বুধবার, ১৫ জুন ২০২১; ১০:৪০ অপরাহ্ণ


ক্রীতদাসের হাসি পড়ে প্রথমে চিন্তা করলাম রিভিউ লিখে শুধু শুধু বাক্য ব্যয় করার কোন মানে হয় না। তারপর বইয়ের কোন এক পৃষ্ঠার কথোপকথনে আকৃষ্ট হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম না লিখব। তারপর আবার একঘেয়েমি কিছু সংলাপ পড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, লিখব না। তারপর একেবারে শেষের পৃষ্ঠার শেষ সংলাপটা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। কিছু লিখি।

বই: ক্রীতদাসের হাসি
লেখক: শওকত ওসমান

রচনাকালঃ ১৯৬২ (আইয়ুব খানের শাসনামল)

মূল কাহিনী: তখনকার বাগদাদের খলিফা হারুন আর রশিদ। একটা রাতের ঘটনাকে নিয়েই যত কেচ্ছা। সেই ঘটনাকেই নিয়ে নাটক সামনে আগায়। বাদশাহ একদিন তার খাসকামরায় দাঁড়িয়ে পুলকিত, স্বচ্ছ, নির্ভীক, নিজেকে ভুলিয়ে দেওয়ার মতো একটা হাসির শব্দ শুনতে পান। হাসিটা তার হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। হাসির উৎস খুজতে থাকে কিন্তু কোন হদিস মিলে না। পরেরদিন খলিফা আবার উৎকর্ণ। শুনলেন সেই মানব-মানবীরা হাসছে। রুমুঝুমু নিনাদ তরুলতার ক্রোড়ে, বাতাসের পাখনায়, পাখ পাখালিদের স্থির পালকের আবেশে, যখন –বসুন্ধরা হাস্যমগ্ন। পরদিন সেই হাসির খোজে খলিফা নিজেই বেড়োলেন।

সেই মানব-মানবীরা আর কেউ নয়, একজন তারই গোলাম বস্তিতে থাকে। অন্যজন বেগম সাহেবের বিশ্বস্ত দাসী। প্রাসাদের দাসী। গোপনে তারা ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ব্যভিচার করছে। খলিফার দৃষ্টিতে এটা মৃত্যু সমতুল্য অপরাধ। কিন্তু খলিফার ওই ক্রীতদাসের হাসিতে এতই আকৃষ্ট হয়েছে তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং বাগান বাগিচার আমির হয়ে বানিয়ে দিলেন। তারা গোপনে বিয়ে করেছিল, স্বয়ং বেগম সাহেবা এর স্বাক্ষী।

ওই ক্রীতদাস শান শওকত, ধন- দৌলত সব পেলেন। একদিনে গোলাম থেকে আমির বনে গেলেন। কিন্তু তার মুখে তার হাসিটা কেউ নেই। সে, এইসবের কিছুই চায় না। সে শুধু তার ভালবাসার মানুষকে চায়। কোনভাবেই তার মুখে হাসি ফেরানো গেলো না।

নাটকের সবচেয়ে মিস্ট্রিরিয়াস ও টার্নিং পয়েন্টটা হচ্ছে খলিফা ঐ ক্রীতদাসের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার জন্য বাগদাদের সবচাইতে সুন্দরী নারী বুসায়ানাকে পাঠান। সে এমন এক নারী বাগদাদের যে কাউকে সে ভুলিয়ে দিতে পারে। সবাই তাকে কামনা করে। বুসায়ানা ভেবেছে এই সামান্য এক ক্রীতদাসকে সে এক তুড়িতে নিজের করে নিবে।

এর জন্য সে বাজিও ধরেছে খলিফার প্রধান সহচর মশরুরের সাথে। যদি সে তাতারীকে (ক্রীতদাসকে) সম্মতি গ্রহনে অপারগ হয় তার গর্দান নেওয়া হবে। কিন্তু আফসোস! সে অপারগ হয়। তাতারীকে রাজি করাতে অক্ষম হয়। এই দুঃখে সে সেই রাতেই গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁসি দেয়। তাতারী তাকে হত্যা করেছে এই ভেবে তাকে কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস। শত অত্যাচারেও সে আসল ঘটনা প্রকাশ করে নি। এতে বুসায়ানার সম্মান হানি হবে এটা ভেবে। সেদিন রাতে কি হয়েছিল এই ঘটনা যদি সে প্রকাশ করে তাহলেই তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। খলিফা এই কথাও তাকে দেয়। যতই তাকে অত্যাচার, বেত্রাঘাত করা হচ্ছে প্রতিক্ষেত্রেই সে নিরুত্তর। সে নির্বাক হয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তার জবানীতে ভাষা নেই। এখানে বুসায়ানার সম্মানকে তাতারী নিজের জীবনের চেয়েও মূখ্য করে দেখেছে।

নাটকের শেষ উক্তিটা এমন- “শোন, হারুনর রশীদ। দীরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে। বান্দি কেনা সম্ভব! কিন্তু ক্রীতদাসের হাসি! না – না – না। হাসির মানুষের আত্নারই প্রতিধ্বনি।”

পাঠক প্রতিক্রিয়া: একদিন সব হাসিরই ময়নাতদন্ত হবে। ফরেনসিক রিপোর্টার এসে বলবে, ” সব হাসিগুলোই মিথ্যা”। সাহিত্য সমালোচকগণ মনে করেন আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকে ব্যঙ্গ করে এই সৃষ্টিকর্ম রচিত হয়েছিল।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন