, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ


নোয়াম চমস্কি একজন অগ্রগণ্য ভাষাতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, সামাজিক সমালোচক ও রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট। অতি সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিতইয়োগোস্লাভিয়াঃ পিস, ওয়ার অ্যান্ড ডিসসল্যুশনসমেত অনেক বহুল উল্লিখিত বই ও নিবন্ধের রচয়িতা তিনি। বর্তমানে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাগনেস নেল্‌মস হাউরি চেয়ারে ভাষাতত্ত্বের লরিয়েট প্রফেসর এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনলোলজি-তে ইনস্টিটিউট এমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে যৌথভাবে নিযুক্ত আছেন। জার্নাল অফ পলিটিক্যাল থিওরি অ্যান্ড ফিলোসফি-র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক স্বগত বড়ুয়ার সাথে কথোপকথনে তিনি তাঁর প্রোপাগান্ডা মডেলের সাপেক্ষে বুদ্ধিজীবী, সামাজিক মাধ্যম সম্বন্ধে তাঁর ধারণা, #মিটু আন্দোলন, ভারতে আধার সিস্টেম, বাকস্বাধীনতা সম্বন্ধে তাঁর ধারণা, শি জিনপিং-কে সম্ভাব্য আজীবন প্রেসিডেন্ট বানিয়ে চীনের সাংবিধানিক সংশোধন, আজকের দিনে অ্যানার্কি ও বামপন্থার প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর ভাবনাসমূহ, এবং ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুঁকো-র সাথে তাঁর সময় নিয়ে আলোচনা করেছেন।         

 

আপনি ১৯৬৭ সালেবুদ্ধিজীবীদের দায়বদ্ধতাশিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আপনি কি মনে করেন সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটের যুগে এইদায়বদ্ধতাএবং এমনকিবুদ্ধিজীবী”-র ধারণা কোনোভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?

নোয়াম চমস্কিঃ আচ্ছা, শুরুতেই বুদ্ধিজীবী নিয়ে ধারণাটি খুবই কৌতূহল জাগানোর মতো। ড্রাইফাস মামলার আগ পর্যন্ত এই শব্দটি সত্যিই সমসাময়িক অর্থে ব্যবহৃত হতো না, যখন ড্রাইফাসপন্থীদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিলো এবং আদতেই তীব্রভাবে নিন্দা জানানো হয়েছিলো কারণ এসব লেখক ও শিল্পীরা রাষ্ট্রের সম্রাট ও এর প্রতিষ্ঠানসমূহকে আঘাত করার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। এখন একাদেমি ফ্রঁসেজ  এর অমরেরা এই গোয়ার্তুমি ও আরও অনেক কিছুর জন্য তাদেরকে তীব্র সমালোচনায় জর্জরিত করলেন। আর শব্দটি কৌতূহলজাগানিয়া একদল মানুষের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করলো।

একটি ব্যাপার হচ্ছে, এঁদের একটি অগ্রাধিকার আছে, তাই যদি বলি, একজন পদার্থবিজ্ঞানীকে ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানে সর্বশেষ প্রচেষ্টার উপর তাঁর গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি অন্যান্য বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেন না। তাঁকে বুদ্ধিজীবী বলা হয় না। এখন ধরা যাক, সেই পদার্থবিজ্ঞানীর অফিসে দায়িত্ব পালনকারী দারোয়ানের আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী ও স্বরাষ্ট্র নীতির ধারণাসমূহের ব্যাপারে খুব বিচক্ষণ বিচারবুদ্ধি আছে এবং তাঁকে সেসব নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে সে আলাপ চালিয়ে যায়। তবুও তাঁকে বুদ্ধিজীবী বলা হয় না।

এখন, যে দলটি এই ক্যাটাগরিতে খাপ খায় তাঁদের একটি অগ্রাধিকার আছে এবং তাঁরা জনসাধারণের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে মতামত ও মনোভাব প্রকাশের জন্য এর সুবিধাও নিয়ে থাকে। এঁদেরকেই মোটামুটিভাবে বুদ্ধিজীবী বলা হয়। এ বিষয়ের প্রারম্ভেই কিছু প্রবণতা ও ধারণা আছে। আপনার প্রশ্নের দিকে যদি ফিরে যাই, তাঁদের দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে, আমি মনে করি না সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারের কারণে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়বস্তুটি আবির্ভূত হয় সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষ্য হিসেবে গণ্য হওয়ার দ্বিধাপূর্ণ মানকে প্রতিপন্ন করে কিনা।

তাহলে আপনি কি পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করছেন?

নোয়াম চমস্কিঃ শব্দ দু’টি ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়। একজন পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশেষজ্ঞ যিনি কিনা মেসোপটেমিয়ার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন, কিংবা শুধুমাত্র বাস্তিল আক্রমণে অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে যিনি গবেষণা করছেন তাকেও বুদ্ধিজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয় না। তিনি একজন পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশেষজ্ঞ। একজন পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি হয়ত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও জনসাধারণের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিগণিত হতেও পারেন। তবে এটি একটি অদ্ভূত শ্রেণিবিচার। আমি একে কোনো নির্দিষ্ট কৃতিত্ব দিতে চাই না।

তবে আপনি কি মনে করেন না যে, প্রযুক্তির মতো জিনিসপত্র আজকাল প্রচুর পরিমাণে আছে এবং তারপরও সেগুলোর জন্য মানুষের কিছু নির্দিষ্ট উন্নত দক্ষতা অর্জন করা চাই, আর যে সকল মানুষ এসব নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছে তারা বাকি জনসাধারণের চেয়ে খানিকটা এগিয়ে থাকতে বাধ্য, এবং এজন্য তারা অধিকতর ভালোভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষ্যে নিয়োজিত হতে পারে?

নোয়াম চমস্কিঃ তারা যে দক্ষতা অর্জন করেছেন সেটার চেয়েও বেশি দক্ষতায় অধিকতর অগ্রবর্তী হয়েছেন। উদারহরণস্বরূপ, আমি আমার অটোমোবাইল ইঞ্জিন সারাতে গেলে এটাকে নষ্ট করে ফেলতাম কিন্তু আমি যদি একে কোনো দক্ষ মেকানিকের কাছে নিয়ে যাই তাহলে সে খুব সহজেই একে ঠিক করে দেবে। তার যে দক্ষতা আছে তা আমার নেই। আমার যদি হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার করানোর দরকার হয় আমি এমন কারোর কাছে যাবো যিনি এই পেশায় দক্ষ এবং যিনি কৌশলগুলো জানেন আরকি। ধরুন, আমি যদি কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা সম্বন্ধে জানতে চাই, আমি তার কাছে যাবো যিনি এই ক্ষেত্রে কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন এবং আমি যে ভাষায় বুঝতে পারবো সে ভাষায় আমাকে তিনি বুঝাতে পারবেন কিনা তা জিজ্ঞেস করবো।

অবশ্যই সকল ধরনের বিশেষ দক্ষতা ও সক্ষমতা আছে। তার মধ্যে কিছু আছে উদ্ভট, এমন ব্যক্তিগত গুণসম্পন্ন যেটা তাদেরকে ওই দক্ষতা ও সক্ষমতা আয়ত্ত করার সুযোগ করে দেয়। আমি নিশ্চিত আমি কখনো গাড়ির মেকানিক হতে পারতাম না। কাজ ও প্রচেষ্টার মধ্যে কিছু অর্জিত হয়ে থাকে। তবে এটি বুদ্ধিজীবীদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যেটা সেসব মানুষের দায়বদ্ধতা যারা সুবিধাপ্রাপ্ত, যাদের ভিত্তি আছে, এবং যাদের সেই বিষয়গুলো নিয়ে জনসাধারণের সাথে ভাব বিনিময় করার মতো সঙ্গতি আছে। তাই তাদের দায়বদ্ধতা আছে।

অতি সম্প্রতি মারজুকি দারুসম্যানের নেতৃত্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের তথ্য অনুসন্ধান মিশনটি ঘোষণা করেছে যে, সামাজিক মাধ্যম মিয়ানমারেঅসন্তোষ, মতবিরোধ ও সংঘর্ষের মাত্রায় বাস্তবিকভাবে অবদান রেখেছে।এখন, ২০১৫ সালে বাইলাইনএর সাথে সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, “আমি টুইটার দেখি না কারণ এটা আমাকে কিছুই বলে দেয় না।

যাই হোক, ২০১৭ সালের আগস্টে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রায় ৬৭% আমেরিকান খবরের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, এবং এই সংখ্যাটি হয়ত সারা বিশ্বজুড়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেমনটা আমরা বলছি। এটি কেবল প্রমাণ করে যে মানুষ ক্রমশ খবরের জন্য সামাজিক মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আপনার প্রোপাগান্ডা মডেলের বিষয়ে আপনার কী মত?

নোয়াম চমস্কিঃ  আচ্ছা, সবার প্রথমে, আমি যে টুইটার ব্যবহার করি না এই মন্তব্যটি এখনো সত্য এবং এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। আমি সেখানে কোনো আগ্রহের কিছু খুঁজে পাই না। এটি হচ্ছে সতকর্তা ছাড়া কথা বলা ও কিছু বিষয়ে শব্দ দেখার একটি উপায়।

প্রোপাগান্ডা মডেলের উপর সামাজিক মাধ্যমের কোনো বাস্তবিক প্রভাব নেই। জনসাধারণ যেসব খবর ও তথ্যের উপর নির্ভর করে সেগুলোর প্রকৃত উৎসের সরবরাহকারী মুখ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ে অধ্যয়নই হচ্ছে প্রোপাগান্ডা মডেল।

সামাজিক মাধ্যমে যে খবরগুলো আসে, যেমন ধরুন ফেসবুকে, সেগুলো প্রধান মিডিয়া থেকে আসে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ামনারে কী ঘটছে সেটা নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করার মতো অনুসন্ধানী সাংবাদিক তাদের নেই। এই সত্যটি এখনও বিদ্যমান যে, খবর, তথ্য, মতামত ও বিশ্লেষণের একটি মূল উৎস হলো বড় বড় মিডিয়া। প্রোপাগান্ডা মডেল কেবল তাদের কাঠামো নিয়ে অধ্যয়ন করে। এটি বলে দিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের ধরন কী, তারা কোন শ্রোতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে, দর্শক ও পাঠক, সরকারের মতো অন্যান্য ক্ষমতা ব্যবস্থার সাথে তাদের সম্পর্ক কী, এবং প্রতিষ্ঠানগত সামাজিক আয়োজনসমূহের এই সন্নিবেশিত মডেল থেকে আমরা মিডিয়ার উপকরণ যেমনটা হবে বলে আশা করি সে বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করেছি।

এটিই হচ্ছে মডেল। তারপর আসছে তদন্ত ও সমালোচনামূলক অধ্যয়ন যা আদতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসমূহের বিশ্লেষণ থেকে উদ্ভূত প্রত্যাশা আসলে আমরা মিডিয়াতে যা খুঁজে পাই তার কারণ দর্শায় কিনা তার অনুসন্ধান করে। বস্তুত, আমাদের মেনুফ্যাকচারিং কনসেন্ট  বইটি প্রধানত কেস স্টাডি।

কিন্তু আপনি কি ফেসবুক কিংবা সামাজিক মাধ্যমের অভিমুখে তথ্যের ক্ষমতার একটি গভীর কেন্দ্রীকরণ দেখতে পান না?

নোয়াম চমস্কিঃ আমি মনে করি ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজনের মতো কতিপয় প্রধান কর্পোরেশনের মাধ্যমে এরই মধ্যে তথ্য অধিগমনের কেন্দ্রীকরণের ফলে বাস্তবিকভাবে তথ্যের প্রবাহ কুক্ষিগত হয়েছে যা প্রচণ্ড ক্ষতিকর।

২০১৭ সালের অন্যতম ইতিবাচক সামাজিক ও প্রভাবশালী আন্দোলন ছিলো #মিটু আন্দোলন। একুশ শতকের নারীবাদী আন্দোলনে এটি সহসাই একটি পুনর্জাগরণ নিয়ে এসেছে এবং বিশ্বব্যাপী সমাজগুলোর উপর এর অন্তর্নিহিত প্রভাব দেখা গেছে। আপনি এই ব্যাপারে কী মনে করেন?    

নোয়াম চমস্কিঃ আমি মনে করি এটি সামাজিক রোগের একটি বাস্তব এবং গুরুতর ও গভীর সমস্যা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি সামাজিক ব্যাধিটিকে উন্মোচিত করেছে এবং প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে, অনেক বর্হিমুখী ও নির্দিষ্ট বিষয়কে এবং আরও অনেক কিছুকে মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে আমি মনে করি একটি বিপদ আছে। বিপদটা হলো প্রদর্শিত কার্যকলাপের সাথে অভিযোগকে গুলিয়ে ফেলা। ব্যক্তিবিশেষ এবং তাদের কার্যকলাপ ও তাদের অবস্থানকে আক্রমণ করার পূর্বে অভিযোগগুলো যাতে খতিয়ে দেখা হয় সেটা নিশ্চিত করার ব্যাপারে আমাদের যত্নবান হতে হবে। তাই অন্যায্য, অসঙ্গত ও অনেক সময় অপরাধমূলক কার্যকলাপসমূহকে উন্মোচিত করার যেকোনো প্রচেষ্টায় অভিযোগ ও বাহ্যিক প্রকাশের মধ্যে যেন একটি তফাত থাকে, সেটাকে স্বীকার করার একটি প্রেক্ষাপট সবসময় থাকতে হবে।

আপনি কি এই আন্দোলনটিকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জোরালো ক্ষমতার সম্পর্ক হিসেবে দেখেন, অন্ততপক্ষে দুটি লিঙ্গের মধ্যে?

নোয়াম চমস্কিঃ আমি মনে করি এটি ক্ষমতার সম্পর্কের একটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং বেশ খানিকটা বিলম্বিত পুনর্বিবেচনার দিকে এগিয়ে গেছে। আর এগুলোকে বিভিন্ন পরিভাষায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা ও পুনঃনির্ণয় করার দিকে এটি অধিক সংহত হয়েছে। তাই এটি একটি খুবই সুস্থ বিকাশ হতে পারে।

সম্প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি বহুল আলোড়ন সৃষ্টিকারী রায়ে আদালত সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষণা করেছে যে, গোপনীয়তার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। অন্য দিকে, ভারতীয়রা তাদের বায়োমেট্রিক ও জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ডেটার উপর ভিত্তি করে তৈরিকৃত আধার কার্ড নামের ১২ ডিজিটের একটি অনন্য পরিচিয়মূলক নম্বরের প্রতি বাধ্যতামূলকভাবে অধীনস্ত, যার ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বায়োমেট্রিক পরিচিতি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কোনো রকম আইনি সমর্থন ছাড়াই একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আধারকে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং এটি করা হয়েছিলো ভারতের নাগরিকদের একটি বৃহৎ ডেটাবেজ সিস্টেমের অধীনে নিয়ে আসার জন্য এবং নিত্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার সাথে একে যুক্ত করার জন্য।

অনেক তত্ত্ব আছে এবং আদতে এটি একটি বাস্তবিক উদ্বেগের বিষয় যে ভারত সরকার কীভাবে, এই বৃহৎ ডেটা সংগ্রহের মাধ্যমে, একটি ওরওয়েলীয় নজরদারি ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। আধারের মত এমন সিস্টেমের বিষয়ের আপনার ভাবনা কী, যেটাকে সাংবিধানিকতা ও গণতান্ত্রিক আবশ্যকতার ছদ্মবেশে সম্পন্ন করা হয়েছে?

নোয়াম চমস্কিঃ এমন একটি সিস্টেম কীভাবে সম্পূর্ণ অপ্রীতিকর উপায়ে ব্যবহৃত হতে পারে তা নিশ্চয়ই বুঝা যায়।

এর জন্য রক্ষাকবচ থাকা উচিত। এমন একটি ব্যবস্থায় আপনি কতিপয় উপযোগিতা দেখতে পারেন যেটা আসলেই নাগরিকদেরকে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে সহায়তা করবে এবং আপনি একটি স্বৈরাচারী সিস্টেমের হাতে এর সম্ভাব্য অপব্যবহারের ভয়াবহতাও দেখতে পারেন। তাই এমন কোনো ব্যবস্থা যদি জারি করা হয় এবং তা করা উচিত হবে — এটি অবশ্যই করতে হবে — গণতান্ত্রিক জনসমর্থন নিয়ে এবং এর সাথে যুক্ত থাকতে হবে রক্ষাকবচ ও কাঠামো, যেটা সহজেই অনুমেয় অপব্যবহারকে ব্যাহত করতে পারে।

কিন্তু এর ফলে ইতোমধ্যে অপব্যবহার এবং খুবই অরক্ষিত একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এমনকি লোকজন প্রাণ হারিয়েছে কারণ তারা জরুরী চিকিৎসার সময় নিতান্তই আধার কার্ড প্রদর্শন করতে পারেনি। আর এটাকে সংসদীয় আদেশ নয়, বরং একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যেভাবে নিয়ে আসা হয়েছে তা সত্যিই উল্লেখ করার মতন, যেটা অন্যান্য সফল কিন্তু সম্পূর্ণরূপে একই রকম নয় এমন সিস্টেমের বেলায় দেখা গেছে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর। আধারের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির পরিচিতি খতিয়ে দেখা হয় একজন ব্যক্তির মৌলিক উপযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে কার্ডের সাথে সংযুক্ত করা হলে তার অস্তিত্ব এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

নোয়াম চমস্কিঃ আচ্ছা, হুট করেই সামাজিক নিরাপত্তা বা অন্য কোনো পরিচয়মূলক সিস্টেমের বিষয়ে মন্তব্য করা যায় না। কাউকে এটি জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, এটি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কিংবা গণ-আলোচনার মাধ্যমে হয়েছে কিনা। চিন্তা ও বয়ানের ধরনগুলো একটি বৈধ গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়েছে নাকি কেবল একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে করা এসেছে। এটি একটি প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, যদি পরেরটাই হয়ে থাকে, আমরা ইতোমধ্যে অন্যায্যতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপাদান পেয়ে গেছি। যদি প্রথমটি হয়ে থাকে তাহলে ন্যায্য হতেও পারে। সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জনগণের ব্যবহার ও সুবিধাগুলো আছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরটি অনেক ক্ষেত্রে উপকারী।

তারপরে আসে এটি কীভাবে ব্যবহৃত হয় সেই প্রশ্ন। এটি জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি খারাপ উপায় নাকি এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ করতে, তারা যা করে সেগুলোকে উন্নত করতে, তাদের জিনিসগুলোকে আরও সহজ এবং আরও সুবিধাজনক করতে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং এই দু’টো প্রশ্ন তুলতে হবে। ভারতীয় সিস্টেমের ব্যাপারটা আমি ঘেঁটে দেখিনি, তবে আপনার বর্ণনা অনুসারে উভয় প্রেক্ষিতে একে অপব্যবহারকারী মনে হচ্ছে, যেভাবে একে জারি করা হয়েছে এবং যেভাবে এটি ব্যবহৃত হয়।

২০১৫ সালে বাইলাইনএর সাথে সাক্ষাৎকারে আপনি একই কথা বলেছিলেন। সেখানে আপনি বাকস্বাধীনতার বিষয়ে আপনার ধারণা ও কোনো কিছু সংঘটনের আগেই একে দমন করার বিপক্ষে আপনার অবস্থানের বিষয়টি পরিষ্কার করেছিলেন যে, কেউ যদি টাইমস স্কয়ারের একটি বিজ্ঞাপনে ইহুদীদের গ্যাস চেম্বারে পাঠানোকে গৌরবান্বিত করতে চায় তাহলে আপনি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন, কিন্তু রাষ্ট্র এখানে পুলিশি করুক সেটাও আপনি চাইবেন না। আপনার এই ধারণাটি কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাকি বাকস্বাধীনতার ধারণার ব্যাপারে এটিই আপনার সাধারণ অবস্থান? কারণ ভারতের মতো ধর্মীয়ভাবে ও সাংস্কৃতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশে এমন বক্তব্য দাঙ্গা ও রক্তপাত বয়ে আনতে পারে।    

নোয়াম চমস্কিঃ এমন কোনো অধিকারের কথা আমি জানি না যেটা ধ্রুব। শর্ত ও সীমাবদ্ধতা, প্রতিবেশের উপাদানসমূহ সবসময়ই থাকে, যেটা যেকোনো মানবীয় কার্যে প্রবেশ করে। তাই এমন কতগুলো মৌলিক অধিকার আছে যেগুলো আচরণ, কার্যকলাপ, মনোভাব ও আরও অনেক ব্যাপারে নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। তবে বিদ্যমান প্রতিস্থিতিতে মানবীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে সেগুলোকে নিয়মিতভাবে সমন্বয় করে নিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, আমি মনে করি বাকস্বাধীনতার বেলায় সীমাবদ্ধতা আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ব্র্যান্ডেনবুর্গ বনাম ওহাইও মামলায় বাকস্বাধীনতার বিষয়ে মোটামুটিভাবে একটি যথার্থ মানদণ্ডে পৌঁছেছিলো। সেখানে বলা হয়েছিলো, কোনো অত্যাসন্ন অপরাধমূলক কাজে অংশগ্রহণের আগ পর্যন্ত বক্তব্য হওয়া উচিত স্বাধীন। তাই আপনি ও আমি যদি একটি মুদি দোকানে যাই এবং আমার হাতে একটি বন্দুক ধরা থাকে এবং আপনি বললেন “গুলি করো”, তাহলে সেটা কোনো সুরক্ষিত বক্তব্য নয়। এখন যেকোনো উপায়ে সর্বক্ষেত্রে এটি একটি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট মানদণ্ড প্রদান করে না। আবার এর দ্বারা এটাও বুঝায় না যে, আপনাকে টাইম স্কয়ারে “ইহুদীদের হত্যা করো” লেখা সম্বলিত একটি বিশাল বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত। আমি মনে করি না এটার অনুমোদন দেওয়া হবে।

এটি আপনাকে টাইমস স্কয়ারে দাঁড়িয়ে “ইহুদীদের হত্যা করো” এই লিখা সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করার অনুমতি দেয় কিনা। হ্যাঁ, আমি মনে করি, দেয়। আমি মনে করি এটি অনুমোদনযোগ্য হওয়া উচিত। আমাদেরকে বিচার করতে হবে এবং সেই বিচারের বেলায় সমাজের প্রকৃতিকে বিবেচনায় আনতে হবে।

এখান থেকে সামাজিক মাধ্যমের সাপেক্ষে ভিন্নমতের ধারণার দিকে এগোনো যাক। আপনি সবসময়ই যুক্তি দিয়েছেন যে ভিন্নমতকে সহ্য করা হবে, তবে সংকীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত একটিমূলধারার আলাপের মধ্যে, যেটাকে পত্রিকা, টিভি ইত্যাদির মতো দ্বাররক্ষকের মাধ্যমে পাহারা দেওয়া হয়। সামাজিক মাধ্যমের যুগে ভিন্নমতকে কীভাবে ধারণ বা সহ্য করা হয়?

নোয়াম চমস্কিঃ সামাজিক মাধ্যম মূলত নিয়ন্ত্রিত নয়। ফেসবুক ও গুগল যেসব কথাবার্তা ও উপাদানকে অনুপযুক্ত মনে করে সেগুলোকে তাদের তরফ থেকে কিছুটা সেন্সর করার প্রচেষ্টা আছে। তারা কীভাবে এটা করে থাকে তা আমি সম্পূর্ণরূপে বিস্তারিত অনুসন্ধান না করলেও এটা বুঝা যায়। তবে আবারও  আমাদের মৌলিক অধিকারসমূহের অপব্যবহারের সম্বন্ধে খুব সজাগ হতে হবে।

কথাবার্তার অনেক নিয়ন্ত্রণ আছে। আমি নিজে এর শিকার হয়েছি। আপনাকে আমি একটি উদাহরণ দিতে পারি, ‘মেনুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’, প্রোপাগান্ডা মডেল সম্বন্ধে আপনি যে বইটি উল্লেখ করেছেন, সেটা আমার প্রয়াত সহকর্মী ও বন্ধু এডওয়ার্ড হারম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা হয়েছিলো। আমরা প্রথম বইটি লিখেছিলাম ১৯৭৩ সালের দিকে। আমরা ‘কাউন্টার-রেভোল্যুশনারি ভায়োলেন্স’ নামে একটি ছোট বই লিখেছিলাম। বেশ ভালোই চলছিলো এমন একটি ছোট, সফল প্রকাশনী থেকে এটি বের হয়েছিলো এবং ২০,০০০ কপি প্রকাশ করেছিলো। অনেকগুলো ছোট ব্যবসার মতো এই প্রকাশনীটি চূড়ান্তভাবে একটি প্রধান ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের দ্বারা অধিকৃত হয়েছিলো, যেটা এখন হয়েছে টাইম ওয়ার্নার। ব্যবসায়ী গোষ্ঠীসমূহের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বইটির বিজ্ঞাপনগুলো দেখলেন এবং তিনি সেগুলো পছন্দ করেননি। তিনি খোদ বইটি দেখতে চাইলেন এবং তারপর বইটির প্রকাশনা বাতিল করতে প্রকাশনীকে নির্দেশ দিলেন।

তারা সেটা করতে নারাজ ছিলেন। অনেক দেন-দরবার হয়েছিলো। অবশেষে ওই কর্মকর্তা পুরো প্রকাশনীর ব্যবসা এবং প্রকাশনীর স্টক তুলে দিলেন। এখন, এটি কি বাকস্বাধীনতার একটি উল্লঙ্ঘন? অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডে নয়। এ কারণে আমি এটি বাকস্বাধীনতার অনেক সমর্থনকারীর নজরে নিয়ে এসেছিলাম, যারা প্রতিষ্ঠান ও লোকজনকে উল্লেখ করবেন না। তাঁদের সিদ্ধান্ত ছিলো যে এতে করে বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়নি কারণ এটি সরকারি সেন্সরশিপের কোনো ঘটনা ছিলো না, এটি কেবলই একটি কর্পোরেট সেন্সরশিপ। একটি প্রকাশনীকে ধ্বংস করে দেওয়া, সেটার বিতরণ করা একটি বই পছন্দ না হওয়ার কারণে তার সকল স্টক ধ্বংস করে দেওয়া। আচ্ছা, আমি প্রায়োগিক অর্থে মেনে নিলাম। আমি মনে করি না সেই কর্মকর্তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা কিংবা শাস্তি দেওয়া উচিত হতো। তবে এটি একটি চরম দৃষ্টান্ত, কোনোভাবেই এটি একটি স্বাভাবিক দৃষ্টান্ত নয়। তবে ভিন্নমত কীভাবে অবরুদ্ধ করা যেতে পারে তার একটি চরম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এই ঘটনা, এবং অনেক ক্রমাগত ও আরও অনেক সূক্ষ্ম দৃষ্টান্ত আছে।

গত বছর ও তার ধারাবাহিকতায় এ বছরেও আমেরিকা জুড়ে ভাস্কর্য উৎখাতের অনেক ঘটনা ঘটেছিলো এবং ঘটেছে। সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলো নর্থ ক্যারোলাইনায় জেনারেল রবার্ট ই. লীর ভাস্কর্য উপড়ে ফেলা সম্প্রতি ভারতে এমন নজির দেখা গেছে। কোনো সমাজের সংস্কার সাধন করতে গেলে আমাদের প্রথমে সংস্কৃতির সংস্কার সাধন করতে হবে, যেমনটা বলতেন ডব্লিউ.ই.বি ডু বয়েজ। যে জায়গায় আমরা কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য সমতা আদায়ের চেষ্টা করছি, সেখানে আমরা সত্যিই রবার্ট ই. লীর একটি ভাস্কর্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারি না এটি কি ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ, গুণ্ডামি নাকি সাংস্কৃতিক সংস্কার? আপনি এটাকে কীভাবে দেখেন?

নোয়াম চমস্কিঃ আচ্ছা, আবারও আমাদের দেখতে হবে ও জিজ্ঞাসা করতে হবে যে, কীভাবে ও কখন এটি সংঘটিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, নিউ ইয়র্কের একটি ইহুদী কমিউনিটিতে আমি হিটলারের কোনো ভাস্কর্য দেখতে চাইবো না। আধুনিক ইতিহাসের কয়েকটি জঘন্যতম ও সুনিশ্চিত অপরাধের প্রতীক রবার্ট ই. লী’র বেলায়ও তা সত্য। দাসপ্রথার আমেরিকান ব্যবস্থাটি ছিলো দাসপ্রথার সবচেয়ে বিদ্বেষপূর্ণ ব্যবস্থা। এটি ছিলো নির্যাতন, অবদমন, পরিবারগুলোর হত্যা ও উৎপাটনের একটি বীভৎস ও দানবীয় প্রবর্তন। পুরো ইতিহাসটি একদমই অসভ্যতার ঊর্ধ্বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিও ছিলো এটি।

যিনি সেই ব্যবস্থার প্রতিরক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁকে পাবলিক প্লেসে রাখা অনেকটা মর্মান্তিক। আমি যা অনুভব করি তা হলো ভাস্কর্যটি বিকৃত না করলেও হতো, বরং এটাকে মিউজিয়াম অফ স্লেভারি-তে স্থানান্তর করা উচিত যেখানে নৃশংসতাকে গোচরে আনা হয় এবং তা আলোচিত হয় ও উপস্থাপিত হয়, যেমন তারা আউশভিৎস মিউজিয়ামে বর্ণনা করে সেখানে কী ঘটেছিলো।

শি জিনপিং-কে কার্যকরভাবে আজীবন প্রেসিডেন্ট করার মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সাংবিধানিক সংশোধনটি এর প্রতি একটি খুবই জোরালো বার্তা দেয়। আফ্রিকায় ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে নয়া-উপনিবেশবাদের অভিযোগের ভিত্তিতে এটি নজরে আসে যে, চীন খুবই অনন্য একটি উপায়ে, অর্থাৎ সহিংসতা ব্যতীত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বর্তমান সময়ের ও পূর্বের সকল পরাশক্তির চেয়ে ভিন্ন উপায়ে পরাশক্তির মর্যাদা অর্জন করেছে অথবা করে থাকতে পারে। এই বিষয়ে এবং সাম্প্রতিক সময়ের সাংবিধানিক সংশোধনের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?  

নোয়াম চমস্কিঃ সাংবিধানিক সংশোধনটি চীনে একনায়কত্ব ও নিপীড়নের পথে আরেকটি বিপজ্জনক ও দুর্ভাগ্যজনক পদক্ষেপ। এর সাথে আসলে কঠোর, নির্মম নিপীড়নের অনেক কার্যকলাপ জড়িত। এ সবকিছুর নিন্দা করা উচিত। চীনের বৈদেশিক কার্যকলাপের বেলায়, যতদূর সেটা শোষণ, সম্পদের ধ্বংস, মানুষের অধিকার দমন ও সহিংসতার সাথে জড়িত, তখন অবশ্যই সেগুলোর নিন্দা জানানো উচিত। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের পরাশক্তির মর্যাদা অর্জনের ক্ষেত্রে অত্যধিক সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে, অবশ্যই অন্য কেউ এমন কিছু করলে তা জায়েজ হয়ে যায় না। সবমিলিয়ে, চীনের আন্তর্জাতিক মিথষ্ক্রিয়া বৃহৎ পরিসরে জোরপূর্বক হবার পরিবর্তে বরং বাণিজ্যভিত্তিক হয়েছে। তবে এটি শতভাগ সত্য নয় এবং এই সীমানাগুলো যদি অতিক্রম করা হয়, তাহলে আবার একে নিন্দা করা এবং প্রতিহত করা উচিত। তবে এ সময়ে পৃথিবীর বৃহৎ অংশ জুড়ে ক্ষমতা লাভের আশায় সহিংসতা ও শক্তি ব্যবহারের দিক থেকে চীন পশ্চিমের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে।

সম্প্রতি ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ফ্রন্টের সাথে কথা বলার সময় স্টিভ ব্যানন অতি ডানপন্থীদেরকে বর্ণবাদ ও বিদেশীদের প্রতি ঘৃণাকে আঁকড়ে ধরতে এবং সেসব ট্যাগকে একটিব্যাজ অফ অনারহিসেবে ধারণ করতে বলেছেন। পাশ্চাত্যের লোকরঞ্জনবাদী নেতারা বিদেশীদের প্রতি বিদ্বেষের বশবর্তী হচ্ছেন, এমনকি একে অতিরঞ্জিত করছেন, তাঁরা বলছেন শরণার্থীরা তাঁদের দেশগুলোতে ভিড় জমাচ্ছে, তবে আমরা বলতে চাই পশ্চিমারা যে দেশগুলোতে বোমা ফেলছে সেসব দেশ থেকেই শরণার্থীরা আসছে। ইউরোপে বিরাট শরণার্থী সংকট ও আমেরিকায় অভিবাসী সংকটের আলোকে অতি ডানপন্থা ও এর ক্ষমতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

নোয়াম চমস্কিঃ “শরণার্থী সংকট” নামে যেটা পরিচিত তার প্রতিক্রিয়াটি আদতে পাশ্চাত্যের একটি নৈতিক সংকট। এখানে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত। এখন আশাহীন মানুষেরা পরিচর্যা, সহানুভূতি, এবং গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে। আর এটি এ সত্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা যে, তাদের দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে  পাশ্চাত্য প্রায়শই একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এটি দায়বদ্ধতার একটি অতিরিক্ত স্তর যুক্ত করে। তবে প্রতিক্রিয়াটি অত্যন্ত কুৎসিত হয়েছে এবং মানুষের স্বভাবের সবচেয়ে কদাকার কিছু বৈশিষ্ট্যকে তুলে এনেছে। শরণার্থীদের প্রতি প্রতিক্রিয়াটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় সত্য এবং ইউরোপের বেলায়ও সত্য।

তাই লিবিয়ার মধ্য দিয়ে প্রায়ই ইউরোপে পালাতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন এসব মানুষকে পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলোতে নেওয়া উচিত। তাদের যথাযথ তত্ত্বাবধান করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর সম্পদ আছে, তারা যতক্ষণ না তাদের বাড়ি ফিরে যেতে চায় সেই সময় পর্যন্ত তাদের ন্যায়সঙ্গত জীবন নিশ্চিত করা যেতে পারে পারে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ফিরে যায় যতক্ষণ না তাদের স্বদেশ তাদেরকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারে। এর জন্য শুধু যে প্রচুর সম্পদ আছে তা নয়, বরং যে দেশগুলো শরণার্থীদের গ্রহণ করে তাদের জন্যও সুফল বয়ে আনতে পারতো। এর পরিবর্তে যা ঘটেছে তা হচ্ছে এসব দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের লড়াই চরমভাবে কুৎসিত ও লজ্জাকর প্রতিক্রিয়াসমূহকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেটা আপনি উল্লেখ করেছেন, কতকটা তার চেয়েও খারাপ। আর এটি একটি নৈতিক সমস্যা, পাশ্চাত্যের একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা যেটা প্রকাশ করা উচিত। এটিই শরণার্থীদের একটি মৌলিক সংকট। যেমনটা পোপ দ্বিতীয় জন পল বলেছিলেন, শরণার্থীরা সংকটাপন্ন নয়, বরং এর প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়াটি সংকটের মুখে পড়েছে।

নির্দিষ্টভাবে যেটা আপনার চিন্তার ক্ষেত্র, সেই অ্যানার্কিজমের বিষয়ে আপনার সুসঙ্গত বোঝাপড়া আজকের বিশ্বায়িত দুনিয়ায় অ্যানার্কিজম অথবা অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজমের সম্ভাবনার ব্যাপারে আপনাকে কী বার্তা দেয়?

নোয়াম চমস্কিঃ আচ্ছা, আমি অ্যানার্কিজমকে মূলত মানব বিষয়াবলীর এক প্রকার প্রবণতা হিসেবে অভিহিত করি, যেটা কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের ধারণা সংক্রান্ত সংশয়বাদের ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি এই মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে যে, যেকোনো প্রকার আধিপত্য ও শ্রেণিবিন্যাস, যেকোনো কাঠামো, যেকোনো মানবীয় সামাজিক কাঠামো যেখানে কতিপয় লোক নির্দেশ দেয় ও অন্যরা তাদের অনুসরণ করে, কিছু লোক নিয়ন্ত্রণ করে ও অন্যরা তা মান্য করে, এই ধরনের যেকোনো কাঠামোকে তার ন্যায্যতা যাচাই করে নিতে হয়। এর আত্মপক্ষ সমর্থনের একটি বোঝা আছে, একটি ভারি বোঝা। এটি যদি সেই বোঝার সম্মুখীন হতে না পারে, যেটা সাধারণত হয়ে থাকে, তাহলে একটি অধিকতর স্বাধীন ও ন্যায্য সামাজিক ব্যবস্থার স্বার্থে সেটাকে ভেঙ্গে দেওয়া উচিত। এটিই অ্যানার্কিজমের মূল নীতি এবং সারা বিশ্বব্যাপী তা  প্রয়োগ করা হয়, একটি পরিবারের ভেতরকার সম্পর্ক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী এবং এর মাঝে যা আছে সবকিছুতেই।

অতএব এই অর্থে অ্যানার্কিজমের সম্ভাবনা কী? আমি মনে করি, খুব ভালো। অনেক উদাহরণ আছে। আপনি আমার কাছে দুটো আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন। অনেকগুলোর মধ্যে যেটা আমরা উল্লেখ করতে পারি তা হলো কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের কাঠামোগুলোকে প্রশ্ন করা ও চ্যালেঞ্জ করা এবং অনেক সময় সফলভাবে সেটা করা। যেকোনো জনপ্রিয় আন্দোলনের মতোই একটি অধিকতর স্বাধীন ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ বাস্তবায়নের পথে সেটি একটি পদক্ষেপ, তবে আধিপত্য ও কর্তৃত্বের সাথে জড়িত অবৈধ কাঠামোগুলোকে শুধরে নেওয়া ও অতিক্রম করার পথে মৌলিকভাবে এটি একটি পদক্ষেপ। এসব অবমাননাকর কাঠামোসমূহ থেকে মুক্ত একটি সমাজে অ্যানার্কিস্ট নীতিসমূহ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যের অভিমুখে এটি একটি পদক্ষেপ। সম্ভাবনাগুলো, আমি মনে করি, আমাদের চারপাশে রয়েছে। এগুলো সব জায়গায় দৃষ্টিগোচর হয়, আন্তঃব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো থেকে হয় যেগুলোকে #মিটু আন্দোলনের দ্বারা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার চরিত্রে বড় পরিবর্তনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেমন উদাহরণস্বরূপ, একটি কর্মী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী, যিনি হতে পারেন বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রকৃতিতে আমূল পরিবর্তনের বীজ।

আজকে পুঁজিবাদ কিংবা নব্য-উদারনীতিবাদকে সত্যিকার অর্থে মানুষ ও সামাজিক কাঠামোগুলোর উপর ছড়ি ঘোরাতে দেখা যায়, আর এখন পর্যন্ত পুঁজিবাদের অন্যতম অন্তর্নিহিত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে এটি কীভাবে বারবার নিজেকে সংস্কার করে এর অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমরা এখন পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে মানুষের মধ্যে, বিশেষত তরুণ ও টিনএজারদের মধ্যে হতাশার হারের ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি আজকের পুঁজিবাদী সমাজে একটি সুস্থ জীবন যাপনের জন্য তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনি কী উপদেশ দেবেন?

নোয়াম চমস্কিঃ আচ্ছা, অন্য সকল সমাজের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি পুঁজিবাদী সমাজ হওয়া থেকে দূরে অবস্থান করছে। এটি একটি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা যা বৃহৎ দক্ষতার সাথে অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে এবং অন্য অনেক কিছুতে বড় আকারের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, যেটা পুঁজির নীতিসমূহ উল্লঙ্ঘন করে। মোটামুটিভাবে ১৯৮০ এর দশক ও ১৯৭০ এর দশকের শেষার্ধ থেকেই এটি নব্য-উদারনৈতিক সময়। এটি বহু ক্ষেত্রে এর পূর্ববর্তী নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের সামাজিক গণতান্ত্রিক যুগের থেকে কম-বেশি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের দু’টো ভিন্ন প্রকরণ।

অতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে বর্বর পুঁজিবাদ ক্রিয়াশীল হয়েছে তা এখনো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের একটি পর্যায়। আজকাল ছাত্রদের যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত, অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, আমি মনে করি ফলপ্রসূ ও আশাজাগানিয়া অনেক বিকল্পই আয়ত্তের মধ্যে আছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচন দিয়ে শুরু করা যাক। পাশ্চাত্যের বৃহদাংশ জুড়ে এই নির্বাচনে প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি রাগ ও ক্ষোভ দেখা গেছে। সমাজের মৌলিক কাঠামোতে যে কিছু গুরুতর সমস্যা আছে এবং মধ্যপন্থী প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে খোদ নির্বাচনের সময়ে মোটামুটিভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য হয়নি যখন সেগুলো আবার প্রভাব বিস্তার করেছিলো। কিন্তু অন্য নির্বাচনগুলোর দিকে দেখুন, ইতালিতে ও ইউরোপের অন্যান্য নির্বাচনগুলোর দিকে। মধ্যপন্থী পার্টিগুলো বড় দলগুলোর চরমপন্থার সাথে পেরে উঠেনি। রিপাবলিকান পার্টির একটি সীমিত পরিসরেও এটি সত্য ছিলো। ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি বড় পরিসরের ক্ষেত্রে এটি সত্য ছিলো। প্রচুর আর্থিক সমর্থন ও বড় মিডিয়ার সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয় লাভ করা একজন বিলিয়নিয়ারের পক্ষে একেবারেই ব্যতিক্রম কিছু নয়। ট্রাম্প মূলধারার রিপাবলিকান এস্টাবলিশমেন্ট থেকে সরে গিয়েছিলেন কিন্তু এটি খুব বড় কোনো প্রস্থান ছিলো না। ডেমোক্রেটদের বেলায় যেটা হয়েছিলো সেটা ছিলো নজর কাড়ার মতো প্রস্থান। আমি স্যান্ডার্সের প্রচারাভিযানের কথা বলছি। আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম বারের মতো একজন প্রার্থী আবির্ভূত হলেন, যিনি মূলত অপরিচিত, এবং ভীতিকর ‘সমাজতন্ত্রী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং যার প্রতি কর্পোরেট সেক্টর অথবা প্রাইভেট ক্ষমতার কোনো সমর্থন ছিলো না। কোনো মিডিয়া সাপোর্ট ছিলো না — হয় তিনি উপেক্ষিত হয়েছেন নয়ত হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। তবে তাঁর বিশাল জনপ্রিয় সমর্থন ছিলো। যদি পার্টি ব্যবস্থাপকদের কোনো ষড়যন্ত্র না থাকতো, তাহলে তিনি সম্ভবত ডেমোক্রেটিক মনোনয়ন জিতে যেতেন। তিনি হয়ত নির্বাচনেও জিতে যেতে পারতেন।

এটি আমেরিকার সমগ্র রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে একটি চমকপ্রদ পরিবর্তন, যেখানে নির্বাচনগুলো মূলত কিনে নেওয়া হয়। খেয়াল করুন কীভাবে আপনি কেবলমাত্র প্রচারাভিযানের অর্থায়নের নিয়ামকের দিকে তাকিয়ে চারটি বড় ইস্যুতে কংগ্রেসের ভোট ও কংগ্রেস পারসনদের ভোট প্রায় অসাধারণ নিপুণতায় আন্দাজ করতে পারেন। লবিং ও প্রাইভেট পুঁজির অন্য সকল প্রভাবের পাশাপাশি সেই নিয়ামকটি এককভাবে একটি আশ্চর্জনক ভবিষ্যদ্বাণী। তাঁর এর কোনোটিই ছিলো না। তিনি সম্ভবত মনোনয়ন পেয়ে যেতেন এবং একটি নিরপেক্ষ সুযোগ থাকলে হয়ত নির্বাচনেও জিতে যেতেন। এখন তিনি ব্যাপক অর্থে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তির একটি মতামত থাকে। আপনি তাঁকে মিডিয়ায় দেখবেন, টেলিভিশনে দেখবেন, এবং পত্রিকায় দেখবেন। কিন্তু এখানে তা হবার নয়। এখন এখানে এটি সহিংস নিপীড়ন নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের একটি রূপ। এই আন্দোলটি, তা সত্ত্বেও, সবকিছু করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর আছে এবং অনেক তরুণের মাঝে জনপ্রিয় হয়েছে। এসমস্ত প্রতিফলন, আপনার প্রশ্নের দিকে ফিরে তাকালে, এগুলো সেসব সুযোগের প্রতি ইঙ্গিত দেয় যা সমাজে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সৃষ্টিতে তরুণদের আয়ত্তের মধ্যে আছে। কোনোভাবেই এটি একটি বদ্ধ সিস্টেম নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সকল ত্রুটিসহ এখনো মোটামুটিভাবে একটি মুক্ত সমাজ।

আজকের যুগে আপনি কি বামপন্থার পক্ষে বড় সম্ভাবনা দেখতে পান?

নোয়াম চমস্কিঃ আমি মনে করি অনেক বড় সম্ভাবনা আছে। তাই ইয়ানিস ভারুফিকাসের গ্রুপ ডিয়েম ২৫ (DiEM 25) নির্বাচনসমূহে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ইউরোপের একটি বহুজাতিভিত্তিক তালিকা চালু করেছে, যেটা ইউরোপে ব্রাসেলসের স্বৈরচারী শাসনের বিরোধিতা ও অস্বীকৃতি জানানোর জন্য নিবেদিত। ইউরোপের পলিসি একটি অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক উপায়ে জেঁকে বসে আছে।

এটি আইএমএফ, ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক ও ইউরোপিয়ান কমিশনের মতো অনির্বাচিত গ্রুপের দ্বারা খুব বেশি পরিমাণে নির্ধারিত হয়ে থাকে। তারা ইউরোপে সাধারণ পলিসি ঠিক করে এবং অন্যরা তার সাথে মানিয়ে নেয়। এই পলিসিগুলো অনেক ক্ষেত্রে খুবই পশ্চাৎমুখী। সবচেয়ে বাজে শিকার হয়েছে গ্রীস, কিন্তু অন্যরাও হয়েছে এবং এর বিপক্ষে বিরোধীপক্ষের একটি জোয়ার আছে যেটা সব রকমভাবে দেখা গেছে, এর মধ্যে কিছু আছে খুবই বিপজ্জনক ও আক্রমণাত্মক, যেমন ডানপন্থী নব্য-ফ্যাসিস্ট গ্রুপসমূহ, আর কিছু আছে মোটামুটি প্রকাশ্য ও প্রগতিশীল।

বহুজাতিভিত্তিক তালিকা হলো এটাকে একটি জনপ্রিয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে মোকাবিলা করার সূচনা, যা এমন একটি উপায়ে করতে হবে যাতে এটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যা ভালো ও প্রগতিশীল তাকে গ্রহণ করবে এবং যা খারাপ ও ধ্বংসাত্মক তাকে এড়িয়ে চলবে এবং এটা থেকে খুঁজে খুবই গঠনমূলক ও দূরদর্শী কিছু একটা বিকশিত করবে। আচ্ছা, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি একটি সম্ভাব্য ধাপ এবং কোনোভাবেই এটা সবকিছুর উত্তর নয়। তবে এটি একটি সহজলভ্য সূচনা , অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্যান্ডার্সের প্রচারাভিযানের মতো।

ত্রিপুরার নির্বাচনে সাম্প্রতিক পরাজয়ের পর ভারতে বামপন্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত  হয়েছে। এখন ভারতে শুধুমাত্র একটি রাজ্যে বামেরা আছে আর সেটা হচ্ছে কেরালা। এই বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

নোয়াম চমস্কিঃ ভারতের বামপন্থীরা কেরালায় দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী এবং এ থেকে দেখা যায় যে, স্বাক্ষরতা ও মানবাধিকার এবং নারীর অধিকার ও অন্য অনেক ক্ষেত্রে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কেরালা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি সহজেই লক্ষণীয়।

পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থা একটি শক্ত অবস্থানে ছিলো এবং অনেক কারণ, দুর্নীতি, ও অযোগ্যতার জন্য তারা সেটা আপস করেছে। তবে আমি মনে করি এটাকে পুনর্নির্মাণ করা যেতে পারে। হ্যাঁ, প্রগতিশীল শক্তি অনেক সময় ধ্বংস হয়েছে এবং তারা আবার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসেছে। আমেরিকার ইতিহাস এই ধরনের ঘটনায় ভরপুর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম আন্দোলনের কথা ধরা যাক। ১৯২০ এর দশকে ব্যাপক সহিংসতার মাধ্যমে এর অধিকাংশই কার্যত ধ্বংস করা হয়েছিলো। উড্রো উইলসনের লাল ভীতি ছিলো খুবই সহিংস। শ্রম আন্দোলনে কার্যত কিছুই আর অবশিষ্ট ছিলো না। ১৯৩০ এর দশকে এটি পুনর্গঠিত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। এটি নিউ ডিল ওয়েলফেয়ার স্টেট ব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দিয়েছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোটামুটি ইউরোপীয় সামাজিক গণতন্ত্রের লাইনে নিয়ে যায় এবং এটি যুদ্ধোত্তর কালের প্রথমার্ধে টিকে থেকেছে। ওটা ছিলো নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের সময়, আমেরিকার ইতিহাসে সর্বাধিক প্রবৃদ্ধি এবং সাম্যবাদী প্রবৃদ্ধির সময়, অনেক সময় যাকে বলা হয় ‘পুঁজিবাদের স্বর্ণ যুগ’ এবং আদতে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ। আচ্ছা, ওটা সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছেছিলো ও তারপর একটি প্রতি-আক্রমণ হয়েছে এবং ইউনিয়নগুলো গুরুতর আক্রমণের শিকার। সামনের দিনগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের যে সিদ্ধান্তগুলো আসছে তাতে শ্রম আন্দোলন ধ্বংস হয়েছে ও হবে। তবে এটি পুনর্গঠন করা যেতে পারে। পরিস্থিতির সাথে অবিরাম মানিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ী শ্রেণী ক্রমাগত শ্রেণী যুদ্ধে নিয়োজিত আছে এবং সাধারণ মানুষকেও সাড়া দিতে হয়।

এটি ব্যাপকভাবে গুজব রটানো হয়েছে যে, ১৯৭১ সালে মানব প্রবৃত্তি, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার বিষয়ে আপনার সাথে বিতর্ক করার জন্য মিশেল ফুঁকোকে নাকি গাঁজা দেওয়া হয়েছিলো এবং তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মজা করে একেচমস্কি গাঁজাবলতেন। জেমস মিলার তাঁর দ্য প্যাশন অফ মিশেল ফুঁকো  বইতে এটা উল্লেখ করেছেন। আপনি জানেন এটা?

নোয়াম চমস্কিঃ এই নির্দিষ্ট গুজবটি কখনোই শুনিনি এবং আমি নিশ্চিত যে এর কোনো সত্যতা নেই। হল্যান্ডে অবস্থিত ডাচ গ্রামীণ এলাকা ধরে হেঁটে হেঁটে আমরা একসাথে একটি আনন্দময় দিন কাটিয়েছিলাম, কারণ আমরা কিছুটা একে অপরের সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিলাম এবং কিছুটা নিরীক্ষা করার জন্য যে আমি ইংরেজিতে এবং তিনি ফরাসিতে কথা বললে আমাদের ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে। তিনি বেশি ইংরেজি জানতেন না এবং আমি বেশি ফরাসি জানি না। দেখা গেলো যে ব্যাপারটা বেশ ভালোই যাচ্ছে। তাই ফরাসি ও ইংরেজি দুই ভাষাতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে আমরা কথা বলেই কেবল সময় অতিবাহিত করেছিলাম। আমি নিশ্চিত এর বেশি কিছু ছিলো না।

আলী জি (সাচা ব্যারন কোহেন) এর সাক্ষাৎকারটি কী ছিলো? সাক্ষাৎকারে আপনাকে দৃশ্যত অপ্রস্তুত দেখা গিয়েছিলো।

নোয়াম চমস্কিঃ সাক্ষাৎকারের অনুরোধে আমাকে বলা হয়েছিলো যে, একজন খুবই সিরিয়াস সাক্ষাৎকারপ্রার্থী আমার সাথে সময় কাটাতে চান এবং এটাকে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ করতে চান। যখনই আমি প্রবেশ করলাম তখনই বুঝলাম কিছু একটা গোলমাল আছে। আর যখন সাক্ষাৎকার চলতে থাকলো তখন আমি খুবই নম্র থাকার চেষ্টা করেছি এবং আমার মনে হয়েছে, এটা আরও বেশি করে উদ্ভট হতে শুরু করলো। অবশেষে আমি যবনিকা টানলাম। আপনি অপ্রস্তুত বলেছেন, আমি মনে করি এটি হাস্যস্পদ ছিলো। ওরকম জিনিস নিয়ে অপচয় করার মতো সময় আমার নেই। আমার একটি ব্যস্ত জীবন আছে।

 সাক্ষাৎকারটি লাইভ ল নিউজ নেটওয়ার্কে ১৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন