, ১৩ জুন ২০২১; ৮:২৭ অপরাহ্ণ


হজরত শাহজালাল মাজার, সিলেট

(এক)

তেরো শতকের গোড়ায় ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত। যদিও নবম ও দশম শতাব্দীর গোড়ায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলে আরব ও পারস্য বণিকদের বাণিজ্য-সূত্রে আগমনের নজির পাওয়া যায়। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে কুতুব উদ্দিন আইবেক এবং ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক যথাক্রমে দিল্লি ও নদীয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই সে-সময়টাতেই মূলত এ অঞ্চলে মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নদীয়া অর্থাৎ বঙ্গ-বিজয়ের আগেই এই অঞ্চলে ধর্মের মহিমা ও গুণকীর্তন প্রচারের লক্ষ্যে বেশসংখ্যক পীর, দরবেশ ও সুফি এসেছিলেন বলে কিছু ইতিহাসবিদের অভিমত রয়েছে। তবে এ-মতের সপক্ষে যথাযথ ঐতিহাসিক প্রমাণাদি সহজলভ্য নয়। অনেক গবেষকের মতে, খিলজির শাসন-প্রতিষ্ঠার পরই মূলত বাংলায় সুফিবাদের বিস্তৃতি ও বিকাশ হয়েছে। এসব সুফীগণ মুসলমান সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অপরাপর সুফিসাধকদের ধারাবাহিকতায় ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে ৩৬০ জন আউলিয়াসহ সিলেট অঞ্চলে আসেন হজরত শাহজালাল (রহ.)। এরপর থেকে ১৩৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আমৃত্যু এই জনপদে মুসলিম ধর্মপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর মধুর বাণী ও হিতোপদেশ ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেকে শাহজালাল-বন্দনায় মত্ত হয়ে ওঠেন। ওই ধারাবাহিকতা তাঁর মৃত্যুর প্রায় সাত শ বছর পর এখনও সমানভাবে অক্ষুন্ন রয়েছে। তাঁর সমাধি অর্থাৎ ‘মাজারস্থল’ কেন্দ্র করে প্রতিদিনই হাজারও ভক্ত-আশেকানের ভিড় লেগেই থাকে।

(দুই)

শাহজালাল মাজারে অসংখ্য ভক্ত-আশেকানের উপস্থিতির সঙ্গে সিলেটসহ সারা দেশের নানা স্থানের বাউল-ফকিরদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিও যথেষ্ট লক্ষণীয়। বিশেষত প্রতি বৃহস্পতিবার বাউল-ফকিররা মাজারে অবস্থান নেন। আর যেখানে তাঁদের উপস্থিতি সংগত কারণেই সেখানে গান-বাজনা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁরা রাতভর মাজারে সুফী, মরমি, ফকিরালি, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্বসহ নানা পর্যায়ের গান গেয়ে পার করে দেন। এর বাইরে শাহজালালের গুণকীর্তন করে মহিমাসূচক গান রচনা করে সেসবও পরিবেশন করা হয় এসব আসরে।

শাহজালালের প্রসংশাসূচক পদাবলি হওয়ায় এসব গান ‘শাহজালাল শানে’ ও ‘জালালি-গান’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কবে থেকে শাহজালাল মাজারে এসব গানের আসরের সূচনা হয়েছিল সেটির সঠিক দিন-ক্ষণ জানা না-গেলেও অন্তত এটি বলা যায়-শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯), দুর্বিন শাহ (১৯২০-১৯৭৭), গিয়াসউদ্দিন আহমদ (১৯৩৫-২০০৫), আবদুল হামিদ জালালিদের (১৯৪৯) হাত ধরে ‘জালালি-গান’ রচনার ধারাটি বিকশিত হয়েছে। কারণ এঁদের আগে শাহজালাল বন্দনাসূচক পদাবলি রচনার ইতিহাস খুব একটা পাওয়া যায় না। করিম-দুর্বিন-গিয়াস-হামিদদের আগে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ফুলগাঁও গ্রামের শাহ আবদুল লতিফের (১৮৪০-১৯৬০) রচিত কেবলমাত্র একটি গানের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি নিম্নরূপ :

শোন বলি সারাসার বাংলাদেশের অধিকার
নায়েবে রাসুল আমার বাবা শাহজালাল ॥

পূর্বে ছিল অন্ধকার ফয়েজের গুণে পরিষ্কার
ইসলাম হইল জারি ফজলে আল্লার।
নায়েবে রাসুল আমার বাবা শাহজালাল ॥

তিন শ ষাট আউলিয়া সঙ্গেতে আইলা বাবা আনন্দতে
ধন্য ধন্য শত ধন্য আনন্দবাজার।
নায়েবে রাসুল আমার বাবা শাহজালাল ॥

উমেদও রাখিয়া দিলে শোভা নাহি ফল মিলে
কৃপাসিন্ধু দীনবন্ধু ধর্ম অবতার।
নায়েবে রাসুল আমার বাবা শাহজালাল ॥

লতিফ শাহ কয় বারেবার আছি বাবার তাবেদার
দরগাহ শরিফে হয় জিকিরও আল্লার।
নায়েবে রাসুল আমার বাবা শাহজালাল ॥

তার মানে এটা বলা যায়-শাহ আবদুল লতিফই প্রথম ‘জালালি-গান’ রচনা করেছিলেন।

যদিও তাঁর পরে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে শেখ ভানু (১৮৪৯-১৯১৯), দীনহীন (১৮৫৪-১৯১৮), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), ইব্রাহিম তশ্না (১৮৭০-১৯৩০), আরকুম শাহ (১৮৭৭-১৯৪১), দেওয়ান একলিমুর রাজাসহ (১৮৮৯-১৯৬৪) অনেক সাধক জন্ম নিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের রচিত গানগুলোর মধ্যে ‘জালালি-গান’ রচনার বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। শাহ আবদুল লতিফের জন্মের দীর্ঘ পরে দুর্বিন শাহের গানের সংকলন ‘প্রেমসাগর পল্লীগীতি’ (আনু. ১৯৫০) বইয়ে শাহজালাল বন্দনাসূচক কিছু গানের মুদ্রিতরূপ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও কিছু ‘জালালি-গান’ রচনা করেছিলেন। একইভাবে শাহ আবদুল করিমের কালনীর ঢেউ (১৯৮১) গ্রন্থেও কিছু ‘শাহজালাল শানে’ অর্থাৎ ‘জালালি-গান’-এর মুদ্রিতরূপ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে তাঁর ‘কালনীর কূলে’ (২০০১) বইয়েও একই পর্যায়ের কিছু গান মুদ্রিত হয়। করিম-দুর্বিনদের পর কফিলউদ্দিন সরকার (১৯৩২-২০১২), গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ক্বারী আমীরউদ্দিন আহমদ (১৯৪২), মো. শফিকুন্নূর (১৯৪৩-১৯৯৬), আবদুল হামিদ জালালি, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, শিবলী চিশতিসহ অনেকেই ‘জালালি-গান’ রচনা করেছেন।

(তিন)

‘জালালি-গান’ রচনার ইতিহাস খুব একটা প্রাচীন নয়। মোটামুটি শত বছর ধরে শাহজালাল মাজারে এ-গানের চর্চা হয়ে আসছে। তবে এটিও ঠিক যে, অন্তত কয়েক শ বছর আগে থেকেই বাউল-ফকিরদের একটা সমৃদ্ধ আস্তানা হিসেবে শাহজালাল মাজার সমাদৃত হয়ে আসছে। শুরুতে হামদ ও নাতে রাসুল, সৃষ্টিতত্ত্ব, আউলিয়া শানে, মুর্শিদি, পারঘাটা, দেহতত্ত্ব, শরিয়ততত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব জাতীয় গান পরিবেশিত হতো। এরপর ‘জালালি-গান’ রচনার প্রচলন শুরু হওয়ার পর অন্যসব গানের পাশাপাশি ‘জালালি-গান’ শীর্ষক গানও গীত হতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ‘বিচ্ছেদ’ পর্যায়ভুক্ত গানও শিল্পীরা আসরে পরিবেশন করে থাকে। ‘জালালি-গান’ রচিত হওয়ার আগেও এখানে মাজারকেন্দ্রিক গানের ধারাটি সজীব ও প্রাণবন্ত ছিল। ঐতিহ্য-পরম্পরায় সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার এখনও এ-রকম গানের আসর বসে।

প্রতি বছর জিলকদের চাঁদের ১৯ ও ২০ তারিখ শাহজালাল মাজারে ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের বাউল-ফকির ও শাহজালালের লাখো ভক্ত-অনুসারী মিলিত হন। প্রাসঙ্গিকভাবেই ওরশে গান হয়ে ওঠে মুখ্য নিয়ামক। এসব কারণেই সিলেটের মরমি-বাউল-ফকিরি গানের ধারাটি বেগবান হওয়ার পেছনে শাহজালাল মাজারের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

(চার)

দুর্বিন শাহ শাহজালাল-বন্দনা করতে গিয়ে এক গানে লিখেছিলেন – কী সুন্দর এক নুরের বাতি হইয়াছে প্রচার/ বঙ্গদেশের পূর্বাংশে শাহজালাল নামটি যার ॥/ বাতির রৌশনি এমন, আকাশে চন্দ্র তারার যেমন কিরণ/ এই আলোতে ঘুচল তখন সিলেটেরই অন্ধকার ॥’ অন্যদিকে শাহ আবদুল করিম শাহজালাল মাজারের গানের আসরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁর কালনীর কূলে বইয়ের ‘শাহজালাল ইয়ামনি ওলির দরবারে’ শীর্ষক গানে লিখেছিলেন : ‘ফকির যারা নাম ধরেছে অন্য এক ভাবে পড়েছে/ কেউ গায় কেউ নাচে কেউ জিকির পড়ে ॥/ আরেক দল ফকিরের ধারা গান করেন যন্ত্র ছাড়া/ পাক-পবিত্র হয়ে তারা বসেন উপরে ॥/ আমি সবার কাছে যাই, আমি সবার করিম ভাই/ আমার কোনও বিভেদ নাই আমার বিচারে ॥’ তবে গিয়াসউদ্দিন আহমদের লেখা ও বিদিতলাল দাসের সুরোরোপ করা একটি ‘জালালি-গান’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটির পাঠ নিম্নরূপ :

সিলেট পরথম আজান ধ্বনি বাবায় দিয়াছে।
তোরা শোন সেই আজান ধ্বনি আইজো হইতাছে
যেই ধ্বনিতে পাথর গইলা পানি হইয়াছে ॥
এমনি শাহজালাল বাবা, সঙ্গে তিন শ ষাইট আছহাবারে
বোরহানের দাওয়াতে বাবা সিলেট আইসাছে ॥
রাজা ছিল গৌড়গোবিন্দ, বাবার পথ করিল বন্ধরে
জায়নামাজ বিছাইয়া সুরমা পাড়ি দিয়াছে ॥
উঠে সাত তালার উপরে, বাবায় আজান দিলো জোরে
সাত তালা ঝরিয়া পড়ে পরমান রইয়াছে ॥
সিলট পরথম আজান ধ্বনি, শুনাইলেন জালাল এমনি রে
বাবার দোয়ায় কত পাপী নাজাত পাইতেছে ॥
আওরে যত মুরিদান, আগে গাই বাবার গান রে
আসরে আসিয়া বাবা উদয় হইয়াছে ॥

শাহজালালের সিলেট আগমন এবং তাঁকে ঘিরে প্রচলিত লোকশ্রুতিগুলোই গিয়াসউদ্দিন আহমদের গানের বিষয়বস্তু হিসেবে হাজির হয়েছে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বরইকান্দি গ্রামের ছিদ্দিকুর রহমান (১৯২৬-২০০৫) একাধিক ‘শাহজালাল শানে’ শীর্ষক গান রচনা করেছেন। তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গান নিম্নরূপ :

জালাল বাবা ঘুমাইছেন, সিলেটেরই মাটিতে
আওরে ভাই চলে যাই, ফয়েজ রহমত লইতে ॥

পূণ্য আত্মার মুক্তি লইয়া, জুল্লে জালাল নাম ধরিয়া।
দুয়ারে যাই ভিখারি হইয়া, সবে মিলে এক সাথে ॥

মাজারে হইয়া হাজির, করিবো জালালি জিকির।
নাচতে নাচতে হইব অস্থির, সেই নাম লেখি বুকেতে ॥

ভক্তের ডাক শুনিয়া পরে, বাবায় যদি দোয়া করে।
ছিদ্দেক কয় আঁধার ঘরে, ভরে যাবে আলোতে ॥

অন্যদিকে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার আকিলপুর গ্রামের প্রয়াত বাউল-গীতিকার কফিলউদ্দিন সরকার শাহজালালবিষয়ক অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন। এগুলোর অধিকাংশ এখনও অমুদ্রিত অবস্থায় থাকলেও মাজারে গানের আসরে তাঁর শিষ্য-অনুসারীদের কণ্ঠে প্রতিনিয়তই এসব পরিবেশিত হচ্ছে। বর্তমান প্রবন্ধ-লেখকের সম্পাদনায় প্রকাশিত কফিলউদ্দিন সরকারের গান শীর্ষক গ্রন্থে একটি ‘জালালি-গান’ মুদ্রিত হয়েছে। এ গানে শাহজালাল মাজারে বাউল-ফকিরদের গানের জলসার কিছুটা রূপ পরিস্ফুট হয় :

জালাল বাবার গুণে আমরা শিক্ষা পাই মুসলমানি
এই দেশ করিল আবাদ শাহজালাল ইয়ামনি ॥

পির আউলিয়া সাধু ফকির
ধ্যানে বসে করিতেছে জালালি জিকির
উপাসনা হয় জিন্দিগির ঘুচে সব পেরেশানি ॥

দরবেশ অলি বাউল আর মস্তান
জালালি রূপ ধ্যানে করে নামের সুধা পান
প্রাণ খুলিয়া জালালি গান গায় তারা দিনরজনী ॥

পাইয়া বাবার জালালি পরশ
ব্যাধিমুক্ত পায় আর দেহ হয় সরস
কফিলউদ্দিন নামেরই বশ এই সারা জিন্দেগানি ॥

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের বাউল-গীতিকার শাহ মো. খোয়াজ মিয়াও (১৯৪২) শাহজালাল বন্দনাসূচক গান রচনা করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার আলমপুর গ্রামের বাউলশিল্পী ও গীতিকার ক্বারী আমীর উদ্দিন আহমদ শাহজালাল বন্দনাসূচক গানকে ‘জালালি-গান’ অভিধা দিয়ে লিখেছিলেন : ‘[…]/ তাই তো গাই জালালি-গান, আল্লাহ কত মেহেরবান/ সিলেটবাসী খ্যাতি পায়, জালালি মুসলমান ॥’
সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার ওসমানীনগরের বাসিন্দা গীতিকার নবীন সিদ্দেক আলীর (১৯৬৪) নিগুঢ়া : নবীন সঙ্গীত (২০১১) শীর্ষক প্রকাশিত গানের সংকলনটিতে শাহজালালের স্তুতিসূচক তিনটি গান মুদ্রিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘লালে লাল শাহজালাল’ শীর্ষক তাঁর একটি গান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানটি তিনি ২০০৩ সালের ১০ জুলাই রচনা করেছিলেন। গানটির সম্পূর্ণ পাঠ নিম্নরূপ :

লালে লাল, লালে লাল, লালে লাল, লালে লাল
কুদরতী কামাল তুমি বাবা শাহজালাল-
তোমার প্রেমে আশেক মাস্তান, দোলেরে ধামাল ॥

তোমার পরশ পাইয়া বাবা খুশাল এই বাঙাল-
বাবা খুশাল এই বাঙাল।
নিরস ভূমি সরস হইলো, কী সুন্দর মিছাল-
বাবা কী সুন্দর মিছাল ॥

সিলেটে জ্বালাইলায় বাবা তাওহিদের মশাল-
বাবা তাওহিদের মশাল।
জুল্লে জালাল তুমি বাবা, রহমতের আলাল-
বাবা রহমতে আলাল ॥

ফয়েজ রহমত পাইতে বাবা আসিলাম এ কাঙাল
বাবা আসিলাম এ কাঙাল।
নবীন সিদ্দেক তোমার গানে, হইয়া যে মাতাল-
বাবা হইয়া যে মাতাল ॥

একইভাবে ‘শাহজালাল শানে’ শীর্ষক গান রচনা করেছেন হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের বাউল-গীতিকার আবদুর রহমান (১৯৫৫), সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের শাহ নূরজালাল (১৯৬৪), মজলিসপুর গ্রামের বাউলশিল্পী বশিরউদ্দিন সরকার (১৯৬৪), ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের দুর্বিনটিলার আলম শাহ (১৯৬৬) প্রমুখ।

শাহজালালের বন্দনাসূচক গান রচনার ক্ষেত্রে সিলেট শহরের আম্বরখানা বড়োবাজার এলাকার আবদুল হামিদ জালালি পথিকৃৎতুল্য ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। তিনি অন্তত শতাধিক ‘জালালি-গান’ রচনা করেছেন। জালালি-গান রচনার ধারাটিকে বেগবান করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনন্য, এ কারণে তাঁর নামের পেছনে শাহজালাল ভক্ত-অনুসারীদের বদৌলতে ‘জালালি’ শব্দটা পর্যন্ত জুড়ে যায়। তিনি ১৯৬৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন বাউলগানে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে শাহজালাল মাজারে গানের আসরে অংশ নিতে শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে রচনা করেছিলেন ‘ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে’ শীর্ষক একটি শাহজালাল স্তুতিসূচক গান। এ গানটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে এখন তো বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গানটি নিম্নরূপ :

ঝাঁকে উড়ে আকাশ জুড়ে
দেখতে কি সুন্দর
জালালি কইতর, জালালের জালালি কইতর ॥

ঝর্ণার পাড়ে আছে বাবার প্রথমও কাহিনি
গায়েব হইতে আসিতেছে ঝমঝমের পানি।
সোনার কই মাগুরে খেলে কূপেরও ভিতর
জালালি কইতর ॥

হাজার হাজার গজার মাছ আছে পুকুর ভরা
দিন রজনী খেলিতেছে বাবার আসিক যারা
সেই গজার মাছ গেলে মারা দেয় তারে কবর
জালালি কইতর ॥

জালালের হাতের জালালি তসবি ওরাই বর্তমান
তরবারি দেখিলে মিলে বীরত্বের প্রমাণ।
পায়ের খড়ম দেখলে জুড়ায় হামিদের অন্তর
জালালি কইতর ॥

বাউল-ফকিরেরা ছাড়াও নাগরিক ধারার কবিদের মধ্যে জালালি-গান/কবিতা চর্চার বিষয়টিও সিলেট অঞ্চলে পরিলক্ষিত হয়। কবি দিলওয়ারের (১৯৩৭-২০১৩) লেখা ‘তুমি রহমতের নদীয়া’ শীর্ষক জালালি-গানটি তো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

(পাঁচ)

শাহজালালের বন্দনা-সূচক গানগুলো কেবল বাউল-ফকিরদের চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইদানীং এসব গান নাগরিক শিল্পীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। বাউলশিল্পী রণেশ ঠাকুর এবং সিরাজ উদ্দিনদের অডিও অ্যালবাম ও সিডির পাশাপাশি ‘জালালি-গান’-এর সিডি প্রকাশনায় হালের শিল্পীদের আগ্রহও ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রায় বছরজুড়েই সিলেট ও ঢাকা থেকে নিয়মিতভাবে নানা শিল্পীদের কণ্ঠে ‘জালালি-গান’-এর অ্যালবাম মুদ্রিত হয়। শাহজালাল মাজারে আসা দর্শনার্থীরাই মূলত এসব অ্যালবামের প্রধান ক্রেতা।

‘জালালি-গান’-এর বেশ কয়েকটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন শিল্পী সৌরভ সোহেল। তাঁর গাওয়া ও মুদ্রিত অ্যালবামগুলোর মধ্যে ‘শাহজালাল বাবার দরবারে’, ‘নায়েবে রাসুল বাবা শাহজালাল’ ও ‘জালালীয়া শান’ উল্লেখযোগ্য। শিল্পী মুনের ‘লালে লাল শাহজালাল’ এবং শরিফ উদ্দিনের ‘শাহপরান বাবা’ শীর্ষক অ্যালবামগুলোর কাটতি ভালোই বলে ‘জালালি-গান’ অ্যালবামের একাধিক বিক্রেতা জানিয়েছেন। এর বাইরে আরও শিল্পীর গাওয়া ‘জালালি-গান’-এর একাধিক অ্যালবাম রয়েছে। লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী মমতাজ, শিরিন, রিংকু, জামালউদ্দিন হাসান বান্না, কালা মিয়া প্রমুখ তাঁদের অ্যালবামে ‘জালালি-গান’ স্থান দিয়েছেন।

(ছয়)

শাহজালালের মাজার ছাড়াও সিলেটসহ দেশের মাজারকেন্দ্রিক লোকগানের একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ধারা তৈরি হয়েছে। এক শ্রেণির মানুষের মাজারবিরোধী অপতৎপরতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক-পারিপার্শ্বিক সংকটে মাজারকেন্দ্রিক গানের ধারাটি ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ঠেকছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বাউল-ফকিরদের প্রাণবান ধারাটি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসার কারণে আগের মতো প্রতি বৃহস্পতিবার আর ঘটা করে মাজারে গানের আসরও বসে না। তবে আশার কথা হচ্ছে-দেশের অপরাপর মাজারের তুলনায় শাহজালাল মাজারকেন্দ্রিক বাউল-ফকিরদের তৎপরতা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেনি। তাই ‘জালালি-গান’ রচনার ধারাটিও আপাতত অব্যাহতভাবে চলছে। ঠিক কতদিন এ-রকম চলবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন