, ২০ জুন ২০২১; ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ


ফটোঃ চাঁদ দেখা কমিটির সংবাদ সম্মেলন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর মধ্যে সময় সংক্রান্ত ব্যবধান থাকলেও প্রায় কাছাকাছি টাইম জোনে অবস্থিত মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের দিনক্ষণে তারতম্য দেখা যায়। সম্প্রতি শুরু হওয়া রোজার মাস তিনটি অঞ্চলে তিনটি ভিন্ন দিনে শুরু হয়েছে। তিনটি অঞ্চলই প্রায় এশিয়ায় অবস্থিত হওয়ায় চাঁদ, রোজা ও ঈদের ক্ষণ নিয়ে জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

এই আগ্রহ আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে বেশ গভীরে। কিছু প্রবন্ধ, বইয়ের অংশ ও বিভিন্ন মাজহাবের বোঝাপড়ার প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাতের উৎসাহ পেয়েছি। মূলত এখানে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফি ও ইমাম মালিক(র:) এত মত জ্ঞানী ও সম্মানিত ফকিহ ও মুজতাহিদের চাঁদের হুকুম, রোজা শুরু করা ও ঈদ উদযাপনের বিষয়ে প্রদত্ত ইজহাদের প্রতি আলোকপাত করেছি। পাশাপাশি ইবনে তাইমিইয়্যা (র:), ইমাম নাফাসী, আশরাফ আলী থানবি, ইবনে হাজার, ইমাম নববী, রশীদ আহমদ গাংগুহী, সালাফি স্কলার নাসিরুদ্দিন আলবানী সহ আরো অনেক ফকিহ ও মুজতাহিদদের ইজতেহাদি হুকুমও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

উল্লিখিত স্কুল অব থটস (মাজহাবের) সকল ফকিহরা ও সমসাময়িক বিভিন্ন উসূল ফলো করা মুজতাহিদ ও ফকিহরা সবাই একই ইজতিহাদ দিয়েছেন রোজা শুরু ও ভঙ্গ করার ব্যাপারে। আর সেটা হলো ”সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা শুরু ও একই দিনে ঈদ”। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আজ আমাদের মুসলিম উম্মাহ দুই এমনকি তিন দিনের ব্যবধানেও রোজা শুরু ও ঈদ পালন করে!

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সবাই হানাফি মাযহাবের অনুসারী হলেও রোজা রাখার বিষয়ে ইমাম হানাফি (র:) এর ইজতিহাদ মানে না! ইমাম হাম্বলি, সাফেয়ী ও মালেকি, ইবনে তাইমিয়্যা, কিংবা নাসিরুদ্দিন আলবানী কাউকেই মানেনা চাঁদের হুকুমের বিষয়ে!

পাঠকদের জন্য নিচে কয়েকটা ইজহাদের প্রামাণ্য সারাংশ দেওয়া হলঃ

**হানাফী ফিকহের বক্তব্য**

(১) হানাফি মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত ও সর্বজন বিদিত ফিকহ্ গ্রন্থ “ফতহুল কাদির”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

“যখন কোন শহরে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হবে, তখন সকল মানুষের উপর রোযা রাখা ফরয হবে। ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মাযহাব অনুযায়ী পাশ্চাত্য বাসীর চাঁদ দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা রাখা ফরয হবে।”
— (ফতহুল কাদির, খন্ড-২, পৃঃ-৩১৮) অথবা (ফতহুল কাদির, খন্ড-৪, পৃঃ-২১৬)

এছাড়াও হানাফী মযহাবের বাকি ফিকহি বই গুলো “ফাতওয়া-ই- আলমগিরী” “ফাতওয়া-ই-শামী” “বাহরুর রায়েক” তাবয়ীনুল হাকায়েক, “হাশিয়া-ই-তাহতাবী” তে ও একই বক্তব্য। প্রয়োজনে এভিডেন্স দিবো।

হানাফি বিখ্যাত গ্রন্থ “মায়ারিফুস্‌ সুনান”-এর ভাষ্য হচ্ছে-

“আমাদের মাযহাবের কিতাব সমূহের উপর ভিত্তি করে আমরা লিখেছি যে, এক দেশের চাঁদ দেখা অন্য দেশে গ্রহণীয় হবে। যদিও দেশ দুটির মধ্যে মাগরিব ও মাশরিকের দূরত্ব হয়। আর এ মাসয়ালা ফকীহ্‌গণের এ নীতিমালার উপর ভিত্তি করে যে চাঁদ উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে না। তবে ফকিহগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, নামায ও ইফতারের ওয়াক্ত সমূহের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে এবং যার যার স্থানীয় সময় অনুযায়ী নামায পড়বে ও ইফতার করবে”। — (মায়ারিফুস্‌ সুনান, খন্ড-৫, পৃঃ-৩৩৭)

 

**মালিকি ফিকহের বক্তব্য**

(১) মালিকি মাযহাবের বিশ্ব বিখ্যাত ফিকহ্‌ গ্রন্থ “মুগনী”-এর সিদ্ধান্ত হচ্ছে-

-قريبا او بعيدا وحكم من لم يره كمن راه ولو اختلفت المطالع
অর্থাৎ “কোন এক দেশের মানুষ চাঁদ দেখলে সকল দেশের মানুষের জন্যে রোযা রাখা জরুরী হবে। চাই সে দেশ কাছে বা দূরে হোক, আর যে চাঁদ দেখেনি সে শরীয়তের দৃষ্টিতে তারই মত আমল করবে যে দেখেছে। চাঁদ উদয়ের স্থান ও কাল ভিন্ন হোক (তাতে পার্থক্য নেই)” ।
(আল-মুগনী, খন্ড-৪, পৃঃ-১২২) অথবা (আল-মুগনী, খন্ড-৩, পৃঃ-১০)

(২) এছাড়া দেখুন আল-মুনতাকা-ফি শরাহিল মুয়াত্তা (খন্ড ২, পৃঃ ৩৭)
অথবা (আল-মুনতাকা-ফি শরাহিল মুয়াত্তা ২য় খন্ড পৃঃ ১৫২)

 

**হাম্বলী ফিকহের বক্তব্য**

ইমাম বাহুতি আল হাম্বলী (রহ  এর “শরহে মুনতাহা আল ইরাদাত” কিতাবের ভাষ্য

“যখন একটি শহরে চাঁদ দেখা প্রমানিত হয়, সকল মুসলিমের উপর সিয়াম রাখা বাধ্যতামূলক এই হাদীস অনুসারে ‘তোমাদের সবাই রোযা রাখ যখন এটাকে দেখবে’ এটা সমগ্র উম্মাতের প্রতি নির্দেশ” —(শরহে মুনতাহা আল ইরাদাত, খন্ড ৩, পৃ:৩০৭)

 

চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ “আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া” নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে-

“পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে । চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই । তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে । তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি- এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে”
(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) অথবা (আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৮৭১)

 

** ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ)**

 

-يشمل كل من بلغه رؤية الهلال من اى بلد او اقليم من غير تحديد مسافة اصلا
অর্থাৎ “নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না”।
— (ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭)

 

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা রশীদ আহমদ গাংগুহী (রহঃ)-এর ভাষ্য–

“ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মতানুসারে রোযা রাখা ও ঈদ করার ব্যাপারে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। প্রাচ্যবাসীর দেখা দ্বারাই পাশ্চ্যাত্যবাসীর উপর আমল জরুরী হবে।” —[ফাতওয়া-ই-রশিদিয়া, পৃঃ-৪৩৭]

 

**নাসিরউদ্দিন আলবানী**

Sheikh Nasir ud-Deen al-Albani espoused the view that the global sighting must be taken, he explained the term in the hadith, صوموا لرؤيته … ” “Do fast when you it is sighted,” was general to all Muslims irrespective of locality. [Al-Silsilah as-Saheeh, Vol 6, p. 123]

এরকম অসংখ্যা ইজতিহাদ আছে মুজতাহিদদের! কিন্তু আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের আলেমরা এটা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তকর অবস্থায়!

কি সেলুকাস! আমাদের তিনপাশে ভারত,পশ্চিমবঙ্গে চাঁদ দেখেছে, আর এত বিশাল দেশে রোজা শুরু হয়ে গেছে। আর শুধুমাত্র একটি কাটা তারের বেড়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গে থেকে ৫৮ মিনিটের রাস্তা সাতক্ষীরায় রোজা হচ্ছেনা! বাংলাদেশের তিনপাশে ইন্ডিয়া রোজা রাখছে আর মাঝখানে বাংলাদেশ নামক দেশের আন্ডারে কলকাতা না পড়ায় কাটাতারের এই পাড়ে রোজা রাখছেনা! কে দিয়েছে এই বর্ডার? ইসলাম? না মোটেও নয়! এই বর্ডার হলো জাতীয়তাবাদের বর্ডার! ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কলোনিয়ালিস্টদের একে দেয়া বর্ডার।

তাইলে এই সমস্যা কি আজকের? এই সমস্যা সমাধান নিয়ে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘ওআইসি’- এর ফিকহ একাডেমী ১৯৮৬ সনের ১১-১৬ অক্টোবর জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে শতাধিক শরীয়াহ্‌ বিশেষজ্ঞের সর্ব সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে—

“যদি কোন এক দেশে নতুন চাঁদ উদয় প্রমানিত হয়, তবে বিশ্বের সকল মুসলিমকে অবশ্যই ইহা মেনে চলতে হবে। চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। কারন রোযা শুরু এবং শেষ করার বিধান বিশ্বজনীন”।

প্রশ্ন হল আমাদের হেলাল কমিটির এই অবস্থা কেন? কারা আছে হেলাল কমিটিতে? এরা কি ফিকহকে বুঝতে অক্ষম? এরা সব জায়গায় নিজেদের হানাফী বলে, অথচ রোজার ক্ষেত্রে তাবেদারি জাতীয়তাবাদকেই অনুসরণ করে!

অবশ্য এই নিয়ে কথা উঠলে অনেকেই আরজ আলী মাতব্বর টাইপের হাস্যকর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়- যেমন সৌদিতে যখন ফজর নামাজ পড়ে আমরা কি তখন ফজর পড়ি?

এর উত্তর খুবই সহজ এবং যৌক্তিক। দিন/তারিখের হিসাব হয় চাঁদের সাথে, সময়ের হিসাব হয় সূর্যের সাথে। আর যারা এই লজিক আনে, এটা স্ববিরোধী হয়ে যায়। ধরুন, আমাদের দেশেরও সবাই একই দিনে রোজা শুরু করে, কিন্তু একই সময়ে কি আমরা ইফতার, সেহরী করি? এক জেলার সাথে অন্য জেলার ২/৪/৫/১০ মিনিটের ও পার্থক্য হয়। নাকি আমরা ঢাকার সাথে মিলিয়ে করি! সুতরাং রোজা শুরুর তারিখ আর নামাজ পড়া, ইফতার করা, সাহরী করা দুইটা দুই বিষয়।

এই লেখাটা মূলত সাধারণ অনুসারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য। এটা কোন বিশেষজ্ঞ বয়ান নয়, আমি মুজতাহিদও না, কাউকে তার মতামত ও পদ্ধতি পরিবর্তন করার জন্যও আমার কোন অভিপ্রায় নেই। তবে এই জাতীয়তাবাদী হেলাল(চাঁদ দেখা) কমিটির উপর আমার কোনো আস্থা নাই। আমার আস্থা হলো হানাফী, মালেকি, শাফেয়ী হাম্বলী, ইবনে তাইমিয়্যা রঃ এর মত ফকিহ ও মুজতাহিদদের প্রতি। আমি কাটাতারে বিশ্বাস করিনা, জাতিরাষ্ট্রের বিধানে ধর্মের ব্যবধানে বিশ্বাস করিনা, ইসলামে এটা কখনো ছিলোনা।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন