মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৩:৪৩ অপরাহ্ণ


ফটো কার্টেসিঃ ডিবিসি

যানজট, দূষণ কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর বিশুদ্ধ পানির সংকট— সময়ের পরিক্রমায় নাগরিক জীবনের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে এমনই কিছু যন্ত্রণার পদবন্ধ। ইতিহাসের পাতায় মসজিদের নগরী কিংবা বিদেশী পর্যটকদের চোখে রিকশার নগরী হিসেবে চিরপরিচিত এ রাজধানীর চিত্র পুরোটাই পাল্টে গেছে।

চারদিক থেকে স্কন্ধের মতো জেঁকে ধরা নগর জীবনের নিত্যসঙ্গী এখন এক ভুতুড়ে স্থবিরতা, নামান্তরে যানজট। এর প্রভাবে সহজ করে বললে থমকে গেছে কর্মচাঞ্চল্য, থেমে গেছে নগর জীবনের প্রাণোচ্ছলতা।

মিরপুর থেকে শান্তিনগর, গাবতলী থেকে মতিঝিল ঘুরে ফিরে একই চিত্র। সুদূর চক্রবালে দৃষ্টি দিলে চোখ ব্যথা হয়, মাথাটাও বুঝি ধরে আসে। তবু পিঁপড়ার মতো সারি ধরে থেমে থাকা যতগুলো গাড়ির দেখা মেলে তাদের ধৈর্যের সীমা অবাক করে আমাদের। সাত জনমের স্থবিরতাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে এরা, ব্রতই যেন নগর জীবনকে পুরো অচল করে দেয়ার। সকাল থেকে দুপুর, বিকাল থেকে সন্ধ্যাকাল এরা থেমে আছে, নড়ার কোনো চেষ্টাই যেন নেই। নগরীর কর্মচাঞ্চল্যে শশব্যস্ত মানুষ চলছে দুর্দিনের প্রণতি সামনে রেখে, পায়ে হেঁটে দৌড়ে। কখনও তাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে থেমে থাকা গাড়ির ফাঁকফোকর গলিয়ে খোদ রাজপথ ধরেই। আবার কেউ কেউ একটু কষ্ট করে নাকে রুমাল চেপে এগিয়ে যাচ্ছেন ফুটপাত ধরেই। প্রক্ষালণ কক্ষের অপ্রাপ্তিতে সোজা পদচল পথটিকেই যারা প্রাকৃতিক কর্মসাধনের একমাত্র অবলম্বন ভেবে দিনের পর দিন নোংরা জলবিয়োগ করছেন, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছেন; তাদের অপকর্মের মতো থেমে নেই সেখানে যাতায়াতও। তাই এমনি করে বললে চলছে সবই, চলছে সবাই, থেমে নেই সবার প্রিয় নগর ঢাকা; তবে ঠিকই থমকে গেছে জীবন।

বিভীষিকার নাম ট্রাফিক সিগনাল। মোড়ে মোড়ে যমদূতের মতো লালরঙা দণ্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রাফিক পুলিশ। অপেক্ষা কখন চলতি পথে গাড়ি আটকে দেয়া যায়, আর যাত্রী-গাড়িচালক-হেল্পারের ভয় কখন বের হন কোনো ভিআইপি। আর তার জন্য রাস্তাকে খালি রাখতে হবে, আটকে রাখতে হবে ইতর প্রাণী সাধারণ জনগণকে, যাদের মূল্য কেবল ভোটের দিনই। এমনই ঝক্কি ঝামেলা পোহানোর পরও রাজপথে চলতে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে উঠতে পারে যে কারোই।

সেক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হয়ে দেখা দিতে পারে যেটি, সেটি হলো— এ গাড়িভরা রাজপথে আপনার বাহন কোথায়? থমকে থাকা গাড়ির সারিতে দৃষ্টি দিলে দৃষ্টিসীমা ক্লান্ত হয়ে ফিরবে দূর দিগন্ত থেকে, দেখবে সাদা-কালো-বেগুনি-লাল নানা গাড়ির সমারোহ। আর সেখানে সাধারণ কোনো মানুষের চড়ে বসার এখতিয়ার নেই।

প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহনগুলোর আধিক্যে নিজের জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে গণপরিবহনগুলো। সারি বেঁধে রাস্তায় নেমেছে ব্যক্তিগত পরিবহনগুলো। তার বেশির ভাগ মানছে না ট্রাফিক সিগনাল। কেউ অসৎ পথে জোর করে আদায় করে নিতে চাইছে ভিআইপি সুবিধা। দেখা যাচ্ছে বিশাল একটা জায়গা দখল করলেও তাতে যাতায়াত সংস্থান হচ্ছে মাত্র এক কিংবা দুজনের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট গন্তব্য থেকে মালিককে ফিরিয়ে আনতে কোনো কোনো গাড়িতে বসে এগিয়ে যাচ্ছেন চালক স্বয়ং। তখন তার ভেতরে অন্য সময়ের মতো একজন মাত্র যাত্রীও উপস্থিত নেই। আর এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে গাড়িগুলো। এগুলো দেখে দিনের শেষে নগরবাসীর যে কারো মুখে একটি প্রশ্নই উঠতে পারে, গাড়িভর্তি রাজপথে গণপরিবহন কোথায়?

যে নাগরিক জীবন আপনাকে দিয়েছে অনেক যন্ত্রণার উদরপূর্তি, বসনের পছন্দসই বক্কল আর ইচ্ছেখুশি আটপৌরে যাপনের আদিখ্যেতাময় অবকাশ; ঠিক সে নগর জীবন জিঘাংসার নির্মমতায় আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে সেকেন্ডের পর সেকেন্ড, মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টা থেকে ঘণ্টা মূল্যবান সময়। আপনার ইচ্ছে, উদ্যম আর সামর্থ্য থাকার পরও নানা ক্ষেত্রে ছিটকে পড়ছেন জীবনের দৌড় থেকে। শুধু স্থবিরতাই হয়ে যাচ্ছে ব্যর্থতার কারণ। একটু গুরুত্ব সহকারে দেখলে এক্ষেত্রে পরিবহনের শ্রেণীগত বৈষম্য প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।

সমাজের উচ্চ শ্রেণী নিম্ন শ্রেণীর সেই সংঘাত কার্ল মার্ক্স থেকে শুরু করে লেনিন, ট্রটোস্কি গুয়েভারারা যে যার মত বলে গেছেন; কিন্তু আমাদের রাজধানীতে অন্তত যানবাহনের ক্ষেত্রে যে শ্রেণী সংঘাত তার বিবরণ মেলেনি তাদের কারো বিবরণে। এ বিবরণের বিশ্লেষণ মেলে চর্মচক্ষে, দিনদাহাড়ে দেখে নিতে হয় নিজের মতো করে। ঘর্মাক্ত পোশাকে রাজ্যের ক্লান্তি-অবসাদে অনুভব করতে হয় নিতান্ত অসহায়ের মতো। হয়তো কারো চাকরির ইন্টারভিউ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের ১ ঘণ্টা আগেই রওনা দিয়েছেন তিনি। তার পরও কোনো ভিআইপির বদান্যতায় পড়ে গেছেন সিগনাল বিড়ম্বনায়। তার পর সিগনাল শেষ করে যখন তিনি গন্তব্যে পৌঁছেছেন, ততক্ষণে সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। ইন্টারভিউ বোর্ড পাততাড়ি গুটিয়ে সটকে পড়ার অপেক্ষায়। শুধু গণপরিবহন সংকট আর যানজট তার জীবন থেকে কেড়ে নিল একটি স্বপ্ন, অপমৃত্যু হলো একটি নতুন সম্ভাবনার।

হরতাল, অবরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে রাস্তার সব পরিবহন বন্ধ থাকলে সেটা এক বিশেষ সমস্যা তার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা অবস্থানিক সমতা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, যানজটের কারণে ত্যক্ত বিরক্ত বাসমালিকরা প্রয়োজনের সিকিভাগ গাড়ি রাজপথে নামায়। তার মধ্য থেকে কিছু গাড়িকে সরাসরি যাতায়াতের কথা বলে গেট লক করে রাখা হয়। আর তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে ঠিকই, বিপত্তিটা ঠিক সেখানেই। এভাবে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে পৌনঃপুনিকভাবে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। অনেকে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও গণপরিবহনের সংকটে বাধ্য হচ্ছেন ব্যক্তিগত পরিবহনের দিকে ঝুঁকে পড়তে। তাই রাজধানীর পথগুলোয় যতদূর দৃষ্টি যায় তার সিংহভাগ ব্যক্তিগত পরিবহন, শতাংশের দশমাংশ হয়তো গণপরিবহন। বিভিন্ন রীতিনীতি আর রুট জটিলতায় সেগুলো মানুষের কতটুকু কাজে আসছে, তা নিয়েও সন্দিহান অনেকে।

ব্যক্তিগত পরিবহন বলতে শুধু প্রাইভেট কারের কথা বলা ঠিক হবে না, তবে সিংহভাগ রাজপথ দখলে রেখেছে এটিই। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ঝুঁকছেন মোটরবাইক থেকে শুরু করে সরাসরি বাইসাইকেলের প্রতি। ত্যক্ত বিরক্ত অনেক মানুষকে বহুগুণ বেশি ভাড়া গুনে রাজপথ দিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে রিকশায়ও! এতে রাস্তায় যানজটের পরিমাণ যেমন আনুপাতিক হারে বেড়ে চলেছে, তেমনি গণপরিবহনের অবস্থান হয়ে পড়ছে আরো প্রান্তিক ও অবহেলিত।

যানজটের কারণে যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে না পেরে বাসমালিক ও চালকরা শুরু করেছেন বিভিন্ন ধরনের ফন্দিফিকির। নির্দিষ্ট গন্তব্যে সরাসরি পৌঁছে দেয়ার আশ্বাসে সেগুলোয় আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। এতেও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। অহেতুক অতিরিক্ত ভাড়া যেমন গুনতে হচ্ছে, তেমনি শুধুই নামে কিন্তু কাজে নয় এসব সিটিং সার্ভিস প্রতিদিন ধোকা দিচ্ছে নগরবাসীকে। অন্যদিকে বিশেষ সময়ে যখন মানুষের বাসের খুব বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই লোকাল বাসগুলো সরাসরি যাতায়াতের উদ্দেশে তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে শুধু দূরপাল্লার যাত্রী বহন করছে। বিশেষ করে মিরপুর মতিঝিল রুটের গাড়িগুলোর কথা বলা যেতে পারে। এখানে সিটিং এবং লোকাল দুই ধরনের বাসই চলাচল করে। কিন্তু মাঝপথে শাহবাগ, কারওয়ান বাজার কিংবা ফার্মগেট এলাকায় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সেসব গাড়িতে ওঠার সুযোগ নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে যেসব গাড়ি সাধারণ সময়ে লোকাল সার্ভিস দিয়ে থাকে, পিক আওয়ারে তারাও মওকা বুঝে নিজেদের রূপান্তর করে নেয় সিটিং সার্ভিসে। এতে আরেক দফা বেড়ে যায় যানবাহন সংকট।

বিআরটিসি সিটি সার্ভিসের নামে যে পরিবহনগুলো মহানগরীতে চলছে, সেগুলোর অবস্থা বর্ণনা করা যেতে পারে একটি উপমায়, আর তা হলো— ‘যাচ্ছেতাই’। সকাল থেকে শুরু হয় তাদের পথচলা। কিন্তু তারা কোথায় যাবে, কোন গন্তব্যে যাত্রী নেবে আর কতক্ষণে যাবে— স্বয়ং স্রষ্টা বাদে সেটা বোধকরি আর কারো ধ্যানজ্ঞানে থাকে না। আসছে রমজান, সন্ধ্যার আগে ঘরমুখো মানুষের ঢল আরো বাড়বে, স্বভাবতই প্রকট হবে যানজট। তখনো যদি বাস কিংবা গণপরিবহনের এমন সংকট থাকে, তা জনদুর্ভোগ কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে, সেটা ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রাজপথে বাসের চলাচল অবাধ করতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের উচিত এখনই এগিয়ে আসা। প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোয় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রিকশার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিবহনের অবাধ যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপও করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে দেশ কিংবা এই মহানগরী কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, একজন নাগরিক হিসেবে সেখানে সবার অধিকার সমান। তাই রাজপথ কারো দখলে থাকবে, আর তাদের কারণে দুর্ভোগ-দুর্দশার শিকার হবে সবাই, এটা কাম্য নয়। আমার প্রশ্ন, গাড়িভর্তি রাজপথে গণপরিবহন কোথায়? কে নিবে জনসাধারণ বহনের দায়?

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন