, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:০০ অপরাহ্ণ


অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানকে বুদ্ধিজীবী ভেবে অনেক পোলাপানকে বখে যেতে দেখেছি। ইউটিউব থেকে লেকচার মুখস্থ করে এমন ভাবে ঝাড়বে মনে হবে ল্যাকা কবর থেকে উঠে এসেছে। যদি চুপচাপ ধৈর্য্য নিয়ে শুনে প্রশ্ন করেন, এর পর কি? দেখবেন খেলা শেষ।

এদেশে অনেক অশিক্ষিত যেমন ভাবে ১৯৭১ থেকে দুনিয়ার ইতিহাস শুরু, তেমনি দর্শনের অনেক তালেবে এলেম ভাবে ল্যাকা বা ফুকো বা ফরাসি দার্শনিক দিয়ে দর্শনের শুরু। আফসোস। নকল বুদ্ধিজীবীতার খারাপ গুণ হলো যারা এটার লোভে পড়ে তাদের দশা পাকার আগে পোকায় খাওয়া ফলের মতো হয়। খাওয়ার অযোগ্য। এবং জীবনে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়। গুরু বলেছেন, যে ব্যক্তি একটা নির্দিষ্ট স্কুল অফ থটে বিশ্বাসী, তার থেকে দূরে থাকতে। এদের কাছে আদি ও অন্তের খবর থাকে না। কেবল মাঝের বয়ান। সক্রেটিস বলেছিলেন, যে জ্ঞান আদি ও অন্তের খোজ দেয় না, সেই জ্ঞান জ্ঞান নয়।

প্রফেসর সলিমুল্লাহ খানকে আমি খুব ভালো পাই। কখনো দেখা হয়নি বটে কিন্তু তাঁর বই পড়েছি ও কথা শুনেছি বিস্তর। খান সাহেবের এক বিরল প্রতিভা আছে। আলোচনার বিষয় যাই হোক, উনি ওনার সাম্প্রতিক পড়া যে কোন বিষয়ের যে কোন বইকে রিলেট করতে পারেন। সাথে আছে তাঁর প্রিয় দু চারজন লেখক যেমন ছফা, ফুকো, ল্যাকা, ফ্যানো ইত্যাদি। এতে কোন সমস্যা নাই। আমার ভালই লাগে। ওই যে কুমিরের খাঁচ কাটা খাঁচ কাটা রচনার মতো। প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান এর বিশ্লেষণ ছকে বাঁধা! মানে নির্দিষ্ট ছাঁচেই ফেলবেন তিনি সব। মিললে মিলল না মিললে নাই…এমন । তা সে যাই হোক!!

জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ব্যাখ্যায় প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান সাহেব “এক বিপন্ন বিস্ময়’- কে “অতি আনন্দের সাথে তুলনা [অতি আনন্দ’ (Jenseits des Lustpriûips বা Beyond the Pleasure Principle)] করেছেন। ‘উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা’ কে ফ্রয়েডের ভাষায় ‘থানাটোস’ বা বিরতি দেবতা। বাহ! জীবনানন্দ যেন ফ্রয়েড পড়ে পড়ে এমন ভাষার রুপান্তর করেছেন বা যেন ফ্রয়েড জীবনানন্দের সাইকো এনালাইসিস করছেন!! সলিমুল্লাহ সাহেব সাইকো এনালাইসিস পড়ান। জগতের সকল কথার ব্যাখ্যা তিনি জ্যাক লাকা / ফ্রয়ে্ড / মরিস মারলপাতি/ মিশেল ফুকো দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। মানে মাপা ছকে। মিললে মিলল …না মিললে নাই এমন.. সলিমুল্লাহ খান খারিজিপন্থী!! সব আলোচনায় কেবল ‘কেন না’ ‘কেন খারিজ’ তাই শুনি। কিন্তু বাতিলের পরে ‘তাহলে কি হতো ‘সেটা বলার স্তরে হয়তো উনি যাননি এখনো। কখনো গেলে খারিজের যোগ্য তার অন্তত একটা বই পেতাম। আশা করি লিখবেন।

সলিমুল্লাহ খান ও লোক সাহিত্য পুরস্কার গত বছর প্রফেসর খান লোক সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করলেন। ওনাকে অভিনন্দন। খান সাহবের পান্ডিত্য বা বাগ্মিতা নিয়ে আমার সন্দেহ নাই। কিন্তু মজাটা হল এটা সাহিত্য পুরস্কার। খান সাহেবের বই প্রায় সব ই আমার পড়া। ওনার লেখা গুলো প্রায় সব ই রাজনৈতিক সমালোচনা মুলক প্রবন্ধ। তো ওনাকে লোক কিসের উপরে ভিত্তি করে পুরস্কার টা দিল? সাহিত্যে কোন অবদানের জন্য- এটা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। পুরস্কারের জন্য তাঁর কোন কোন বই গুলো বিবেচনায় এসেছে? গল্প, উপন্যাস তো উনি মনে হয় লেখেন নি। বোধ হয় একটা বই আছে কবিতা। শুরুর বই। সেটর জন্য কি? পুরস্কার কমিটি যাকে ইচ্ছে পুরস্কার দিতেই পারে। আর সেভাবেই দেয় এই দেশে। অন্তত পরের বছর খান সাহেবকে সভাপতি করে পাবে।

সাদাত হাসান মান্টোর উপর প্রফেসর খান এর এক আলোচনা শুনলাম।গোটা আলোচনার তিন ভাগের এক ভাগও মন্টো নন। উনি কত ভাবে আলোচনার প্রসঙ্গ পালটালেন, কত অপ্রাসঙ্গিক ভাগে কত জনকে গালি দিলেন আর কত ভাবে আহমদ ছফাকে বড় লেখক বললেন কাজী নজরুল ইসলাম কে সাক্ষি করে পুরো যাত্রা খুব মজার। কেবল এতে মন্টোর সাহিত্য কিছু বুঝা গেলো না। তাতেও সমস্যা নাই। খান সাহেব বাগ্মী মানুষ। উনি প্রথমে প্রগতিশীল সাহিত্য সঙ্ঘের প্রসঙ্গ তুললেন উদ্দেশ্য সাজ্জাদ জহির কে গালি দিবেন। সেই সুত্রে অনুমিত ভাবে বুদ্ধদেব বসু , সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দের গুড়ি ও ছুয়ে দিলেন। সমান্তরাল ভাবে হুমায়ূন কবিরকে আনলেন নজরুল ও জসীম উদ্দিন প্রসঙ্গে। আনলেন জিন্নাহ ও আল্লামা ইকবাল। এমনকি এটাও বললেন ইকবাল যদি নিটসের চেয়ে বড় দার্শনিক হয় তবু তাকে দিয়ে কি করবেন?? কেননা ইকবাল, সাজ্জাদ জহির ও হুমায়ূন কবিরের মতো লোকজন যারা কালা পানি পার হয়ে বিলেতে বিদ্যে শিখেছে তারা তো এলিটপনা নিয়ে সাহিত্য ও সমাজ বিচার করে । নজরুল, ছফা বা মন্টো ভাগ্যিস বিলেত যায় নি!! ইকবাল যে জিন্নাহকে দেশভাগের পথ দেখিয়েছেন তাঁর সাক্ষি হিসেবে আয়েশা জালাল ও তাঁর বই আনলেন। আনলেন নেহেরু ও রাজা গোপালাচারিকে। ইকবাল সাহেব ও মওলানা মাদানির দার্শনিকতার দ্বন্দ্ব এর প্রসঙ্গ ও আনলেন। শেষে হযরত আল্লামা হসাইন আহমদ মাদানী রহঃ এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন। তত ক্ষনে ওনার বক্তব্যের নির্ধারিত সময় শেষ। খান সাহেবকে থামতেই হবে। তাই মাদানি রহঃ স্বপ্নের সাথে মন্টোর সাহিত্যের কি যেন মিল বলে থামলেন। আমার মনে করতে সময় লাগল কথা হচ্ছিল মন্টোকে নিয়ে। খান সাহেব নিজে সাহিত্যের কালা পানি পার হওয়া লোক। স্বয়ং মার্কিন ফেরত। উনি কেবল ধর্ম ও জিরাফে থাকেন না, জিরাফের পিঠে করে ঘোরেন। সেই জিরাফের আকার প্রকার ও বিশেষত্ব কি জিজ্ঞেস করলে উনি নিশ্চয় ফুকো বা অন্তত ছফা ভাইয়ের কথা থেকে আমাদের কিছু জানাবেন। সেসব শোনাও বেশ মজার। বুদ্ধিজীবী হতে হলে মৌলিক চিন্তা থাকবেই আমি তেমন দাবি করছি না। জ্ঞান চর্চা শেষ মেশ মজার। কোন কালো পানির পারে কখনো তাঁর সাথে দেখা হলে এই জিরাফের কথা জিজ্ঞেস করবো। সেই অপেক্ষায় থাকলাম।

প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান সাহেবের বই নিয়ে উচ্চাশা কোনকালেই ছিল না, ছিল কৌতুহল, যার উৎপত্তি তার অজ্ঞান ভক্ত কূল। সেই কৌতুহল বেচারা নিদারুণ ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছে ওনার সাম্প্রতিক বহি ‘প্রার্থনা’ তে। বইয়ের বিষয় বস্তু নিয়ে কিছু বললাম না, সেটা ধরলাম ওনার, আর ওনার প্রকাশকের নিজস্ব ব্যাপার, আমি বলি ভূমিকা লইয়া। খান সাহেব অহেতুক বস্তুহীন ভাবে ফ্যানাইতে পারেন না এই সত্য ওনার কোন শত্রু ও অস্বীকার করতে পারবেন না।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন