মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ


ছোটবেলা থেকেই আপনাকে শেখানো হয়ে থাকতে পারে, অল্পতেই সুখে থাকতে হবে বা যতটুক আছে তার মধ্যে থেকেই সুখে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারণ বস্তুগত সম্পদ কখনোই আপনাকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে না। এই প্রেক্ষাপটেই যেন সুখের বাতিঘর হিসেবে পৃথিবীকে পথ দেখাতে চলছে হিমালয়ের পাদদেশের ছোট্ট সুন্দর দেশ ভুটান। পৃথিবীর ২২ তম সুখী এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত। আজকে আমরা কথা বলবো ভূটানের অর্থনীতি ও কিভাবে ভূটান উন্নয়ন দর্শনের পরিবর্তনে গোটা বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে, ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত পাহাড় ঘেরা একটা ছোট দেশ ভুটান। তাদের উত্তরে চীনের তিব্বত এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশিমে ভারত। প্রাচীনকাল হতে দেশটি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল যেমন, ভোটান, ভুতানিস, ভোটানটার ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে ভুটানের নামকরণ হয়েছে সংস্কৃত শব্দ ভোতাস্তা থেকে। ভোতাস্তা শব্দের অর্থ তিব্বতের শেষ প্রান্ত। কিন্ত সবচেয়ে প্রচলিত অর্থে, ভুটান শব্দটি এসেছে ভু এবং উত্থান এই দুইটি শব্দ থেকে। যার অর্থ উঁচু ভূমি। তবে ভুটানি জনগন নিজেদের মাতৃভাষা ‘জংখা’য় নিজেদেরকে ‘দ্রুক-উল’ নামে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এর অর্থ হচ্ছে ‘বজ্র ড্রাগন’ এর ভূমি। 

ভুটানের মোট আয়তন ৩৮,৩৯৪ বর্গ কিলোমিটার বা ১৪,৮২৪ বর্গমাইল। আয়তনে ভুটান পৃথিবীর ১৩৩ তম বৃহত্তম দেশ। ২০১৯ সালের জাতিসংঘ ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রস্পেক্টাসের হিসেব অনুযায়ী ভুটানের জনসংখ্যা ৭৫৪৩৮৮ জন। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ফ্যাক্টবুক এর ২০২১ সালের জুন হিসাব অনুযায়ী ভূটানের জনসংখ্যা ৮৫৭,৪২৩জন। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব মাত্র ১৯ জন। ভুটানের রাজধানী থিম্পু পৃথিবীর একমাত্র রাজধানী যেখানে কোন ট্রাফিক লাইট নেই।

ভুটান বহির্বিশ্ব থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল অনেকটা সময়। নিজেদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সুরক্ষণ ভুটানিজদের কাছে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালন করতেই যেন এরা বহির্বিশ্ব থেকে নিজেদের আলাদা রাখতে পছন্দ করে।

অবশ্য এর জন্য দেশটিকে কম মূল্য দিতে হয়নি। ভূটানেও আজকের মায়ানমারে যেরূপ এথনিক ক্লিনজিং এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে তদ্রূপ নেপালী বংশোদ্ভূত ভুটানি লুতশাম্পাদের জোরপূর্বক দেশছাড়া করা হয়েছে। লুতশাম্পাদের অপরাধ ছিল তারা নিজেদের পোশাক, ধর্ম, ও সংস্কৃতি চর্চার গণতান্ত্রিক অধিকার দাবি করেছিল। আনঅফিশিয়াল হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৮ সালের আদমশুমারিতে লুতশাম্পারা মোট জনসংখ্যার ৪৫% ছিল। লুতশাম্পাদের তাড়ানোর জন্য ভূটান “ওয়ান নেশন, ওয়ান পিপল” নামে একটা রেসিস্ট পলিসি করে যেখানে ড্রুকপা জনসংখ্যার আধিপত্যকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অথচ দেশটিতে ৪০০ বছর ধরে লুথশাম্পারা বসবাস করে আসছিল এবং ১৯৫৮ সালে তাদের পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯০ সালের দিকে চূড়ান্ত জাতিগত দাঙ্গায় ভূটান থেকে ১ লক্ষের অধিক নেপালীকে রাষ্ট্রহীন করে বহিস্কার করা হয় যারা রোহিঙ্গাদের মতো হয় নেপালে জাতিসংঘের ক্যাম্পে বসবাস করছে নয় ইউএনএইচসিআর কর্তৃক উত্তর অ্যামেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার পুনর্বাসিত হয়েছে।

১৯৭৪ এর আগে ভুটানে বাহিরের পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ্ব ছিল। আরো নিষিদ্ধ ছিল টিভি, মোবাইল, পোস্টাল সার্ভিস, কিংবা আধুনিক প্রযুক্তিগত সামগ্রী। ১৯৭৪-এর দশকে প্রথমবার বিদেশ পর্যটকদের প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হয় এবং কেবল ২০১৯ সালেই দেশটিতে ৩ লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করেছে। ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মত দেওয়া হয় ইন্টারনেট ও টেলিভিশন ব্যবহারের অনুমতি। তবে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় তারা ঐতিহ্যগতভাবেই যথেষ্ট এগিয়ে। যেমন- ১৯৯৯ সাল থেকে ভুটানে পলিথিন নিষিদ্ধ। দেশটির ৬০ শতাংশজুড়ে বনভূমি। মেশিন এবং কিটনাশক ব্যবহারে অনাগ্রহ তাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর প্রথম অর্গানিক দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এর ফলে ভুটানের কার্বন নিঃসরণ ও নেতিবাচক। এর অর্থ হচ্ছে ভুটানে যত কার্বন নির্গত হয় তারচেয়ে বহুগুণ শোষিত হয়। বলাই বাহুল্য তারা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুখী দেশ।

ভূটানের অর্থনীতিঃ

Bhutan GDP per capita

২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী ভূটানের মোট জিডিপি ২.৪১ বিলিয়ন ডলার ও মাথাপিছু আয় ৩,০০৭ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার উঠানামা করছে ৫ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে এবং সাম্প্রতিককালে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করছে। এ প্রেক্ষাপটে মাথাপিছু আয় এবং মোট জিডিপি দুই সূচকই নিম্নমুখী।  আয় বৈষম্য মাপার সূচক গিনি সহগে ৩৭.৪ স্কোর নিয়ে ভূটান মধ্যম ক্যাটেগরিতে রয়েছে। অন্যদিকে মানব উন্নয়ন সূচকে ভূটান .৬৬ স্কোর নিয়ে মধ্যম অবস্থানে আছে ও এই সূচকে দেশটি দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে।

Bhutan GDP Annual Growth Rate

ভুটানের জাতীয় মুদ্রা গুলট্রাম যেটির মূল্য ভারতের কারেন্সি রুপির সাথে বেঁধে দেওয়া আছে। অর্থাৎ ভারতের মুদ্রার মানের সাথে ভূটানের মুদ্রার মান ফিক্সড করে দেওয়া। তাছাড়া দেশটিতে ভারতীয় রূপি দিয়েও লেনদেন করা যায়। ভূটানের অর্থনীতি এই শতকের শুরুর দিকে তালা হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার স্টেশনের কারণে এক লাফে অনেকদূর এগিয়ে গেছে এবং ১০% এরও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ভূটানের অর্থনীতি মূলত কৃষি, বনজ সম্পদ, পর্যটন ও পানিবিদ্যুৎ এর উপর নির্ভরশীল। মোট জনসংখ্যার ৫৬% এখনো কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভরশীল। ভূটান টেকনোলজিতেও ভালো করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে থিম্পু টেকপার্ক শুরু করেছে যারা ভূটান ইনোভেশন এন্ড টেকনোলজি সেন্টারের মাধ্যমে প্রযুক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগগুলোকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

Bhutan Government Budget

ভূটানের ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলাপ আলোচনা বা হাইপ তৈরি হয় এবং মাথাপিছু আয়কেই উন্নয়নের প্রধানতম সূচক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যদিও সময় অনেক পাল্টেছে গত কয়েক দশকে। দক্ষিণ এশিয়ার দুই রত্ন – ভারতের অমর্ত্য সেন ও পাকিস্তানের মাহবুবুল হকের হাত ধরে উন্নয়ন এখন হিউম্যান ডেভলাপমেন্ট সূচক বা মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। তবুও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপি প্ররবৃদ্ধিকে এখনো অনেক গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। ব্যাতিক্রম নয় বাংলাদেশও। এখানে রাজনীতিবিদদের কাছে বুঝে কিংবা না বুঝে জিডিপি হয়ে গেছে এক বাজওয়ার্ড বা বহুল ব্যবহৃত শব্দ। কিন্তু জিডিপির সাথে যে কোন দেশের মানুষদের ভালো থাকা বা না থাকা নির্ভর করে না সেটা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত।

জিডিপিকেন্দ্রিক এই উন্নয়নের পরিমাপ যদিও একটি দেশের জনগনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য তুলে ধরতে পারে না তবুও সাহস করে কোন দেশ তা থেকে বেরুতে পারেনি। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো ভুটান। ভুটান একমাত্র দেশ, যারা মোট দেশজ উৎপাদন দিয়ে দেশের সফলতা পরিমাপ না করে মোট জাতীয় সুখ দিয়ে তা পরিমাপ করে থাকে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের সুশান্তি খুজে পাওয়া যায়না সব সময়। এই উন্নয়নের সুফলের সমান ভাগীদার সবাই হয়না। তাই ভুটানে জীবনযাপনের মান বিচার করা হয় গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (GNH)-এর মাধ্যমে।

কিন্ত কি এই GNH এবং কেন আসল এই ধারণা। আজ থেকে পাঁচ দশক আগে, ভুটানের তৎকালীন রাজা, জিগমে সিং ওয়াংচুক এর ব্রেইনচাইল্ড হচ্ছে GNH। ১৯৭০ সালে জিডিপির পরিবর্তে তিনি জিএনএইচ এর প্রবর্তন করেন। GNH এর মূল তত্ত্ব ছিল, অর্থনিতির সূচক দিয়ে কোন জাতির প্রবৃদ্ধি পরিমাপ করা যায়না তাই সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এর জন্যে প্রয়োজন জীবনের সার্বিক দিক থেকে বিবেচনা। জনগনের মঙ্গল এর জন্যে অর্থনৈতিক মাপকাঠি ছাড়াও অ-অর্থনৈতিক প্রপোঞ্চগুলোকে সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। কারণ প্রথাগত উন্নয়নের মাধ্যমে অন্যান্য দেশ আধুনিক যুগে প্রবেশ করলেও, তারা একটা প্রত্যয়কে বরাবরই উপেক্ষা করে যাচ্ছিল। সেটা হচ্ছে হ্যাপিনেস বা সুখ-শান্তি।

কিন্ত GDP তো সংখ্যায় প্রকাশ বা পরিমাপ করা যায়। কিন্ত সুখ তো সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবেনা। নাকি যাবে? তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সুশাসন, এ চারটির প্রপঞ্চ থেকে GNH সূচক নির্ধারন করে। যেহেতু মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দের ওপর নির্ভর করে ভুটানের অর্থনীতির সূচক তাই এর পরিমাপ করার প্রক্রিয়াও কঠিন।

GNH এর প্রয়োগের লক্ষে ১৯৯৮ সালে ভূটান সরকার Center for Bhutan Studies and Gross National Happiness (CBSGNH or CBS) প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রতিষ্ঠানটি শুধু GNH নিয়েই কাজ করে। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস ইনডেক্স তৈরি করা এবং এই সূচক নির্ণয়ে যথার্থ নির্দেশক ও খুজে বের করা যেন সরকার এই বিষয়ে কাজ করতে পারে। এই তত্ত্ব প্রবর্তনের পর থেকে ভুটানি স্কলাররা এটা নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। তারা আলকার-ফস্টার (Alkier-Foster) তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে জিএনএইচ সূচক নির্ণয় করেন।

মূলত আলকার ফোস্টার মেথডোলজির ওপরে ভিত্তি করে জিএনএইএইচের ধারনাটি আসে দারিদ্রতা এবং জনগনের মঙ্গল পরিমাপকের জন্যে এটা একটা তত্ত্ব যা সহজে প্রয়োগ করে যায় তত্ত্বটি ফ্লেক্সিবল হওয়ায় একটা নির্দিষ্ট ঘটনায় একে বহুমাত্রিক উপায়ে প্রয়োগ করা যায়

যেহেতু তত্ত্বটি বহুমাত্রিক তাই জিএনএইচ সূচক তৈরীর লক্ষে কাজ করতে যেয়ে CBSGNH এই তত্ত্বের চারটি মূল স্তম্ভের প্রবর্তন করে।

১। সুশাসন

২। টেকসই উন্নয়ন

৩। সংস্কৃতির সুরক্ষা ও উন্নয়ন এবং

৪। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ

কিন্ত শুধু এই চারটি মাত্রার প্রণয়ন করেই থেমে ছিলনা ভুটান। ২০০৮ সালে সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেকটা আইন প্রনয়ণকারী কর্তাব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যেকোন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই চারটি বিষয়ে বিবেচনায় রেখে প্রণয়ন করতে হবে। পরবর্তিতে GNH কে আরও বিস্তৃভাবে বোঝাপড়ার জন্যে এবং ইনডেক্স তৈরীর খাতিরে এই চারটি মূল বিষয়কে বর্ধিত করে ৯ টি ডোমেইন নির্ধারন করা হয়।

GNH ইনডেক্স কে আরো বিস্তারিতভাবে এবং বিভিন্ন ভাগে দেখা যায়।

ডোমেইনগুলো হলঃ

মানসিক সুশান্তি

স্বাস্থ্য

সময়ের সদ্বব্যবহার

শিক্ষা

সংস্কৃতির বৈচিত্র এবং শক্তি

সুশাসন

সম্প্রদায়ের একতা

প্রতিবেশের বৈচিত্র এবং স্থিতিস্থাপকতা

জীবনযাত্রার মান

ভুটানের উন্নয়নকে বুঝতে হলে এই ৯ টি ডোমেইনকেই সমান ভাবে দেখতে হবে। এবং এর ফলে উন্নয়নের বহুমাত্রিকতা আরো ফুটে ওঠে আমাদের সামনে। এই ৯ টি ডোমেইনই সমান তাৎপর্যপূর্ণ। কোনটার গুরুত্ব কোনটার থেকে বেশি বা কম নয়। এই ৯টি ডোমেইন একত্রিত হয়ে গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস বা ভুটানের সুখ শান্তির একটা বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে। এবং এই ৯টি ডোমেইনের মাধ্যমেই GNH ইন্ডেক্স এর কাঠামোটি দাঁড়ায়।

১৯৭০ সালে প্রথম এই GNH এর ধারনা আসলেও তার ফলাফল প্রথমবারের মত দেখা যায় ২০১৫ সালে। উপরোক্ত ডোমেইনের ওপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালে CBSGNH দেশটির প্রথম GNH index report প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেরিং টবগে।  A Compass Towards a Just and Harmonious Society নামক এই রিপোর্ট-এ দেখা যায়, যেসকল মানুষ এই সার্ভেতে ৫০ শতাংশের কম ডোমেইন-এ সক্ষমতা অর্জন করেছে তারা ‘অসুখী’। যারা ৯ টি ডোমেইন অনুযায়ী ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ সক্ষমতা অর্জন করেছে তারা ‘কিছুটা সুখী’। এবং যারা ৬৬ থেকে ৭৬ শতাংশ ডোমেইনে সক্ষমতা অর্জন করেছে তাদের বলা হবে ‘পর্যাপ্ত সুখী’। এবং একদম শেষে যারা ৭৭ শতাংশ অথবা তারচেয়ে বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে অর্থাৎ ৭ বা তার চেয়ে বেশি ডোমেইনেই সক্ষমতা অর্জন করেছে তারা ‘সবচেয়ে সুখী’ রয়েছে বলে ধরা হবে।

২০১৫ এর ইনডেক্স অনুযায়ী ভুটানের ৮.৪ শতাংশ জনগন সর্বোচ্চ সুখী রয়েছে। ৩৫ শতাংশ জনগন হচ্ছে পর্যাপ্ত সুখী। ৪৭.৯ শতাংশ কিছুটা সুখী এবং ৮.৮ শতাংশ অসুখী।

GNH ভুটানের একটা বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে। কারণ এর মাধ্যমে শুধু একটা মাধ্যমেই উন্নয়নের উন্নয়ন প্রকাশ হচ্ছে এমন নয়। উন্নয়ন এবং এর প্রভাব হয়ে আসছে বহুমাত্রিক। এখানে শুধু নিজের সুশান্তিই নয় বরং কালেকটিভ হ্যাপিনেসটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ইনডেক্স এ দেখা যায় ৯১ শতাংশ জনগনই ৯ টি ডোমেইনের ৫০ শতাংশের বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। উন্নয়নের এই ধারনাটি শুধু সূচকেই যে অস্তিত্ব রয়েছে এমন নয়। এই সময়ে ভুটানের জনগনের জীবনের মান যেমন উন্নয়ন হয়েছে তেমনি অশিক্ষার হার কমে এসেছে।

ভুটানের সুখে থাকার এই বার্তা শুধু তাদের আদর্শই নয়, সকলের জন্যেই হয়ে উঠতে পারে একটি শিক্ষা। আমরা যে বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন রিজাইমে আছি সেখানে কোনভাবেই জিডিপিকেন্দ্রিক ধবংসাত্মক অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ এটা প্রমাণিত যে জিডিপি বাড়লেই মানুষ ভালো থাকে না। একটি জাতির অর্থনৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে ছুঁয়ে যাওয়া। সে প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর দেশগুলো যতো দ্রুত ভুটানের উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করতে পারবে ততো সহজ হয়ে আসবে মানুষের জীবনধারা।

https://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDVfMThfMTNfNF8yNl8xXzQxMzE0
https://en.wikipedia.org/wiki/Bhutan

http://statisticstimes.com/ranking/global-peace-index.php

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন