, ১ জানুয়ারি ২০২১; ১:৩২ অপরাহ্ণ


হুমায়ন আহমেদ এর একটা বই পড়ছিলাম, “অন্ধকারের গান”। বইটির একটি চরিত্র বুলু যে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। তারপর রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে অথবা যে কোন ভাবে তার পায়ে একটি শিমুল কাটা ফুটে। চিকিৎসার জন্য বুলু তার বাবার কাছে টাকা চাইতে পারে না কারণ বেকার ছেলে কিভাবে টাকা চায় বাবার কাছে যেখানে সে নিজেই বাবার কাছে এক যন্ত্রনার নাম। পায়ের এই যন্ত্রনা নিয়ে সে ঘোরাফেরা করে, দিনযাপন করে। সমস্যা এটা না যে বুলুর পায়ে কাটা ফুটেছে বরং সমস্যা হলো হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম যে আমি আমার নিজের পা কুঁচকে রেখেছি, মানে বইটিতে আমি এতো বেশি ডুবে গিয়েছিলাম যে বুলুর ব্যাথাকে নিজের ব্যাথা মনে করেছি !  আমি অনুভব করছিলাম যে কাটা বুলুর নয় আমার পায়ে ফুটেছে, ব্যাথা যা পাবার বুলু নয় পাচ্ছি আমি!

এমনই মনোমুগ্ধকর হুমায়ূন যার কল্পনার ব্যাথা নিজের ব্যাথা বলে ভুল হয়। যার জন্য গাইতে ইচ্ছে করে “বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও”!

সাধারনত হুমায়ন আহমেদ এর বই তখনই পড়ি যখন অন্য কিছুই পড়তে ভালো লাগেনা। তাঁর বই মগজকে আনন্দে ভাসিয়ে রাখে। যেমন কোন পার্কের Marrry go round এর মতো কিছুক্ষন আনন্দের সাথে বসবাস করা । হুমায়ুন আহমেদের বই হচ্ছে তাই আমার কাছে ঠিক তেমনই আনন্দের সাথে বসবাস করা ।

যে জিনিস চোখের সামনে থাকে তাকে আমরা ভুলে যাই যে ভালবাসা সব সময় আমাদের ঘিরে রাখে  তার কথা আমাদের মনে থাকে না। মনে থাকে হঠাৎ আসা ভালবাসার কথা। আমার মনে হয় হুমায়ুন আহমেদ প্রতিনিয়ত আমাদের সেই সব ভালোবাসার কথাই মনে করিয়ে দেয় যে সব ভালোবাসা আমাদের মনে থাকে  না । যেই সব ঘটনা আমরা চোখে দেখি না।

আমার চোখে হুমায়ন আহমেদ এর সেরা সাতটি  বই:

হুমায়ুন আহমদ বাংলাভাষী যেকোন মানুষ এর কাছেই আকর্ষণীয় এক মানুষ। শুধু এপার বাংলায় নয় তিনি ওপার বাংলাতেও সমানভাবে জনপ্রিয়। তার বই মানেই বেষ্টসেলিং তকমা।  তিনি গল্প বলার জাদু জানতেন তাই তার বই ম্যাজিক এর মতোই মানুষকে কাছে টানে!  তার সেরা বই নিয়ে লেখা একটি দুঃসাহস, তার সব বইই মনোমুগ্ধকর এবং সমানভাবে পাঠক কে কাছে টানে। তাই এই লেখাকে হুমায়ন আহমেদ এর সেরা বই এর তালিকা না ভেবে লেখকের পছন্দের সেরা বইয়ের তালিকা হিসেবে বিবেচনা করলেই হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর প্রতি সুবিচার করা হবে বলে আমি মনে করি:

১. জোছনা ও জননীর গল্প:

মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা এই উপন্যাস লেখক নিজেই বলেছেন দেশ মাতৃকার প্রতি ভালোবাসা থেকে। এটা কোন ঐতিহাসিক বই নয় বরং সেই উওাল সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে লেখা এই বইটি। তবে বইতে কিছু ইতিহাস উঠে এসেছে । শেখ মুজিবর রহমান ,ইয়াহিয়া,নিয়াজীরা উঠে এসেছে ইতিহাসের চরিত্র হিসেবে । এছাড়া তার নিজের জীবনের ছায়া তার, সেই সময় তিনি যা প্রত্যক্ষ

 

করেছেন তারই চিত্র উঠে এসেছে বইটিতে  । মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা এক অনন্য উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প।

 

২.  তন্দ্রাবিলাস

মিসির আলী সিরিজের একটি চমৎকার বই যেখানে মিসির আলীর কাছে একটা সুন্দরীর চেয়ে একটা মাছি অনেক গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠে । এই বইতে যথারীতি মিসির আলী সিরিজের অন্য বইগুলোর মতো মিসির আলীর অসাধারন বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করা হয়েছে আর তার সাথে হুমায়ন আহমেদের সেন্স অব হিউমার তো আছেই ! বইটা আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন কোন এক দুপুর বেলায় পড়েছিলাম এবং সেই সুন্দর দুপুরের ঘোর এখনও আমার চোখে, মুখে লেগে আছে  ।তাই পাঠককে আমি বলবো আপনারাও দুপুর বেলায় তন্দ্রালু চোখে পড়তে পারেন তন্দ্রাবিলাস । আশা করি পড়তে গিয়ে বারবার চমকে উঠবেন । তখন তন্দ্রাকে একরকম বিলাসই মনে হবে !

এখানে আমি তন্দ্রাবিলাস থেকে আমার নিজের খুব প্রিয় একটি উক্তি তুলে ধরছি –

“ভোর বেলায় মানুষের মেজাজ মোটামুটি ভালো থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খারাপ হতে থাকে, বিকাল বেলায় মেজাজ সবচে বেশি খারাপ হয়, সন্ধার পর আবার ভালো হতে থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।”

 

৩. আমি এবং আমরা

মিসির আলী সিরিজের আরেকটি বই । একজন সাইকোপ্যাথের গল্প নিয়ে আবর্তিত হয়েছে এই বইটির কাহিনী  । মিসির আলী কীভাবে একজন সিরিয়াল কিলারের সম্মুখীন হলেন এবং কীভাবেই তার হাত থেকে বেঁচে আসলেন জানার জন্য পড়তে হবে এই বইটি । এই বইটির আরেকটি অসাধারন বিষয় হলো সাইকোলজি। মিসির আলী সুনিপুণ ভাবে একের পর এক সাইকোলজিকাল বিশ্লেষণ করেছেন তার অসাধাররন বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যা আপনাকে চমকে দিবে বারে বারে !

 

 

 ৪. রোদনভরা এ বসন্তে

অনবদ্য এক প্রেমের উপন্যাস । গল্পের নায়ক নায়িকা হলো বারসাত আর মীরু । উপন্যাসের শেষে দেখা যায় বারসাতের ক্যান্সার হয়েছে আর এই সময়কার মীরুর মানসিক টানাপোড়ন নিয়ে এই চমৎকার উপন্যাসটির কাহিনী গড়ে উঠেছে ।

 

৫. আয়নাঘর

আয়নাঘর ভোতিক থ্রিলার টাইপের একটা বই । ভোতিক না বলে রহস্যময়ও বলা যায়। রহস্যময় সব ঘটনা নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি ।  লিলিয়ান আর তাহেরের গল্প। লিলিয়ান নেপলসের মেয়ে যে ভালোবেসে বাংলাদেশি ছেলে তাহেরকে বিয়ে করে । তাহেরকে দেখার পর থেকেই লিলিয়ান দুঃসপ্ন দেখতে থাকে । কী তার সে দুঃসপ্ন জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে আয়নাঘর বইটি । এই বইয়ের আরেকটি আকর্ষনীয় দিক হলো তাহের আর লিলিয়ানের মধ্যকার রোমান্টিক ব্যাপারগুলো । উপন্যাসের এক পযার্য়ে এক রাতে অনেক তুষার ঝরছিলো (বিদেশে তুষার পড়াটা অনেকটা আমাদের দেশের বৃস্থি পরার মতো রোমান্টিক ঘটনা )  সে রাতে লিলিয়ান লাল টকটকে একটা গাউন পরিধান করে দেখা করতে যায় তাহেরের সাথে ! এ যেন রাধার কৃশ্মর সাথের অভিসারে যাওয়ার গল্প । বলা তো যায়না বইটা পড়তে পড়তে আপনারও মনে জাগতে পারে লাল একটি গাউন পরে ডেটে যাওয়ার ইচ্ছা !

 

৬. এপিটাফ

হুমায়ন আহমেদ স্যারের অন্য সব লেখা থেকে এই লেখাটি একদম ব্যাতিক্রম । একটা তেরো বছরের ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়ের কাহিনী নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি । মৃতু্্যপথযাত্রী এই মেয়ের গল্পটা পড়া শেষ হলে আবেগে এমনিতেই মনটা ভার হয়ে যায় ।

 

৭. প্রিয়তমেষু

পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকা নিশাত পুষ্পকে ছোট বোনের মতো ভালোবাসে। নিশাতের স্বামী জহির ভালো চাকরি করে। অন্যদিকে দেড় বছরের ছেলেকে নিয়ে দারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে পুষ্পের পরিবার। এক আত্মীয়ের বদান্যতায় ফ্ল্যাটটিতে আপাতত থাকছে ওরা । রকিবের বড়লোক বন্ধু মিজান প্রায়ই সময়-অসময়ে ওদের বাসায় আসে। পুষ্পর সাথে গল্পগুজব করে। এতে পুষ্প বিব্রত হলেও কিছু বলতে পারে না। একদিন মিজান কর্তৃক ধর্ষিত হয় পুষ্প। রাগে, ঘৃণায়, অপমানে বিপর্যস্ত পুষ্প লোকলজ্জার ভয়ে আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। কিন্তু পুষ্প মিজানকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়। পরে নিশাতের সহযোগীতায় শুরু হয় দুই নারীর আত্মসম্মান আর আত্মগ্নানি পুনরুদ্ধারের লড়াই।

 

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে আমাদের সমাজের মনসাত্ত্বিক আবস্থান । তিনি মনে হয় আমাদের তরুন সমাজের সাইকোলজি খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন । তাইতো লিখেছেন-

“আমাদের মধ্যে সম্মান করা এবং অসম্মান করার দুটি প্রবণতাই প্রবলভাবে আছে। কাউকে পায়ের নিচে চেপে ধরতে আমাদের ভালো লাগে, আবার মাথায় নিয়ে নাচানাচি করতেও ভালো লাগে।”

শেষ করছি আমার প্রিয় হুমায়ুন আহমেদের প্রিয় একটি উক্তি দিয়ে  –

“চট করে কারও প্রেমে পড়ে যাওয়া কোনো কাজের কথা না। অতি রূপবতীদের কারও প্রেমে পড়তে নেই। অন্যরা তাদের প্রেমে পড়বে, তা-ই নিয়ম। মৃতদের সাথে ভালোবাসার মিল আছে। মৃতরা চলে যায় শুধু স্মৃতি ফেলে যায় তেমনি ভালোবাসাও শেষ হয়ে যায় ভালোবাসার মানুষ রয়ে যায়। হুমায়ন আহমেদ ঠিক এই কাজটিই করেছেন স্মৃতি, ভালোবাসা আর ভালোবাসার মানুষ হয়ে আমাদের অন্তরে রয়ে গেছেন । আরো থাকবেন হয়তো হাজারো বছর ভালোবাসার মানুষ বলে কথা তাই না!”

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন