্টিস্টরা বলছেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এড়াতে দিনে দুই বার সঠিক নিয়মে দাত ব্রাশ করা সহায়ক হতে পারে। 

তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তারা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে যাতে করে মিউকোরমাইকোসিস সংক্রমণের সম্ভাবনা কমিয়ে আনা যেতে পারে। এগুলো তুলে ধরা হলো।

১. যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসি বলছে, যেসব জায়গায় অনেক বেশি ধুলোবালি রয়েছে সেসব জায়গা এড়িয়ে চলা। যদি সেসব জায়গা এড়িয়ে চলা সম্ভব না হয়, তাহলে এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার করা।

২. প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেসব স্থাপনা পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। সিডিসি বলছে এসব জায়গা থেকে ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে।

৩. শরীরের চামড়ায় যাতে কোন ইনফেকশন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। কোথাও কেটে গেলে কিংবা চামড়া উঠে গেলে সেটি যাতে ধুলো-ময়লার সংস্পর্শে না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

৪. কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা

৫. রোগীর স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানী হতে হবে। বারডেম হাসপাতালে রেসপিরেটরি মেডিসিনের অধ্যাপক স্টেরয়েডের ব্যবহার ডায়াবেটিসকে অনিয়ন্ত্রিত করে তুলতে পারে। ফলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমতি হবার ঝুঁকি বেশি ধাকে।

৬. রোগীকে অক্সিজেন দেবার সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

৭. মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বলছে, এসব সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিলেই যে মিউকোরমাইকোসিস সংক্রমণ এড়ানো যাবে, সেটি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। গবেষণার মাধ্যমে আমরা তা জানতে পারব। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন