মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ১২:১১ পূর্বাহ্ণ


bengalview-abir-01

কলারসিকদের রস আস্বাদনের আঙ্গিক বিবেচনায় শিল্পকলার অন্যান্য অঙ্গসংস্থানের সাথে চিত্রকলা বা পেইন্টিং এর তফাৎটা মৌলিক। অন্যান্য যেকোনো শিল্পকলা – তা সে গান হোক বা কবিতা, উপন্যাস হোক বা নাটক – সিনেমা, মূলভাষার দর্শক শ্রোতাদের সমাদর – ভালোবাসার গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের ভালোবাসা বা স্বীকৃতি পেতে হলে যেতে হয় ভাষান্তরের মধ্য দিয়ে। অনুবাদে বা সাবটাইটেলে তা ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং অনুবাদ যেহেতু কখনোই মুলানুগ হয় না বা হওয়াটা বাঞ্ছনীয়ও নয়, ফলে যেটা করা হয় সেটা হচ্ছে – ভাবানুবাদ বা পুনঃনির্মাণ। তাতে বদলে যায় শিল্পীর মূল সৃষ্টিকর্মের স্বাদ। অপরদিকে চিত্রকলার অনন্যতা তার ভাষাগত সার্বজনীনতায়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসেই একজন চিত্রকর ছবি আকেন না কেন, তিনি কথা বলবেন – তুলিতে , কালিতে। তার ছবিকে আমরা বিচার করবে তার ছবির জমিন বা টেক্সচার, মাধ্যম বা মিডিয়াম আর পেন্সিল বা তুলির স্ট্রোকে। তাই, প্রতিভা থাকলে বাংলার একজন চিত্রশিল্পী মাইকেল মধুসূদন সিনড্রোমে না ভুগেই বার্সেলোনা অথবা প্যারিসে নিজের ছবির প্রদর্শনী করাতে পারেন। নিজগুণে পেতে পারেন বিশ্বময় খ্যাতি। এই ব্যক্তিক অর্জনটুকু যদি দূরে সরিয়ে রাখি, তারপরেও বলা যায় যে – আর্টের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সীমানাপ্রাচীর ভেঙ্গে দেয়ার কাজটা যদি সত্যিই কোন শিল্প মাধ্যম করে থাকে, তবে তা হচ্ছে চিত্রকলা।

তবুও ছবি থেকে ছবি আলাদা। এই বৈচিত্র্য তৈরি হয় দেশভেদে, কালভেদে, প্রকাশভঙ্গীর ভেদে। ভৌগলিকভাবে বা সময়ের প্রেক্ষিতে শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতার দ্যোতনায় পরিবর্তন আসে। অনুপ্রেরণা বদলে যায়। রেখার সূক্ষ্মতা যেখানে একসময় কোন এক অঞ্চলের শিল্পীদের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, সেখানে সময়ের প্রয়োজনেই তুলির আঁচড়ে পরিবর্তন আসে। রেখা হয়ে ওঠে বলিষ্ঠ, গতিশীল। যেখানে রঙের ছড়াছড়ি দেখা যেত ক্যানভাস জুড়ে, সেখানে কালভেদে রঙের সবচে মিনিম্যাল ব্যাবহার বা মিতব্যায়িতাই হয়ে ওঠে চিত্রকলার নতুন ফর্ম। বদলে যাওয়া সময়ের সাথে সাথে শিল্পসৃষ্টির উদ্দেশ্যও বদলায়। বদলায় শিল্পীর মানস, একই সাথে বদলে যায় শিল্পসৃষ্টির উদ্দেশ্য, বদলে যায় শিল্পসৃষ্টির করণকৌশল। প্রকাশভঙ্গীর এ ভিন্নতার সাথেসাথেই জন্ম হয় বিবিধ ‘ইজম’ বা ‘বাদ’ – এর।

বিশ্ব চিত্রকলার ইতিহাসের ইজমের জন্মের ইতিহাস খুঁজে বের করার একটি চেষ্টা করা যাক। অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউএর মতই পাশ্চাত্য শিল্পের উপকূলে রেনেসার ঢেউ আছড়ে পড়লে গোটা ইউরোপ মোহিত হয় সে প্রভাবে। বত্তিচেল্লী, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলেঞ্জেলো বা রাফায়েলের তুলির নিপুণ আঁচড়ে ছবির ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে ওঠে একদম নিখুঁত ফিগারেটিভ ড্রয়িং এ। কিন্তু প্রশ্ন হল যে, মানুষ অথবা পৃথিবীর অন্য কোন প্রাণীই তো রেনেসার শিল্পীদের ক্যানভাসে আঁকা ফিগারদের মত নিখুঁত আকৃতির নয়। নিখুঁত মানুষ বা যেকোনো কিছুর ত্রুটিহীন আঙ্গিক খোঁজার জন্যে হয়তো আমাদের ফিরে যেতে হবে দার্শনিক প্লেটোর সেই কাল্পনিক আইডিয়ার জগতে যেখানে সবকিছু পারফেক্ট। শিল্পীরা খুব দ্রুতই এই অসামঞ্জস্য উপলব্ধি করেন এবং সে সূত্র ধরেই চিত্রকলায় প্রথম বিদ্রোহ ঘোষিত হয় রেনেসার একশো বছরের মাথায়ই। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রথম ‘ইজম’ এর আবির্ভাব ঘটে চিত্রকলায়। শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধারা তার নাম দেন – ম্যানারিজম (১৫২৭ -১৫৮০)। রেনেসার পারফেক্ট ফিগারেটিভ পেইন্টিং এর বিরুদ্ধ ধারার কিছু শিল্পী মিলে ছবি আঁকতে থাকেন প্রকৃতি যেমন – তেমন করেই। এরপর শিল্পকলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে একে একে সামনে আসতে থাকে গ্রিকো-রোমান কালচারকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট আর্ট মুভমেন্ট নিওক্লাসিসিজম (১৭৫০-১৮৫০), আবেগের মুক্ত স্ফুরনে তৈরি শিল্প – সাহিত্য ও চিত্রকলা নিয়ে তৈরি আর্ট মুভমেন্ট রোমান্টিসিজম(১৭৮০-১৮৫০), উনিশ শতকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সমাজবাস্তবতার সাথে মিল রেখে আর্ট মুভমেন্ট রিয়েলিজম(১৮৪৫-১৯০০), প্রাকৃতিক আলোছায়ার খেলার মাঝে কোন বিষয়বস্তু (সাবজেক্ট) একঝলকে চোখের দেখায় যে অনুভূতি একজন শিল্পীর মনে তৈরি করলো – তার ক্যানভাসে তৈরি রূপ বা ইম্প্রেশনিজম(১৮৬৫-১৮৮৫) , ইম্প্রেশনিজমের বিরুদ্ধে মৃদু কিন্তু দৃপ্ত বিদ্রোহ ঘোষণা করে এলো পোস্ট ইম্প্রেশনিজম(১৮৮৫-১৯১০), রঙের তীব্রচ্ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে এলো ফওভিজম(১৯০০-১৯৩৫), বিষয়বস্তু (সাবজেক্ট) না বরং একটি বিষয়বস্তুকে দেখার পর শিল্পীর মনে তা যে ভাবসঞ্চার করে – ক্যানভাসে তার কাল্পনিক এবং বিকৃত (ডিস্টর্টেড) রূপ ফুটিয়ে এলো এক্সপ্রেশনিজম(১৯০০-১৯৩৫), প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মাঝে মানুষের জীবন যাত্রার জটিলতার রুপায়নে একটি একক দৃষ্টিভঙ্গী (সিঙ্গেল ভিউপয়েন্ট) থেকে ছবি আঁকার বদলে ফিগারের শেপ এবং তার ছায়ার জ্যামিতিক অনুপাতে ইউরোপিয়ান শিল্পীদের ক্যানভাসে সৃষ্টি হল ত্রিমাত্রিক ছবি – কিউবিজম(১৯০৫-১৯২০)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিলগ্নে, সময়কালে এবং তার কিছু পরবর্তী সময়কাল পর্যন্ত জোরেশোরে আলোচিত সমালোচিত হল দাদাইজম এবং স্যুররিয়ালিজম (১৯১৭-১৯৫০) যেখানে ফুটে উঠতে লাগলো মানুষের স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন, মানুষের অবচেতন মন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে আরম্ভ হল পূর্ণ বিমূর্ত চিত্রশিল্পের চর্চা – অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম(১৯৪০-১৯৫০) বা পপ কালচার (১৯৬০)। আর বর্তমানে, অতীতের সব আর্ট ফর্ম মিলিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যে মূর্ত বা বিমূর্ত চিত্রকলার সৃষ্টি হচ্ছে আমরা তাকে বলি উত্তরাধুনিক বা পোস্টমডার্ন আর্ট (১৯৭০ -)।

শিল্পকলার ইতিহাসে একেবারেই ইউরোপিয়ান প্রভাবমুক্ত কোন আর্টফর্ম যদি আমাদের উপমহাদেশে থেকে থাকে তবে তা আমাদের শুদ্ধসঙ্গীত, বা রাগরাগিণী। লেখনীর ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, ইউরোপে গদ্যের, নাটিকার, উপন্যাসের বা কবিতার বিভিন্ন ফর্ম আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর তা পড়ে ও অনুকরণ করে আমাদের দেশের লেখকেরা কাঁচা হাতে তৈরি করেছেন বাংলা গদ্য – উপন্যাস – নাটিকা ইত্যাদি। একই কথা প্রযোজ্য আমাদের চিত্রকলার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাস মূলত দীর্ঘদিন ধরে একটি নিজস্ব ভাষা বা প্রকাশভঙ্গী খোঁজার ইতিহাস। বাংলাদেশে শিল্পচর্চার শুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের হাত ধরে ১৯৪৮ সালে ঢাকা আর্ট ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বাংলাদেশের চিত্রকলায় ‘৪৮ এর পরে যে বিবর্তন সেটার হিসেব করা হয়তো অপেক্ষাকৃত সহজ, কিন্তু তাই বলে যা কিছুর অনুবর্তীতায় জয়নুল – কামরুল – সফিউদ্দিন – কিবরিয়া – সুলতান হয়ে আমাদের আজকের শিল্পী – চিত্রকরেরা, তার বা তাঁদের অবদান উহ্য রেখে এগুনোটা যথার্থ হবে না।

বঙ্গীয় চিত্রকলার ওপর প্রভাব রয়েছে বহুজাতির, বহু ব্যক্তিক বা সমষ্টিগত শিল্প আঙ্গিকের। ঐতিহাসিকভাবে বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলার প্রথম বিকাশ ঘটে পালরাজাদের আমলে। বৌদ্ধধর্মীয় রীতিনীতি ও স্বয়ং গৌতম বুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হয় পালপুঁথি চিত্রকলা। তাতে এসে ধাক্কা দেয় উত্তর ভারতের জৈন পুঁথিচিত্র। এভাবে একে একে সুলতানি শাসনামলে পারসিক চিত্রকলা, হুসেন শাহী আমলে শ্রী চৈতন্যদেবের অনুসারী শিল্পীদের হাতে তৈরি বৈষ্ণব চিত্রকলা, মুঘল আমলে মুঘল শিল্পীদের থেকে ঋদ্ধ হবার পর কোম্পানি শাসনামলে প্রথমবারের মত ইউরোপিয়ান আর্ট স্টাইলের সাথে বঙ্গীয় চিত্র ঘরানার সংমিশ্রণ ঘটে।

ইউরোপীয় কেতার সাথে এদেশি শিল্পীদের পরিচিত করিয়ে দেয়া এবং ইউরোপীয় চিত্রের ভাবধারায় তাঁদের শিক্ষিত করে তলার উদ্দেশ্য ১৮৫৪ সালে কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ইউরোপিয়ান আর্ট স্কুল – ‘স্কুল অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট’। আর এর প্রথম ব্রিটিশ অধ্যক্ষ ছিলেন হেনরি হোভার লক। লক নিজে ছিলেন লন্ডনের সাউথ কেন্সিংটন মিউজিয়ামের স্কুল অফ ডিজাইনের চিত্রকলার ছাত্র। তিনি তার আজীবন অধিত ভিক্টোরীয় আমলের ইংল্যান্ডে অনুসৃত শিল্পাদর্শ ও করণকৌশল এদেশে বহন করে আনেন। যদিও তখন পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে অ্যাকাডেমিক রীতির বিরুদ্ধে রীতিমত বিদ্রোহ ঘোষণা করে রোম্যান্টিক অভিব্যক্তিতে নিমগ্ন, সেই শিল্প ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রি র্যাফেলাইট আন্দোলন, ব্রিটিশ চিত্রকলা বস্তুজগত ছাপিয়ে বিচরন করা শুরু করে দিয়েছে রোম্যান্টিক কাব্যময়তার জগতে, কিন্তু অধ্যক্ষ লকের তাতে কিছুমাত্র আগ্রহও ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল এদেশের ছাত্রদেরকে ক্লাসিক্যাল তথা রেনেসার অনুগামী অ্যাকাডেমিক রীতির অনুসরণে গড়ে তোলা। ছাত্র তৈরির ক্ষেত্রে তার নিষ্ঠা ও সততা এবং ছাত্রদের সাথে তার সম্পর্কের গভীরতা ছিল প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে, কিন্তু চিত্ররীতিতে যে আদর্শ তিনি অনুসরণ করতেন তাতে তিনি ছাড় দেন নি এক চুলও।

লকের মৃত্যুর পর(১৮৮৫) দশ বছর স্কুল অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টের কর্মপন্থা লকের অনুবর্তীই থাকে। ১৮৯৬ সালে উক্ত স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন আরনেস্ট হ্যাভেল। অধ্যক্ষ হিসেবে তার কর্মপন্থা ছিল লকের পুরো বিপরীত। তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশীয় কলাশিল্পের নিজস্ব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের প্রতি সংবেদনশীল। তাই ইউরোপীয় চিত্রকলার অনুবর্তিতার বদলে তিনি এদেশের ছাত্রদের স্বদেশী চিত্রকলা মুখী করে তুলবার চেষ্টা করেন। সঙ্গী হিসেবে পান শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। আর্টস্কুলের শিক্ষার্থীদের এক বিরাট অংশের বাধার সম্মুখে তারা স্বদেশী শিল্পকলা চর্চার সংকল্পে দৃঢ় থাকেন। নব্যভারতীয় চিত্রকলার আন্দোলনকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে ১৯০৭ সালে অবন ঠাকুরের উদ্যোগে গঠিত হয় ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট।

এই দ্বিমুখী প্রেষণের মধ্যখানে বঙ্গের আধুনিক চিত্রকলার ভবিতব্য নির্ণয়ক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ও সমাজ বাস্তবতা। কি শিল্পে, কি সমাজ ব্যাবস্থাপনায়, কি ব্যক্তিজীবনে – চিরায়ত আদর্শ আর মূল্যবোধগুলিতে ধরছিল ভাঙন। বাংলার চিত্রশিল্পীরা প্রকাশ্যে নিরীক্ষণ শুরু করেন তাঁদের চিত্রাঙ্কনের পদ্ধতি নিয়ে। ইজমের অনুপ্রবেশ ঘটে বঙ্গদেশীয় চিত্ররীতিতে, প্রবর্তনা ঘটে আধুনিকতার। আর এই প্রবর্তনা ঘটে শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের হাত ধরে।

সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত রাজকন্যা (১৯২৫), হিমালয়ের সঙ্গীত (১৯২৫), মানবাত্মার বৈতরণী অতিক্রম (১৯২৯), আত্মার সোপানারোহন (১৯২৯), উচ্চহাস ( ১৯৩০) প্রমুখ ছবিতে এমন সব দৃশ্যজগত রূপ লাভ করেছে যা প্রধানত কল্পলোকের, তাই বিষয়ের বিচারে এরা স্যুররিয়ালিস্ট এবং রচনারীতিতে – বিশেষ করে চিত্রপটকে ভিন্ন মাত্রিকতায় বিভাজিত করে উপস্থাপন করার কারণে এদের মাঝে কিউবিস্ট বা ঘনত্ববাদী আদল লক্ষ্য করা যায়। গগনেন্দ্রনাথের চিত্রের মূলে রয়েছে গড়নের পরিবর্তে আলো এবং তার বিপরীতে ছায়ার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ। অপরদিকে ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিক রীতিতে চিত্রবিদ্যা শিক্ষালাভ করলেও অ্যাকাডেমিক রীতিতে চিত্রাঙ্কন শিল্পী যামিনী রায়কে ততটা আকর্ষণ করে নি। তিনি ঝুঁকে পড়েন ইউরোপের আধুনিক চিত্রকলার দিকে। তাকে আকৃষ্ট করে পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী তথা সেজান, ভ্যান গগ,গগ্যাঁর কাজ। তেলরঙে আর টেম্পেরাতে করা তার কয়েকটি নিসর্গচিত্র আর ভ্যান গগের আত্মপ্রকৃতির একটি অনুলিপিতে তার এই সময়কার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিচয় মেলে।

যামিনী রায়ের পর যার হাতে আধুনিক বাংলার চিত্রকলা একদম সাম্প্রতিক হয়ে ওঠে, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবির জগতে তার অনুপ্রবেশ এক আকস্মিক বিস্ফোরণের মতই। কবি – সাহিত্যিক ও গীতিকার হিসেবে যখন তিনি জগৎবিখ্যাত, যে বয়সে এসে সাধারণ মানুষ জীবন নিয়ে নিরীক্ষা চালানোর সাহস আর রাখে না – রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে, সত্তর বছর বয়সে খুব আবেগের সাথে মনোযোগ দেন ছবি আঁকায়।

নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে রবীন্দ্রনাথের ছবিগুলিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। তার সূচনাপর্ব – তৃতীয় দশকের প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলি, যার সূচনা পাণ্ডুলিপি সংশোধনের মধ্য দিয়ে। চতুর্থ দশকের প্রথম দিকে দেখা যায় তার ছবি রচনার ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্যায়। এ সময়ে তিনি শুরু করেন ঘষে ঘষে গাড় জলরঙের ব্যাবহার। তার ছবিতে দেখা যায় টেক্সচার বা বুনট আর সেই সঙ্গে হাইলাইট বা উজ্জ্বলতার ব্যাবহার। তার তৃতীয় পর্যায়ে, ১৯৩৫ থেকে নিয়ে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত অঙ্গিত ছবিগুলির মধ্যে আঁকা সুস্পষ্ট পরিপ্রেক্ষিতবোধ সম্পন্ন কিছু নিসর্গচিত্র আমাদের ইউরোপের এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বঙ্গদেশীয় চিত্রকলায় ইজমের আবির্ভাবের এই ভিত্তিটুকু রচনা করে এবার আমরা আলোচনা করতে পারি আমাদের বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজে আধুনিকতা বা ইজমের প্রবেশ নিয়ে। ঢাকা আর্ট কলেজ বা বর্তমান চারুকলার প্রথম যুগের শিক্ষক ছাত্রদের মাঝেও সমাদৃত ছিল ইউরোপিয়ান অংকনের নানা ফর্ম ও টেকনিক। আমাদের বাংলাদেশের চিত্রকলায় ইজমের আবির্ভাব ঘটে জয়নুল আবেদিনের ইম্প্রেশনিজম ভিত্তিক চিত্রকলার হাত ধরে, তার ওপর খানিকটা রিয়ালিজম বা বাস্তববাদের রুখু কালির পোঁচ। শুধু বাস্তববাদের চে বরং বলা যাক প্রকাশবাদী বাস্তববাদ (এক্সপ্রেশনিস্ট রিয়েলিজম)। দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের না খেতে পেয়ে মারা যাবার মর্মান্তিক দৃশ্য ফুটে ওঠে তার আঁকা অবয়বনির্ভর প্রকাশবাদী (ফিগারেটিভ এক্সপ্রেশনিজম) ছবিতে। বাংলার ছাপচিত্রের পুরোধা স্থানীয় ব্যক্তিত্ব সফিউদ্দিন তার কর্মজীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন এক্সপ্রেশনিস্ট আর ইম্প্রেশনিস্ট – এই দুই পন্থার প্রভাববলয়ের মাঝখানে দোদুল্যমান অবস্থায়। কামরুলের তিনকন্যা ছবিতে একই মুখের গড়ন বিশিষ্ট তিনটি মেয়ের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় কিউবিস্ট ফরম্যাটে আঁকা পিকাসোর বিখ্যাত ছবি ‘আভিনোর মেয়েরা’ এর। কিবরিয়ার সাদা কালোর বর্ণহিন্দোলে তৈরি বিমূর্ত ( অ্যাবস্ট্রাক্টিভিজম) চিত্রকলা, ইউরোপ থেকে শিক্ষা লাভ করে আসা শিল্পী আমিনুল ইসলামের কাজে লিরিক্যাল কিউবিজমের ছাপ, মুর্তজা বশীরের ‘পাখা’ সিরিজের কাজে বিমূর্ত বাস্তববাদ বা অ্যাবস্ট্রাক্ট রিয়ালিজম, রঙকে স্বপ্নময় পরিধির আবশ্যক উপাদানে পরিণত করা স্যুররিয়ালিস্টিক বা পরাবাস্তববাদী শিল্পী রশিদ চৌধুরী, ষাটের দশকের অ্যামেরিকায় চিত্রকলা অধ্যয়ন করে দেশে ফেরত শিল্পী কাজী আবদুল বাসেতের বিমূর্ত প্রকাশবাদী কাজ – এসবের মাঝেই ব্যতিক্রমী শিল্পী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন শিল্পী এস এম সুলতান। গ্রামীণ মানুষদের মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সৃষ্টির অনাদিকাল থেকে প্রবাহিত অদম্য শক্তির খোঁজ, সভ্যতার বহু প্রেষণেও যাতে তিলমাত্র পরিবর্তন ঘটে নি। রেনেসার দেবোপম মনুষ্য আকৃতির আদলে বিশাল বিশাল ক্যানভাসে আঁকা সুলতানের ছবিতে খুঁজে পাওয়া যায় মিকেলঞ্জেলো ও রাফায়েলের কাজের ছাপ।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশেও চিত্রকলার এ তাত্ত্বিক ধারা বা ইজমের প্রয়োগ অব্যাহত থাকে। তবে, এ সময়কালে ইজমসমূহের ব্যাবহার থাকে প্রায় পূর্ণভাবে নিরীক্ষাধর্মী, তা সে কিউবিজম হোক বা রিয়েলিজম। বাইরের বিশ্বে, কি ইয়োরোপ – কি অ্যামেরিকায়, কি ফর্মে – কি ইজমে, চিত্রকলা তখন পরিবর্তনের নেশায় উন্মাতাল। পূর্বেই উত্তর আধুনিক চিত্রকলার সংজ্ঞায়ন করেছিলাম এভাবে যে – পূর্বের সমস্ত ইজম বা বাদের মধ্যে নিরীক্ষাধর্মী সমন্বয়সাধন। এ কাজটাই স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের চিত্রকরেরা করে যাচ্ছেন। পৃথিবী আজ আরও ছোট, সমস্ত পৃথিবীর চিত্রকরেরা আজ যেন একই ছাঁদনাতলায় অবস্থান করে, একে অপরের হাঁড়ির খবর রাখে, কে কি নিয়ে কাজ করছে, গোটা বিশ্বে এখন কোন ফর্মটা সবচে বেশী ব্যাবহৃত হচ্ছে সকলেই তা জানে। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের প্রায় সব উজ্জ্বল শিল্পীর ক্যানভাসেই দুটো জিনিস এসেছে – তা হল বিমূর্ত চিত্রকলার ব্যাবহার বা অ্যাবসট্র্যাক্টিজম এবং আমাদের লোককলা। বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্যে আসলে আত্মপরিচয়ের বা স্বজাতবোধের তো বিকল্প নেই কোন।

একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা এই যে – মানুষ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন আজ। আর এই বিচ্ছিন্নতা, এই নিঃসঙ্গতা, এই অসহায়ত্ব তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে চিত্রকরদের ফিরে যেতেই হবে বিশ্বের চিত্রকলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের এবং পটপরিবর্তনকারী একেকটি ‘বাদ’ বা ইজমের কাছেই। সহজ কথা সহজে বলা যায় না – কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছিলেন। তাই যদি হয়, তবে যে কথা জটিল, মনের যে ভাব জটিল – তার প্রকাশটি সরল রৈখিক বিন্যাসেই করে ফেলা সম্ভব? উত্তর হল – না। আর এখান থেকেই চিত্রকলায় ইজমের উৎপত্তি , এর উপর ভিত্তি করেই ইজমের টিকে থাকা।

তথ্যসূত্রঃ
১। বাংলার চিত্রকলা – অশোক ভট্টাচার্য
২। বাংলাদেশের চিত্রশিল্প – মইনুদ্দিন খালেদ
৩। ভারতের চিত্রকলা (২য় খণ্ড) – অশোক মিত্র
৪। হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতি – গোলাম সারোয়ার

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন