, ২০ জুন ২০২১; ৪:৪৯ অপরাহ্ণ


সরকারী চাকরিতে কোটা বা পিছিয়ে থাকাদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা যে সকল দেশে চালু আছে, তার সব কয়টিতেই এই বিশেষ আয়োজন নিয়ে মাত্রাভেদে কম বা বেশী অস্বস্তি ও ক্ষোভ লক্ষ্য করা যায়। তবে বাংলাদেশে কোটা সংরক্ষণের নামে দীর্ঘদিন ধরে যা চলে আসছে, তা অন্যায্য, অন্যায় ও জুলুমের পর্যায়ে পড়ে। এটার গদগদে পচা চেহারাটা দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হবার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত, এটা নিয়ে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের কোন মনযোগ ছিল না! এরা জেগে ঘুমান, না সবসমই তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকেন, তা আজ তদন্তের দাবী রাখে।

আরেকটি বিষয়ও যাচাই বাছাই করে দেখা জরুরী, এতো দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা এই ‘আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা’ কতটা দূর্নীতি মুক্ত ছিল! এর সুযোগ নিয়ে যারা সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের ঢোকার ক্ষেত্রে মামা- চাচাদের প্রভাব, অথবা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের প্রতিপত্তি, অথবা প্রবল দূর্নীতিগ্রস্থ আমলাদের আরো টাকা বানানোর কাজ-কামে এটা কতটা অপব্যবহারের শিকার হয়েছে তা পরীক্ষা- নিরীক্ষা করেও দেখা দরকার।

সরকারী চাকরিতে কোটা পদ্ধতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সমাজের অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য কিছু অংশ সংরক্ষিত রেখে, তাদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর বেসামরিক (সিভিল) চাকরিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৫৬% কোটা আছে, বাকী ৪৪% নিয়োগ হয় মেধার ভিত্তিতে। ৫৬% ভাগ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা বা সন্তান বা নাতিপুতির জন্য ৩০%, জেলা কোটা ১০%, মহিলা কোটা ১০%, উপজাতি কোটা ৫%, প্রতিবন্ধি কোটা ১%। এছাডা়ও ননক্যাডার ও নিম্নপদস্থ পদে আরও বিভিন্ন ধরনের কোটার আয়োজন আছে!

তবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর নিয়োগে কোটার কোনো অস্তিত্ব নাই। ফলে সেখানে এখনো পেশাদারীত্ব, শৃঙ্খলা ও সততার কিছু লেশ অবশিষ্ট আছে।

~কেমন করে কোটা এলো~

বাংলাদেশ স্বাধীন হওযা়র পর, ১৯৭২ সালে সরকারী চাকরিতে নিয়োগদানের জন্য তৎকালীন সরকার একটি অস্থায়ী নিয়োগ বিধিমালা জারী করে। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭২, মন্ত্রিপরিষদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাপন বিভাগের সচিব এম. এম. জামান স্বাক্ষরিত ইস্ট/আরআই/আর-৭৩/৭২-১০৯(৫০০) নম্বর প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে সকল জেলার নাগরিকদের সুযোগদানের নিমিত্তে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে মেধা কোটা হবে ২০%, বাকী ৮০% জেলার মধ্যে বন্টন করা হবে। এর মধ্যে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, মুক্তিযুদ্ধে নিগৃহীত মহিলাদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষিত থাকবে।

১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল পরিপত্র নং ইডি/আরআই/আর-৫৬/৭৫/৫২ মূলে মেধা কোটা ২০% থেকে ৪০% করা হয়। মহিলা কোটা ১০% করা হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে কিছু বলা হয়নি।
১৯৮৫ সালের ২৮ জুলাই, এমইআর/আর-১/এস-১৩/৮৪-১৪৯(২৫০) স্মারকমূলে ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের মেধাভিত্তিক কোটা বর্তমানে প্রচলিত ৪০% হইতে ৪৫% উন্নীত করা হয়। জেলা ভিত্তিক ৫৫% কোটার মধ্য হতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০%, মহিলাদের ১০%, এবং উপ-জাতীদের ৫% পদ রাখা হয়।

এভাবে চলতে চলতে এক সময় দেখা যায়, আবেদনকারীদের বয়স শিথিল করেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আর লোক পাওযা় যাচ্ছে না! তখন ১৯৯৭ সালে আওযা়মী লীগ সরকারের সময়ে বিধান করা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ ভাগ কোটা তাদের সন্তানদের দিয়ে পূরণ করা হবে (সম(বিধি-১)এস-৮/৯৫ (অংশ-২-৫৬(৫০০) তারিখ: ১৭/০৩/১৯৯৭)। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় বিধানটির ব্যাখ্যা করে বলা হয়- কোনো কোটায় প্রার্থী না পাওযা় গেলে সেই শূণ্য পদ মেধাকোটা দিয়ে পূরণ করা যাইবে; (সম(বিধি-১) এস-১৪/৯৯-২৮৪, তারিখ ০৪/০৯/২০০২)।

এরপরে যখন কোটা পূরণের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরও পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন এই ৩০% কোটা পূরণ করতে বর্তমান আওযা়মী লীগ সরকার তা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতি পর্যন্ত প্রসারিত করে।

 

~সংবিধানও অগ্রাহ্য হয়েছে~

১৯৭২ সালের অস্থায়ী নিয়োগ নীতিমালায় যখন কোটা চালু করা হয়, তখন দেশে কোনো সংবিধান ছিল না। বাংলাদেশের সংবিধান গৃহিত হয় এরপরে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ। এই সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বলা হয় ‘১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে; ২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেইক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ ২৮ অনুচ্ছেদে নারী, শিশু, বা অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে বাধা না থাকার কথা বলা আছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান করতে অনাপত্তির কথা বলা হয়েছে, যার আওতায় অনগ্রসর জেলা কোটা, মহিলা, উপজাতিদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জেলা কোটা সম্পর্কে ১৯৯২ সালের ৩ মে সংস্থাপন সচিব হাসিনুর রহমান সাক্ষরিত সম/বিধি-১/এস-১৫/৯২-১০২(১৫০) নম্বর পরিপত্রে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন অনগ্রসর জেলার নাগরিকগণকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের বিষয়ে সমতাভিত্তিক সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী তাহাদের অনুকূলে বিশেষ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্যেই ৫-৯-৭২ ইং তারিখের স্মারকের মাধ্যমে সর্বপ্রথম কোটাভিত্তিক পদ সংরক্ষণের নীতিমালা জারী করা হয়। ইহা অনস্বীকার্য যে জেলাকোটা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(৩)(ক) অনুচ্ছেদের বিধান।

~মুক্তিযোদ্ধা কোটা, কে মুক্তিযোদ্ধা~

তাহলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাটি কোন বিভাগে / শ্রেণীতে (cetagory) পড়ে? এটা কোন অনগ্রসর শ্রেণী? এই সংক্রান্ত কোনো সরকারী আদেশ বা বিধি অদ্যবাধি জারী হয় নাই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ কোটা বা সুবিধা দেযা়র কথা ১৯৭২ সালের সংবিধানের কোথাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও বলা হয়নি। তাহলে গত ৪৬ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা কোটাটি কিসের ভিত্তিতে চালু থাকলো? এই প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা কি বাংলাদেশের কোন সরকার কখনো দিয়েছে!
মুক্তিযোদ্ধা কোটাটি অনগ্রসর শ্রেণী কি না, তা যাচাই করতে একটি পরিসংখ্যান দিকে দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত ১ লাখ ৬০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার জন্য ৩০% কোটা দেযা় হয়েছে। অর্থাৎ ০.০১% নাগরিকদের জন্য ৩০% কোটা! তাহলে এই বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তরা কি আর অনগ্রসর শ্রেণীতে পড়ে? সংবিধান বা কোনো আইন বা বিধিতে কি ৩০ ভাগ কোটা সমর্থন করে? বরং এটি সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে উল্ল্যেখিত সকল নাগরিকদের সমান সুযোগ লাভের অধিকার খর্ব করে। ফলে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংবিধানে কোনো কোটা বা আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও প্রায়োগিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তিনটি সুবিধা এতো দিন ধরে চলে আসছে:

১. তাদের জন্য ৩০% পদ রিজার্ভ রাখা;
২. ঢোকার সময় তাদের বয়স দুই/তিন বছর বেশি পর্যন্ত ছাড় দেযা়; 
৩. পরবর্তিতে, চাকরি শেষে অবসরের বয়সও দুই বছর বাড়িয়ে দেয়া হয়। 

মূলত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে এটি করা হয়েছিল যুদ্ধের কারণে লেখাপডা়য় যে বিঘ্ন ঘটেছিল এবং যথাসময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরিতে ঢুকতে না পারার ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য।

দু:খজনক ভাবে বাংলাদেশে কোন কিছু একবার শুরু হলে তা আর কেউ থামানোর সাহস পায় না। এই অচল হয়ে পড়া কোটার ভাগ্যেও তাই ঘটেছে! দীর্ঘকাল ধরে মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে প্রশাসনের ভেতরে অবস্থানকারী একটি স্বার্থান্বেষী মহল এই অসাংবিধানিক, অযৌক্তিক ও অসম ব্যবস্থা জারী রেখেছিল। যা আজ নতুন প্রজন্মের প্রশ্নের মুখে পড়ায়, তা বিগত সকল শাসকদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আবার এটাও সত্য, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এই শব্দটি খুব স্পর্শকাতর হওয়ায় অনেকেই হয়তো এই বিধানের অবাস্তবতা ও অন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহসও পায়নি! কারণ অনেকেই খুব অসংযত ভাবে ‘রাজাকার’ শব্দটি যত্রতত্র ব্যবহার করেন।

মুক্তিযোদ্ধা কোটার সাথে জড়িয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে নানা জাল জালিযা়তির করুন কাহিনী। ভুযা় মুজিবনগর সনদ, মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলো এমনদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাওয়ার মত কৌতুকপ্রদ কেলেঙ্কারি, এমনকি বর্তমান সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী সচিব জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেখিয়ে সুবিধা নেয়ার পর, যখন তা ধরা পড়ে, তখনও তাদের কোন শাস্তি না হওয়ার মত লজ্জাজনক কলঙ্কে ঠাসা বিষাদময় ইতিহাস।

~আগে কোটার ভাগ, তারপর পরীক্ষা~

নিয়োগের ক্ষেত্রে এতদিন ধরে বিসিএস পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতি প্রয়োগ হতো, পরীক্ষা শেষে চুডা়ন্ত নিয়োগের সময়। অর্থাৎ প্রিলিমিনারী, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে যখন একজন প্রার্থীকে চাকরির জন্য বিবেচনা করা হবে, সেই পর্যায়ে কোটা ভাগ করা হতো। করিৎকর্মা বর্তমান আওযা়মী লীগ সরকার এই রীতিকে আরেক ধাপ অধ:পতিত করে ৩৪তম বিসিএস থেকে প্রিলিমিনারী পরীক্ষার আগেই কোটা ভাগাভাগির নতুন প্রথা চালু করেছে!

উদাহরনস্বরূপ, যদি ১০০০ পদের বিপরীতে ১ লাখ প্রার্থী থাকতো, সেক্ষেত্রে পুরনো ব্যবস্থায় সব পরীক্ষা শেষ করে, মেধা তালিকা তৈরীর পরে কোটা ভাগ করা হতো। বর্তমানে সেটাও করা হয় না! প্রাথমিক পরীক্ষা শুরুর আগেই কোটার ভিত্তিতে ভাগ করা হয় পদসমূহ। বিশেষ কোটায় শূণ্য পদ কতটা আর প্রার্থী কতজন এটা আগে নির্ধারণ করে, তাদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে পদপূরণের ব্যবস্থা নেযা় হয়। এমন নিয়োগ সম্পন্ন হবার পর দেখা গেছে, মেধা তালিকার উত্তীর্ণ ২২০তম ব্যক্তি চাকরি পায়নি সে কোটাভূক্ত নয় বলে! পাশাপাশি কোটার সুবিধা নিয়ে ৫৬৩২তম ব্যক্তিও পুলিশ ক্যাডারে এএসপির চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে।

চড়া গলার লজ্জাহীন নীতিনির্ধারকদের নেতৃত্বে, ভয়াবহ এক ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ায়, একটি মেধাহীন প্রশাসন গড়া হচ্ছে বাংলাদেশ শাসনের জন্য। দুর্নীতি, অপশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বহীন একটি ব্যবস্থা জারী রাখতে হলে, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক আনুগত্যটাই সকল শ্রেয়বোধের উর্দ্ধে আসন গেড়ে বসে। দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনের মুখেও দাবী না মেনে ছল- চাতুরির আশ্রয় নেয়ার অবিরাম অপচেষ্টা দেখে বুঝা যায়, এমন শাসকদের জন্য এই পচা ব্যবস্থাটি একটি বড় অবলম্বন!

~পিতার বৈষম্যের স্মৃতি, কন্যার বৈষম্যপ্রীতি~

পাকিস্তান আমলে বাঙ্গালীদের প্রতি পাঞ্জাবিদের বৈষম্যের কথা স্মরণে রেখেই হয়তো বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা মুক্তিযোদ্ধা নামে কোনো বিশেষ শ্রেণী তৈরী করেননি এবং তাদের জন্য জন্য কোন কোটা সংবিধানে রাখেননি। সংবিধান প্রণয়নের আগে ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জারী করা ইন্টেরিম রিক্রুটমেন্ট পলিসিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ শতাংশ কোটার কথা বলা হয়। এটি নির্বাহী আদেশের বলে জারী করা একটি ইন্টেরিম মানে অস্থায়ী বা স্বল্পকালীন ব্যবস্থা। ১৯৭৩ সালে পিএসসি’র মাধ্যমে ৩৫০টি পদে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োগের পর এই অস্থায়ী ব্যবস্থাটি বন্ধ হওযা়র কথা ছিল। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশন (রশিদ কমিশন) সরকারি নিয়োগে প্রচলিত কোটাসমূহ ১৯৮৭ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছরে ধীরে ধীরে কমিয়ে তা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন।

কায়েমী স্বার্থোন্মাদ পক্ষ তা না করে, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ১৯৯৭ সালে এই কোটাব্যবস্থার কার্যকারীতা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান পর্যন্ত প্রসারিত করে। পরে আরো এক ধাপ বাড়িয়ে এই ব্যবস্থাকে বংশপরম্পরা পর্যন্ত বিস্তৃত করে, এদের নাতি-নাতনী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে শেষ নয়, ২০০০ সালে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ২৩তম বিশেষ বিসিএস অনুষ্ঠিত করে, তাদের মধ্য থেকে কয়েক হাজারকে নিয়োগ দেযা় হয়েছিল। পরিশেষে এর অর্থ দাঁডা়লো, মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরা পেলো, তাদের সন্তানরাও পেলো, তারপর রাখা হলো তাদের নাতি-পুতির কোটা!

বিশেষ বিবেচনায় দীর্ঘ প্রায় সাতচল্লিশ বছর ধরে, একটি ‘অসাধারণ’ গোত্র বা গোষ্ঠী তৈরীর মাধ্যমে, বংশ পরম্পরায় ৩০% কোটার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কি, বাংলাদেশের সংবিধান অথবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুমোদন করে?

~কোটা সংস্কারে বিশিষ্টজনদের তাগিদ~

১৯৯১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশেনের বার্ষিক প্রতিবেদনে কোটা পদ্ধতি পূনবিন্যাস করার সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশে বলা হয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকুরী প্রার্থী পাওযা় যাচ্ছে না, তাই এটি ৩০% থেকে কমিয়ে ৫% করাটা সমিচিন হবে।

খ্যাতিমান অর্থনীতিবীদ, প্রফেসর মুজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ২০০৭ সালের টি. আই. বি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এখন আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও জেলা কোটা রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এগুলো বাতিল করা দরকার। অন্তত ৭৫% নিয়োগ মেধাভিত্তিক করে, বাকী অংশ লিঙ্গ, জাতিগত, ধর্মীয় কোটায় বিভক্ত করা যেতে পারে।

পিএসসির সাবেক চেযা়রম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেছেন, ‘সরকারী চাকুরীতে মেধাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেযা় উচিত। কেননা, মেধাবীরাই একসময় দেশের নেতৃত্ব দেবে। মেধাবীরা সরকারী চাকুরীতে আসলে গতিশীল নেতৃত্ব তৈরী হবে। যেভাবেই হোক না কেন, মেধার কোন বিকল্প নেই।’

মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কেবিনেট সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ডঃ আকবর আলি খান ২০০৮ সালের একটি গবেষণায় ৫৫% কোটাকে অমানবিক উল্লেখ করে বলেছেন, কোটার সুযোগ মেধার চেয়ে বেশি হওযা় উচিত নয়। এতে করে জনমনে এই ধারণা হতে পারে যে, কম মেধাবীরা প্রশাসনে নিয়োগ পাচ্ছে, এবং প্রশাসনের মান নীচের দিকে নামছে।

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আরেক প্রাক্তন চেযা়রম্যান এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে প্রচলিত কোটা প্রয়োগ পদ্ধতি সরলীকরন করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিযা়জ আহমেদ বলেছেন, এদেশে এক ধরনের গোষ্ঠী আছে যারা চায়, সরকারী নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে কোটা থাকুক। সব ধরনের কোটা এখন আর দরকার নাই। কিছু কোটা থাকবে, কিন্তু সেসব কোটা প্রবর্তনের সময়ই উল্লেখ করা উচিত, তা কত বছর বহাল থাকবে।

উল্ল্যেখিত মতামতসমূহ থেকে বুঝা যায়, শিক্ষাবিদ ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই প্রসারিত কোটার বিরোধী। তারা দীর্ঘদিন যাবত এই পদ্ধতির সংস্কার, স্বচ্ছতা ও সরলীকরণ চেয়ে আসছেন।

লক্ষপ্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে স্বাধীন হয়েছিল মূলত, বাঙ্গালীদের প্রতি পাঞ্জাবিদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে। একটি সমতাভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ, গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সৃষ্টিই ছিলো স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। সেখানে কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে অনন্তকাল ধরে (যারা মোট জনসংখ্যার ০.০১% শতাংশ) ও বংশানুক্রমে সরকারী চাকুরীর প্রায় এক তৃতীযা়ংশ দিয়ে যাওয়া হবে, আর বাদবাকী ৯৯.৯৯% মানুষের জন্য রাখা হবে মাত্র ৭০ ভাগ; এমন ভয়াবহ বৈষম্য দেশবাসী কতদিন নীরবে সহ্য করতে পারে!এটা কি স্বাধীনতার বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে যায়?

~সংস্কারে অরুচি; ঝোঁক বাতিলের দিকে~

কোটাপদ্ধতি সংস্কারের জন্য দেশজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ, বিরক্তি ও হতাশা জড়ানো কণ্ঠে জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিয়ে কোটা পদ্ধতি তুলে দেযা়র ঘোষণা দিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোন লিখিত আদেশ, নির্দেশ বা গেজেট আজো প্রকাশিত হয়নি! ফলে বিষয়টি নিয়ে সমাজ ও সংসারে পুনরায় বাদানুবাদ দেখা দিয়েছে। এর প্রতিক্রিযা়য় গত ২ মে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সন্মেলনে প্রধানমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করে বিষয়টি নিয়ে আর কোন কথা না বলতে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের ছবি ও ডাটা সরকারের কাছে আছে বলে সতর্ক করেছেন।

কেবল মাত্র একটি প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে গত ৪৭ বছর ধরে চলছে থাকা এই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করাটা কোন কঠিন কাজ নয়।। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা রাখার কোন আয়োজনও বাংলাদেশের সংবিধানে নাই। তাতে পরিষ্কার ভাবে লিখা আছে, “নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন” করা যাইবে। এই করণীয় সম্পাদনের নির্দেশনাও বাধ্যতামূলক নয়। রাষ্ট্র বা সরকার প্রয়োজন মনে করলে এটা করতে পারে।
তাই এখন সরকারের সৎ অভিপ্রায় জাগ্রত হওয়া মাত্রই, তারা একটি নির্বাহী আদেশ জারী করে চলমান কোটা ব্যবস্থার সংস্কার বা এটা পুরোপুরি বাতিল করে, দ্রুত ধাবমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের ব্যাপক জনপ্রিয় এই দাবীটি আর কোন বিতর্ক, বিবাদ ও বিসংবাদ ছাড়াই নিষ্পত্তি করতে পারে।

 

লেখকঃ নোমান ইরফান, জনপরিসর নামক নাগরিক সংগঠনের জন্য লিখিত। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন