মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৮:৪৭ অপরাহ্ণ


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সুপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। সম্পূর্ণ আবাসিক ঘরানার বিশ্ববিদ্যালয়টি বিভিন্ন কার্যক্রম দ্বারা ইতিমধ্যেই একটি স্বতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি হয় জ্ঞান উৎপাদনের পাশাপাশি সমাজকে সামনে থেকে চিন্তা ও নতুন সংস্কারের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিষ্ঠান তাহলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সফল ও স্বার্থক। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগরের অবস্থান ছিল অগ্রণী। আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীগণ।

জাহাঙ্গীরনগরের আন্দোলন শুরু হওয়ার ক্ষেত্রটা প্রস্তুত হয়েছে ধীরে ধীরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পঠন ও প্রাত্যহিক আলাপ-আলোচনা থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির মতোই জাহাঙ্গীরনগরের সরকারী চাকুরী প্রার্থীদের চাকুরী পরীক্ষার প্রস্তুতির একটা বড় প্লাটফর্ম হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। লাইব্রেরির সিনিয়র ভাই-বোনদের দিনরাত কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন বেকার থাকা ও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী না পাওয়ার হতাশার কথা ফুটে উঠতো লাইব্রেরির পাশে চায়ের আড্ডায়। সেখান থেকেই শুরু এক নবজাগরণের।

নবজাগরণের উৎসস্থল সরকারী চাকুরীর অন্যায় ও অন্যয্য কোটা ব্যবস্থা যেটি জল্লাদপাথর হয়ে চেপে ধরেছে জনপ্রশাসনকে। ৫৬ শতাংশ সংরক্ষিত কোটায় বন্দী হয়ে পড়েছিলো সরকারী চাকুরীগুলো, স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছিল মেধাবী ছাত্রসমাজের। একদিকে কোটার আসনগুলো ফাঁকা রাখা অন্যদিকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব যেন তরুণ সমাজের জীবনকে বিষময় করে তুলছিলো। সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকুরীপ্রার্থীরা এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থা হতে মুক্তির পথ খুঁজছিলো। দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার এই ছাত্র সমাজ একটি সুনির্দিষ্ট প্লাটফর্ম ও সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে সংগঠিত হতে পারছিলো না।

বঞ্চিত ও হতাশাগ্রস্ত এই মানুষগুলোর পথের দিশারী হয়ে দাঁড়ায় “বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ”। এই সংগঠনের ছায়ায় সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে উঠে শাখা কমিটি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তারই ধারাবাহিকতায় সংগঠিত হয়। প্রথমে আমরা কিছু সিনিয়র-জুনিয়র একসাথে বসে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করি। সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে কোটা ব্যবস্থার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য পুরো ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ প্রচারণা ও ফান্ড কালেকশন করি। প্রায় সকল শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতায় শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় আমাদের আন্দোলনের কার্যক্রম।

কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মসূচীর সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মানববন্ধন, জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ,গণপদযাত্রা, ঝাড়ুমিছিল, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, রাস্তা অবরোধ এই সকল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করে। উল্লেখযোগ্য কর্মসূচীর মধ্যে ২৬ শে মার্চ পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ৮ ই এপ্রিল মিছিল শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ ছিল অন্যতম। ৯ এপ্রিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ চলাকালে আমাদের উপর পুলিশের রাবার বুলেট, লাঠি চার্জ, টিয়ারশেলের নির্যাতনে শ্রদ্বেয় প্রক্টর স্যারসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। আক্রমনে ক্যাম্পাসের ছোট ভাই আরেফিনের চোখে স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয় যা এখনো সরানো যায় নি।

পুলিশের এই নির্যাতনের প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নিজ উদ্যোগে তিনদিন ব্যাপী সকল প্রকার ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেয়। সেই ডাকে শ্রদ্বেয় শিক্ষকবৃন্দ ও সকল শিক্ষার্থী আমাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে সকল প্রকার ক্লাস বর্জন কর্মসূচী পালন করে। ১১ এপ্রিল সংঘটিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিছিল। মিছিল শেষে সারা দিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণার পর সন্ধ্যার পর অবরোধ তোলা হয়। আর ১২ এপ্রিল আনন্দ মিছিল। কোটা বাতিলের ঘোষণার প্রজ্ঞাপন না হওয়ার ৯ মে প্রজ্ঞাপনের দাবিতে মানব বন্ধন। ১৪মে বিক্ষোভ মিছিল শেষে প্রজ্ঞাপন না পাওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত থাকার কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। হামলার প্রতিবাদে ১৬ তারিখ বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচী পালিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সাথে সাথেই এই আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া ঘোষণা কোন এক অজানা কারণে এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের পথ পরিষ্কার হয়নি। এই প্রহসনের বিরুদ্ধে তাই ছাত্রসমাজকে এখনো পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় অবস্থান করতে হচ্ছে। ছাত্রসমাজ কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন চায়, একমাত্র প্রজ্ঞাপনই পারে ছাত্র সমাজকে পড়ার টেবিলে ফেরাতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আন্দোলনের মাধ্যমে এক নবজাগরণ সূচিত হয়েছে বলা যায়। কেননা এই প্রথম কোন আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এক কাতারে নেমে এসেছে।  বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক সম্প্রদায় সকল দৃশ্য-অদৃশ্য বাধা উপেক্ষা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যেভাবে আগলে রাখছেন এটি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সারাদেশের আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলতেই চাই অতীতের মতো জাহাঙ্গীরনগর আজও জেগে আছে, জাহাঙ্গীরনগর জেগে থাকবে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন