মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৮:১০ পূর্বাহ্ণ


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যখন খুবই নিকটে সেই সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর বাংলাদেশে তুমুল অালোচনার জন্ম দিয়েছে। তার যৌক্তিক কারণও রয়েছে বটে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপই হয়ত এই সফর জনগনের অাতংকিত হওয়ার কারণ।

বিগত নয় বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত যা চেয়েছে সম্পূর্ণ বিনা বাধায় তাই পেয়েছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী জনগণের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ সরকার ন্যুনতমও কানে নেয়নি। কিশোরী ফেলানীর লাশ কাটাতারে ঝুলে থাকলেও বিশ্বাসযোগ্য কোন বিচারের ব্যবস্থা ভারত করেনি। বন্দুকের নলের মুখে জনগণও তেমন করে জেগে উঠতে পারেনি, যেমনটা ঘটেছে নেপালে যেখানে নেপালি নাগরিক গৌরাঙ্গ নেপাল-ভারত সীমান্তে খুন হলে নেপালের জনগণ দেশব্যাপী ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ও ভারতকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে। ফেলানি ও অনান্য শত বর্ডার হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে সে দায় নিশ্চয়ই অামাদেরও, অামরা পারিনি। তবে সে প্রসঙ্গ আজ থাক। শেখ হাসিনার ভারত সফরই আজকের আলোচ্য।

(১)

শেখ হাসিনার দুই মেয়াদের শাসনামলে সরকার ভারতকে কখনই কোন বিষয়ে নাখোস করেনি। নামমাত্র শুল্কে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারত সহজেই ১৪০০ কিমি এর রাস্তা মাত্র ৪০০ কিমি এ পাড়ি দিয়ে তার পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহ করার বহুল আকাংখিত ট্রান্সজিট পেয়ে গেল একেবারে বিনা শ্রমে! ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিশাল এক বাংলাদেশী পণ্যের বাজার হারালো বাংলাদেশ!

(২)

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনের বাছবিচার না করেই স্বেচ্ছায় উলফা নেতা অরবিন্দ রাজকোয়া, অনুপ চেটিয়াসহ ভারতের স্বাধীনতাকামীদের শেখ হাসিনা সরকার ভারত সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। অথচ এই স্বাধীনতাকামীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে অনেক দর কষাকষি করতে পারত। কেমন হত যদি ভারত একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীদের পাকিস্তানের হাতে তুলে দিত? কেমন হত? সব কিছুই ভুলে যাওয়া এক জাতি অামরা!

(৩)

চট্টগ্রাম, মংলা বন্দর ভারতকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলো অথচ চীন কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে নিজস্ব অর্থায়নে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে চাইলে বাংলাদেশ ফিরিয়ে দিলো! কারণ এতে ভারতের অাপত্তি অাছে!বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের বাণিজ্যিক প্রতিনিধি চীন নাক গলাক তা ভারত চায়নি! সরকারও কথা না বাড়িয়ে চীনের প্রজেক্ট বন্ধ করে দিল! না জানি ভারত নাখোশ হয়! সম্প্রতি ঢাকা স্টক একচেঞ্জের শেয়ার ভারতের চেয়ে চীন বেশি দামে কিনতে চাইলেও বাংলাদেশ রাজি হয়নি! এটা নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্টদের সাথে সরকারের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। কারণ ভারত চায়নি বাংলাদেশ চীনের সাথে শেয়ার ব্যবসায় জড়াক।

(৪)

ভারতীয় সংস্কৃতির অাগ্রাসনে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি এখন পঙ্গু! ভারতীয় চ্যানেল বাংলাদেশে সহজলভ্য করা হলেও বাংলাদেশের কোন চ্যানেল ভারতে দেখা যায়না! অথচ পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশী পণ্য ও নাটকের বেশ বাজার রয়েছে। কেন? এটা কি বন্ধুত্ব? বন্ধুত্ব শুধু নেওয়ার হলে এটার নাম হয় গোলামী যা বর্তমান সরকার করছে।

(৫)

ভারতের বাংলাদেশকে দেয়া কঠিন শর্তে ঋণ ও সম্প্রতি হওয়া প্রতিরক্ষা স্মারক এবং এগুলো সম্পর্কে গোপনীয়তা বাংলাদেশের জনগনকে ভারত সম্পর্কে সন্দেহের মাত্রা চরম পর্যায়ে বাড়িয়ে দিয়েছে।

(৬)

নজরুলের জন্ম বার্ষিকীতে পশ্চিম বঙ্গে শেখ হাসিনা ডিলিট ডিগ্রী অানতে গেলেও ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিশ্বভারতীতেই! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যা অনেকটা দৃষ্টি কটুই লেগেছে।

(৭)

পঁয়ত্রিশ কোটি টাকায় বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা হল বাংলাদেশ ভবন! এই মুহূর্তে এটা কি অামাদের মত অর্থনীতির একটি দেশের জন্য খুব প্রয়োজন ছিল? সেই সক্ষমতাও অামাদের রাষ্ট্রের অাছে? নাকি ঋণ করে ঘি খাওয়ার বিলাসিতা হলো?

(৮)

অানন্দবাজার পত্রিকার শিরোনাম-দিল্লীর পাশে ছিল ঢাকা,এবার প্রতিদান চায় হাসিনা! এর মানে কী? এমনও উল্লেখ করা হয়েছে অাওয়ামীলীগ ক্ষমতায় না অাসলে ভারতকে তার পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটো পাকিস্তান মোকাবেলা করতে হতে পারে? এটা কিসের ইঙ্গিত?

(৯)

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সংকট এখন তিস্তার পানি নিয়ে অথচ এ বিষয়টি নিয়ে কোন কথাই হলনা! রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা কল্পবিলাস মাত্র! বিগত নয় বছরে অান্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ভারতকে নিশর্ত সমর্থনেরও বিনিময় চায়নি অাওয়ামী লীগ।

(১০)

শেখ হাসিনার ভারত সফর মূলত অাগামী নির্বাচনে অাওয়ামীলীগের প্রতি ভারতের অাগাম স্বীকৃতির জন্য। যেমনটা পাঁচই জানুয়ারিতে ভারত করেছিল। এ সফরে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট,সেটা হলো ক্ষমতা হারানোর এক চরম অাতংকে অাছে অাওয়ামীগ। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের জনগণ কি বারবার হেরেই যাবে?

ভারত যদি বাংলাদেশের বিশেষ কোন দলের সাথে সম্পর্কে না জড়িয়ে বাংলাদেশের জনগনের পাশে থাকে তাহলে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হবে সুন্দর সিদ্ধান্ত। সার্বিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় অাওয়ামীলীগ খুব সহজে আরেকটা ভোটারবিহীন নির্বাচনের পথে এগুতে পারবে বলে মনে হয়না। শেখ হাসিনার ভারত সফরে সেই অসহায়ত্বই ফুটে উঠেছে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন