রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:৪০ পূর্বাহ্ণ


১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯, জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের একটি প্রশ্ন- অবশ্য প্রশ্নটি করা দরকার ৭৭.৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থীদের যারা আজকের(৬ মে) দেয়া এসএসসির ফলাফলে কৃতকার্য হয়েছে। সাধারনত, ৭ সংখ্যাকে সৌভাগ্য সংখ্যা ধরা হয়। বলা হয়- লাকি সেভেন। এবারের এসএসসির ফলে পাশের হারে সে লাকি সেভেনের ছড়াছড়ি (৭৭.৭৭ শতাংশ)। অবশ্য আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পাশ করা এই ৭৭.৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের সৌভাগ্যে নয় বরং পাশ করেছে পরিশ্রমে। আবার এটাও বিশ্বাস করি, অনেকে পাশ করেছে টেনেটুনে, অনেকে সম্মানজনক ফলাফল করলেও অংকে কোন মতে পাশ করেছে।

আমি প্রশ্নটা করতে চাই, অংকে ভালো শিক্ষার্থীদের। আর তাই ঝুঁকিমুক্ত হতে প্রশ্নটা করছি, জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের (এটা তো নিশ্চিত যে, তারা গনিতেও ভালো করেছে) অনেকে এখন প্রশ্ন করতে পারেন- আপনার প্রশ্ন আজকের এসএসসি কৃতকার্যদের বিশেষত জিপিএ ৫ প্রাপ্তদেরই কেনো? উত্তর- এসএসসির ফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এ ফলাফলের খবর ছেয়ে গেছে। ফলে চাপা পরেছে অনেক গুরুত্বপূর্ন খবর। আজকের ৭৭.৭৭ শতাংশ সৌভাগ্যবান-বতীরা যেহেতু আগামীর ভবিষৎ, তাই ভবিষৎ গড়ার আগে বর্তমানে নিজ দেশকে বুঝে নেয়া তাদের দায়। আমি তাদের অগ্রজ হিসাবে সে বুঝে নেবার সুতাটা ধরিয়ে দিতে চাই।

হে জিপিএ ৫ পাওয়া ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ মেধাবী, তোমরা কি দেশের প্রয়োজনে এ অংকটা করে দেবে- ৪ হাজার কোটি টাকা যদি পিনাট (চিনাবাদাম) হয় তবে ৫-৭ হাজার টাকা কী? তোমাদের উত্তর যদি হয়, সরিষাদানা। তবে তোমাদের উত্তর ভুল। ৪ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ৫ হাজার টাকা ৮০,০০০০০ ভাগের এক ভাগ। চিনাবাদাম আর সরিষাদানার রেশিও কী এতটা? হে মেধাবীরা, হে দেশের ভবিষৎ-এরা, এবার তোমরা হিসেব মিলিয়ে দাও, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ৪ হাজার কোটি টাকা চিনাবাদাম হলে ৫ হাজার টাকা কী?

হিসাব মেলানোর আগে, এ গনিত সম্পর্কে একটা ধারনা দেই। ৪ সেপ্টেম্বর’১২ তে হলমার্ক কেলেংকারী নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন- “৪ হাজার কোটি টাকা কিছুই না, সামগ্রিক অর্থনীতিতে পিনাট” তারপর থেকে দেশের অর্থনীতিতো চিনাবাদাম আর কাজুবাদামের মতই মুখোরোচকে বিধস্থ হয়েছে, হচ্ছে! দেশে এখন খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ এখন ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অবলোপন করা ঋণের ৪৫ হাজার কোটি টাকার হদিস নেই। এ টাকা আদায় হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

এবার ঋন আদায়ের একটা গল্পের কথা বলি- ৬ মে বাংলা ট্রিবিউনে একটা গুরুতর নিউজ প্রকাশিত হয় যা এসএসসির ফলাফলের নিচে চাপা পরে- “কুমিল্লায় সাড়ে চার হাজার কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলার খড়গ ঝুলছে। কৃষি ঋণের টাকা শোধ করতে না পারায় এসব কৃষকের নামে ইতোমধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। জেলার ১৭টি উপজেলায় ছয়টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ঋণের ১২ কোটি ৪৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা আদায়ে মোট ৪৫ হাজারটি সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করে।” আমি যেহেতু লেখাটি লিখছি, এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া সফলদের উদ্দেশ্যে, আমি জানি তারা বাংলাতেও A+ পেয়েছে।

তাই এসএসসি সিলেবাসে আল মাহমুদের বোশেখ কবিতাটি তাদের টাটকা স্মৃতি। সে স্মৃতির প্রতি স্নেহ রেখেই এ বৈশাখে আমি আবৃত্তি করছি কবিতাটি- ‘যে বাতাসে বুনোহাঁসের ঝাঁক ভেঙে যায়, জেটের পাখা দুমড়ে শেষে আছাড় মারে, নদীর পানি শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে, নুইয়ে দেয় টেলিগ্রাফের থামগুলোকে সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি। তিষ্ঠ হাওয়া, তিষ্ঠ মহাপ্রতাপশালী, গরীব মাঝির পালের দড়ি ছিঁড়ে কী লাভ? কী সুখ বলো গুড়িয়ে দিয়ে চাষীর ভিটে? বেগুন পাতার বাসা ছিঁড়ে টুনটুনিদের, উল্টে ফেলে দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি, হে দেবতা, বলো তোমার কী আনন্দ, কী মজা পাও বাবুই পাখির ঘর উড়িয়ে? রামায়ণে পড়েছি যার কীর্তিগাথা সেই মহাবীর হনুমানের পিতা তুমি? কালিদাসের মেঘদূতে যার কথা আছে, তুমিই নাকি সেই দয়ালু মেঘের সাথী? তবে এমন নিঠুর কেনো হলে বাতাস? উড়িয়ে নিলে গরীব চাষীর ঘরের খুঁটি, কিন্তু যারা লোক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়ে, তাদের কোনো ইট খসাতে পারলে না তো! হায়রে কতো সুবিচারের গল্প শুনি! তুমিই নাকি বাহন রাজা সোলেমানের, যার তলোয়ার অত্যাচারীর কাটতো মাথা, অহমিকার অট্টালিকা গুড়িয়ে দিতো। কবিদের এক মহান রাজা রবীন্দ্রনাথ, তোমার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন করজোড়ে, যা পুরোনো শুষ্ক মরা অদরকারী, কালবোশেখের একটি ফুঁয়ে উড়িয়ে দিতে। ধ্বংস যদি করবে তবে শোনো তুফান, ধ্বংস করো বিভেদকারী পরগাছাদের, পরের শ্রমে গড়েছে যারা মস্ত দালান, বাড়তি তাদের বাহাদুরি গুঁড়িয়ে ফেলো।’

আমি ভাবছিলাম, ঋন আদায় না হওয়ায় শুধু কুমিল্লার ১৭ টি উপজেলায় সাড়ে চার হাজার কৃষকের নামে মামলা হয়েছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এ দেশের কৃষকেরা দুর্নীতি মুক্ত, ঋন পরিশোধের সফল অতিত রেকর্ড কৃষকদের। সে কৃষকেরা যখন ঋন পরিশোধ করতে পারেনি তখন বুঝতে হবে অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি সহ নানা কারনে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক অসামর্থ হয়েছে। এদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিলে কিছু হয় না, মামলা হয় না, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় না! অথচ কৃষক ৫-৭ হাজার টাকা ঋন নিয়ে (যে ঋন পেতে গেলেও ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের লোকদেরকে ঘুষ দিয়ে পেতে হয়) প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফসল নষ্টে পরিশোধে ব্যর্থ হলেই কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা! এ এক তামাশা বটে! কবিতার মতোই- উড়িয়ে নিলে গরীব চাষীর ঘরের খুঁটি, কিন্তু যারা লোক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়ে, তাদের কোনো ইট খসাতে পারলে না তো!

আমি আবারও ফিরছি আমার প্রশ্নে, যে প্রশ্নটি রেখেছিলাম ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯, জিপিএ ৫ প্রাপ্ত মেধাবীদের। ৪ হাজার কোটি টাকা চিনাবাদাম হলে ৫ হাজার টাকা কী? এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শৈশব থেকে তোমাদের কাঁধে বইয়ের বস্তা তুলে দিয়েছে, আর মাথায় ভালো ফলাফলের চাপ।

এসএসসির এ অবসরে, মাত্র যখন রেজাল্ট দিলো, এ সময়কে উপভোগ করো। আমার দেয়া অংকটা কঠিন হলে আপাতত ছুড়ে ফেলে দাও, এটা করার আরো সময় পাওয়া যাবে। তোমরা এ অবসরকে, এ আনন্দময় সময়কে উপভোগ করো। বিচরন করো তোমাদের স্বপ্ন জগৎ-এ। যে জগৎ-এ তুমিই রাজা, তুমিই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বোশেখের ঝড়। যে ঝড় টুনটুনির বাসা নয় বরং ভাঙ্গবে লোক ঠকানো প্রাসাদ। কী? এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে তো?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন