, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৩:২৫ অপরাহ্ণ


এক.
ভুল নয়,ঠিকই পড়েছেন।মিয়ানমারে এখন দুটি সরকার।একটা সামরিক বাহিনীর,অন্যটা রাজপথের গণতন্ত্রপন্থীদের।যারা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাদের,যারা নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতা পায়নি।অনেকটাই বাংলাদেশের ১৯৭০ সত্তর সালের নির্বাচনের মতো।মিয়ানমারে আসলে কী হচ্ছে? চলুন, আজ চোখ রাখি,সেদিকে।

সামরিক শাসন আর মিয়ানমার যেন একই সূত্রে গাঁথা। ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর তিয়াত্তর বছরের মধ্যে দেশটির পঞ্চাশ বছরই কেটেছে সামরিক শাসনের অধীনে।সেনাবাহিনী মিয়ানমারে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী জায়গা করে নিয়েছে যা গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্র পারমিট করতে পারেনা।রাজনীতি ও মানুষের কথা বলার অধিকার চরমভাবে নিয়ন্ত্রিত।এবারের সমস্যাটা একটা নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে।২০২০ সালের ৮ নবেম্বর, মিয়ানমারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয় মূলত নোবেল জয়ী অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি -এনএলডি এবং সেনাবাহিনী(তাতমাডো) সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি- ইউএসডিপি এর মধ্যে। নির্বাচনে সুচি’র দল এনএলডি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং চরম ভরাডুবি হয় সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউএসডিপি’র।সুচি’র দল এনএলডি আশি পার্সেন্ট ভোট পেয়ে জয়ী হয়।বিষয়টা মানতে পারেনি সেনাবাহিনী। তাদের কাছে এটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।ফলে সেনাবাহিনী এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা, বৈধতা এবং ভুয়া ভোটার নিয়ে প্রশ্ন তোলে যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে একটি সঠিক নির্বাচন হিসাবেই স্বীকৃতি দিয়েছে।মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশনও সেনাবাহিনীর অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়।বিষয়টি সহজ ভাবে নিতে পারেনি সেনাবাহিনী।

দুই.
১লা ফেব্রুয়ারি ২০২১।এইদিন মিয়ানমারের নব নির্বাচিত পার্লামেন্টের অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের শুভ যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো আবারও সেই সেনাবাহিনী। সংগঠিত হলো সামরিক অভ্যুত্থান।গৃহবন্দী হলে হলেন এনএলডি নেত্রী অং সান সুচি সহ অনেকেই।শুরু হলো সেনাবাহিনীর বিচার।কাঠগড়ায় দাঁড়ালো রাজনৈতিক দল,নেতৃত্ব ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।রাষ্ট্রের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলো সেনাবাহিনী।যা যে কোনো মুক্তি পাগল জাতির জন্য এক ভয়ানক চ্যালেঞ্জ।এনএলডি ১৯৯০ সালের নির্বাচনেও প্রায় একাশি পার্সেন্ট ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিল কিন্তু সেবারো সেনাবাহিনী ক্ষমতা দেয়নি,এবারের মতোই অং সান সুচিকে গৃহবন্দী করে। পনের বছর গৃহবন্দী থেকে অক্সফোর্ড পড়ুয়া,মিয়ানমারের জাতির জনক জেনারেল অং সানের কন্যা অং সান সুচি হয়ে উঠেছিলেন মিয়ানমারের গণতন্ত্রের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর।সুচি ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম রাজনীতির ফ্রন্টলাইনে আসেন।পরবর্তীতে এনএলডি ই হয় তার রাজনৈতিক ফ্ল্যাটফর্ম।১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পান সুচি।কিন্তু তার রাজনৈতিক চরিত্রের একটা ভয়ানক রুপ আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিগত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা গেছে -যা শান্তিতে নোবেল জয়ী কোনো নেত্রীর কাছ থেকে একেবারেই অপ্রকাশিত। সেটা হচ্ছে সুচি’র কট্টর রোহিঙ্গা বিরোধী রাজনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান।রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সুচি’র দল এনএলডির রাজনৈতিক অবস্থান প্রায় একই।চরম রোহিঙ্গা বিরোধী।তারা রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিক তো দূরের কথা মিয়ানমারের যে একশো আটত্রিশটা ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী রয়েছে তার একটাও মনে করে না,রোহিঙ্গা মানে সেনাবাহিনী ও সুচি’র কাছে বাংলাদেশী,বাঙ্গালি!যা রাষ্ট্র কর্তৃক তার নাগরিকদের সাথে চরম নিষ্ঠুরতা ছাড়া কিছুই নয়।রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে,নারীদের ধর্ষণ ও খুন করা হচ্ছে, যারা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে চেয়েছে তাদের কন্ঠ চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে। জীবন নিয়ে এখন পর্যন্ত এগার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে (প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি) ।যাদেরকে জাতিসংঘ বলছে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী’।মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের সাথে অং সান সুচি রোহিঙ্গা ইস্যুতে একাকার হয়ে যাচ্ছিলেন,এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গাদের উপর যুদ্ধাপরাধের যখন বিচার শুধু হলো তখনও সেনাবাহিনীর পক্ষে সুচির স্পষ্ট অবস্থান দুনিয়ার শান্তি প্রিয় মানুষকে চরম হতাশ করেছে!আর আজ?হায়!সেই সাধের সেনাবাহিনীই সুচিকে গৃহবন্দী করে তার বৈধ ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে কথিত এক ওয়াকিটকি রাখার দায়ে মামলার বিচার করছে?ইতিহাস বড় নির্মম!রোহিঙ্গাদের নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে নিজের বৈধ ক্ষমতাটাও ভোগ করতে পারলেন না সুচি।যদিও আমি বর্তমানে সুচির দল এনএলডির সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করি,কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির অবস্থান তাকে ইতিহাসের কোন পাতায় জায়গা দিবে সেটা অলরেডি নিশ্চিত হয়ে গেছে।নিশ্চয়ই সেটা ঘৃণার,চরম ঘৃণার।

তিন.
রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই।কথাটা মিয়ানমারের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আবারও প্রমাণ করলেন।
আসছি সেই ঘটনায়।মিয়ানমারের আন্দোলনরত রাজনৈতিক দল গুলো মিলেমিশে বর্তমান সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি সরকার গঠন করে ফেলেছে।যাকে জাতীয় ঐক্যের সরকার বলা হচ্ছে। ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্ট বা এনইউজি নামে পরিচিত এই বিকল্প সরকার মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ঘুম হারায় করে দিচ্ছে। হইচই পরে গেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে।এখন পর্যন্ত সামরিক শাসন বিরোধী রাজপথের আন্দোলনে প্রায় আট শতাধিক গণতন্ত্রপন্থী মারা গেছে।লেখক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যেকদের উপরও রাজনীতিবিদের মতোই ভয়ানক নির্যাতন নেমে আসছে।মতপ্রকাশের জায়গা গুলোর টুটি চেপে ধরা হচ্ছে।সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন মিয়ানমারের বিদ্রোহী, ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠী গুলোকেও এক কাতারে নিয়ে এসেছে। সবার লক্ষ্য কেবল একটা, সেটা সামরিক শাসনের শেষ দেখা।সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা রাজনৈতিক শক্তি গুলোর সামনে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থীদের জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করে ফেলা একটা নতুন বার্তা,নতুন কনসেপ্ট।এটা স্বৈরশাসকদের জন্য একটা কঠিন বার্তা।অবশ্য কয়েক বছর আগে এমন একটা সরকার আমরা ভেনিজুয়েলাতেও ক্ষমতাশীন নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধেও তার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি গঠন করতে দেখেছি।গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে -মিয়ানমার গৃহযুদ্ধের ধারপ্রান্তে।আসলে সেনাবাহিনী না থামলে মিয়ানমারের কঠিন সময় সামনে। কারণ গণতন্ত্রপন্থীরা এবার সহজে থামবে না,সেনাবাহিনী এদেরকে রোহিঙ্গা কৌশলে নির্মুল করতে পারবে বলে মনে হয় না।আলরেডি গণতন্ত্রপন্থীরা মিয়ানমারে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি একটা সেনাবাহিনীও গড়ে তুলেছে।যেখানে প্রতিবাদী তরুণরা যোগ দিচ্ছে।এটা একটা আন্দোলনের নতুন ডাইমেনশন,যা পূর্বে খুব কমই দেখা গেছে। সুতরাং সমস্যাটা বহুমাত্রিক রুপ ধারণ করছে,আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরো বেশি মনোযোগী হচ্ছে।বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলোর জাতীয় সরকার এনইউজি-কে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানাচ্ছে গণতন্ত্র পন্থীরা।বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাসরত মিয়ানমারের নাগরিকরা রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন, আবেদন জানাচ্ছেন যাতে জাতীয় সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।পরিস্থিতি দিন দিন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। শক্তিশালী হচ্ছে রাজপথে মিয়ানমারের জনগণের আন্দোলন।

চার.
একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে ৩জুন ২০২১,এদিন মিয়ানমারের বিরোধী রাজনৈতিক দল গুলোর গঠিত ঐক্যের সরকার এনইউজি ঘোষণা দিয়েছে তারা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের সবচেয়ে বড় বাধা ১৯৮২ সালের কালো আইনটি তুলে দিবে।রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দিবে এবং রোহিঙ্গাদের উপর সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করবে। যেসব রাষ্ট্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের সাথে সংগঠিত চুক্তি গুলো এনইউজি সরকার মেনে চলবে।সারমর্ম হচ্ছে বিরোধী দল গুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারে যে পলিসি এতদিন নিয়ে আসছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন কথা বলছে।সুচির এনএলডিও একই কথা বলছে কারণ এনএলডি জাতীয় ঐক্যের সরকারের বড় অংশ।মূল কথা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিশ্রুতি যদি শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে তাহলে রোহিঙ্গারা তাদের নিজ মাতৃভূমি আরাকানে মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবেই ফিরে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের শরনার্থীরাও জাতীয় ঐক্যের সরকারের পক্ষে কথা বলছে।এখন একটি বড় কাজ হচ্ছে যে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি জাতীয় ঐক্যের সরকার এনইউজি গঠিত হলো সেই সরকার যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত,মিয়ানমারের একটি বৈধ সরকার,আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তার স্বীকৃতি আদায় করা। কিন্তু কাজটা কি সহজ হবে?
জাতীয় ঐক্যের সরকারের স্বীকৃতির ব্যাপারে রোহিঙ্গারাও একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে, মনে হয় এনএলডি সহ রাজনৈতিক শক্তি গুলো রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সেই বার্তাই দিতে চাইছে।

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখন চীন। মিয়ানমারের বাজার চীনের দখলে।চীনের ইনভেস্ট মিয়ানমারে অনেক বড় অংকের। অবকাঠামো ও বন্দর হচ্ছে চীনের টাকার।ভারতও চোখ রাখছে।ওবামা প্রশাসনের সময় থেকে মিয়ানমারের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বাজার সৃষ্টিতে কাজ শুরু। ভারত মহাসাগরের এই অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে চীন,আমেরিকা এবং ভারত-সবার কাছেই মিয়ানমার ভূ-রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেজন্য আমেরিকা,ভারত ও পাশ্চাত্য রাজনৈতিক শক্তি গুলো মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকার এনইউজির প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারে।চীন বরাবরই মিয়ানমারে সামরিক শাসনের কট্টরসমর্থক।সেনাবাহিনীর জন্য বাজেটে প্রায় ১৪% বরাদ্দ রাখে মিয়ানমার।যার মাধ্যমে কেনা অস্ত্রের বড় চালান আসে চীন থেকেই।সুতরাং পরিস্থিতি জটিল।

পাঁচ.
রোহিঙ্গা শরনার্থী নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যায় আছে বাংলাদেশ। এগার লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীকে দেখাশোনা করা খুব সহজ ব্যাপার নয়।শরনার্থীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়া যেকোনো রাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটির জন্য কোনো ভালো সংবাদ নয়।ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের জন্য দৃষ্টি নন্দন দালানকোঠা বানানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।টেকনাফের রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির গুলো রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের জন্য মানবিকতার প্রতীক, মর্যাদার প্রতীক নয়।একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে কোনো মানুষের একটা দেশ থাকবে না,ঠিকানা থাকবে না, তা হতে পারে না।নিজ দেশ থেকে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা জাতিগোষ্ঠীর একটা নিজস্ব পরিচয়ের জন্য দেশ ছেড়ে পালাতে হবে -এটা মানবজাতির জন্য লজ্জার,মানবাধিকারের চরম লংগন।মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জন্য সংসদে পঁচিশ পার্সেন্ট আসন সংরক্ষিত।সংবিধান সংশোধন করতে হলে এমপিদের চারভাগের তিনভাগের সমর্থন প্রয়োজন হয়।যে ব্যবস্থা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করা অসম্ভব। সংবিধান অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং সীমান্ত বিষয়ক মন্ত্রণালয় থাকে সেনাবাহিনীর হাতে। এঅবস্থায় সেনাবাহিনীর সামরিক সরকার কস্মিনকালেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নিবে বলে মনে হয় না।বাংলাদেশের সামনেও কিছু বিকল্প আছে।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়,বিভিন্ন রাষ্ট্র, যদি মিয়ানমারের রাজনৈতিক দল গুলোর সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যের সরকারকে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বৈধ সরকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া শুরু করে তাহলে বাংলাদেশ কী করবে? বাংলাদেশের উচিত হবে জাতীয় ঐক্যের সরকারকেই সমর্থন করা।বাংলাদেশ যদি জাতীয় ঐক্যের সরকার- এনইউজিকে সমর্থন দেয় তাহলে আমেরিকা ও ইইউ সহ পাশ্চাত্য দুনিয়ার সমর্থন বাড়তে পারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে,চাপে পড়বে মিয়ানমারের সামরিক সরকার।চীনও বলতে পারে -দেখো এসব করার দরকার নেই, দেখি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কী করা যায়?রাতারাতি বড় কিছু হবে বিশ্বাস করি না কিন্তু এটা একটা সুযোগ। বাংলাদেশ কি পারবে সাহসী কোনো ভূমিকায় যেতে?

ছয়.
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরিণ রাজনীতি যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে,বাংলাদেশ সে সুযোগ অবশ্যই নিতে পারে।সমস্যা হলো একটা অবৈধ সরকার আরেকটা অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কি না?মিয়ানমারে কে ক্ষমতায় আসলো গেলো এর চেয়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশে শরনার্থী হিসেবে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো গেলো কিনা?রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের নিজ দেশে পাঠানোর যতগুলো সুযোগ আছে বাংলাদেশ তার সব গুলো সুযোগ ব্যবহার করুক। সরকারের সফলতা এটা নয়,একটা দ্বীপ রোহিঙ্গাদের দিয়ে স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করা।সফলতা এটা রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। বাংলাদেশ এখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে বলতে পারে-তোমরা বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ফিরিয়ে নাও,না হয় আমরা কিন্তু মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকার-এনইউজি কে সমর্থন বা স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হব,এতে চীন কিংবা আমেরিকা কী মনে করলো তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।
এমন কিছু করা গেলে আর যাই হোক সামরিক সরকার
রোহিঙ্গা শরনার্থী বিষয়ে চাপে থাকবে নিশ্চিত,এটা এখন নেই।মিয়ানমারের সামরিক শাসন হঠানো রাজনৈতিক দল গুলোর জন্য খুব সহজ হবে কি না জানি না।তবে এবার মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিদ্রোহী গোষ্ঠী, প্রতিবাদী জনগোষ্ঠী এবং সিভিল সোসাইটির মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, মনে হয় না,তারা খুব সহজে থামবে।সামরিক শাসন অং সান সুচি’র রাজনৈতিক কলঙ্ক মোচনেরও একটা সুযোগ করে দিয়েছে। সুচি ও তার দল অতীতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে ঘৃণা অর্জন করেছিল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টা এনইউজি সরকার সামনে এনে তার দায় মোচনের একটা বড় সুযোগ পেল।আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র গুলোও যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পছন্দ করে তারা ব্যাপারটা ভালো ভাবেই নিচ্ছে মনে হয়।রোহিঙ্গাদের জন্য একটা পজেটিভ ব্যাপার হচ্ছে এতদিন যারা তাদের দেশ ছাড়া করেছে, তারাই (এনএলডি) এখন নাগরিকত্ব দিয়ে রোহিঙ্গাদের স্ব সম্মানে দেশে ফেরত নিতে চাচ্ছে।এটা একটা বড় অগ্রগতি।মিয়ানমারের সামরিক সরকার কখনোই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবেনা,এটা এখন স্পষ্ট,তাহলে বাংলাদেশের সামনে যত গুলো বিকল্প আছে তার সব গুলো চেষ্টা করা দরকার।সেটা যদি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থীদের গঠিত জাতীয় ঐক্যের সরকারকে (ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্টেকে) স্বীকৃতি দিয়ে হয়,তাও।মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকারের শেষ পরিনতি কী হয়,বলা মুশকিল কিন্তু এটা সফল হলে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা প্রতিটি দেশেই বিরোধী এই মডেল অনুসরণ করে বসতে পারে,গণতন্ত্রপন্থীদের সফলতায় রোহিঙ্গা সমস্যার একটা সুরাহা হলে হয়েও যেতে পারে।তবে বর্তমান সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে এমনটা বিশ্বাস করার নুন্যতম কোনো কারণ দেখিনা।
মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজনৈতিক দল গুলোর ঐক্যবদ্ধ এক প্রচেষ্টার নাম
ন্যাশনাল ইউনিটি গভমেন্ট। বলতে পারেন এটাই মিয়ানমারের জনগণের বৈধ সরকার।

মো.নিজাম উদ্দিন
৬জুন ২০২১, ঢাকা

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন