মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৪:১০ অপরাহ্ণ


ছবি-১

বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ আছে। বলা বাহুল্য এই উন্নয়নের চালিকাশক্তি বিদেশ থেকে অদক্ষ শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স ও বিশ্বের সবচেয়ে স্বল্পমূল্যের নারী পোশাক শ্রমিক। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স হিরো নামে আখ্যায়িত করেছে। যদিও প্রতি বছর কয়েক হাজার হিরো লাশ হয়ে ও কয়েক লক্ষ শ্রমিক হাড়ভাঙা খাটুনির পরও কপর্দকশূন্য হয়ে দেশে ফেরেন। বাংলাদেশী শ্রমিকের অন্যতম গন্তব্য এশিয়ার মালয়শিয়ায় পিএইচডি অধ্যয়নের সুবাদে সুযোগ হয়েছে এই হিরোদের প্রাত্যহিক জীবন প্রত্যক্ষ করার। আজকের লেখা ‘উন্নয়নের গণতন্ত্রে’র পথে থাকা বাংলাদেশের হিরোদের অগ্রন্থিত ট্র্যাজেডি নিয়ে।

প্রথম ছবিতে যে রাস্তাটা দেখছেন, এর শেষ প্রান্তেই ২০০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক থাকেন। প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের অফিস থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্ব। ১০ ফুট বাই ১২ ফুট এর প্রত্যেকটি ঘরে ৭/৮ জনের বাস। এই ঘরেই তাদের রান্নাবান্না হয়। সকাল ৭ টায় কাজে বের হয়, ফিরে আসে সন্ধ্যা ৭ টায়। সকালের সতেজ মুখ নিয়ে বের হয়ে যাওয়া মানুষটা সন্ধ্যা বেলায় ফিরে আসে ঘামঝরা ও গায়ে ময়লা কাপড় নিয়ে। এসেই শুরু হয় তাদের গোসল ও রান্নার কাজ। ২০০ জন মানুষের জন্য মাত্র ৮টা বাথরুম। গোসলের জন্য একেবারেই পরিমিত পানি। খাওয়া-দাওয়া শেষে শুরু হয় বাংলাদেশে পরিবারের সাথে ফোনালাপ কিংবা বিশ্রাম। মা, বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের সামান্য আবেগঘন কথায় ওরা ঘুমিয়ে পড়ে। আবার প্রস্তুত হয় পরের দিনের জন্য।

প্রবাসী শ্রমিকদের ইফতারে লেখক।

এদের মানবেতর জীবন-যাপনের তেমন কিছুই দেশের বাড়ীতে পরিবার জানেননা। জিজ্ঞেস করায় কয়েকজন বললো, “এতোটা খারাপ পরিবেশে থাকি সেটা বাড়িতে পরিবার জানেনা”। অবশ্য জানবার কথাও না। এদের কারো ক্ষুদ্র ব্যবসা ছিলো দেশে, কেউ দিনমজুর ছিলো। আবার কেউ প্রতারকের খপ্পরে পড়ে এসেছে ভালো জীবনের আশায়। এমন একজনের সাথে কথা হয় প্রায় সময়।

মামুন নামের ঝিনাইদহের এই লোকটা ফারমাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে মার্কেটিং অফিসার ছিলো। কিন্তু তাকে এখানে মার্কেটিং এর ভালো জব ও উচ্চ বেতনের কথা বলে আনা হয় বছর তিনেক আগে। এখন তিনি ওয়েল্ডিং এর কঠিন কাজ করেন। তিনি জানান, “দেশে বউ বাচ্চাদের দেখতে খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু কি করবো এখনো খরচের টাকা উঠাতে পারিনি। তাছাড়া আমার আয়ের উপর আমার সংসার চলে দেশে”।

এমন হাজারো মামুনের গল্প বলে শেষ করা যাবেনা। আজ আমি ও UPM এর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক ভাই শ্রমিক ভাইদের ইফতার আপ্যায়ন করলাম। সবাই মিলে একসাথেই কাজ করলাম। খেলামও একসাথে। তারা সবাই আমাকে মাহাদি কিংবা মেহেদি ভাই বলে ডাকে। আমিও ওনাদের অনেকের নামই জানি।

যে সময়টা আমাদের ছাত্র ভাইয়েরা সবাই খেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে, আমি মাঝে মাঝে এই ১০ ফুট বাই ১২ ফুট ঘরে যেয়ে আড্ডা দেই এই ভাইদের সাথে। গার্মেন্টসকর্মী, কৃষক ও রেমিট্যান্স শ্রমিক- এই তিন ধরনের মানুষ আমার খুব প্রিয়। তাঁদের দেখলে আমার জলের তেষ্টা মিটে যায়। এখানে এদের সাথে কথা বললে আত্না সতেজ হয় আমার। আমি জানি দেশটা ওনাদের রক্ত আর ঘামের উপর দাঁড়িয়ে আছে। তবুও এই তিন পক্ষই অবহেলিত হয় বার বার- কর্মক্ষেত্রে বিমানে কিংবা গ্রামের হাটে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার সময় দেখেছি কিভাবে বিমানবালারা এই শ্রমিকদের সাথে খারাপ আচরণ করে। এই সহজ মানুষদের গায়ে ঘাম থাকতে পারে, জামা মসৃণ না হতে পারে, কিন্তু এদের হৃদয় পরিচ্ছন্ন এবং এদের ভালোবাসা আমাদের মত তথাকথিত ভদ্দরলোক সাজা মানুষদের মত নোংরা না। এরা টাকা-পয়সা-খাবার চায় না আমাদের কাছে।

এই সোনার মানুষেরা চায় বিমানবালা একটু সুন্দর ব্যবহার করুক। পাশের সিটে বসা ভদ্রলোক ভালো আচরণ করুক। তাকে দেখে নাক সিটকানো বন্ধ করুক। আমার সোনার দেশে অনেক উন্নয়ন হয়, হচ্ছে ঠিক। কিন্তু রেমিটেন্স শ্রমিকদের জন্য কি হচ্ছে? তাদের রক্ত ঘামের মূল্য ক’জনা দিচ্ছে? উদাহরণ স্বরুপ কয়েকজন ভাই বলেছেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনে গেলে সামান্য কাজের জন্যও এখানে ঘুষ দিতে হয়। দালালের দৌরাত্ম্য সর্বস্তরে পৌঁছেছে।

কাউন্টারে সার্ভিসের জন্য যাবার আগে গেইট থেকে অন্তত ২০ জন দালাল নানান ভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত শ্রমিক ভাইদের জ্বালাতন করে। এর কোন প্রতিকার নেই। বাংলাদেশ হাইকমিশনে এই দালালদের ঢুকবার সুযোগ করে দেয় কারা এই প্রশ্নই করে যাই বিবেককে। এরা দেশ থেকে আসার পর থেকেই দালালদের খপ্পরে পড়ে। ধাপে ধাপে টাকা দিতে দিতে বিদেশে আসার খরচ অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।

স্বল্প পরিসরে হলেও যে সুব্যবস্থা বর্তমানে আছে বিদেশগামীদের জন্য, তা আরো বড় পরিসরে হওয়া উচিত যেন এরা সবচেয়ে কম খরচে দেশের বাইরে আসতে পারে। আশা রাখি সরকারের উচ্চমহল আন্তরিক হলে এই মানুষদের জীবনে একটু স্বস্তি নেমে আসবে। এরা প্রাণ খুলে হাসবে। আমার দেশের আকাশ বাতাস হোক মেহনতি মানুষদের জন্য। তা না হলে এদের দীর্ঘশ্বাসে একদিন আমরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবো। সেদিন অনেক দেরি হয়ে যাবে।

দীর্ঘ সময় নিন্মমানের জীবন যাপনের কারণে এরা নানা ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে নিয়মিত। ভালোবাসাহীন ছোট্র ঘরে থেকে হৃদপিণ্ডটা এদের পাষন্ড হয়ে উঠেছে। সেজন্যই বোধ হয় ৫/৬ বছরে দেশে না গিয়েও আমাদের উন্নয়নের বুলিছোড়া শোষকদের চেয়েও এরা বেশি হাসতে পারে।

রোগ শোক যাই হোক কাজ বন্ধ করা যায়না। আগের কাজ হারালে, নতুন কাজ পেতে অনেক ঝামেলা। তার ওপর দেশের ৫/৭ জনের সংসারের কি হবে যদি মাস শেষে টাকা পাঠায় এই মানুষেরা। আমার চোখে এরা একেকজন জীবন্ত শহীদ। বাংলাদেশ এই জীবন্ত শহীদদের মর্যাদা কবে দিবে ঠিকভাবে? আমার দেশের হাজারো উন্নয়নের পাশাপাশি এই মানুষদের ও উন্নয়ন হোক। ঘর ছেড়ে প্রবাসে পরে থেকে যারা আমাদের ব্যাংক রিজার্ভ একটু মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে এই মানুষদেরকেও দেয়া হোক বিশেষ সুবিধাদি।

আমি চাইবো আমার সোনার বাংলা যদি সত্যিকারের সোনার বাংলা হতে চায়, তাহলে এই শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে। বিমানে কিংবা গ্রামের হাটে এরাই হবে সবচেয়ে মূল্যায়িত। আজকাল এই জীবন্ত শহীদেরা যাদের স্যার/ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে থাকেন তাদের অবদান কি ওনাদের চেয়ে অনেক বেশি? নাকি তারা দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকায় ইউরোপ আমেরিকায় প্রাসাদ বানাতে ব্যয় করেন?

এই রেমিট্যান্স হিরোরাই আমাদের স্যার। এরাই সত্যিকারের মানুষ। এই মতি মিয়া, রাজা মিয়া, মামুন মিয়ারাই আমাদের সোনার মানুষ। কেবল মে দিবস আসলে ফেসবুক ভাসিয়ে দিয়ে কী হবে যদি এদের শ্রদ্ধা না করি?

এদের প্রতিদিনই রাস্তা ব্রীজ বা বাড়ি বানানোর কাজ থাকে দেশে কিংবা বিদেশে। অথচ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এদের নিজেদের আর ঘর সাজানো হয়না। কি করুণ এই মানুষদের জীবন! এই মতি মিয়াদের সাথে দেখা হলে তাদের গল্প শুনুন। বিমানের পাশে বসা কোনমতে প্যান্ট শার্ট পরা মানুষটাকে দেখে ভ্রু না কুঁচকিয়ে কথা বলুন। ওদের ভালো লাগবে। আপনারো জীবন সম্পর্কে ধারনা বদলে যাবে নিশ্চিত।

চলুন আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করি আমরা কৃষক, গার্মেন্টস কর্মী, গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিদেশ শ্রমিকদের গল্পগুলো শুনব। তাঁদের জন্য নূন্যতম স্পেসের ব্যবস্থা করব লাখো শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশে। 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন