মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ


Photo: Humayun Ahmed

পাঠককে বইমুখী করা বা বইয়ের বাজার বৃদ্ধি করা- এগুলো সাহিত্যের কাজ না। সাহিত্য ব্যবসায়ীর কাজ হতে পারে। যেমন, বিপননে যারা জড়িত। এমনকি মিডিয়া। পাঠককে বইয়ের দিকে আকৃষ্ট করার কাজ সারা দুনিয়ায় প্রকাশকগণ ও তাঁদের বিপনন মাধ্যম করেন। নানান ভাবেই করেন। যেই লেখক বাজার টার্গেট করে বা পাঠকের তুলতুলে আগেবকে উপজীব্য করে বা প্রকাশকের চাওয়া অনুযায়ী লেখেন তাকেই বেস্ট সেলার (বাজারি লেখক) বলে। বাইরের দুনিয়ায় বেস্ট সেলার বুক আর আকাডেমিক বুকের পরিস্কার ফারাক থাকে। এই দেশে কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ে সবাই। বিষয় তো আলাদা। শুধু সাহিত্য না, আজকাল টেকনলজি বা মোটিভেশন বা বিজ্ঞান ইত্যাদির জনপ্রিয় শাখাও বেশ রমরমা।

হুমায়ুন আহমদ নিজেকে কখনও সাহিত্যিক দাবি করেননি আমার জানা মতে। উনি নিজেকে ‘বেস্ট সেলার রাইটার’ ভাবতেন ( তাঁর অনেক সাক্ষাৎকারেই বলেছেন সরাসরি)। এখন ওনার ভক্তকূল জোর করে ওনাকে সাহিত্যিক বানাইতে চান। এখানেই লাগে প্যাচ। তখন জনপ্রিয়তার সাথে শিল্পের সম্পর্ক বা বই বিক্রির সাথে লেখার মানের তুলনা চলে আসে স্বাভাবিক ভাবে। এবং সেই সাহিত্যের আলাপ তুলতে গেলে ভুক্তকুল মধ্যবিত্ত, নন্দিত নরকে, টিভি নাটক ইত্যাদি অসংলগ্ন সব কথা বার্তা বলতে থাকেন। যা সাহিত্যের নিক্তিতে মাপা যায় না।

হুমায়ুন আহমদের প্রথম যে বই পড়েছিলাম সেটার নাম ছিল ‘তিতলি বেগম’। একটা ছোট মেয়ে পিপড়ার কাহিনী। এটা আমার কাছে এখনও সবচেয়ে প্রিয়। এরপরে হয়ত অনেক পরে ‘নন্দিত নরকে’ বা ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’ বা ‘অপেক্ষা’ বা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’- এই বই গুলো ভালো লেগেছিলো। ( ২৫ বছর দূরের স্মৃতি থেকেও এই কয়টা বইয়ের কাহিনীর নির্যাস বলতে পারবো সম্ভবত)। তিনি দুইটি সাইন্স ফিকশন অসামান্য লেগেছিল (অথচ তিনি সিরিয়াসলি সাইন্স ফিকশন আর না লিখে তাঁর ভাইকে শাখাটা দান করেছেন)।

আরও কয়েকটা বইয়ের নাম মনে পড়ছে এই মুহুর্তে, মানে এগুলোও ভালো লেগেছিলো; নীলরতন হাইস্কুল, গৌরিপুর জংশন, ইস্টিশন ( নাম ভুল হতে পারে স্মৃতির ভরসায় লিখলাম)।

ঠিক করেছিলাম হুমায়ুন আহমদকে নিয়ে কিছুই বলবো না। তাঁর মাজারের খাদেমদের হাতে নানান সময়ে অনেক হুমকি পেয়েছিলাম। গত দুই বছর তেমন বলিনি।

ওনার ভক্তরা ভক্তি দেখিয়েই খালাস। লেখালেখি নিয়ে আলাপ করেন না। লেখালেখি বা জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা তুললে ওনারা বইয়ের বাজার বাড়ানো বা পাঠক তৈরি ইত্যাদি অদরকারী আলাপে যান। এবং দীর্ঘদিনে দেখেছি তাঁদের বুঝের ধরণে তাঁরা সাহিত্যের ‘মুতাজিলা ঘরণার’ এবং বেশ উগ্র এবং অস্থির। যেন হুমায়ুনের সমালোচনা করলে নিজেরে ‘এলিট দাবি করা’ বুঝায় বা হুমায়ুন পড়াকে ‘নিচু চোখে দেখা’ বলা হয়। আসলে এর কোনটাই না। কারণ বই অনেক রকমের।

পাঠক অনেক রকমের। এবং বইয়ের উপযোগিতাও অনেক রকমের। ওনার প্রায় সব বই (শেষ ৪/৫ বছরের কিছু বই বাদ থাকতে পারে) পড়েছি একসময়। কিশোর কালে বেশি পড়ার তালিকায় মাসুদ রানা, অনুবাদ, ওয়েস্টার্ন, সেবার বই, আর হুমায়ুন ছিলেন। মানে চানাচুর বা চকলেট বা আচারের মতই লাগতো (কিছু কিছু বই এখনও লাগে ওয়েস্টার্নের)।

আমি হুমায়ুন পড়েছি তো বটেই, তাঁর অনেক পাঁড় ভক্তের চেয়ে বেশি পড়েছি। কিন্তু হুমায়ুনের বই পড়ে বই পড়ার অভ্যাস হয়নি। বা তাঁর বই পড়ার পরেও জ্যোস্না বা বর্ষার বৃষ্টি বা কদম ফুলের প্রতি আমার দিলে আলাদা কোন তাছির পড়েনি।

মজার ব্যাপার হলো আজ সম্ভবত হুমায়ুন আহমদের জন্ম বা মৃত্যু দিবস হবে। যেহেতু দিবসে বাধ্যতামূলক ভাবে সবাই পোষ্ট দেন, তাই জানা হয়ে যায়। যত জন যত পোষ্ট দিয়েছেন, সবাই যেন কৈফিয়ত দিচ্ছেন যে হুমায়ুনকে যেন লেখক হিসেবে খারিজ করা না হয়।হাহ হাহ হাহ। দুনিয়ায় কে কারে খারিজ করে?

তবে হুমায়ুনের সাহিত্য নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন লেখা পড়িনি। সবাই নুহাশ পল্লীর ভূত বা মাহফুজ বা রিয়াজ বা ( একজন সিলেটের দিকের গায়ক যিনি হাসন রাজার গান গেয়ে নাম করেছিলেন একদা) বা কেকা ফেরদৌসির হুমায়ুনের প্রিয় রান্নার কথা উল্লেখ করে।

হুমায়ুন আহমদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো, স্মরণীয় প্রায় কিছুই না লিখে উনি জনপ্রিয় হয়েছেন ( টিভি নাটকও বড় ভূমিকা রেখেছে)। দুনিয়ায় সর্বকালে সর্বদেশে জনতার রুচি নিম্নমানের- ( কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদে। এটাতে শিল্প সমালোচকদের ইজমা অনেক আগের। এবং দুর্ভাগ্যক্রমে এমন জনপ্রিয় লেখকরা মৃত্যুর আগেই মরে যান, কিন্তু হুমায়ুন মরেননি।

এটার কারণ ওনার লেখার অসামান্যতা না। আমাদের ( বাঙ্গালী সমাজের রুচির তারল্য) এবং এই ধারায় আরও অনেকে জনপ্রিয় হয়েছেন এবং হবেন। আরও একটা কারণ উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে ‘অশিক্ষিত’ এবং অদরকারী বই না পড়া জাতির মধ্যে এমন লেখা লিখেছেন যাতে বই পড়া হয় কিন্তু মাথার পরিশ্রম করতে হয়না। একহাজার পাতা পড়ার পর এক লাইন মনে করতে পারবেন না বা তিনশ বই পড়ার পরে পাঁচটা বইয়ের নাম করাও কঠিন।

( নির্বাচিত অংশ) হুমায়ুন আহমদ নিয়ে কিছু কথা / জাহিদুর রহিম ( ২০১৫)

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন