, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৪:০৮ অপরাহ্ণ


রাস্তায় একটা মেয়ে দেখলেন সে ভালো না খারাপ কিভাবে বুঝবেন? ভারতবর্ষীয় সমাজে এই সিদ্ধান্তে আসার সহজ উপায় হল হল মেয়েটির পোষাক!
পোষাক দিয়ে নারীর স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার অভ্যাস আমাদের পুরনো। আমরা প্রায় সময়ই ভুলে যাই পোষাক একটা বহিরাবরণ মাত্র। এটা কখনও চারিত্রিক সনদ হতে পারে না। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমের পোষাক নারীদের পড়তে হয় এবং সেই পোষাকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে সমাজের সবার সাথে নাও মিলতে পারে এবং এটা কখনোই অপরাধ হতে পারে না।

আদিতে যখন পোষাক এর ব্যবহার ছিল শুধু শীত-গরম ও বিরূপ প্রকৃতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া এখন সেই পোষাককে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে রমরমা বাণিজ্য। মুক্তবাজার অর্থনীতির এ সময়ে পোষাক একটি অর্থনীতির খুটিও বটে। বাংলাদেশের তৈরি পোষাক শিল্প এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাছাড়া আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তাও ফ্যাশন হাউসগুলোও পোষাকের বৈচিত্রকে পুঁজি করেই গড়ে তুলেছেন তাদের ব্যবসার পুঁজি। এই পোষাকের সাথে পণ্যায়ণেরও একটা সম্পর্ক আছে। সিনেমার নায়িকাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যারা যত আবেদনময়ী পোশাকে পর্দায় আসে সেই সিনেমার কাটতিও বেড়ে যায়। এটাই যেন নিয়ম।
এই যে নারীকে পণ্য করা হচ্ছে, পোষাক আর প্রসাধনীর আড়ালে বিক্রয় হচ্ছে নারীদেহ এই বাস্তবতার জন্য কি গোটা সমাজব্যবস্থাটাই দায়ী নয়? আমি বলছি না নারীকে ছোট পোষাক পরিধান করতে; আমি বরং বলতে চাচ্ছি পোষাক দিয়ে নারীর চরিত্র মাপজোক করা আর অন্যদিকে পোষাককে কেন্দ্র করে রমরমা বাণিজ্য এটা কি স্ববিরোধিতা নয়?

ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সময় মেয়েদের ধর্ষণের অপব্যাখাতে কেউ কেউ পোষাকের প্রসঙ্গ নিয়ে আসে যদিও দলটি সংখ্যায় খুব কম তারপরও বলতে চাই, এ আস্ফর্ধা কেমন করে হয়? একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে নারী পুরুষের সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে চলছে, সমাজের অর্জনগুলোর সমান অংশীদারিত্ব নিচ্ছে এ সময় মেয়েদের পোষাক নিয়ে কথা বলাটা একটা গর্হিত কাজ নয় কি? তাছাড়া প্রায় সময়ই দেখা যায় অত্যাচারের শিকার নারীরা বেশ শালীন পোষাক পরিহিত ছিল।

আমার খুব প্রিয় এক লেখক পাওলো কোয়েলহো তার এক বই winner stands alone( জয়ীরা একা) তে লিখেছিলেন : আমরা কি এক পৃথিবীতে দুই ধরনের সমাজ তৈরি করছি না যেখানে এক সমাজ আমাদের শিখাচ্ছে তোমার পোষাক কোন ব্যাপার না Your karma or your work does matter আরেক সমাজ আমাদের বলে যাচ্ছে Dress for success তোমার সাফল্য তুমি কতটা সঠিক পোষাক পরিধান করেছো তা দিয়েই নির্ধারিত হবে।

তাই তো প্যারিস লন্ডন ফ্যাশন উইকগুলো এখনও এতো জনপ্রিয় । অন্যদিকে আমাদের বিলিয়নার টেক আইকনরা উদাহরণ হিসেবে মার্ক জুকারবার্গ অথবা বিল গেটস কে দেখি অগাধ অর্থ সম্পদের মালিক হয়েও তারা সাধারন একটা জিন্স টি শার্ট পড়ে দিনের পর দিন পার অতিবাহিত করছে আরেকদিকে আমাদের হলিউড বলিউড টালিউডের নায়িকারা একের পর এক দামি ড্রেস পরিধান করে মিডিয়ার হেডলাইনে পরিনত হচ্ছে ।

পোষাক এর ব্যাপারে আমি যখনই কথা বলি তখন আমার মাথায় আসে দ্রৌপদীর কথা । আমার জানা মতে দ্রৌপদী ছোট কাপড় পরিহিত কেউ ছিল না যার বস্ত্রহরন করা যায়! হিন্দু পুরাণের অন্যতম জনপ্রিয় নারী চরিত্র দ্রৌপদী। পাশা খেলায় হারতে হারতে সর্বস্বান্ত যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীকেই পাশা খেলায় বাজি ধরে ফেলে এবং যথারীতি হেরেও যায়। তখন কৌরবরা প্রকাশ্য দ্যুতসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করে। রাগে দুঃখে ক্ষোভে দ্রৌপদী কৌরবদের দিকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিল, “অন্ধ বাবার অন্ধ সন্তান”।

দ্রৌপদী পুরাণের সম্ভবত একমাত্র নারীচরিত্র যে তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে এবং প্রতিশোধ নিতে পেরেছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত দ্রৌপদীকেও সব হারাতে হয়েছে এবং তার পরিণাম বেদনা বিধুর। বর্তমান সময়েও প্রভাবশালী দ্রৌপদী পাঁচ-পুরুষের মাঝে বস্তুর মত বন্টিত হয়ে যাওয়া একজন নিতান্তই দুর্বল নারী। এবং তার পাঁচ বীরপুরুষ স্বামী কৌরবদের হাত থেকে দ্রৌপদীকে রক্ষা করতে পারে না। তবে দ্রৌপদীকে আমি সবসময়ই একটা আইকনিক চরিত্র বলে মনে করি। মহাভারতে দেখা যায়, যখন সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরন এর চেষ্টা হলো কৃষ্ণের সহায়তায় কোনরকমে দ্রৌপদী ফিরে আসলেও তার কিন্তু যাত্রা থেমে থাকেনি।

দ্রৌপদী ঠিক উঠে দাড়িয়েছে শক্ত হাতে, সাহস জুগিয়েছে, প্রতিশোধ নিয়েছে যারা তার সম্মানহানি করতে চেয়েছিল। তাই এখন সময় এসেছে দ্রৌপদী হওয়ার, বস্ত্রহানি মানে আত্মবিসর্জন নয়। ধর্ষণ মানে কোন অর্থেই সম্মানহানি নয়। ধর্ষণ মানে জীবনের সব চাওয়া পাওয়া শেষ হয়ে যাওয়া নয়, জীবন এতো ছোট নয় ।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন