বুধবার, ১৭ মে ২০২২; ১১:১৭ অপরাহ্ণ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮তম ভিসি হিসেবে মো. আখতারুজ্জামানকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়োগ দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান তিন দফা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে তিনি নির্বাচিত হন। এছাড়া সহসভাপতি ছিলেন দুবার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪তম ভিসি হিসেবে ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট নিয়োগ পান ডা. গোলাম কিবরিয়া। এর আগে তিনি ২০০৪-০৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষক সমাজ সমর্থিত হলুদ প্যানেল থেকে তিনি শিক্ষক সমিতির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি তিনবার প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ছিলেন। সেনাসমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শেখ হাসিনার মুক্তির আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেন তিনি।

২০১৯ সালের নভেম্বরে অধ্যাপক ড. শিরিন আখতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্ব পান। তিনিই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ভিসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি কক্সবাজার জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য। গত বছর মার্চে তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০১৪ সালের মার্চে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম নিয়োগ পান। ২০১৮ সালে তাকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে তিন মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। তখন তিনি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও পদত্যাগ করেনি। তবে ওই দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০২১ সালের মে মাসে অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনকে চার বছর মেয়াদে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২তম ভিসি নিয়োগ করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রাজনীতি রয়েছে। এখানকার শিক্ষকরা আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ জাতীয় রাজনীতির অংশ হিসেবেই শিক্ষক রাজনীতি করেন। মাহমুদ হোসেন ভিসি হওয়ার আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাবেক সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মোজাম্মেল হোসেনের একমাত্র ছেলে। মোজাম্মেল হোসেন ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাগেরহাট-৪ আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে তাকে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়। ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি মারা যান এই সংসদ সদস্য। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১তম ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসানকে ২০১৯ সালের মে মাসে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম ভিসি হিসেবে ২০২১ সালের জুনে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ইমদাদুল হক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি ছিলেন ২০১৮ সালে।

অধ্যাপক ড. স্বদেশ চন্দ্র সামন্তকে ২০২১ সালের মে মাসে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি করা হয়। এর আগে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে পটুয়াখালী কৃষি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং নীল দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রাবস্থায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হল শাখার ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন তিনি।

গত বছর ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর দে। তিনি একাধিকবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সমিতির নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন (আরেফিন মাতিন)। তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সদস্য, ২০০৪ সালে কোষাধ্যক্ষ এবং ২০১১ সালে মহাসচিব নির্বাচিত হোন। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ও ২০১১ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পান ২০১৭ সালের মে মাসে। দ্বিতীয় মেয়াদে তাকে ভিসি করা হয় গত বছর মে মাসে। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সদস্য ছিলেন।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জেডএম পারভেজ সাজ্জাদকে কিশোরগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) পদে নিয়োগ পাওয়া সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সমিতির নেতা ছিলেন। এর মধ্যে তিনজন ভিসি জেলা ও থানা আওয়ামী লীগের নেতা। এসব তথ্য পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা তাদের জীবনবৃত্তান্ত থেকে। অবশ্য তাদের মধ্যে একজন ব্যতিক্রম, তিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ক্ষমতাসীন দল সমর্থক শিক্ষক রাজনীতিতে যোগ দেন।

ব্যতিক্রম ফরিদ : দেশের ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, নিয়োগ পাওয়া ভিসিদের অতীত জীবনে সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সমিতির নেতা ছিলেন। বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সাদা দল করতেন। এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়া চেয়ার করার প্রস্তাবক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীপন্থি নীল দলে যোগ দেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হন, শিক্ষক সমিতির সভাপতিও হন। ২০১৭ সালে শাহজালালের ভিসি হন। ২০২১ সালে তার প্রথম মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় দেড় মাস আগে তাকে আবার দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি নিয়োগ করা হয়।

ফরিদ উদ্দিন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। মূলত তিনি গার্মেন্টস ব্যবসা করতেন। এমনকি মালয়েশিয়ায় পিএইচডি করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। পিএইচডি না করে দেশে ফিরেছেন। ভিসি হিসেবে তিনিই ব্যতিক্রম। কারণ তিনি শুধু আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপি করা ভিসিই নন, একমাত্র তারই পিএইচডি ডিগ্রি নেই।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন