, ১ জানুয়ারি ২০২১; ২:৩৮ অপরাহ্ণ


পারমানবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের ইউটার্ন এটাই মনে করিয়ে দেয় যে-রাজনীতিতে সত্যি শেষ কথা বলতে কিছু নেই! জাতীয় অান্তর্জাতিক রাজনীতির উভয় ক্ষেত্রেই সংকট সমাধানে সংলাপই হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী পথ কোরিয়া সংকট সমাধানের শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া তাই বলে। কয়েকদিন অাগেও উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্য সংলাপ ছিল অকল্পনীয়! অথচ অাজ তা বাস্তব। যুদ্ধও কিন্ত শেষ পর্যন্ত দুটি পক্ষকে অালোচনার টেবিলেই নিয়ে যায়।

সারা পৃথিবীর অান্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের সকল হিসেব নিকেশ তথ্য ও তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনের সাথে কোরিয়ান সামিটে মিলিত হয়েছেন অাজ।দুই কোরিয়ার সীমান্ত বর্তী পানমুনজাম গ্রামের ঐতিহাসিক পিস হাউজে বসে মূল বৈঠকটি। যার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক কার্যক্রম ও ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ রাখবে।

দুই কোরিয়ার মধ্য কিভাবে একটি চুড়ান্ত যুদ্ধ বিরতি শান্তি চুক্তি করা যায় সে প্রক্রিয়ারও তালাশ করা হবে।
এই বৈঠকের ফলে বিশ্ব একটা মারাত্মক সংকট থেকে রক্ষা পেল বলেই মনে হয়। প্রতিদিন যেখানে যুদ্ধের সংবাদ শুনতে শুনতে পৃথিবীর ঘুম ভাঙ্গে সেখানে অাজকের উত্তর কোরিয়ার মত পারমানবিক শক্তিধর একটি রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধের প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে অশান্ত পৃথিবীতে “যুদ্ধ নয় শান্তি”র বার্তাই যে শক্তিশালী বহন করে।

কোরিয়া যুদ্ধের(১৯৫০-১৯৫৩)মাধ্যমে এক কোরিয়া ভেঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।উত্তর কোরিয়া চলে যায় স্টালিনপন্হী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন অার দক্ষিণ কোরিয়া চলে যায় পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদার গনতান্ত্রিক ব্লকে।গত ৬৫ বছরেও পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংঘাত কোরিয়া উপদ্বীপকে একটুও শান্ত করতে পারেনি।কোরিয়া উপদ্বীপের দ্বন্দ্বও মূলত পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংকট।

দক্ষিণ কোরিয়ায় রয়েছে মার্কিন ঘাটি।অামেরিকার কথার বাইরে সে এক চুলও নড়েনা। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া-কোরিয়ার প্রশ্নে মার্কিনপন্হী।সাথে অাছে জাতিসংঘ, ইইউ,যুক্তরাজ্য।যারা কারণে অকারণে উত্তর কোরিয়ার উপর অবরোধ অারোপ করে!

অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া- দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের দিকে তাক করে শক্তিশালী ক্ষেপনাস্ত্র বসিয়েছে!উত্তর কোরিয়া কর্তৃক দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের দিকে অস্ত্র তাক করার মানে অামেরিকার দিকেই চোখ রাঙ্গানোর ইঙ্গিত!এজন্যই তা সহজ ভাবে নেয়নি মার্কিন প্রশাসন।

গত জানুয়ারি থেকেই কিম জং উন ও ট্রাম্পের মধ্য চলতে থাকে পারমাণবিক হামলার হুমকি সমেত বাকযুদ্ধ।কয়েকবার উত্তর কোরিয়া দূর পাল্লার পারমাণবিক বোমা বহনে সক্ষম ব্যালাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র ছুড়ে সারা পৃথিবীকেই অাতংকে ফেলে দিয়েছিল। কেউ কেউ এও বলেছিলেন যে উত্তর কোরিয়া বনাম অামেরিকার মধ্য যুদ্ধ বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি করে ছাড়বে!

উত্তর কোরিয়া দাবী করে তাদের ক্ষেপনাস্ত্র মার্কিন ভূখন্ডেও হামলা করতে সক্ষম। ট্রাম্পের মাথা ব্যথাটা এখানেই।ছয়বার সফল পারমানবিক বোমার বিস্ফোরনের পর উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা থাকার বিষয়ে এখন অার কারই সন্দেহ নেই।এমনকি বলা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক বোমা জাপানের নাগাসাকি শহরে ফেলা বোমা থেকেও তিনগুন শক্তিশালী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ বেধে যায় যায় এমন একটি সময়েই অাজ( ২৭এপ্রিল, ২০১৮)পৃথিবী দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বৈঠকের অাশা জাগানিয়া সংবাদটি পেলো।বৈঠকের শুরুতেই কিম উল্লেখ করেন- A new history begins now। দুই কোরিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলছেন- we are one nation। অবশ্যই অাশা জাগানিয়া সে সংবাদ।

১৯৫৩ সালের যুদ্ধ যে সামরিক সীমারেখায় দুই কোরিয়াকে বিভক্ত করেছিল বিগত ৬৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম উত্তর কোরিয়ার কোনো প্রেসিডেন্ট কিম জং উন সে সীমানা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ায় পা রাখলেন। বিগত এক দশকের মধ্য এটিই প্রথম দুই দেশের অানুষ্ঠানিক বৈঠক। কে সেই ব্যক্তি? কোন সে দেশ যে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সংলাপে মধ্যস্ততা করার এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলল?

প্রথম লোকটি কিম জংয়ের বোন।নাম কিম ও জং। তিনি উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাশীন ওয়াকার্স পার্টির প্রোপাগান্ডা সেলের প্রধান ও একজন প্রভাবশালী নেত্রী। যিনি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের অাপন বোন। অন্যজন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং।

ঘটনার সূত্রপাত দক্ষিণ কোরিয়ায় শীতকালীন অলিম্পিক দিয়ে।যেখানে ট্রাম্প কন্যা ইভাঙ্কাও যোগ দিয়েছিলেন।উত্তর কোরিয়া সে অলিম্পিকে প্রেসিডেন্টের বোন কিম ও জংয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল পাঠায়।এর পর থেকেই মূলত দুই কোরিয়া সংকট সমাধানের বরফ গলতে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার মাধ্যমে ট্রাম্পের সাথে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়,সাথে সাথেই ইতিবাচক সাড়া দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।এর পরে একে একে সংলাপের পথে এগুতে থাকে উত্তর কোরিয়া।

উত্তর কোরিয়া একদলীয় স্বৈরশাসনের জাতাকলে পিষ্ট বিশ্বরাজনীতি থেকে দূরত্বে অবস্হান করা তুলনামূলক গরীব একটি রাষ্ট্র।উত্তর কোরিয়া বিশ্বাস করে বহিঃবিশ্বের অাক্রমণ ঠেকাতে পারমাণবিক বোমাই হল তাদের একমাত্র ভরসা।সেজন্য সামরিক উন্নয়নের পথেই হাটছে সে মানবিক উন্নয়নে নয়।কারণে অকারণে জাতিসংঘ, ইইউ, মার্কিনও যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অবরোধও যে উত্তর কোরিয়াকে অস্ত্রের জগতে ঠেলে দিয়েছে এটাওতো চরম সত্য!

তবে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তর কোরিয়া যে একা তাও নয়। তার পাশে সরব হয়ে অাছে চীন! অার নিরব ভূমিকায় রাশিয়াসহ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো! বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্রের সাথেই উত্তর কোরিয়ার সংলাপের বিষয়টি মূলত দেখে থাকে চীন। দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা অামেরিকার সাথে বৈঠকের ব্যাপারেও চীনই মূল মধ্যস্হতার কাজটি করছে।

২০১১ সালে ক্ষমতায় অাসার পর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের প্রথম বিদেশ সফর হলো সম্প্রতি স্পেশাল ট্রেনে গোপনে চীন সফর। ট্রাম্পের সাথে বৈঠকের প্রসঙ্গটি অাসতেই কিম পরামর্শের জন্য ছুটে গেলেন বেইজিং, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের কাছে। এতেই বুঝা যায় উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রভাব কতটা।
তবে নেতা হিসাবে কিম জং উনও কম নন।তার পিতা ও দাদা যা পারেননি অামেরিকার সাথে বৈঠকের মাধ্যমে তিনি তাই করতে যাচ্ছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ঐতিহাসিক বৈঠকও নিঃসন্দেহে অনেক বড় ব্যাপার!

দক্ষিণ কোরিয়া এখনও দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ চায়। এমনকি দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্যাবিনেটে একজন মন্ত্রীও অাছে। তবে এব্যাপারে উত্তর কোরিয়া উদাসীন। এর বড় কারণ হলো দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ হলে মার্কিন পুজি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনা দুটিই চীন সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে অাসবে! এজন্যই উত্তর কোরিয়ার একদলীয় সরকারকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে চীন! শত স্বৈরাচার হলেও তো চীনের চোখে সমাজতান্ত্রিক বন্ধু রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া। চীন চায়না কিম জং উনের পালাবদল। হবেও না এজন্যই। খাল কেটে উত্তর কোরিয়ায় ঘরের পাশে কেনই বা চীন মার্কিন পুঁজিবাদের কুমির অানতে যাবে? এজন্যই উত্তর কোরিয়ার নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে।

পূর্ব এশিয়ার কোরিয় উপদ্বীপে একটা যুদ্ধ যখন অবিসম্ভাবী এমন সময়ে উত্তর কোরিয়ার শান্তির পথে হাটা দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে হয়ে যাওয়া অাজকের বৈঠক সত্যি বিস্ময়কর!কেউ কেউ এটাকে political miracle ও বলছেন।তবে বড় সংবাদটি হলো অাসন্ন ট্রাম্প-কিম বৈঠক।উত্তর কোরিয়ার চিরশত্রু অামেরিকার সাথে বৈঠক।যেটা জুনে হওয়ার কথা।

হঠাৎ কেন উত্তর কোরিয়ার অাকস্মিক এই পরিবর্তন?
উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনই দিয়েছেন সে প্রশ্নের উত্তর।
তিনি বলছেন- “উত্তর কোরিয়ার অার ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই।দূরপাল্লার পারমাণবিক বোমা বহনে ব্যালাস্টিক ক্ষেপনাস্ত্রের সক্ষমতা অামরা অর্জন করেছি।এখন চাই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিকাশ, মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন”।

কট্টর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর একবিংশ শতাব্দীতে কিছু উদার পুঁজিবাদের দিকে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কেউ কেউ সমাজতন্ত্র ছেড়ে সোসাল ডেমোক্রেট হচ্ছে! সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্হার তুলনামূলক ধীরগতি চায়না মডেলের অর্থনীতির দিকে মার্কবাদীদেরকেও অাকৃষ্ট করছে।উত্তর কোরিয়াও হয়ত সামরিক কট্টরপন্থা থেকে নিজ জাতির ভাগ্য ও জীবনমানের উন্নয়নের জন্য এখন চায়না মডেলের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকেই এগুলোতে চাচ্ছে।

নিকট অতীতে দীর্ঘদিনের শত্রুতা কাটিয়ে বিপ্লবের কিংবদন্তী ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কিউবাও কিন্তু অামেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছে। বারাক ওবামা কট্টরপন্থী সমাজতন্ত্রী কিউবা সফর করেছেন।কিউবার অর্থনীতি২০% অলরেডি ব্যক্তি মালিকানাধীন পুজির অধীনে চলে গেছে।ট্রাম্প-কিমের বৈঠকও হয়তবা সে প্রক্রিয়ারই অংশ।

একটা সম্ভাব্য যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পারমাণবিক অস্ত্রে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন এক সকালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনকে উদ্দেশ্য করে যখন বলছেন- We would not interrupt your sleep anymore. তখন পৃথিবী নিশ্চয়ই নতুন স্বপ্ন দেখে। যে স্বপ্ন যুদ্ধ নয়, শান্তির।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন