রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৫:১৫ অপরাহ্ণ


খুব খেয়াল করে কি হিন্দী সিরিয়াল দেখেছেন? এখন আমি যদি বলি একটা সিরিয়াল থেকে আরেকটি সিরিয়ালের পার্থক্য করুন তো? করতে পারবেন একটা সিরিয়াল থেকে আরেকটি সিরিয়ালের ঘটনাপ্রবাহের পার্থক্য?

যদি মনোযোগ দিয়ে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন সিরিয়ালের গল্প প্রথমে যাই থাকুক না কেন একটা জায়গায় এসে আটকে যায়, তাহলো বিয়ে! বিয়ে এবং তার পরের জীবন নিয়ে ভারতীয় সিরিয়ালগুলো দিনের পর দিন আবর্তিত হয় আর আমরা তা গলধকরন করি। আমার এই লেখাটা পড়ার আগেই যদি আপনি অর্ধশত সিরিয়াল গলধকরন করে থাকেন তাহলে এই লেখাটা আপনার জন্য। কেননা আপনিই ভালো বুঝতে পারবেন আমি কি বুঝাতে চাইছি। খাদ্য গলধকরণের শারীরিক প্রভাবের মতোই সিরিয়াল গলধকরণের প্রভাব পড়ে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে।

আমরা কি দেখি, শুনি আর বলি সেগুলো আমাদের মনে প্রভাব ফেলে, প্রভাব রেখে যায় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। তাই তো আমাদের জীবনও বিয়ে আর বিয়ে পরবর্তী জীবন, চেক ইন আর সেলফিতে আটকে গেছে। জীবন মানে বিয়ে, ঘর, সংসার এই ধারনা আমাদের চিন্তার মানসিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।

একটা সমস্যা তৈরি করেই সিরিয়ালগুলো থেমে যায় না। এগুলোর প্রধান সমস্যা হলো মেলোড্রামা বা অতিনাটকীয়তা। নাটকীয়তা কতো তীব্র হতে পারে একটু উদাহরণ দেই: সিরিয়ালে আপনি যে কোন সময়ে আপনার প্রেমিক অথবা প্রেমিকাকে খুঁজে পেতে পারেন। তার জন্য একটু হালকা ধাক্কা আর চোখে চোখ পড়াই যথেষ্ট। বিয়ের পাত্র হিসেবে অতি ধনী কোটিপতি বাবার ছেলে আর স্ত্রী হিসেবে চোখের পলক পড়েনা রকম রুপবতী নারী বউ হিসেবে ভালো এই ধারনাগুলো তো আমরা এইসব অতিনাটকীয় সিরিয়াল থেকেই পাচ্ছি তাই না? তার সাথে জিরো ফিগার নায়িকা, সিক্স  প্যাক নায়কের ধারনা তো আছেই।

অথচ আমরা কেন ভুলে যাই যে জীবনের আসল সুখ হচ্ছে ভালোবাসাসি আর ভালোবাসার সাথে সম্পদ অথবা শারীরিক সৌন্দর্যের তেমন কোন সর্ম্পকই নেই! এই সত্য জানা থাকলে তো দিনের পর দিন এই পাগলামিগুলো দেখা সম্ভব হতো না। এই ধারনাগুলোতে বিশ্বাস করাও সম্ভব হতো না। এই বিশ্বাস চর্চা করারও সাহস হতো না।

ভারতীয় সিরিয়ালের আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো “Us versus Them” বিভাজন। আমরা এবং তারার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা। বউ বনাম শাশুড়ি, ননদ বনাম ভাবী, বড়বউ বনাম ছোটবউ এরকম করে বিভেদ তৈরিই সিরিয়ালের মসলা। এই বিভেদটা ধীরে ধীরে সমাজের এক নারী থেকে অন্য নারীতেও সংক্রমিত হয়ে পড়ে। সিরিয়ালগুলো এক নারীর সাথে অপর নারীর যুদ্ধোভাব উসকে দেয়। সাতকাহনে সমরেশ মজুমদার লিখেছিলেন “নারীর শত্রু  নারীই”! ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা  সিরিয়াল এই সত্য প্রয়োগের দায়িত্ব নিয়েছে বলা যায়।

সিরিয়ালগুলো আমাদের জীবনকে সংকীর্ণ করে ফেলেছে। জীবন হবে অসংখ্য ভালো আর মন্দের সমন্বয় তা না হয়ে প্রেম বিয়ে আর ভালোবাসার টানাপোড়েনে জীবন এখানে থমকে গেছে। জীবন মানে প্রেমিক অথবা প্রেমিকা নয়! জীবন মানে আমাদের চারপাশের বন্ধু, পাড়া প্রতিবেশী,  আত্নীয়, কলিগ কাছের মানুষ আর দূরের মানুষের সম্মিলন। আমি ভালোবাসা বিরোধী নই! আমি ভালোবাসার মতো গভীর ও মূল্যবান একটি ব্যাপারকে সস্তা বাণিজ্যের ফ্রেমে বন্দী করার বিরোধী!

আমি জীবনের নাটকীয়তায় বিশ্বাসী নই। আমি বিবর্তনবাদী, বিবর্তনে বিশ্বাস করি। মানুষ বিবর্তনের ফসল তাই আমাদের জীবনেও হবে বিবর্তন আর এই বিবর্তনকে নিয়েই আমরা করবো আবর্তন। অথবা জীবন হবে এক পেগ ওয়াইনের মতো! আমাদের সুখ দুঃখগুলোর ধীরলয়ে বিবতর্ন হবে এবং আর ভালোবাসার সর্ম্পকগুলো হবে ওয়াইনের মতো Better with Age!

আমাদের জীবন হবে না কোন নাটকের মতো যা কোন ক্লাইমেক্সের জন্য প্রহর গুনবে, হবে না কোন ছোটগল্পের মতো যা সহজে ফুরিয়ে যায় বরং হবে মহাকাব্যের মতো যেন জীবন শেষে আমরা পিছনে তাকাবো আর তা আমাদের পরিতৃপ্তি দেয়। অনেক ঘটনার সাথে পরিচিত হয়ে নিজেকে বিকশিত অথবা নিজেকে চেনার শক্তি দেয় আর অন্যদেরকে তা আলো দেয় যেমন করে মহাভারত, রামায়ণ কিংবা ইলিয়াড, ওডিসি আলো দিচ্ছে আমাদের যেমন দিয়ে গিয়েছে আমাদের পূর্বসূরীদের।

টাইটানিকের বিখ্যাত গানটির কথা মনে আছে? My heart will go on গানটার একটা লাইন হলো এরকম-  love can touch us for the  first time and last time. কত সুন্দর লাইনটি, তাই  না? ভালোবাসা আমাদের প্রথমবার এবং শেষবারের মতো ছুঁয়ে যেতে পারে। সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই ছুঁয়ে যায়!

আমরা বসবাস করছি পোস্টমডার্ন বা উত্তরাধুনিক সময়ে। মডার্নিজম কে সমালোচনা করে জ্ঞানের যে শাখা গড়ে উঠেছে তাকে বলা হয় পোস্ট মডার্নিজম। এখানে বলা হয় আমাদের আশেপাশের পৃথিবী যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি তার সবটাই হলো ‘তৈরি করা’। আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করি যেখানের সব নিয়ম-কানুন আগে থেকেই তৈরি করা আছে। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের শুধু সে নিয়মগুলো শিখে নিতে হয় এবং তারপর প্রতিনিয়ত তার চর্চা করি।

বতর্মান সময়ে মর্ডানিজমের সবচেয়ে বড় চর্চা হয় মিডিয়ায় যেখানে সবকিছু আগে থেকেই তৈরি করা নিয়মগুলো শুধু পুনরাবৃত্তি করে। এ জন্যই তারা যখন বলে ‘জীবন মানে জি বাংলা’ তখন তাদের তৈরি করা বিশ্বাস আমরাও বিশ্বাস করে ভাবি আসলেই জি বাংলাতেই জীবনের সব মানে বা অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। পরের বার যখন শুনবেন জীবন মানে জি বাংলা তখন অনুগ্রহপূর্বক একটু ভাববেন জীবন মানে আসলেই কি? আসলেই কি জি বাংলা?

অন্যের তৈরি করা ধারনা নিয়ে পৃথিবীতে আপনি কেন বাস করবেন? কেন নিজের মধ্যে তৈরি করা পৃথিবী ধারণ করবেন না?  যেখানে নিজের পৃথিবীর ধারণা, নিজের জীবনের উদ্দেশ্য আপনি নিজেই তৈরি করতে পারেন।

জীবন মানে জি বাংলা না জীবন মানে প্রতিনিয়ত ভালোবাসাকে খুঁজে ফেরা। কেবল মানব-মানবীর জন্য নয়; কিছু ভালো বইয়ের জন্য, ভালো কিছু সিনেমার জন্য, কিছু পোষা পাখির জন্য। প্রত্যেকটা জীবনের অর্থ এক একটি থেকে ভিন্ন আর প্রতিটি জীবনের গতি-প্রকৃতিও ভিন্ন। সবার জীবনের যে উদ্দেশ্য আপনার জীবনেরও একই উদ্দেশ্য থাকবে এরকমটা ভাবাটাও কি জীবনের প্রতি অন্যায় নয়?

গায়িকা সেলিন ডিওন  বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মঞ্চে গেয়েছেন। একবার টাইটানিকের গানটা যখন তিনি কানাডাতে গেয়েছিলেন তখন তার সাথে লাখখানেক মানুষ একত্রে তাল মিলিয়েছিল। এই মূর্হতটাকে আমি বলবো মহাকাব্যিক! এক লাখ মানুষ, এক লাখ হৃদয় এক ভালোবাসার সাগরে ডুবে যাচ্ছিলো। এই প্রসঙ্গটি নিয়ে আসা গানটাকে প্রমোট করা না অথবা হিন্দী বাদ দিয়ে ইংরেজি সংস্কৃতির দিকে ধাবমান হওয়ার ইঙ্গিতের জন্য নয়। বুঝাতে চেয়েছি এরকম একটা মহাকাব্যিক মূহুর্তের জন্যও বেঁচে থাকা যায়, বেঁচে থাকতে হয়।

ভালো কিছু বই, গান, সিনেমা, আধ্যাত্মিকতা এবং সর্বোপরি ভালোবাসার মানুষের সাথে ঘর বাধার জন্য বেঁচে থাকা যায়, এগুলোকে জীবনের উদ্দেশ্য বানানো যায় । জীবনকে জীবনের মতো ভালোবাসা যায় শুধু শাড়ি গহনার জন্য বেঁচে না থেকে, শাড়ি গহনা পারিবারিক রাজনীতিকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য না বানিয়ে।

“You find your own way to live.” আমরা আমাদের বেঁচে থাকার উপায় নিজেরাই খুঁজতে পারি অন্য কোন মাধ্যম দিয়ে কারো মাধ্যমে  প্রভাবিত না হয়ে। So get a life women!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন