বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২১; ৮:১২ পূর্বাহ্ণ


বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ৫০তম জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন করোনা মহামারী গত ৫০ বছরের বেশ কিছু অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ম্লান করে দিচ্ছে। এমন সময় এ বাজেট দেওয়া হয়েছে যখন দেশের জনস্বাস্থ্য সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে এবং করোনার ভারতীয় ধরণের সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলার আশংকা সৃষ্টি করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সময়ে সরকার আয় করার টার্গেট নিয়েছে ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বাকি ২ লক্ষ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ঘাটতি থেকে যাবে যা সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক বিভিন্ন উতস থেকে সংস্থান করার চেষ্টা করবে।

এই বাজেট নিয়ে সংসদে মাসব্যাপী বিতর্ক হবে ও আলোচনা সমালোচনার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনমত সংশোধন ও পরিমার্জন করে চূড়ান্ত করা হবে।

বাজেটের মোট আয়তন বা টাকার এমাউন্ট দিয়ে বাজেটের ভালো মন্দ বিচার করা মুশকিল। ধরুণ, আগামী ৬ মাসের মধ্যে আপনার পরিবারে নতুন অতিথি আসবে কিংবা আপনার অনেক আগের নেওয়া একটা ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আগামী বছর পর্যন্ত। এইরকম বিভিন্ন পরিস্থিতি কিন্তু আপনার আগামী বছরের আয় ও ব্যায়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে ফেলবে। আমরা ব্যক্তিগত জীবনে যেরূপ প্রতিটি ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কনটেক্স বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেই তদ্রুপ বাজেটকেও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে পেশ করতে হয়।

সাধারণত সরকার মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, দারিদ্র দূরীকরণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এই বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে বাজেট গ্রহণ করে থাকে। এর বাইরে বিশেষ পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়, যেমন – ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে মহামারী মোকাবেলা ও এর অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সামলে নেওয়ার চিন্তা থেকে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একজন সংসারের কর্তাকে যেমন খুব বিচক্ষণতার সাথে স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রার সাথে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রার সমন্বয় করে সংসারের সুখ ও স্বচ্ছলতা ধরে রাখতে হয় তেমনি একজন অর্থমন্ত্রীকেও বিচক্ষণতার সাথে সামগ্রিক অর্থনীতির দেখভাল ও সম্পদ বন্টনে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সুবিচার করতে হয় এই বাজেটের মাধ্যমে।

এই বাজেট কি করোনা মহামারীকে যথাযথভাবে আমলে নিয়ে করা হয়েছে? নাকি গতানুগতিক পথেই হেটেছে সরকার? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে করোনায় আমাদের অর্থনীতির কোন কোন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলো মেরামতের কোন কৌশল এই বাজেটে আছে কিনা। বাংলাদেশে করোনার প্রথম ধাক্কা শুরু হয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে সর্বাত্মক লকডাউনের মাধ্যমে। টানা ২ মাসের বেশি লকডাউন নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের জীবনে বিভীষিকা নিয়ে এসেছে। আমরা দেখেছি কিভাবে তল্পিতল্পা নিয়ে রাজধানী ছেড়েছে লক্ষ লক্ষ পরিবার। মোবাইল কোম্পানির ডাটামতে একদিনেই রাজধানী ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় প্রায় ১ কোটির বেশি মানুষ। বন্ধ হয়ে যায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। লকডাউনের পর সীমিত পরিসরে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পোশাক শিল্প কারখানা ধীরে ধীরে খুলে যায়। কিন্তু এর মধ্যেই কয়েক কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে যায়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণায় দেখা যায় নতুন করে দারিদ্রসীমার নিচে গিয়েছে ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ। পাওয়ার এন্ড পার্টিসিপেশন সেন্টার ও ব্রাকের যৌথ গবেষণা দেখায় যে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগেই নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনোমিক মডেলিং বা সানেমের মতে দারিদ্র হার দ্বিগুণ বেড়ে ইতিমধ্যেই ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও অর্থমন্ত্রী মনে করছেন ‘মহামারিতে বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিপর্যয়ের পর্যায়ে যাওয়ার মতো খারাপ হয়নি।’

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন গবেষকদের প্রায় সবাই সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল এবারের বাজেটের প্রধান ফোকাস হবে মহামারীর ধকল থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও করোনাসৃষ্ট নতুন দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারী কর্মসংস্থানকে নগদ প্রনোদনা দিয়ে উৎসাহিত করা যাতে কর্মসংস্থানের বড় উৎসটি আবারও নতুন চাকরি সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নগদ অর্থ সহায়তা দিয়ে বাজার চাহিদাকে বৃদ্ধি করা। এবং ১৯২৯ সালে গ্রেট ব্রিটেন থেকে শুরু হওয়া মহামন্দা থেকে বাঁচানোর যে কৌশল অর্থনীতিবিদ জন ম্যানার্ড কেইনস দিয়েছিলেন তা ২০০৮ সালে শুরু হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ২০১১ সালে সুনামিতে ধবসে যাওয়া জাপানের অর্থনীতিও একই তরিকায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এখন একটা কেইনসীয় ধারার বাজেট প্রণয়ন করে ব্যাপক জনগণকে সাথে নিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করবেন সেটাই ছিল প্রত্যাশিত।

এই ফাকে চলুন দেখে আসি বাজেটের প্রধান ইনডিকেটরগুলো কি অবস্থায় আছে।

১) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিঃ গেলো প্রতিটি বছরেই বাংলাদেশের বাজেটের অগ্রাধিকার ছিল যেকোন মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার উর্ধমুখী রাখা। চলমান বাজেট বা সদ্য বিদায়ী বাজেটেও অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা স্বত্ত্বেও ৮.২ শতাংশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল যদিও সরকার দাবি করছে ৫.৩ শতাংশ ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.২% শতাংশ যেটাকে যৌক্তিক বলা যায় যদিও এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথ মনে হয় সচেতনভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

২) মূল্যস্ফীতিঃ বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিগুলোতে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ে সচরাচর উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেশ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যদিও এর প্রধান কারণ মানুষের হাতে টাকা নেই যেটি উদ্বেগজনক। কারণ অর্থনৈতিক মন্দার শুরুটা হয় এভাবেই। অধিকাংশ মানুষের আয় কমে গেলে তাদের খরচও কমে যায় এবং এতে করে অর্থনীতিতে সামষ্টিক চাহিদাও কমে যায়। তাই সাম্প্রতিক নিম্ন মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতার কারণে নয় বরং বাজার চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সেটা সুস্পষ্ট। এ প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৩ শতাংশ যৌক্তিক যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৫.৪ শতাংশ।

৩) বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বার্ষিক হিসেবে ১২ শতাংশ বেশি হলেও, ২০০৯-১০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের বরাদ্দের গড় বৃদ্ধি ১৭ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। ২০২১-২২ অর্থবছরের সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের ৩ শতাংশের চেয়ে বেশি। সব হিসেবেই, এ বরাদ্দ অপর্যাপ্ত। এই বরাদ্দের মাধ্যমে ২০২৩-২০২৪ সালের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে প্রত্যাশা করছে সরকার। এটা কিভাবে সম্ভব করা হবে সে বিষয়ে তো কোন দিকনির্দেশনাও নেই বরাদ্দও নেই।

৪) নতুন দরিদ্র হওয়া বেশিরভাগ মানুষই অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। করোনা শনাক্তের হার বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন সময় যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তাতে যে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর কোনো লকডাউন যেন না দিতে হয়, তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা। কিন্তু, এ বিষয়টি নিয়েও আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপের কথা বলতে পারেননি কামাল। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, ‘গণটিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব।’

পর্যায়ক্রমে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার একটি পরিকল্পনা সরকারের আছে বলে জানান তিনি। কিন্তু, কখন? এ ব্যাপারে একমাত্র যে ইঙ্গিতটি তিনি দিয়েছেন তা হলো, প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু এতে করে এক বছরে ৩ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। অন্তত ১২ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার জন্য আরো ৪ বছর লেগে যাবে যা আসলেই ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো।

৫) জীবিকা বা কর্মসংস্থানের বিষয়ে এ বাজেট বেশ হতাশই করছে। বাজেটে এমন কিছুই নেই, যা দেখে বোঝা যায় যে বর্তমানে মানুষের চাকরি বাঁচানোর বা কর্মসংস্থান তৈরির ব্যাপারে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করা হয়েছে।  এখন পর্যন্ত সরকারি কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারার জন্য অর্থমন্ত্রী ভূয়সী প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। বর্তমান পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের নড়বড়ে অবস্থায় কেউ সঠিক চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আশা না করলেও তিনি যেভাবেই হোক ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী (বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ প্রতি মাসে পাঁচ হাজার ১২৫ কোটি টাকা) ও প্রায় সাড়ে ছয় লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (পেনশন বাবদ মাসে এক হাজার ৯১৭ কোটি টাকা) আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য দেখানো হয়নি। এমনকি তাদেরকে এমন একটি সময়ে বৈশাখী বোনাস (মূল বেতনের ২০ শতাংশ) দেওয়া হয়েছে, যখন করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সংক্রমণের হার বেড়ে গিয়েছিল এবং পহেলা বৈশাখের বেচাকেনা ও সব ধরনের উদযাপন স্থগিত করা হয়েছিল।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে কর্মরত ৭৫ লাখ মানুষ যেন শুধু দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। সরকার ২২ লাখ করদাতা জনগোষ্ঠীর সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ যত্ন নিতে পারেনি। এই জনগোষ্ঠীর ৮৬ শতাংশই বেসরকারি খাতে কর্মরত। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে মাত্র তিন লাখ করদাতা আছেন, এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই বিষয়টি কি সরকারের অন্যায্য আচরণ নয়? যারা বেসরকারি খাতে চাকরি অথবা ব্যবসা করে কর দিচ্ছেন, তারা চোরাবালিতে আটকে থাকছেন। শুধুমাত্র তাদেরই চাকরি যাচ্ছে, শুধুমাত্র তাদের বেতন কাটা যাচ্ছে অথবা তারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। যদি করদাতারা সংকটের সময় সুরক্ষা না পান, তাহলে তারা কেন কর দেবেন?

রাষ্ট্রের জনগণ আইন ও সংবিধানের চোখে সমান। সার্বিক বিবেচনায় এমন একটি ভয়াবহ মহামারির সময়ে সব নাগরিকদের জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৬) ) দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দুটি কৌশল নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ ছিল। একটা হচ্ছে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কৌশল, কারণ যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছে তাদের অধিকাংশই অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারাই এখন বেশি ভুগছেন। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকেও তারা বেশি সুবিধা পাননি। ২০২১২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতকে পুনরায় সচল করতে সরাসরি কোনো নগদ প্রণোদনার প্রস্তাব আসেনি। এ খাত সংশ্লিষ্ট লাখো লোক কাজ হারালেও, বাজেটে সরকার কেবল স্বল্প আকারে কিছু কর মওকুফের প্রস্তাব করেছে।

কিন্তু কর মওকুফ তখনোই প্রযোজ্য হবে যখন তাদের টার্নওভার একটি পর্যায় অতিক্রম করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লোকজনকে বাজারে ফেরানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানে এই কর মওকুফ মনে হয় না খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বরং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১-২২ সালের বাজেট প্রস্তাবনায় এ খাতে এর আগের এক লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। গত বছর করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হলে সিএমএসএমই ও অনানুষ্ঠানিক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, এ খাতগুলোতে আগের প্রণোদনা প্যাকেজগুলো খুব একটা কাজে লাগেনি।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মহামারির আগের ৩০ লাখ বেকার যোগ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে দেশের প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ লোক গত বছর কর্মহীন হয়েছেন, যা দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় এক পঞ্চমাংশ।’ এর মধ্যে বেশিরভাগ লোক কাজ হারিয়েছেন এই এসএমই খাতেই।

৭) ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যে করছাড়ের প্রস্তাব এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নির্দিষ্ট কিছু হোম অ্যান্ড কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতির প্রস্তাব বেশ প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু, বর্তমানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি খুব বেশি প্রয়োজন এবং এগুলোর একটিও এখন এ সুযোগ তৈরি করবে না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, একজন নিওকনজারেভেটিভ উৎসাহীর মতো অর্থমন্ত্রী সবকিছু স্রষ্টার উপর ছেড়ে দিয়েছেন এবং আশা করছেন, তার ঘোষিত কর ছাড়ের বিনিময়ে বেসরকারি খাত নিজেই এ সমস্যার সমাধান করে নিবে। তবে, ইতিহাস ও কেইনেসিয়ান অর্থনীতি বলছে, কোনো মন্দা থেকে বের হতে হলে, ব্যয়ের মাধ্যমেই বের হতে হয়। যুক্তি অনুসারে, ব্যয় কমে গেলে আয় কমে যায় এবং আয় কমে গেলে ব্যয় কমে যায়। এ দুষ্টচক্রটি ভাঙা দরকার।

এর একটি উপায় হতে পারে কর ছাড়ের মাধ্যমে ব্যবসা ও ব্যয় বাড়ানো। আরেকটি উপায় হতে পারে সরকারি ব্যয় বাড়ানো। আর্থিক দায়িত্বকে এক পাশে রেখে ‘ব্যয়, ব্যয় এবং ব্যয়ের’ পরিকল্পনা গ্রহণের যদি কোনো উপযুক্ত সময় থেকে থাকে, তবে এবার সেই সময় ছিল।

বাংলাদেশের জিডিপি অনুপাত এবং তহবিল দেওয়ার ক্ষেত্রে উন্নয়ন অংশীদারদের আগ্রহকে কাজে লাগানোর রাস্তাও সরকারের জন্য নিশ্চিতভাবেই খোলা ছিল। প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপির এ বাজেট দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও কম। যদিও, আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব দেশ বাংলাদেশের মতো স্বস্তিকর অবস্থানে নেই।

৯) চার কোটি শিক্ষার্থীর যে শিগগিরই ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা বিবেচনা করে আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দ বাড়ানো উচিত ছিল। অনেক শিক্ষার্থীই প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে ভার্চুয়াল ক্লাস করতে পারছে না এবং ঝরে পড়ছে। আর যদি সরাসরি ক্লাস করা শুরু করা সম্ভবও হয়, সামাজিক দূরত্ব মানতে হলে একই পড়ার জন্য আরও বেশি সেশনের দরকার হবে।

মোদ্দা কথা, বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার এ খাতে। কিন্তু, জিডিপির শতাংশ হিসেবে শিক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশেই আটকে আছে। জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশের বয়স ২৪ বছরের কম, এমন একটি দেশের জন্য বিষয়টি হতাশাজনক।

মহামারীতে অর্থনীতি চলবে শর্ট রানে, প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে এবং প্রতিদিনের জীবন জীবিকার সংস্থান করাই সময়ের দাবি। বাজেট বিতর্কে এই বিষয়গুলোর আমূল রিভিশন হবে এবং সার্বিকভাবে মহামারী মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি রক্ষায় সামগ্রিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করছি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন