মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ


Photo: বিবিসিতে প্রকাশিত রিপোর্ট 

গত প্রায় এক দশক ধরেই বাংলাদেশে সরকারী চাকুরির প্রতি তরুণ সমাজ, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত তরুণদের অংশগ্রহণ ব্যাপক মাত্রা বেড়েছে। উন্নয়নশীল একটি দেশের সরকার, যাকে কিনা জনগণের কাছ থেকে করের টাকা উত্তোলন করতে হিমশিম খেতে হয় সেরকম একটা দেশের সরকারী চাকুরীর স্পষ্ট করে বললে সরকারের ফান্ডের প্রতি তরুণ সমাজের আকর্ষণ নতুন ভাবনার দাবি রাখে।

সরকারী চাকুরির শীর্ষ ধাপ হল বাংলাদেশ সরকারী কর্মকমিশনের অধীনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস। এই বিসিএস পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়ছে না পদসংখ্যা। পদসংখ্যা বাড়ানো সম্ভব নয় এবং তার প্রয়োজনও নেই। পিএসসির হিসেব মতে ২০১৭ সালে সংঘটিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় মাত্র ২ হাজার ২৪ টি পদের বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার চাকরিপ্রার্থী। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন পড়েছিল প্রায় চার লাখ।

একটা সময় ছিল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীরাই বিসিএসের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী বলে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমানে একটি নতুন ট্রেন্ড দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রের বিশেষায়িত পেশাজীবী তৈরির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েট, আইবিএ এমনকি মেডিকেল পাশ করেও শিক্ষার্থীরা বিসিএসের সাধারণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন। এতে বেড়ে গিয়েছে প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে তাই প্রস্তুতিপর্বও হচ্ছে পূর্বের চেয়ে লম্বা সময়ের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই বিভাগীয় পড়াশোনার পাশাপাশি বিসিএসের পড়াশোনা শুরু করে দেন। এর প্রভাবও পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক কর্মকান্ডে। ক্লাসরুম থেকে হল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সর্বক্ষেত্রেই এই বিসিএস উম্মাদনা।

এই উম্মাদনার প্রভাব পড়ছে সমাজের সর্বস্তরে। প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস পড়ার কারণে বিভাগীয় পড়াশোনার সিরিয়াসনেস কমে যাছে অনেক শিক্ষার্থীর। এতে করে জাতি গবেষক, সৃষ্টিশীল চিন্তক ও দক্ষ পেশাজীবী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে যেহেতু একটা বিশাল অংশ ভালো প্রস্তুতি থাকা স্বত্ত্বেও সরকারী চাকুরি থেকে বঞ্চিত হয় আসন স্বল্পতার কারণে তা ব্যক্তির অন্যান্য ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনাকে দূর্বল করে ফেলে। কারণ বিসিএস এর প্রস্তুতির পড়াশোনার সাথে বেসরকারী কোম্পানির চাকুরিদাতাদের কাংখিত চাহিদার কোন সম্পর্কই নেই।

সরকারী চাকুরির প্রতি আকর্ষণের কারণগুলোর মধ্যে সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, আর্থিক সমৃদ্ধি, আজীবনের নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতির অভাব অন্যতম। তাছাড়া বেসরকারী খাতে সুশাসনের অভাব ও মানবিক কর্মপরিবেশের অনুপস্থিতিও তরুণ সমাজকে সরকারি চাকুরির দিকে আকৃষ্ট করছে। 

এই উপাদানগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বর্তমান তরুণ সমাজের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে গিয়েছে। অন্যভাবে বললে ঝুঁকি নেওয়ার সাহসও কমে গিয়েছে। এ ঝুঁকি কেবল উদ্যোক্তা হওয়ার ঝুঁকি নয়। বরং বেসরকারী চাকুরিতে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রতিযোগী সক্ষম রাখার চ্যালেঞ্জ, নতুন চিন্তা ও দক্ষতাকে আয়ত্ত্বে আনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তরুণ সমাজ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

সরকারী চাকুরি একবার নিতে পারলে আমরণ টিকিয়ে রাখা যাবে এই চিন্তাটা একটা ঝুঁকি এড়ানোর চিন্তা। সরকারি চাকুরির প্রতি আকর্ষণের আরেকটা বড় কারণ সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের চরম অবক্ষয়। সাধারণ মানুষ এই অন্যয্য বিচারব্যবস্থার সরাসরি শিকার। এই অবস্থায় ক্ষমতার আশেপাশের ব্যক্তিবর্গ সর্বক্ষেত্রেই একটা ইনডেমনিটি ভোগ করে। সরকারী চাকুরীজীবীরা এই অব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী। এ অবস্থায় তরুণ সমাজও বিদ্যমান ব্যবস্থার কর্তা হতে চান নিজেদের ও পরিবারের যাবতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

সমাজে যদি সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করা যেত তাহলে সবাই যে যার মতো কাজ নিয়েই স্বস্তি ও সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারত। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে বিসিএস পড়ে ৩/৪ বার ভাইবা/মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে ব্যার্থ হয়ে বেসরকারী খাতের দিকে যাওয়ার চেয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই বিভাগীয় জ্ঞানের সাথে সাথে সম্পর্কিত খাতে দক্ষতা তৈরি করলে ব্যক্তির পাশাপাশি জাতিও উপকৃত হবে। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন