রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ


ফটো কার্টেসিঃ সমকাল

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের সাথে হাতে হাত ধরে আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান চর্চা, প্রদান আর সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা এখন ক্লীশের (cliche) মত শোনায়। বস্তাপচা বুলি।

ইহলৌকিক জ্ঞানের সাথে গবেষণা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গবেষণা ছাড়া নতুন জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়। জ্ঞান সৃষ্টির তাগিদে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব গবেষণায় নিয়োজিত হওয়া। অপর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে যারা গবেষণা করছেন তাদের আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

অল্প কিছুসংখ্যক আছেন যারা গবেষণায় অত্যন্ত আগ্রহী এবং তাদের বিষয়জ্ঞানও যথেষ্ট উন্নত। নিঃসন্দেহে এরা ভালো গবেষক। তবে ভালো শিক্ষক নাও হতে পারেন। কিছু আছেন যাদের গবেষণায় আগ্রহ আছে কিন্তু বিষয়জ্ঞানে ঘাটতি রয়েছে। তারাও সাধ্য অনুযায়ী কিছু গবেষণা সম্পন্ন করে থাকেন। কিছু আছেন গবেষণায় অনাগ্রহী। গবেষণা করতে তাদের ভালো লাগেনা। এদের ভেতর কারো কারো বিষয়জ্ঞান ভালো, শিক্ষক হিসেবেও নামডাক আছে।

কিছু আছেন আবার পিওর ধান্দাবাজ, পড়াশোনা বা গবেষণা কোনটাতেই আগ্রহ নেই। সম্পুর্ন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এবং এদের কাজ রাজনৈতিক দলগুলোর দালালী এবং অশিক্ষকসুলভ কাজকারবার। এই শেষ শ্রেণীটি আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো আছে। সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। দুধ-মধুতে ডুবে থাকে। পদ-পদবি হাতিয়ে নেয়। প্রমোশন কখনো আটকায় না।

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তাদের অনেকেরই জানা নেই, এই দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রমোশন পাওয়া কতোটা সহজ। কোন রকমে কিছু বছর চাকরীতে কাটিয়ে দিতে পারলে এবং বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, চারটি গবেষণা প্রবন্ধ থাকলেই আপনি প্রফেসর পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হতে কোন পাবলিকেশনের প্রয়োজন নেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর থেকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হতে একাধিক গবেষণা প্রবন্ধের প্রয়োজন। অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর থেকে প্রফেসর হতে আবারও প্রয়োজন একাধিক গবেষণা প্রবন্ধের। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক মানে হচ্ছে একটি প্রকাশিত এবং অপরটি সাবমিটেড। গবেষণা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে কোন ধরণের বাছবিচার করা হয় না। রাঙ্গামাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ আর বিশ্বখ্যাত নেইচারে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের মূল্যায়ন সমান! বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি জায়গায় তুঘলকি কাণ্ড।

পৃথিবীর কোথাও এত সহজে প্রফেসর হওয়া যায় বলে মনে হয় না। অ্যাকাডেমিক চাপ বলতে কিছু নেই। রাজনীতি আর লেজুড়বৃত্তির জন্য অনেক সময়। এই ধরণের নীতিমালা, যা প্রণয়ন করাই হয়েছে অযোগ্যদের প্রমোট করার জন্য তা একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ধংসের জন্য যথেষ্ট। এই ধরণের নীতিমালা চরিত্র নষ্ট করে। এই ধরণের নীতিমালা বহাল রেখে মর্যাদা দাবী করলে হবে না। মর্যাদা পাওয়া যাবে না।

একজন নবীন শিক্ষক শুরুতে আগ্রহ নিয়ে তার কাজ শুরু করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই আগ্রহ ধরে রাখতে পারেন না। কি হবে লেখাপড়া আর গবেষণায় সময় দিয়ে? এর থেকে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি অনেক লাভজনক। হাউস-টিউটর, প্রভোস্ট, প্রোক্টর ইত্যাদি হওয়া যায়। লেগে থাকলে ভিসি, প্রোভিসি, ইউজিসির মেম্বার, ইউজিসির চেয়ারম্যান পর্যন্ত। গবেষণা এবং পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে বোকারা। নিজের লাভটুকুও বোঝে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এখনকার পরিবেশ এই ইঙ্গিতই দেয়।

বুদ্ধিবিবেক অবশিষ্ট থাকলে শংকিত না হয়ে পারা যায় না। এই ধরণের নীতিমালার কারণেই বিপুল সংখ্যক অযোগ্য মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় চলে এসেছে। সার্বিক ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার যে মান মর্যাদা তা আজ কমে এসেছে। একজন বিষয়জ্ঞানে দুর্বল বা মাঝারি আমলা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে পরিহাস করতে কুণ্ঠিত হয় না। তারা জানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিভাবে চলছে। কারা চালাচ্ছে।

মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে যোগ্যতার কোন বিকল্প নেই। সীমাবদ্ধতার ভেতরেও নীতিমালা এমন হতে হবে যেখানে যোগ্যতার প্রশ্নে কোন ছাড় নেই। সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। যিনি পারেন তিনি দ্রুত পদোন্নতি পাবেন। যিনি পারবেন না তার দেরি হবে। বছর গুনে আর যেনতেন প্রকাশনা দেখে পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হওয়া উচিৎ।

সত্যিকারের যোগ্য মানুষ সবসময় আত্মমর্যাদাশীল। আত্মমর্যাদা যার আছে তিনি লেজুড়বৃত্তি করতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি যোগ্য মানুষ খুঁজে তাদের উপযুক্ত স্থান দিতে পারে তাহলে আজ যে মর্যাদার সঙ্কট তা অচিরেই বিদায় নেবে। মেরুদণ্ড আর যোগ্যতা একে অপরের সমানুপাতিক। মেরুদণ্ড সোজা, এমন একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে কেউ খেলতে পারে না। এটিই একমাত্র সমাধান।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন