, ১৩ জুন ২০২১; ৯:০৭ অপরাহ্ণ


বাংলাদেশের ৪৭ বছরে পদার্পনের প্রাক্কালে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছিলাম এমআইটি’র অধ্যাপক ডারেন আচেমোগলু এবং হার্ভাডের অধ্যাপক জেমস রবিনসনের লিখা Why Nations Fail: The Origin of Power, Prosperity, and Poverty বইটি। অর্থনীতি এবং রাজনীতির যুগপৎ সম্পর্ক নিয়ে লিখা এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালের মার্চে। ৫৪৬ পৃষ্ঠার বইটি অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুই দুনিয়ায়ই ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।

বইটির বাংলা অর্থ হয়, কেন রাষ্ট্রসমূহ ব্যর্থ হয়? কিন্তু আমার লেখায় আমি কেন’র পরিবর্তে কখন ব্যবহার করছি, উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট অবস্থাকে বিশ্লেষণ করা যার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ বিধায় বইটির একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ-বিবেচনা হাজির করছি এই প্রবন্ধে।

১৫ চ্যাপ্টারের বইটিতে লেখকদ্বয় কোন দেশের কিংবা রাষ্ট্রের সফলতা অথবা ব্যার্থতাকে দেখেন দেশটির অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় কিংবা সমন্বয়হীনতার ফল হিসেবে। এই বইয়ে দাবি করা হয়েছে যে, অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাক্টর উপস্থিত থাকলেও দুইটি দেশের মধ্যকার পার্থক্য প্রধানত তৈরি হয় তাদের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। একটি দেশ এগিয়ে যায় যখন তা ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে অল্প কিছু লোকের লুন্ঠন এবং ফায়দা লোটার হাতিয়ার হয় তখনই রাষ্ট্র ব্যার্থ হয়।

সাধারণভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান মানে হল এমন প্রতিষ্ঠান যেগুলো সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা নিশ্চিত করে, সবার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে, নতুন প্রযুক্তি এবং দক্ষতায় বিনিয়োগ করার পাশাপাশি সামগ্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নিশ্চিত করে।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা সাপোর্টেড হতে হয়। কারণ অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতাকে একটি প্লুরালিস্টিক বা বহুত্ববাদী উপায়ে বন্টন করে যাতে করে কিছুটা রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারে যেটি আবার মালিকানার অধিকার এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক বাজার অর্থনীতির পূর্বশর্ত। অন্যদিকে লুন্ঠক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে সেগুলো তাদের মত করে লুণ্ঠনকারী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।

আচেমোগলু একটা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেন যে, এই বইয়ের মৌল পয়েন্ট হল যে ধরণের জাতিগুলো (বিভিন্ন কারণে লেখক জাতি এবং রাষ্ট্রকে সমার্থক ধরেছেন) রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পেরেছে যেগুলো প্রতিটি নাগরিকের উদ্ভাবনী উদ্যম এবং সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা দান করে এবং তাদের সুষ্ঠু বিকাশে সাহায্য করে থাকে। তারা দেখিয়েছেন কিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিম ইউরোপের জর্জিয়া, উজবেকিস্তান কিংবা ইজরায়েলের সাথে আরব বিশ্বের পারফর্মেন্স আলাদা হয়েছে। কিংবা কিভাবে কুর্দিস্তান ইরাকের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিজেদের আলাদা করে পরিচিত করতে চায় এবং সে পরিচয়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত অর্জন করতে পারছে। এই পার্থক্যগুলোই লেখকদ্বয় ব্যাখ্যা করেন রাষ্ট্রসমুহের প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্য বিশ্লেষণ করে।

চীনের সাফল্য দেখাতে গিয়ে তাঁরা বলেন, ইতিহাসের শিক্ষা হল যথার্থ রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিও সঠিক হবে না। ঠিক এই কারণেই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সমন্বয় চীন করতে পেরেছে সেইটা অন্য কোন রাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারবে না। আচেমোগলুর মতে, চীন কমিউনিস্ট পার্টির অথোরিটারিয়ান হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এক্সট্রাক্টিভ বা লুণ্ঠনকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাকে একচেটিয়াভাবে কুক্ষিগত করতে পেরেছে এবং ব্যাপক পরিসরে সম্পদের সঞ্চালন করতে পেরেছে বলেই মূলত চীন একটি নিম্ন ভিত্তির প্রবৃদ্ধি থেকে একটি উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে।

 

কিন্তু লেখকের মতে, চীনের এই প্রবৃদ্ধি টেকসই নয় কারণ এটা ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’কে প্রোমোট করে না যেটি উদ্ভাবন এবং উচ্চ আয়ের জন্য অতীব দরকারী।  টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবন। উদ্ভাবনকে কখনোই ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না যেটি পুরাতনকে নতুনের দ্বারা প্রতিস্থাপন করে এবং রাজনীতির বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্ককে অস্থীতিশীল করে দেয়।

চীন যতক্ষন পর্যন্ত না ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন স্টেজে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত চীন তার প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে পারবে না। লেখকদ্বয় দাবি করেন, চীনে কি এটা সম্ভব যে, বিশ বছর বয়সী একজন কলেজ পালানো ছেলে নতুন একটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং তার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিভিত্তিক গোটা ব্যবস্থাটাকেই চ্যালেঞ্জ করবে?

৯/১১ এর পর আরব বিশ্ব এবং আফগানিস্তান যেভাবে খারাপ অবস্থার দিকে চলে গেল তার মূলে যে গণতন্ত্রের অভাব পশ্চিমাদের সে চিন্তাটা যে ভুল ছিল না তা লেখকদ্বয় স্বীকার করেন। কিন্তু যেটা ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন সেটা হল এই চিন্তা যে, আমরা (লেখক পশ্চিমা বিশ্বকে নির্দেশ করেছেন) আরব বিশ্বে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে পারব। টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসতে হয় তৃণমূল পর্যায়ের সংগ্রাম থেকে।  কিন্তু সেটা আবার এটা নয় যে বাইরের শক্তির কিছুই করার নেই।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র মিশরে মিলিটারি সহায়তা কমিয়ে দিয়ে সেখানকার আভ্যন্তরীণ খাতগুলোকে রাজনীতিতে ভোকাল হওয়ার জন্য প্রমোট করতে পারে। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য যাচ্ছে মিশর, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে যেখানে সত্যিকার অর্থে আমরা তাদের এলিটগুলোকে খারাপ কাজে সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য পয়সা দিচ্ছি, মানে ঘুষ দিচ্ছি। অথচ এই পয়সাগুলোই তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির জন্য ঢালতে পারলে এগুলো আরো আকর্ষণীয় এবং উদ্দেশ্য সাধনে কার্যকর হতো।

লেখকদ্বয় আরো পরামর্শ দেন যে- কায়রোকে আরো ১.৩ বিলিয়ন ডলারের মিলিটারি সাহায্য না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিশরকে বাধ্য করতে পারে এই সাহায্য নেওয়ার জন্য একটা কমিটি করতে যে কমিটি থেকে যথার্থ উপায়ে খাত ধরে ধরে প্রস্তাব পাঠানো হবে যে কোন কোন স্কুল, হাসপাতাল কিংবা তদ্রুপ প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের বৈদেশিক সাহায্য দরকার। যদি যুক্তরাষ্ট্র কাউকে পয়সা দিতে চায় তাহলে এটা যাতে তৃণমূলকে শক্তিশালী করে এবং সার্বিকভাবে আলোচনার টেবিলকে প্রমোট করে সেই লক্ষ্যে দেওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসির কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেন, বাহির থেকে আমরা কেবল একটি ‘ফোর্সড মাল্টিপ্লাইয়ার’ হিসেবে কাজ করতে পারি। যেখানে তোমার তৃণমূল আন্দোলন আছে যার মাধ্যমে তুমি অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আমরা তো তৈরি কিংবা প্রতিস্থাপন করতে পারি না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা আফগানিস্তান এবং আরব রাষ্ট্রগুলোতে তৃণমূল আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করছি। তাই সেখানে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তুমি যদি ০ দিয়ে ১০০ কে মাল্টিপ্লাই করো তুমি শূন্যই পাবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে যতই লম্ফঝম্প করো আখেরে কিছুই লাভ হবে না। একটা সময় পর সবকিছুই পূর্বের প্রতিষ্ঠানেই ফিরে যাবে।

আমেরিকা রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলতে গিয়ে লেখকদ্বয় বলেন, আমেরিকায় যে হারে চরম বৈষম্য বাড়ছে তা আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো আমলেই নিচ্ছে না। বাস্তবিকই এইটার একটা পাল্টা প্রতিক্রিয়া আছে। যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বড় হয়ে দেখা দেয় তখন এটি রাজনৈতিক বৈষম্যে রূপ নেয়। আর রাজনীতিতে যখন একজন ব্যক্তি তোমার গোটা প্রচারণার অর্থায়নের চেক লিখে দিতে পারে তখন তুমি কিসের জন্য অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে মনোযোগী হবে? আমেরিকা ঠিক এই গ্যাঁড়াকলেই আটকে গেছে।

গত ৪৬ বছরে বিভিন্ন রকম হতাশার কথা শোনা গেলেও বলা যায় বাংলাদেশ উন্নয়নের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছে। বলাবাহুল্য এই উন্নয়নে সুশাসন বড় কোন ভূমিকা রাখেনি। প্রখ্যাত জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও আমলা ড. আকবর আলি খান বলে থাকেন – সরকার থাকা স্বত্ত্বেও এখানে উন্নয়ন হচ্ছে। মানে এই উন্নয়নে সরকারের কোন ভূমিকাই নেই এটাকে আটকে ধরা ছাড়া। এখনকার পরিস্থিতি অনেকটা “ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া” প্রবাদের মত। আপনি যখন ক্ষুধার্ত তখন আপনি যেকোন উপায়ে উদরপূর্তি করতেই চাইবেন, এর বেশি হলে ভালো হয়, কিন্তু অপরিহার্য নয়। কিন্তু ক্ষুধা মিটে গেলে কি করবেন?

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে এখন চরম ক্ষুধার স্তর থেকে বেরিয়ে আসছে বলা যায় যদিও সার্বিকভাবে ক্ষুধা-দারিদ্র্য এখনো কাংক্ষিত মাত্রায় কমেনি। সংখ্যার দিক দিয়ে বড় একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে গেছে। তাদের এখন নগরে এবং নগরের বাইরে মোটামুটি মাত্রার ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তিও হয়েছে। এইটার একটা প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বিগত দিনগুলোতে মধ্যবিত্তের মাঠের রাজনীতিতে কম অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সহজ হিসাব, রাজনীতির রুটি-হালুয়া ছাড়াও বিকল্প পথ এতোদিনে তার তৈরি হয়ে গিয়েছে। তাই যা অর্জন হয়েছে তা সে হারাতে চায় না।

ঠিক এই জায়গায়ই ডারেন আচেমোগলু ও রবিবনসনের কাজের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাই। এই জায়গায় এসেই মনে হয়, আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি ও সর্বজনের জানমালের নিরাপত্তা দেবার জন্য এই রাষ্ট্রে কার্যকর কিছু দরকার। তা না হলে স্বতস্ফূর্ত মধ্যবিত্তের এই অর্জনও হারিয়ে যাবে। বর্ডারের ওপারে পাড়ি দেবে। মানুষ যখন জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার অভাবে কোন রাষ্ট্র ছাড়ে তখনই তো সে রাষ্ট্র ব্যার্থ হয়!

বাংলাদেশ আজ ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সংখ্যালঘুর জীবন ও সম্পত্তি নিরাপদ নয়, বাঙালি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর, ভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠীর জীবন ও সম্পত্তি এখানে নিরাপদ নয়। এখানে ‘ব্যক্তি’ ও ‘নাগরিক’ ধারণায় ফাটল ধরেছে, আর এই ফাটল টেনে নিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ফাটলে।

এই মুহুর্ত থেকেই এই ফাটল সারাবার ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রের ব্যার্থতা এড়ানো সহজসাধ্য হবে না!

 

সহায়ক সূত্র:

  1. Daron Acemoglu & James Robinson, Why Nations Fail: The Origin of Power, Prosperity, and Poverty, Crown Business, US, 2012
  2. www.whynationsfail.com
  3. TL Friedman, Opinion on Why Nations Fail,  New York Times, 2012

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন