রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৫:২৮ অপরাহ্ণ


(প্যারিস রিভিয়্যুতে প্রকাশিত রিতা গুইবার্ত এর নেয়া পাবলো নেরুদার সাক্ষাতকার Pablo Neruda, The Art of Poetry বাংলায় অনুবাদ করেছেন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক ও অনুবাদক সাবিদিন ইব্রাহিম)

কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে আমি কখনো ফারাক দেখিনি। চিলির কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে রাষ্ট্রপতি পদে লড়ার আগে এই কথা বলেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার চাতক পাখি পাবলো নেরুদা।

আমি একজন চিলিয়ান। দশকের পর দশক আমি দেখেছি কিভাবে এ দেশের মানুষগুলো দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। আমিও দেশের অংশ হিসেবে তাদের কষ্টসুখের ভাগিদার হয়েছি। আমি তাদের কাছে অতিথি নই। আমি এই জনগণ থেকেই উঠে এসেছি এবং আমি তাদেরই অংশ। আমি একটি শ্রমজীবি পরিবার থেকে উঠে এসেছিআমি ক্ষমতাবানদের মতন নই। আমার পেশা এবং কর্তব্য হচ্ছে চিলিয়ান জনগণকে সেবা করা। এবং আমি আমার কাজ এবং কবিতার মাধ্যমে সেটা দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি তাদের গান গেয়ে, তাদের পক্ষ নিয়েই বেঁচেছি।

বাম মোর্চাতে বিভেদ দেখা দিলে তিনি তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন এবং পপুলার ইউনিটির প্রার্থীকে সমর্থন দেন। (নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদের আলেন্দে ছিল তার আবার বন্ধু। অগাস্তা পিনোচেট সামরিক অভ্যুত্থান করে যাকে সড়িয়ে দিয়েছিলেন।) অথচ এর আগে দীর্ঘ চারমাস দীর্ঘ ক্যাম্পেইন চালিয়েছিলেন। এই সাক্ষাতকারটি নেয়া হয়েছিল ১৯৭০ এর জানুয়ারিতে। তখন তিনি তার আইলা নিগ্রার বাড়িতে ছিলেন। এটা ছিল নির্বাচন থেকে ইস্তফা দেয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে।

আইলা নিগ্রা (কৃষ্ণ দ্বীপ) আসলে কালোও নয় আবার এটা একটা দ্বীপ ও নয়। এটা আসলো একটি অসাধারণ সুন্দর সমুদ্র সৈকত। এটা ভালপারাইসু থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং সান্তিয়াগো থেকে ২ ঘন্টার ড্রাইভের দূরত্ব। কেউ আসলে জানে না নামটা কেমনে আসলো। নেরুদা মনে করেন সেখানটার কালো কালো পাথরগুলো যেগুলো একেকটা দ্বীপের আকার নিয়ে আছে সেগুলোর কারণে এমনতর নাম হতে পারে। তার বাড়ির টেরাসে দাড়ালেই নেরুদা এই পাথরগুলো দেখেন।

এখন থেকে ত্রিশ বছর আগে যখন আইলা নিগ্রা ততটা ফ্যাশনেবল হয়ে উঠেনি তখন বইয়ের রয়ালটি দিয়ে এই বাড়িটি কিনেছিলেন নেরুদা। সামনে প্রায় ছয় হাজার বর্গমিটারের বিশাল সমুদ্র সৈকত, পেছনে উচু টিলার উপর পাথরের তৈরি ছোট্ট বাড়িটি।

তারপর বাড়িটা বেড়ে উঠতে লাগলো, মানুষগুলির মতো, গাছগুলির মতো।

নেরুদার আরও কয়েকটা বাড়ি আছে-একটা সান্তিয়াগোর সান ক্রিস্তোবাল হিলে এবং আরেকটা ভালপারাইসুতে। তার বাড়ি সাজানোর জন্য সে তাবৎ পুরাতন জিনিসের দোকান চষে বেড়িয়েছেন। প্রত্যেকটা জিনিসের সাথেই যেন একটা করে গল্প আছে।

তাকে কি স্টালিনের মতো লাগে না?”,  ইংরেজ অভিযাত্রী মরগ্যানের একটি আবক্ষ মূর্তির দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন নেরুদা। মূর্তিটি আইলা নিগ্রার ডাইনিং রুমে আছে। নেরুদা জানালেন, “আমার কাছে জিনিসটা বেঁচতে চায়নি প্যারিসের ওই পুরাতন মালের দোকানী। সে যখন জানতে পারলো আমি একজন চিলিয়ান তখন জিজ্ঞেস করলো আমি পাবলো নেরুদাকে চিনি কি না। নেরুদাকে চেনার গল্প বলার মাধ্যমেই আমি তাকে জিনিসটি আমার কাছে বেঁচতে প্ররোচিত করেছিলাম।

তার তৃতীয় স্ত্রী মাতিলদের সঙ্গে আইলা নিগ্রার এই বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকেন নেরুদা। মাতিলদেকে আদর করে ‘পাতোজা’ বা মিউজ বলে ডাকেন নেরুদা। নেরুদা দেখতে মোটামুটি লম্বা, মোটাসোটা, গায়ের রং জলপাইয়ের মতো। তার নাকটা দর্শনীয় এবং চোখগুলো বাদামী। তিনি খুব ধীরে হাঁটেন কিন্তু হাঁটায় দৃঢ়তা রয়েছে। কোন ধরণের ভনিতা বা কৃত্রিমতা না রেখে তিনি কথা বলেন। হাঁটতে বের হলে সঙ্গে দুটো পোষা কুকুরকে নিয়ে যান। এ সময় হাতে থাকে পুরনো মডেলের ছড়ি। তার আইলা নিগ্রার বাড়িতে সবসময়ই অতিথিদের আনাগোনা লেগে থাকে এবং তার টেবিলে শেষ মুহূর্তের অতিথিদের জন্যও জায়গা থাকে। নেরুদা বেশিরভাগ অতিথিদেরই আপ্যায়ন করেন বারে।  টেরাসের পর একটা করিডোর পের হলেই বারটি। সামনে সমুদ্র সৈকত।

করিডোরের ফ্লোরে একটি ভিক্টোরিয়ান মডেলের বেসিন এবং একটি পুরনো হ্যান্ড ওয়াগন। জানালা বরাবর তাকটিতে অনেকগুলো বোতলের সংগ্রহ। বারটি একটি জাহাজের স্যালুনের মতো সাজানো হয়েছে। আসবাবগুলো ফ্লোরের সঙ্গে আটকানো। আরও আছে নটিক্যাল ল্যাম্পস ও পেইন্টিং। সৈকতের দিকের দেয়ালটি কাঁচের তৈরি। সিলিংয়ের প্রত্যেকটি কাঁঠের বিমে নেরুদার হাতের লেখায় তার মৃত বন্ধুদের নাম খোদাই করা আছে। কাঠমিস্ত্রীরা নেরুদার হাতের লেখা অনুকরণ করে এই নামগুলো খোদাই করেছে। বারের পেছনেই লিকারের শেলফ। ওখানে লেখা ‘নো সে ফিয়া মানে ‘কোন টাকা লাগে না নেরুদা খুবই সিরিয়াসভাবে পরিবেশক বা বারটেনডারের ভূমিকা পালন করেন। অতিথিদেরকে প্রচুর পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করেন। নিজে অবশ্য শুধু স্কচ ও ওয়াইন পান করেন। দেয়ালে দুটো নেরুদা-বিরোধি পোস্টার লাগানো। একটি পোস্টার নিয়ে এসেছেন কারাকাসে তার সর্বশেষ ভ্রমণের সময়। ওখানে তার একটি ছবির সাথে লেখা, ‘নেরুদা, বাড়ি যাও’। আরেকটি হচ্ছে একটি আর্জেন্টাইন ম্যাগাজিনের কভার। সেখানে নেরুদার ছবির সাথে লেখা ‘নেরুদা কেন আত্মহত্যা করছে না?’

আইলা নিগ্রার বাড়িতে খানাপিনা একেবারেই চিলিয়ান। নেরুদা এগুলোর কথা তার কবিতায় বলেছেন: এর মধ্যে আছে কয়েক ধরণের মাছের স্যুপ, টমেটোর সসের সাথে মাছ, ছোট চিংড়ি ও মাংসের পাই। মদটা সবসময় চিলিয়ান হবেই। মদ পরিবেশন করার পাত্রগুলো চিনামাটির। এর মধ্যে একটি দেখতে অনেকটা পাখির মতো। যখন মদ ঢালা হয় তখন সেটি গান গেয়ে উঠে। গ্রীষ্মের সময় বারান্দাতে লাঞ্চ পরিবেশন করা হয়। বারান্দার সামনেই একটি বাগান। বাগানে পড়ে আছে একটি পুরনো রেল এঞ্জিন। ‘আমি এটাকে ভালোবাসি কারণ এটা দেখতে ওয়াল্ট হুইটম্যানের মতো। এটা অনেক শক্তিশালী, জোরে হুইশেল দেয়, বাঁশি বাজায় এবং গর্জন করে।

সাক্ষাতকারের জন্য আড্ডাগুলো বিভিন্ন ছোট ছোট সেশনে ভাগ করা হয়েছিল। সকালবেলা নেরুদার লাইব্রেরিতে বসতাম। নিজের রুমে নাস্তা করে নেরুদা বাড়ির সে অংশটিতে আসতেন। আমাকে অপেক্ষা করতে হতো। ততক্ষণে তিনি অনেকগুলো চিঠির জবাব দিতেন, নতুন বইয়ের জন্য কিছু কবিতা লিখতেন অথবা ‘বিশটি প্রেমের কবিতা’র নতুন চিলিয়ান সংস্করণের এডিট করতেন। কবিতা লেখার সময় তিনি সবুজ কালির একটি কলম দিয়ে একটি সাধারণ খাতার মধ্যে লিখতেন। তিনি খুব কম সময়ের মধ্যেই বেশ বড়সড় একটি কবিতা লিখে ফেলতে পারতেন। লেখার পর তিনি খুব অল্পই সংশোধন করতেন। তারপর সে কবিতাগুলো তার সেক্রেটারি/সচিব টাইপ করতে বসতেন। ওই সচিব ছিলেন তার ৫০ বছরের বন্ধু হুমেরু আর্ক।

নেরুদা দুপুরবেলা একটা ছোট্ট ন্যাপ/বিশ্রাম নেওয়ার পর আমরা একটি পাথরের বেঞ্চে বসতাম। টেরাসের মধ্যে ওই বেঞ্চটি ছিল সমুদ্রের দিকে মুখ করা। নেরুদা টেপ রেকর্ডারের মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে কথা বলতো। তার কণ্ঠস্বরের সাথে সাথে সমুদ্রের গর্জনও রেকর্ড হতো মাইক্রোফোনটিতে।

সাক্ষাতকার গ্রহীতার প্রশ্ন: আপনি আপনার নাম পরিবর্তন করলেন কেন? আবার কেনই বা পাবলো নেরুদা রাখলেন?

পাবলো নেরুদাঃ আমার মনে নেই। তখন আমার বয়স তের বা চৌদ্দ হবে। আমার মনে আছে আমার লেখালেখির বিষয়টি আমার বাবাকে খুবই বিরক্ত করেছিল। তার মনে আসলে ভালো ধারণাই ছিল। তিনি মনে করতেন লেখালেখি আমাদের পরিবারে ধ্বংস নিয়ে আসবে এবং বিশেষ করে আমি নষ্ট হয়ে যাবো। এবং এটা আমাকে একটা নিকর্মা, অর্থহীন জীবন উপহার দিবে। তার এই মনোভাবের পেছনে পরিবারের স্বার্থ জড়িত কিন্তু এটা আমাকে তেমন ভাবায় নি। তারপরও আমি একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলাম আমার নামটা পাল্টানোর মাধ্যমে।

প্রশ্নঃ চেক কবি জেন নেরুদা থেকে কি আপনি ‘নেরুদা’ অংশটি নিয়েছিলেন?

নেরুদাঃ আমি তার একটি ছোট গল্প পড়েছিলাম। আমি তার কবিতা পড়ি নাই। কিন্তু তার একটি গল্পের বই ছিল ‘স্টোরিজ ফ্রম মালা স্ট্রানা’ নামে যেখানে তিনি প্রাগে তার আশপাশের সাধারণ মানুষ নিয়ে লিখেছিলেন। সম্ভবত আমার নতুন নামটা সেখান থেকে আসতে পারে। যেটা আমি বলছিলাম সম্পূর্ণ ব্যাপারটা এত আগের যে আমি মনে করতে পারছিনা। তাছাড়া চেকবাসীরা মনে করে আমি তাদেরই অংশ। জাতি হিসেবে তাদের সাথে আত্মীয়তা অনুভব করি।

প্রশ্ন:যদি আপনি চিলির প্রেসিডেন্ট হয়ে যান তাহলে কি আপনি লেখালেখি চালিয়ে যাবেন?

নেরুদা: আমার কাছে লেখালেখি হচ্ছে শ্বাস নেয়ার মত ব্যাপার। আমি শ্বাস না নিতে পারলে বাঁচবো না, তেমনি লেখালেখি ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না।

প্রশ্ন: এমন কবি কি আছে যারা বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সফল হয়েছেন?

নেরুদা: আমাদের যুগটা হচ্ছে কবিদের যুগ। এই যে দেখুন মাও সে তুং ও হো চি মিন। মাও সে তুংয়ের তো আরেকটি গুণ ছিল। সে ছিল একজন সেরা সাতারু যেটা আমি নই! লিওপোল্ড সেগর নামে আরেকজন বড় কবি আছেন যিনি সেনেগালের প্রেসিডেন্ট। এইমে সেজার মার্টিনেক শহরের মেয়র। আমার দেশে কবিরা সবসময় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন যদিও আমরা এখনো কোন কবি রাষ্ট্রপ্রধান পাইনি। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে লেখকরা রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছেন। রমিউলো গ্যালেগোস ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

প্রশ্ন: আপনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা কেমনে করছেন?

নেরুদা: প্লাটফর্ম তো একটা তৈরি হয়েই আছে। প্রথমে সবসময়ই লোকগান দিয়ে শুরু হয়। তারপর কোন দায়িত্বশীল নেতা আমাদের ক্যাম্পেইনের মর্মার্থ বলার চেষ্টা করে। তারপর আমি বেশ খোলাখুলিভাবে শহুরে মানুষদের সঙ্গে কথা বলি। এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসংগঠিত। প্রায় সবসময়ই কবিতা পড়ে শেষ করি। আমি যদি কবিতা না পড়ি তাহলে মানুষ হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরবে। অবশ্যই, তারা আমার রাজনৈতিক চিন্তাও শুনতে চায় কিন্তু আমি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোর উপর অতিরিক্ত জোর দেই না। কারণ মানুষের কাছে আরেক ধরণের ভাষায় কথা বলতে হয়।

প্রশ্ন: মানুষ আপনার কবিতায় কেমন সাড়া দেয়?

নেরুদা: তারা আমাকে খুব আবেগ দিয়ে ভালোবাসে। কিছু কিছু জায়গায় আমি ঢুকতেও পারি না, বের হতেও পারি না। আমার চারপাশে একটি বিশেষ দল আমাকে ঘীরে রাখে কারণ চতুর্দিক থেকে মানুষ আমার দিকে আসতে চায় এবং আমার উপর বেশ চাপ দেয়। এটা সব জায়গাতেই ঘটে।

প্রশ্ন: আপনাকে যদি চিলির প্রেসিডেন্ট এবং নোবেল পুরস্কার যার জন্য আপনার নাম অনেকবার উঠেছে, এ দুটির মধ্যে একটিকে বাছাই করতে বলা হয় তাহলে আপনি কোনটি নেবেন?

নেরুদা: এসব হাওয়াই জিনিস নিয়ে কোন ধরণের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন থাকতে পারে না।

প্রশ্ন: কিন্তু তারা যদি রাষ্ট্রপতিপদ ও নোবেল পুরষ্কার একই টেবিলে রাখে তাহলে আপনি কোনটি বাছাই করবেন?

নেরুদাঃ তারা যদি এমন জিনিস আমার টেবিলের সামনে রাখে তাহলে আমি ওই টেবিল থেকে উঠে যাবো এবং অন্য টেবিলে গিয়ে বসবো।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন স্যামুয়েল ব্যাকেটকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া ঠিক আছে?

নেরুদা: হ্যা, আমি মনে করি ঠিক আছে। ব্যাকেট খুব ছোট কিন্তু অসাধারণ জিনিস লিখেন। নোবেল পুরষ্কার যেখানেই পড়ুক এটা সাহিত্যের জন্য একটি সম্মান। আমি তাদের দলে নই যারা সবসময় এটা প্রশ্ন করে নোবেল পুরষ্কারটি ঠিক জায়গায় পড়লো কি পড়লো না। পুরষ্কারটি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ-যদি এর কোন গুরুত্ব থেকে থাকে সেটা হলো এটা লেখকের টাইটেলে একটি সম্মানের পালক যোগ করে। এর বেশি কিছু না।

প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে মনে রাখার মতো স্মৃতি কোনগুলো?

নেরুদা: আমি জানি না। আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতিগুলো সম্ভবত স্পেনে কাটানো দিনগুলো। স্পেনের কবিকুলের সাথে ওই সোনাঝড়া দিনগুলো। আমাদের আমেরিকাতে এমন ভ্রাতৃত্তপরায়ণ কোন গ্রুপ নাই, এরকম আড্ডাবাজ দল নাই। ওই যে, বুয়েন্স আয়ারসে বলে না ‘আলাক্রানেওস’ (গালগল্প)এরকম আর কি। তার পরবর্তীতে গৃহযুদ্ধে এই বিশাল বন্ধু সার্কেলের শেষ হয়ে যাওয়া দেখা ছিল সবচেয়ে ভয়ানক অভিজ্ঞতা। এটা ফ্যাসিস্ট নির্যাতনের সবচেয়ে ভীতিকর বাস্তবতাকে দেখিয়ে দিয়েছিল। আমার বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল। কাউকে কাউকে দেশের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো, যেমন-গার্সিয়া লোরকা ও মিগেল হার্নান্দেজ। অন্যরা নির্বাসিত অবস্থায় মারা গেল। আর এখনো অনেকেই নির্বাসিত অবস্থায় বেঁচে আছে। আমার জীবনের এই পুরো পর্বটাই ছিল ঘটনায় পরিপূর্ণ, আবেগের তীব্রতায় সমৃদ্ধ এবং এগুলোই আমার জীবনের গতিপথকে একেবারেই পরিবর্তন করে দিল।

প্রশ্ন: তারা কি এখন আপনাকে স্পেনে ঢুকতে দেবে?

নেরুদা: সরকারিভাবে তো আমার বিরুদ্ধে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। একবার চিলিয়ান দূতাবাস আমাকে কবিতা পড়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছিল। খুব সম্ভাবনা যে তারা আমাকে ঢুকতে দেবে। আমি এটা নিয়ে বেশি সোরগোল করতে চাই না বা এটাকে ইস্যু বানাতে চাই না। কারণ স্পেনিশ সরকারের জন্য এই গণতান্ত্রিক আচরণ করাই সবচেয়ে সহজতর হতে পারে যার মাধ্যমে তারা তাদের বিরোধিদেরকে দেশে প্রবেশ করার অনুমতি দিতে পারে।

আমাকে এখন ঢুকতে দেবে কিনা সেটা আসলে আমি জানি না। আমাকে এত বেশি দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এবং এত বেশি দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে যে আমি এখন আর কিছু মনে করি না। প্রথম দিকে এটা আমাকে বিরক্ত করতো, কষ্ট দিতো।

প্রশ্ন: আপনি গার্সিয়া লোরকার প্রতি একটা শোকগাথা (Ode) লিখেছেন তার মৃত্যুর আগে। একটা দিক দিয়ে বলতে গেলে বলা যায় সেটাতে তার নির্মম মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে।

নেরুদা: হ্যা, এই কবিতাটা অনেক অদ্ভূত। অদ্ভূত এ কারণে যে সে ছিলো এত সুখী মানুষ, এরকম একটি সুখী সৃষ্টি। আমি তার মতো সুখী মানুষ আর দেখি নাই। সে ছিল সফলতার অবতার (ইনকারনেশন)…আসলে বলতে গলে সফলতার নয়, জীবনের প্রতি ভালোবাসার। সে তার অস্তিত্বের প্রতিটি মিনিট উপভোগ করেছে-যেন সুখের এক বেহিসেবী কর্তা! এজন্য তাকে হত্যা করা ছিল ফ্যাসিজমের অসংখ্য ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধ।

প্রশ্নকর্তা: আপনার অনেক কবিতায় তাকে নিয়ে আসেন। মিগেল হার্নান্দেজকেও নিয়ে আসেন দেখেছি।

নেরুদা: হার্নান্দেজ ছিল ছেলের মতন। কবি হিসেবে একদিক দিয়ে সে ছিল আমার শিষ্যের মত। সে তো প্রায় আমার বাড়িতেই থাকতো। তাকে জেলে পোড়া হলো এবং সে সেখানেই মারা গেল। কারণ সে লোরকার হত্যাকাণ্ডের সরকারি ভার্সনকে/ব্যাখ্যাকে মেনে নেয়নি। তাদের ব্যাখ্যা যদি সঠিকই হতো তাহলে কেন ফ্যাসিস্ট সরকার মিগেল হার্নান্দেজকে আমৃত্যু জেলে পুড়ে রাখলো? কেন চিলিয়ান দূতাবাসের প্রস্তাব অনুযায়ী তাকে হাসপাতালে পাঠানো হলো না? মিগেল হার্নান্দেজ এর মৃত্যুও একটি হত্যাকাণ্ড।

প্রশ্ন: ভারতে থাকা দিনগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি আপনি কোন জিনিসগুলো স্মরণ করেন?

নেরুদা: সেখানে থাকতে গিয়ে আমি যে ধরণের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এই অপরিচিত মহাদেশটির ব্যাপকতা আমাকে মোহিত করেছিল কিন্তু তারপরও আমি বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। কারণ সেখানে অনেক দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছিলাম এবং একাকীত্বে ভুগছিলাম। মাঝে মাঝে মনে হতো আমাকে যেন একটি রঙিন ছবিতে আটকে রাখা হয়েছে-অসাধারণ ছবি কিন্তু আমি তা থেকে বের হতে পারছিনা। আমি ওখানে কোন মিস্টিসিজমের দেখা পাইনি যা অনেক দক্ষিণ আমেরিকান বা অন্যান্য বিদেশীরা অনুসন্ধান করতে যান। যেসব লোক তাদের সংকটের ধর্মীয় সমাধান খুঁজতে যায় তারা ব্যাপারটাকে ভিন্নভাবে দেখে। আমার ক্ষেত্রে আমি সামাজিক অবস্থা দেখে বেশ নাড়া খেয়েছিলাম। এই বিশাল, নিরস্ত্র দেশটি কিভাবে সাম্রাজ্যের জোয়ালে বন্দি। ইংরেজ সংস্কৃতির প্রতি আমার যা-ই একটু ভালো লাগা ছিল এর ফলে ঘৃণা হয়েছিল। কারণ আমি দেখেছিলাম সেটা কিভাবে শিক্ষিত হিন্দুদেরকে দাস বানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছিল। আমি সেখানকার বিপ্লবী তরুণদের সাথে মিশেছিলাম। আমার দূতাবাসের পদ থাকলেও তখনকার বড় বড় আন্দোলনের সব বড় বিপ্লবীদেরকে চিনতাম। সেসব বড় আন্দোলনের ফলেই অবশেষে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।

প্রশ্ন: ভারতে থাকাকালীন সময়ে কি আপনি ‘রেসিডেন্স অন আর্থ’ (দুনিয়ায় বসত) লিখেছিলেন?

নেরুদা: হ্যা, যদিও আমার কবিতাতে খুব অল্পই বুদ্ধিবৃত্তিক ছাপ ফেলতে পেরেছে ভারত।

প্রশ্ন: আপনি আর্জেন্টাইন হেক্টর এনাদির কাছে কিছু মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেছিলেন। এটা কি রেঙ্গুন থাকাকালীন সময়ে লেখা?

////////////////////////////////////////////////////////////////

নেরুদা: হ্যা। ওই চিঠিগুলো আমার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই লেখককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না কিন্তু একজন ভালো সামারিতান হিসেবে সে আমাকে বিভিন্ন খবর ও সাময়িকী পাঠাতো যেগুলো আমার নি:সঙ্গতার সময়ে বেশ কাজে দিয়েছিল। আমার ভয় হচ্ছিল যে আমি হয়তো আমার ভাষার সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলতে পারি। কারণ কয়েকবছর ধরে আমি এমন কাউকে পাইনি যে ষ্পেনিশ ভাষা বুঝতে পারে। রাফায়েল আলবার্তির কাছে একটি চিঠিতে আমি ষ্পেনিশ ডিকশনারি চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আমাকে একজন কনসাল পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এবং এটা ছিল নিম্ন মানের একটি পদ এবং আমার বিশেষ কোন ভাতা ছিল না। আমি মারাত্মক দারিদ্র্যের মধ্যে কাটিয়ে ছিলাম এবং তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমি ভয়ানক নিঃসঙ্গতার মধ্যে ছিলাম। এমন সময়ও গেছে কয়েক সপ্তাহ ধরে একজন মানুষও দেখি নাই।

প্রশ্নকর্তা: তখন তো আপনার হোসি ব্লিসের সাথে বেশ রোমান্স চলছিলো এবং তার কথা আপনার বিভিন্ন কবিতাতে উঠে এসেছে।

নেরুদা: হ্যা, হোসি ব্লিস হচ্ছে এমন একটি নারী যে আমার কবিতায় গভীর ছায়া রেখে গিয়েছে। আমি তাকে সবসময় স্মরণ করি এমনকি আমার অতি সাম্প্রতিক বইগুলোতেও।

প্রশ্ন: তাহলে আপনার কাজ আপনার ব্যক্তিগত জীবনের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত?

নেরুদা: স্বাভাবিকভাবেই। একজন কবির জীবন তার কবিতায় প্রতিফলিত হবেই। এটা হচ্ছে শিল্পের ধর্ম, জীবনের ধর্ম।

প্রশ্ন: আপনার কাজকে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করা যায়, তাই নয় কি?

নেরুদা: এইটা নিয়ে আমার ধারণা ভয়ানক প্যাজগির মনে হয়। আমার আসলে কোন ধাপ নেই, সমালোচকরা সেটা আবিষ্কার করেছেন। আমার কবিতা নিয়ে যদি আমি কিছু বলতে চাই তাহলে বলবো আমার কবিতার মধ্যে একটা অর্গানিজম আছে, আমি যখন বালক ছিলাম তখন বালকসুলভ গুণ ছিল, আবার যখন তরুণ হলাম তখন তরুণের গুণারোপিত হলো। আবার যখন কষ্টে ছিলাম তখনকার একাকীত্ব ও কষ্টের তীব্রতা ভর করলো কবিতায়। এ সবগুলো প্রবণতার যোগফলই হল এখনকার আমার কবিতা।আমি আমার ভেতরকার প্রয়োজনেই লিখে এসেছি এবং আমার মনে হয় এটা সব লেখকের বেলাতেই ঘটে, বিশেষত কবিদের সাথে।

প্রশ্নকর্তা: আমি দেখছি আপনি গাড়িতেও লিখছেন।

নেরুদা: আমি যেখানেই পারি যখনই পারি লিখি। আমি সবসময়ই লিখি।

প্রশ্ন: আপনি কি সবকিছুই হাতে লিখেন?

নেরুদা: একটি দুর্ঘটনার পর আমার হাতের আঙুল ভেঙে গেল। এরপর থেকে কয়েক মাস ধরে আমি টাইপরাইটার ব্যবহার করতে পারছিনা। এখন আমি আমার তরুন বয়সের অভ্যাসে ফিরে গেছি। আবার হাতে লেখা শুরু করেছি। এখন দেখছি যে আমার হাতের লেখা কবিতাগুলো টাইপরাইটারে লেখা কবিতাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সেনসেটিভ/সংবেদনশীল। এর প্লাস্টিক ফর্মটা খুব সহজেই পরিবর্তন করা যায় এমন। রবার্ট গ্রেইভস্ একটি সাক্ষাতকারে বলেছেন যে চিন্তা করার জন্য আশেপাশে যত কম সম্ভব যন্ত্রপাতি থাকে ততই ভালো। হাতের তৈরি জিনিসপত্র ছাড়া অন্য ধরণের যন্ত্রপাতি কম থাকা মঙ্গলজনক! তিনি হয়তো এ কথাটিও যোগ করতে পারতেন যে কবিতা হাতেই লেখা উচিত। এই টাইপরাইটার আমাকে কবিতার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থেকে দূরে রাখে। আঙুল ভাঙার ফলে আমি আবার কবিতার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে ফিরে এসেছি।

প্রশ্ন: আপনি কোন সময় লেখালেখির কাজ করেন?

নেরুদা: আমার তেমন সময়সূচি নাই তবে সকালবেলা লিখতে পছন্দ করি। সে কথা বলতে গেলে তুমি যদি আমার সময় অপচয় না করতে(এবং তোমার সময় নষ্ট না করতে!) আমি তাহলে লিখতাম। দিনের বেলা সাধারণত আমি বেশি পড়ি না। আমি প্রায় সারাদিন লিখতে পারি। কিন্তু মাঝে মাঝে একটা চিন্তার পরিপূর্ণতা আসে, আমার ভেতর থেকে এমন একটা এক্সপ্রেশন বের হয়ে আসে যেটা আমাকে সন্তুষ্ট করে দেয়, ফুরিয়ে দেয়, ক্লান্ত করে দেয় বা শূণ্য করে দেয়। সেটাকে পুরনো টার্মে ধরেন বলা যায়, ‘ইনষ্পিরেশন’/অনুপ্রেরণা। ওখানেই শেষ। তারপর আমি আর যেতে পারি না।

এর বাহিরে বলতে গেলে আমি সারাদিন আমার ডেস্কে বসে থাকতে পছন্দ করি। আমি জীবনের বহমানতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পছন্দ করি, আমার বাড়ি, আমার রাজনীতি এবং প্রকৃতি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আমি সারাজীবনই এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করেছি। কিন্তু আমি তীব্রভাবে লিখতে পছন্দ করি যখনই পারি যেখানেই পারি। আমার আশেপাশে প্রচুর মানুষের উপস্থিতি আমাকে বিরক্ত করে না।

প্রশ্ন: আপনার চারপাশ থেকে আপনি একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান?

নেরুদা: হ্যা, আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে সবকিছু যদি আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায় তখন সেটা আমাকে বিরক্ত করে।

প্রশ্নকর্তা: আপনি তো গদ্য লেখার দিকে মনোযোগ দিলেন না।

নেরুদা: গদ্য…. আমি সারাজীবন পদ্যে লেখারই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। গদ্যের প্রকাশভঙ্গি আমাকে টানে না। কোন ক্ষনিকের আবেগ বা ঘটনার বর্ণনা দেয়ার জন্য আমি গদ্য ব্যবহার করি। এটা আসলে ওই ন্যারেটিভের জন্যই। সত্য কথা হচ্ছে আমি একেবারেই গদ্য লেখা ছেড়ে দিতে পারি। আমি আসলে খুব অল্প সময়ের জন্যই সেটা করি।

প্রশ্ন: ধরেন আপনার সব লেখাগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হবে। আপনি কোন লেখাটা বাঁচানোর চেষ্টা করবেন?

নেরুদা: সম্ভবত একটাও না। এগুলো আমার কি কাজে লাগবে? আমি বরং একটা মেয়েকে রক্ষা করবো…অথবা গোয়েন্দা গল্পের ভালো কোন সংগ্রহ… যেগুলো আমার লেখার চেয়ে আমাকে বেশি আনন্দ দেবে।

প্রশ্ন: সমালোচকদের মধ্যে কারা আপনাকে ভালো বুঝতে পেরেছে বলে মনে করেন?

নেরুদা: ওহ! আমার সমালোচকরা! দুনিয়ার সব ভালোবাসা বা ঘৃণা দিয়ে তারা তো পারলে আমারে ছিড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলে! একজন সবাইকেই সন্তুষ্ট করতে পারে না, জীবনে যেমন শিল্পেও তেমন।এটা আমাদের ব্যাপারে সবসময় সত্য। একজন কবি সবসময় চুমাও খায়, থাপ্পরও খায়, আদরও পায় লাত্থিও পায়। এটাই হচ্ছে কবির জীবন।

যেটা আমার খারাপ লাগে সেটা হলো কবিতার ব্যাখ্যায় বিকৃতি অথবা জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা, মিথ্যা ব্যাখ্যা। এই যেমন ধরুন নিউইয়র্কে যে পেন(চ.ঊ.ঘ.) ক্লাব কংগ্রেস হলো যেখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে মেধাবী লোকেরা সমবেত হলো। আমি সেখানে আমার সমাজ বিষয়ক কবিতাগুলো পড়লাম। ক্যালিফোর্নিয়াতেও আমি সেটা করলাম। কিউবা বিপ্লবকে সমর্থন করে, কিউবাকে উত্সর্গ করে কবিতা পাঠ করলাম। তারপরও কিউবার কবি-লেখকরা কি করলো। তারা আমার বিরুদ্ধে চিঠি লিখলো এবং এটা লাখ লাখ কপি ছাপালো। বলা হলো কিউবা বিপ্লব নিয়ে আমার মতামত সন্দেহজনক এবং আমাকে উত্তর আমেরিকা আশ্রয় দিচ্ছে। এবং তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ঘটনাটি আমার প্রতি একটি উপহারই /প্রাইজ!

এটা একেবারেই হাস্যকর,ঈর্ষা বা বিদ্বেষের কথা না হয় না-ই বললাম। এখানে তো আরও অনেক সমাজতান্ত্রিক দেশের কবিরা এসেছেন। এবং কিউবা থেকেও তো আসার কথা ছিল। কেউ নিউইয়র্কে আসলেই তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধি চরিত্র হারিয়ে ফেলেনা। তাছাড়া আমার মনে হয় কিউবার লেখকরা খুব তাড়াহুড়ো করে এই সিদ্ধান্তে এসেছেন বা এটা তাদের খারাপ বিশ্বাস।

ঘটনা হচ্ছে এই মুহূর্তে আমি কিন্তু আমার পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। এটা কিন্তু দেখাচ্ছে আমার সত্যিকারের বিপ্লবী ইতিহাস রয়েছে। এখন আমার বিরুদ্ধে যেসব কিউবান লেখক-কবি চিঠিতে সাক্ষর করেছে তাদের মধ্য থেকে এমন একজনকেও বোধ করি পাওয়া যাবে না যাদের আমার সাথে তুলনা করার মতো একশো ভাগের এক ভাগও সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, বিপ্লবী আদর্শের জন্য ত্যাগ রয়েছে।

প্রশ্নকর্তা: আপনার জীবনধারার/জীবনযাপনের জন্য আপনাকে সমালোচনা করা হয়। আপনার এই অর্থনৈতিক অবস্থানের জন্য।

নেরুদা: আসলে এটা পুরোটাই একটা মিথ। একদিক থেকে আমরা ষ্পেন থেকে একটি খারাপ ঐতিহ্য গ্রহণ করেছি। সেটা হচ্ছে আমরা আমাদের মধ্যেকার কাউকে আলাদা বা বিশেষ কিছু আকারে দেখা সহ্য করতে পারি না। ষ্পেনে ফেরার পর তারা কলম্বাসকে বন্দি করেছিল। আমরা এটা পেয়েছি ওই হিংসুটে পাঁতি বুর্জোয়াদের কাছ থেকে। তারা সবসময় অন্যের কি আছে এবং নিজের কি নেই এটা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে।

আমার ক্ষেত্রে বলা যায় আমি মানুষের জন্য আমার জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছি। আমার বাড়িতে যা আছে-এই যে বইগুলো এগুলো তো আমার কাজের অর্জন। আমি কাউকে শোষণ করি নাই। এটা খুবই অদ্ভূত। আমাকে যেভাবে গালাগালি করা হয় সেরকমটা অন্য লেখকদের বেলায় করা হয় না যারা উত্তরাধিকার সূত্রেই বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কিন্তু আমার বেলা হয় অপমান। এটা বুঝা দরকার আমার পেছনে রয়েছে আমার ৫০ বছরের কর্মকাণ্ড। তারা সবসময় বলে,‘দেখছো সে কেমনে জীবনযাপন করে? সমুদ্রের দিকে মুখ করা তার একটি বাড়ি আছে। সে ভালো মদ পান করে। কি হাস্যকর কথা! শেষ দিয়ে যদি শুরু করি তাহলে বলবো চিলিতে খারাপ মদ খাওয়া খুবই কঠিন। কারণ চিলির প্রায় সব মদই ভালো। এই সমস্যাটা আসলে আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা কিভাবে অনুন্নত। সবকিছু যোগ করলে আমরা আসলে সবদিক দিয়েই মাঝারি হতে চাই।

আপনিই তো বললেন উত্তর আমেরিকার সাময়িকীগুলোতে তিনটি প্রবন্ধ লেখার জন্য নরম্যান মেইলারকে প্রায় নব্বই হাজার ডলার দিতে হয়েছে। এখন ল্যাটিন আমেরিকাতে কোন লেখক যদি এরকম বোনাস নিতো তাহলে সব লেখকদের কাছ থেকেই বিরোধিতা আসতো। লেখকরাই ক্ষেপে গিয়ে বলতো,‘কত বড় দুঃসাহস! কি ভয়ানক! এটা কোথায় গিয়ে থামবে?’ লেখকরা এটা নিয়ে সন্তুষ্ট হবে না যে একজন লেখকও এমন ফি দাবি করতে পারেন। আসলে সাংস্কৃতিক দ্রারিদ্র্যের নামে এগুলো হচ্ছে আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য।

প্রশ্ন: এই অভিযোগগুলো তীব্র হওয়ার এটা কারণ নয় কি যে আপনি কমিউনিস্ট পার্টির?

নেরুদা: একেবারেই ঠিক। যার কিছু নাই, স্লোগানে বলা হয় তার শৃঙ্খল ছাড়া খোয়ানোর কিছু নাই। আমি সবসময়ই নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে রাখি, আমার প্রত্যেকটি মুহূর্ত, আমার জীবন এবং আমার যা কিছু আছে-আমার বই, আমার বাড়ি। আমার বাড়ি পুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে অনেকবার শাস্তি দেয়া হয়েছ, আমাকে একাধিকবার আটক করা হয়েছে। আমাকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল এবং আমাকে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। হাজার হাজার পুলিশ লেগেছিল আমার পেছনে। আমার যা কিছুই ছিল আমি মানুষের জন্য, সংগ্রামের জন্য ব্যবহার করেছি। এই যে এই বাড়িটাতে বসে কথা বলছি সেটা তো আমি রিট করে কমিউনিস্ট পার্টিকে দিয়ে দিয়েছিলাম বিশ বছরের জন্য। এখন আমি যে এই বাড়িতে থাকছি সেটাও আমার পার্টির বদান্যতায়। ঠিক আছে, আমাকে যারা গালি মারছে তারা মারুক। শুধু তাদেরকে বলি আপনাদের জুতাগুলো একটু বাইরে রেখে আসেন তো দেখি যাতে অন্যরা নিয়ে যেতে পারে!

প্রশ্ন: আপনি তো অনেক লাইব্রেরিতে অনুদান দিয়েছেন। আইলা নিগ্রাতে লেখকদের কলোনি স্থাপনের কোন প্রোগ্রামে কি আপনি আছেন?

নেরুদা: প্রায় একটা লাইব্রেরি সমান বই আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিয়েছি। আমি আমার বইয়ের আয়ের উপর নির্ভর করেই জীবন ধারণ করে আছি। আমার কোন সেভিংস/জমানো টাকা নেই। মাসে আমার বই থেকে যা আসে তা দিয়েই খরচ চালাই। এটা ছাড়া আমার কোন আর আয় উপার্জন নেই। সেই আয় উপার্জন থেকে উপকূলের কাছে আমি একটি বড় জমি কিনেছি। যাতে ভবিষ্যতে লেখকরা এই অসাধারণ সুন্দর জায়গায় গ্রীষ্ম কাটাতে পারেন এবং তাদের সৃষ্টিশীল কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারেন। এটা হবে ‘কাতালাও ফাউন্ডেশন’। এর পরিচালকরা হবেন ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব চিলি এবং দ্য সোসাইটি অব রাইটারস্ থেকে।

প্রশ্নকর্তা: ‘বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান তো আপনার প্রথম দিককার একটি বই। এটা তো এখনো হাজার হাজার পাঠক পছন্দ করেন।

নেরুদা:বইটা এক মিলিয়ন কপির (দশ লক্ষ কপি) প্রকাশনা উপলক্ষে ভূমিকাতে আমি লিখেছিলাম, শীঘ্রই এটা দুই মিলিয়ন (বিশ লক্ষ)কপি ছাড়িয়ে যাবে। ব্যাপারটা কি আসলে আমি জানি না। এ বইটা তো প্রেমের হতাশা, দুঃখ ও যাতনা নিয়ে লেখা। কেন এই বইটি এত মানুষ এখনো পড়ছেন এবং বিশেষ করে তরুনরা পড়ছেন? সত্যিই আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছিনা। সম্ভবত এ বইটিতে তরুনদের বিভিন্ন কষ্ট, সমস্যা ও যাতনার কথা বলা হয়েছে। তরুন বয়সের বিভিন্ন ধাঁধার উত্তর রয়েছে হয়তো সেখানে। এটা তো একটা শোকাচ্ছন্ন বই কিন্তু এর আকর্ষণটা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

প্রশ্ন: আপনি হচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনূদিত কবিদের একজন। প্রায় ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় আপনাকে অনুবাদ করা হয়েছে। কোন ভাষায় আপনাকে ভালো অনুবাদ করা হয়েছে?

নেরুদা: আমি বলবো ইতালিয়ান। কারণ এ দু’টা ভাষার মধ্যে মিল আছে। ইতালিয়ানের বাইরে আমি আর যে দুটো ভাষা জানি সেগুলো হলো ইংরেজি ও ফরাসী। কিন্তু এ দুটো ভাষা ষ্পেনিশের সাথে যায়না-উচ্চারণ বলুন, অবস্থান বলুন অথবা শব্দের রং বা ওজন বলুন।

এটা এমন না যে সমভাবাপন্ন শব্দ বা বাক্যে নেয়া যায়না। হয়তো সেন্সটা ঠিকই থাকে কিন্তু একেবারে অনুবাদের যথার্থতা ধরে রাখতে গেলে কিন্তু কবিতা ধ্বংস হয়ে যায়। আমার অনেকগুলো ফরাসী অনুবাদে দেখা গেছে যে আমার কবিতা হারিয়ে গেছে, আমার কবিতার আর কিছুই থাকেনি। আমি বলবো না সব গুলোতেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু এটা সুষ্পষ্ট যে আমি যদি ফরাসী ভাষার কবি হতাম তাহলে আমি ওভাবে বলতাম না। কারণ শব্দের অর্থ বা মূল্য একেক ভাষায় একেকরকম। আমি হয়তো অন্য কিছু লিখতাম।

প্রশ্ন: ইংরেজির ব্যাপারে আপনি কি বলবেন?

নেরুদা: আমি দেখি যে ইংরেজি ভাষা ষ্প্যানিশ থেকে অনেক আলাদা। একেবারেই ষ্পষ্ট। সরাসরি বলে দেয়। ইংরেজির বেলায় অনেক সময় দেখা গেছে যে আমার কবিতার অর্থ হয়তো প্রকাশ করতে পেরেছে কিন্তু আমার কবিতার আবহটা প্রকাশ করতে পারেনি। আমার মনে হয় ইংরেজি থেকে যখন ষ্পেনিশে অনুবাদ করা হয় একই ঘটনা ঘটে।

প্রশ্ন: আপনি বললেন যে আপনি গোয়েন্দা গল্পের বড় পাঠক। আচ্ছা আপনার প্রিয় লেখক কারা?

নেরুদা: ধারার বড় সাহিত্যকর্ম হচ্ছে এরিক আম্বলারের ‘অ্যা কফিন ফর দিমিত্রিওস (দিমিত্রিওসের জন্য কফিন)। এরপর কিন্তু আম্বলারের প্রায় সব বই-ই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু আর কোনটিতেই ‘দিমিত্রিওসের জন্য কফিন’ এর মতো দক্ষতা, সংকটের অসাধারণ বুনন, এবং রহস্যময় আবহ তৈরি করতে পারেনি। সাইমনন ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জেমস হাডলি চেজ ভয়, হরর এবং ধ্বংসাত্মক শক্তির বর্ণনায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। ‘নো অর্কিডস্ ফর মিস ব্লান্ডিশ একটি পুরনো বই। কিন্তু এটা কিন্তু গোয়েন্দা/রহস্য গল্পের একটি মাইলফলক। ‘নো অর্কিডস্ ফর মিস ব্লান্ডিশ এবং উইলিয়াম ফকনারের ‘স্যাংকচুয়ারি’(ঝধহপঃঁধত্ু) বা ‘পবিত্র স্থান’ এর অদ্ভূত মিল আছে। ওটা ফকনারের ভিন্নধারার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বই। তবে আমি কখনোই ধরতে পারি নাই আসলে কোনটা আগে লেখা হয়েছিল।

অবশ্যই গোয়েন্দা গল্পের কথা আসলে আমি দাশিয়েল হাম্মেত এর কথা ভাবি। সে-ই তো এটাকে ভূত-প্রেতের আধা-সাহিত্য থেকে নিয়ে এসে এ ধারাকে শক্ত মেরুদণ্ড দিলো। সে একজন অসাধারণ স্রষ্টা। তারপর তো শত শত অন্যান্য লেখক আসলো। এদের মধ্যে জন ম্যাকডোনাল্ড সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট। এদের সবাই প্রচুর লেখেছেন এবং সবাই অনেক খেটেছেন। উত্তর আমেরিকার এই গোয়েন্দা/রহস্য গল্প ধারার সব লেখকের লেখাতেই উত্তর আমেরিকার ক্ষয়িষ্ণু পুজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা রয়েছে।

এই রহস্য উপন্যাসগুলোতে রাজনীতিবিদ ও পুলিশের দুর্নীতি ও অসততার কথা যেভাবে এসেছে, বড় শহরগুলোতে দুর্নীতির চিত্র যেভাবে এসেছে, ‘দ্য আমেরিকান ওয়ে অব লাইফ’ (আমেরিকান জীবনধারা) এর বিরুদ্ধে যে সমালোচনা উঠে এসেছে আর কোন সাহিত্যেই সেটা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। এটা সম্ভবত এই সময়কার সবচেয়ে নাটকীয় সফলতার একটি উদাহরণ। এরপরও এটাকে খুবই তুচ্ছ করে দেখা হয়। সাহিত্য সমালোচকরা এই রহস্যগল্পগুলোকে তাদের সাহিত্য আলোচনায় নিতে চান না।

প্রশ্ন: অন্য আর কি বই পড়েন?

নেরুদা: আমি আসলে ইতিহাসের পাঠক, বিশেষ করে আমার দেশের অতীত ইতিহাস। চিলির অসাধারণ ইতিহাস রয়েছে। এই কারণে নয় যে এর অসাধারণ স্মৃতিসৌধ রয়েছে, পুরাতন স্থাপত্য রয়েছে; এগুলোর কিছুই আসলে চিলিতে নেই। কারণ হচ্ছে আসলে এটা আবিষ্কার করেছেন একজন কবি-ডন আলনসো দে এরকিল্লা যে ছিল পঞ্চম কার্লোসের বালকবৃত্ত (পেজ)।

সে বাস্কের একজন অভিজাত ছিলেন এবং বিজেতাদের সাথে এসেছিলেন। তিনি এদিক থেকে ভিন্ন। কারণ চিলিতে পাঠানো বেশিরভাগই ছিল বিভিন্ন জেল থেকে আনা কয়েদী। এটা ছিল থাকার জন্য সবচেয়ে কঠিন জায়গা। আরাওকানিয়ান ও ষ্পেনিশদের মধ্যে কয়েক শতক ধরে যুদ্ধ চলছিল। মানবতার ইতিহাসে এটা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ। আরাওকানিয়ার এই আধা-সভ্য জাতিগুলো ষ্পেনিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তিনশো বছর ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলো।

ডন আলনসো দে এরকিল্লা ওয়াই জুনিগা নামের ওই তরুন মানবতাবাদী পুরো আমেরিকা শাসনের আকাংখা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি পুরো আমেরিকা শাসন করতে পারলেও এই কঠিন, বন্য দেশ চিলিকে বশে আনতে পারেন নি। ডন আলনসো ‘লা আরাওকানা নামে একটি মহাকাব্য লিখেছিলেন। এটা কাতালিয়ান ভাষায় সবচেয়ে দীর্ঘ মহাকাব্য। সেখানে তিনি আরাওকানিয়ার অজানা গোত্রগুলোকে সম্মান জানিয়েছেন। তার সহযোদ্ধা কাতালিয়ান সৈন্যদের চেয়ে বিভিন্ন গোত্রের নামহীন নায়কদেরকে সম্মান জানিয়েছেন। তিনি তাদের সংগ্রামকে, তাদের নায়কগুলোকে প্রথম নাম দিয়েছেন।

লা আরাওকানা’ ( La Araucana) ষোড়শ শতকে প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর সমগ্র ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়। এটা ছিল একজন মহান কবির মহান সৃষ্টি। এজন্য জন্ম থেকেই চিলির ইতিহাসের মহাকাব্যিক মাহাত্ম্য ও শৌর্য-বীর্য রয়েছে। আমরা চিলিয়ানরা অন্যান্য ষ্পেনিশ ও ইনডিয়ান আমেরিকার সংকরজাত জাতি থেকে আলাদা। আমরা ষ্পেনিশ সৈন্যদের কাছ থেকে বা তাদের অসংখ্য ধর্ষন বা যৌনদাসী (কনকিউবাইন) থেকে আসিনি। আমরা এসেছি মূলত আরাওকানিয়ান ও ষ্পেনিশ নারীদের মধ্যে স্বেচ্ছা বা জোরপূর্বক বিয়ের ফলশ্রুতিতে। ওই দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের সময় বন্দী ষ্পেনিশ নারীদেরকে বিয়ে করতো আরাওকানিয়ানরা।

আমরা একটু ভিন্ন আর কি। অবশ্যই তারপর বলতে হবে ১৮১০ সালে আমাদের রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। আমাদের ইতিহাস ট্রাজেডিতে পরিপূর্ণ, বিরোধ আর সংগ্রামে পূর্ণ। এই ইতিহাসে সান মার্টিন, বলিভার, হোসে মিগেল কারেরা এবং ওহিগিনস্ দের নাম চলে আসে। আমাদের ইতিহাস সফলতা ও দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। এসব কিছুই আমাকে বই পড়ার দিকে নিয়ে যায়। এই যে আমি দেশের ইতিহাস খুড়ে বিভিন্ন জিনিস বের করি সেটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়। আমি এ দেশটির মর্মার্থ খুজি। এটা কিভাবে অন্য সব দেশ থেকে আলাদা, অক্ষাংশে এত ঠান্ডা, এত নির্জন। উত্তরে রয়েছে সল্টপেটার পাম্পাস,এই যে বিশাল পাতাগোনিয়া, বরফাচ্ছন্ন আন্দিজ, উজ্জল সাগর। এটাই আমার দেশ, চিলি। আমি আজীবন ওই চিলিয়ানদের মতো যারা অন্য দেশে যত ভাল ব্যবহারই পাক না কেন নিজ দেশে ফিরে আসবেই। ইউরোপের বড় বড় শহরগুলোকে আমার ভালো লাগে। আর্নো ভ্যালিকে আমি ভালোবাসি, কোপনেহেগেন ও স্টকহোমের কিছু রাস্তা অনেক সুন্দর এবং আর রয়েছে প্যারিস, প্যারিস, প্যারিস-আহ! কিন্তু আমাকে চিলিতেই ফিরে আসতে হবে।

প্রশ্নকর্তা: ‘আমার সমসাময়িকগণ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে আর্নেস্তো মন্তিনিগ্রো উরুগুয়াইন ক্রিটিক রদ্রিগেজের ওই আহ্বানের সমালোচনা করেন যেখানে তিনি বলেন সমসাময়িক ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা তার ল্যাটিন আমেরিকান কলিগদের লেখাপত্র পড়ে তাদের গদ্যে নতুনত্ব নিয়ে আসতে পারে। মন্তিনিগ্রো কৌতুক করে বলেন এটা এমন পিপড়া হাতিকে বলছে,‘আমার কাঁধে চড়ো তারপর বোর্হেসের একটি উক্তি ব্যবহার করেন: “বর্বর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এই দেশ (এই মহাদেশ) সমগ্র বিশ্বে প্রভাব ফেলতে পারে এমন একজন লেখকও জন্ম দিতে পারেনি। এদের নেই কোন এমারসন, হুইটম্যান বা এডগার এলান পো। না তারা জন্ম দিতে পেরেছে হেনরী জেমস বা মেলভিল এর মতো গভীর লেখকদের।

নেরুদা: আমাদের এই মহাদেশে যদি একজন হুইটম্যান, বোদলেয়ার বা কাফকা না থাকে তাহলে কি সমস্যা? সাহিত্য সৃষ্টির ইতিহাস তো মানবতার মতই বিশাল। আমরা কোন কিতা/শিষ্টাচার (এতিক্যাত) কে তো চাপিয়ে দিতে পারি না। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল শিক্ষিত শ্রেণী বা ইউরোপের সুপ্রাচীন জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের সাথে তো এই বইপত্রহীন ল্যাটিন আমেরিকার তুলনা হতে পারেনা। একে অন্যের প্রতি ঢিলা নিক্ষেপ করা বা এক মহাদেশ অন্য মহাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় জীবন পার করে দেওয়া আসলে আমার কাছে একটি আঞ্চলিক সেন্টিমেন্ট। এছাড়া এ ব্যাপারগুলোকে আমি একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে নেই।

প্রশ্ন: ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য চর্চার হাল হাকিকত নিয়ে আপনার মতামত কি?

নেরুদা: হন্ডুরাস থেকে নিউইয়র্ক (ষ্পেনিশ ভাষায় যেগুলো লেখা হচ্ছে), মন্টিভিডিও থেকে গুয়াকুইল সব জায়গাতেই একই জিনিস দেখা যায় তারা এলিয়ট বা কাফকা প্রভাবিত সাহিত্য পয়দা করে যাচ্ছেন। এটা আসলে একধরণের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ। আমরা এখনো ইউরোপিয়ান কিতায় আচ্ছন্ন। আমাদের চিলিতে আপনি দেখবেন বাড়ির কত্রী ঘরের বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে বলবে এটা চায়না থেকে আনা হয়েছে, এটা বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। মুখে হাসি রেখে বলবে,‘এটা বিদেশ থেকে আনা হয়েছে’। বেশিরভাগ চিলিয়ানদের ঘরের তৈজসপত্র বিদেশ থেকে আমদানী করা। এর মধ্যে বেশিরভাগই খুবই বাঁজে, ভয়ানক ও নিম্নমানের। জার্মানি ও ফ্রানে্সর সবচেয়ে বাঁজে কারখানাতে এগুলো তৈরি হয়। এই বাঁজে জিনিসগুলোকে অনেক মান-মর্যাদা দেয়া হয় কারণ এগুলো আমদানি করা হয়েছে।

প্রশ্ন: স্বীকৃতি না পাওয়ার ভয় কি এর জন্য দায়ী?

নেরুদা: নিশ্চয়ই আদিকালে প্রত্যেকেই বিপ্লবী ধ্যান-ধারণা নিয়ে ভীত ছিল, বিশেষ করে লেখকরা। এই দশকে, বিশেষ করে কিউবা বিপ্লবের পর হাল আমলের ফ্যাশন পুরোটা উল্টো। যে লেখকরা একেবারে বামঘেষা অবস্থান না নেয় তারা ভয়ে থাকে। এ কারণে প্রত্যেকে লেখকই একজন গ্যারিলার মতো অবস্থান নিয়ে থাকে। এমন অনেক লেখক আছেন যারা শুধু নিজের ঢোল পিটিয়ে বেড়ান তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি কত বড় সেনানী।

আমরা যারা সবসময়ই এ লড়াইয়ে ছিলাম তারা এটা দেখে খুব খুশি যে সাহিত্য অবশেষে সাধারণ মানুষের পক্ষ নিচ্ছে। কিন্তু আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে এটা অনেকটা ফ্যাশনেরও ফল। সক্রিয় বামপন্থী না হলে বা বিপ্লবী না হলে লেখককে কেউ পুছবে না এই ভয়ও আছে লেখকদের মাঝে। সবশেষে বলতে গেলে আসলে সব ধরণের প্রাণীই এই বিশাল সাহিত্যের বনে স্থান পায়। একবার আমি আমার একদল গোয়ার সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে একটা কথা বলেছিলাম যাদের দেখে মনে হয়েছিল তারা আমার কবিতাকে এবং আমাকে আঘাত করার জন্যই বেঁচে আছে। আমি বলেছিলাম: “তাদেরকে একা থাকতে দাও। জঙ্গলে সবার জন্যই জায়গা আছে। এই যে বিশাল হাতি যেগুলো অনেক জায়গা নেয়, তাদের জন্য যেমন আফ্রিকা ও সিলনের জঙ্গলে জায়গা রয়েছে তাহলে সব কবির জন্যও জায়গা রয়েছে

প্রশ্ন: অনেকেই এ অভিযোগ করে যে আপনি হোর্হে লুই বোর্হেস এর প্রতি বিরূপভাবাপন্ন।

বোর্হেস: আমাদের অরিয়েন্টেশনের ভিন্নতার কারণে বুদ্বিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক জায়গা থেকে বিরূপ ভাব থাকতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ লড়াই চলতে পারে। কিন্তু আমার অন্য শত্রু রয়েছে, লেখককুল নয়। আমার জন্য শত্রু হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, এবং আমার শত্রু হচ্ছে পুঁজিপতিরা যারা ভিয়েতনামে নাপাম ফেলেছে। কিন্তু বোর্হেস আমার শত্রু নয়।

প্রশ্ন: বোর্হেসের লেখা নিয়ে আপনি কি মনে করেন?

নেরুদা: তিনি অনেক বড় লেখক। এবং যারা ষ্পেনিশ ভাষায় কথা বলে তারা খুব গর্ব করে যে বোর্হেস নামে একজন আছেন, বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ। বোর্হেসের আগে আমাদের তেমন কোন লেখক ছিলনা যারা ইউরোপের লেখকদের সাথে দাঁড়াতে পারে। আমাদের অনেক বড় লেখক ছিলেন কিন্তু বোর্হেসের মতো আন্তর্জাতিক মানের লেখক আমাদের দেশে সবসময় দেখা যায় না। আমি এটা বলতে পারি না যে তিনি সবচেয়ে সেরা লেখক। আমি আশা করবো যে তাকে অন্য লেখকরা অনেক ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সবদিক থেকে সে-ই তো আমাদের দিকে আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন, ইউরোপের পণ্ডিতদের চোখ আমাদের দেশগুলোর দিকে নিয়ে এসেছেন। এদিকে মজার ব্যাপার হলো সবাই চায় আমি যেন বোর্হেসের সাথে ঝগড়া পাকাই, কিন্তু সেটা আমি করছি না!

সে যদি ডাইনোসরের মতো চিন্তা করে তার সাথে তো আমার চিন্তার কিছু করার নেই। সাম্প্রতিক বিশ্বে কি ঘটছে সেটা নিয়ে সে কিচ্ছু জানে না। আবার সে মনে করে আমি কিচ্ছু জানি না। তাহলে সেটা তো ভালো কথা! আমরা তো এক লাইনেই আছি! অন্তত এই বিষয়ে তো একমত আমরা কেউ কিছু জানি না।

প্রশ্ন: এক রবিবারে আমরা দেখলাম কিছু আর্জেন্টাইন তরুন গিটার নিয়ে বোর্হেসের ‘মিলোঙ্গা’ গাচ্ছিলো। আপনার ভালো লেগেছিলো, তাই নয় কি?

নেরুদা: বোর্হেসের ‘মিলোঙ্গা’ আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছিলো। বিশেষ করে কিভাবে একজন নিভৃতচারী কবি, এমন একজন রুচিশীল ও পণ্ডিত কবিও জনপ্রিয় থিমে লিখতে পারে। এটাতে এত সুন্দর ও সত্যিকারের/নিখুত শিল্পীর ছোঁয়া রয়েছে। বোর্হেসের ‘মিলোঙ্গা’ অনেক পছন্দ করি। ল্যাটিন আমেরিকান কবিদের তার পথ অনুসরণ করা উচিত।

প্রশ্ন: আপনি কি কোন চিলিয়ান ফোক গান লিখেছেন?

নেরুদা: আমি কিছু গান লিখেছি যেগুলো এ দেশে অনেক জনপ্রিয়।

প্রশ্ন: কোন কোন রাশিয়ান কবিকে আপনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

নেরুদা: রাশিয়ান কবিতার এখনো শক্তিশালী চরিত্র হচ্ছে মায়াকোভস্কি। রুশ বিপ্লবের জন্য তিনি তেমন গুরুত্বপূর্ণ যেমনটা উত্তর আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ওয়াল্ট হুইটম্যান। কবিতার উপর মায়াকোভস্কির প্রভাব এতই প্রবল যে এখন যে রুশ কবিতা হচ্ছে তার প্রায় সবগুলোই মায়াকোভস্কিয়ান।

প্রশ্ন: রাশিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া রাশিয়ান লেখকদের নিয়ে আপনি কি বলবেন?

নেরুদা: যে ব্যক্তি কোন জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চায় তার সেটা করা উচিত। এটা আসলে একেবারেই ব্যক্তিগত সমস্যা। কিছু সোভিয়েত লেখকের এটা মনে হতেই পারে যে তারা বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সাথে বা তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথেই সম্পর্ক রাখতে কষ্ট হচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক দেশ ছাড়াও অন্য দেশগুলোতে রাষ্ট্র ও লেখকদের মধ্যে আমি কখনো কম বিরোধ দেখিনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ সোভিয়েত লেখকরাই তাদের সমাজতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে গর্বিত; নাত্সীদের বিরুদ্ধে তাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে, বিপ্লবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিশ্বযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে গর্বিত। এবং সমাজতন্ত্র তাদের দেশে যে কাঠামো দিয়েছে তা নিয়ে গর্বিত।এর ব্যতিক্রম যদি থাকে সেটা আসলে ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং এটা প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদাভাবে দেখা দরকার।

প্রশ্ন: কিন্তু সৃষ্টিশীল কাজ তো কখনো মুক্ত হতে পারে না। এটাতে সবসময় রাষ্ট্রের চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটাতে হয়।

নেরুদা: এটা বলা আসলো অতিরঞ্জন। আমি অনেক লেখক ও চিত্রশিল্পীকে দেখেছি যারা কখনো রাষ্ট্রের এটা সেটাকে অতিরিক্ত স্তুতিতে ভাসিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। কিন্তু একধরণের একটা ষড়যন্ত্র আছে যে ব্যাপারটা আসলে তাই-ই। কিন্তু তা নয়। অবশ্যই প্রত্যেক বিপ্লবে তার সব শক্তিকে একত্রিত করতে হয়। উন্নয়ন ছাড়া কোন বিপ্লব টিকতে পারে না। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এই যে গোলমাল চলে, পুজিতন্ত্র থেকে যে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয় সে সময়টাতে সমাজের সকল স্তর থেকে সাহায্য জরুরী। লেখক, পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবি, শিল্পী সবার কাছ থেকেই সাহায্য নিতে হয় তা না হলে বিপ্লব টেকেনা। আমেরকািন বিপ্লব নিয়ে ভাবুন বা ষ্পেনের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে খেয়াল করুন। আমেরিকাতে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যদি লেখকরা নিজেদেরকে ব্রিটিশ রাজের প্রজা হিসেবে মনে করতো অথবা যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজকে আবার ক্ষমতায় বসানোর ইচ্ছে করতো তাহলে কেমন হতো বা ষ্পেনের সাবেক উপনিবেশ দেশগুলোতে ষ্পেনের রাজাকে সমর্থন করতো?

কোন লেখক বা শিল্পী যদি ঔপনিবেশিকতার সমর্থন করতো তাহলে তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া হতো। এই বিচারেই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তনের যথার্থতা রয়েছে। আসলে একেবারে শূণ্য থেকে একটা সমাজ নির্মাণ করতে গেলে (যেটা এর আগে দেখা যায়নি), পুজিবাদ বা ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে গেলে তো দেশের সব শক্তিকেই সংহত করতে হয়। এক্ষেত্রে তো দেশের লেখক-বুদ্ধিজীবিদেরও সহায়তা লাগে। এই প্রক্রিয়াটা তো সংঘাতের সৃষ্টি করবেই। এটা তো একেবারে মানবিক ও রাজনৈতিক চরিত্র। কিন্তু আমি আশা করি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতান্ত্রিক সমাজে স্থিরতা আসবে এবং লেখকদেরকে সামাজিক সমস্যা নিয়ে কম ভাবতে হবে। এবং তারা নিজেদের আগ্রহের বিষয়ে কাজ করতে পারবে।

প্রশ্ন: তরুণ কবিদেরকে আপনি কি উপদেশ দিবেন?

নেরুদা: ওহ, তরুণ কবিদেরকে কোন উপদেশ দেয়ার নেই! তাদেরকে নিজের পথ নিজেই করে নিতে হবে। তারা তাদের কথা বলতে গেলে অনেক বাঁধা পোহাতে হয়। এই যে এই প্রকাশভঙ্গির বাঁধা, সেটা অতিক্রম করেই তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাদেরকে আমি সে উপদেশ কখনো দেবো না যে তাদের রাজনৈতিক কবিতা দিয়ে শুরু করা উচিত। অন্য যেকোন প্রকারের কবিতার চেয়ে রাজনৈতিক কবিতা অনেক বেশি ইমোশনাল যেমনটা আসলে প্রেমের কবিতা। এর উপর জোরজবরদস্তি চলে না, এটা করলে খুবই জঘন্য ও অগ্রহণযোগ্য কবিতা হিসেবে দাড়ায়।

রাজনৈতিক কবি হয়ে উঠার আগে এটা জরুরী যে সে কবি অন্য সব কবিতার পথ মাড়িয়ে এসেছে। তার দিকে যে নিন্দার ঢালি যখন ছুড়ে মারা হবে তার জন্যও রাজনৈতিক কবিকে প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজনৈতিক কবিতাকে বিষয়বস্তু ও সারবিচারে এমন হতে হবে যেটা বুদ্ধিবৃত্তিক বা আবেগীয় দিক থেকে সমৃদ্ধ থাকবে। এটা সবকিছুকে তাচ্ছিল্য করার মত সক্ষম থাকতে হবে। এটা আসলে খুব কম সমযেই অর্জিত হয়।

প্রশ্নকর্তা: আপনি প্রায়ই বলেছেন যে আপনি মৌলিকতায় বিশ্বাসী নন।

নেরুদা: মৌলিকতার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো তো একটি আধুনিক শর্ত। আমাদের সময়ে লেখকরা নিজের দিকে মনোযোগ নিয়ে আসার চেষ্টায় থাকেন। এই ভাসাভাসা ব্যাপারগুলো ব্যক্তিকে আত্মরতিতে মগ্ন করে। প্রত্যেকেই চায় এমন একটি পথে যেতে যেখানে সে একা দাঁড়িয়ে থাকবে। এই নতুন পথে যাওয়ার পেছনে কোন গভীরতা কাজ করে না, আবিষ্কারের আনন্দ কাজ করে না। এটা করা হয় শুধু নিজের বিশেষ বৈচিত্র্য দেখানোর জন্য। সবচেয়ে মৌলিক শিল্পী সময়ের পরিক্রমায়, যুগের পালাবর্তে বিভিন্ন ধাপ পরিবর্তন করে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ তো পিকাসো। যে নিজেকে প্রশিক্ষিত করেছে আফ্রিকার আদিম পেইন্টিং ও স্থাপত্যকলার মাধ্যমে তারপর সে একে একে বিভিন্ন রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে গেল।

প্রশ্ন: আপনার উপর কাদের সাহিত্যিক প্রভাব বেশি?

নেরুদা: লেখকরা সবসময়ই একে অন্যকে প্রভাবিত করে আসছে। আমরা যে শ্বাস নিচ্ছি সে বাতাস যেমন কোন নির্দিষ্ট এলাকায় চিরস্থায়ী নয় লেখকদের প্রভাবের ব্যাপারটিও তেমন। লেখকরা সবসময়ই ঘর পাল্টান!তাকে আসলে তার আসবাবপত্র(লেখার বিষয়) নিয়মিত পরিবর্তন করতে হয়। কিছু কিছু লেখক অবশ্য এতে অস্বস্তি অনুভব করেন। আমার মনে আছে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আমাকে সবসময় আমার কবিতার লাইন পড়ে শুনাতে বলতো। তারপর সে আমার পড়ার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলতো, “থামো থামো! আর পড়ো না, তুমি আমাকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারো!”

প্রশ্ন: নরম্যান মেইলার সম্পর্কে কি বলবেন? আপনিই তো তাকে নিয়ে প্রথম কথা বলেছেন।

নেরুদা: মেইলারের ‘নেংটা ও মরা’ (দ্যি নেকেড এন্ড দ্যি ডেড) প্রকাশ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সেটা মেক্সিকোর একটি বইয়ের দোকানে পেয়েছিলাম। কেউই এটা নিয়ে তেমন জানতো না। এমনকি বই বিক্রেতা বলতে পারেনি সেটা কি নিয়ে ছিল। আমি এটা কিনেছিলাম কারণ আমি একটি ভ্রমণে যাচ্ছিলাম এবং একটি নতুন আমেরিকান নভেল পড়তে চাচ্ছিলাম। আমি মনে করতাম আমেরিকান নভেল ফুরিয়ে গেছে,যেটা শুরু হয়েছিল ড্রেইজারের মাধ্যমে শেষ হয়েছে হেমিংওয়ে, স্টেইনবেক ও ফকনারের মত সাহিত্য পাণ্ডবদের পতনের পর। কিন্তু আমি একজন অসাধারণ লেখককে আবিষ্কার করলাম যার মধ্যে ছিল শাব্দিক সংঘাত (ভারবাল ভায়োলেন্স) লাগানোর যোগ্যতা সাথে অসাধারণ বর্ণনার ক্ষমতা এবং তীতা। বরিস পাস্তারনাকের কবিতা আমার ভালো লাগে কিন্তু ‘নেংটা ও মরা সাথে ‘ডা: জিভাগো কে রাখলে কিছু প্রকৃতির বর্ণনা ছাড়া ‘ডা: জিভাগো একটি বোরিং নভেল।

আমার মনে আছে আমি তখন ‘লেট দ্য রেইল ষ্প্লিটার অ্যাওয়েক কবিতাটি লিখেছিলাম। লিংকনের প্রতিভূকে সামনে রেখে বিশ্ব শান্তির প্রতি উত্সর্গ করে কবিতাটি লেখা হয়েছিল। আমি ওকিনাওয়া এবং জাপানের যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছিলাম। সেখানে নরম্যান মেইলারের প্রসঙ্গ ও উল্লেখ করেছিলাম। আমার কবিতা ইউরোপে পৌছলো এবং অনূদিত হলো। আমার মনে আছে অ্যারাগন(অত্ধমড়হ)আমাকে বলেছিল,‘নরম্যান মেইলার কে সেটা খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল আসল ঘটনা ছিল তাকে কেউই চিনতো না। আমার একটু গর্বের অনুভূতি হয় যে আমিই প্রথম লেখকদের একজন যে মেইলারের লেখার প্রসঙ্গ টেনেছি।

প্রশ্ন: প্রকৃতির উপর আপনার তীব্র টান নিয়ে কি কিছু বলবেন?

নেরুদা: আমার শৈশব থেকেই পাখি, সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুক, বন-বনানী ও বৃক্ষলতার প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে এসেছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি সামুদ্রিক শামুক-ঝিনুকের সন্ধানে। এবং ওগুলোর একটি ভালো সংগ্রহ রয়েছে আমার কাছে। আমি ‘আর্ট অব বার্ডস (পাখিদের শিল্প) নামে একটি বই লিখেছিলাম। আমি ‘প্রাণিজগত ও সমুদ্রকম্প নিয়েও বই লিখেছিলাম। ‘দ্য হারভালিস্ট রোজ আসলে ফুল, পাতা ও শাকসবজিকে উত্সর্গীকৃত

প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে আমি বাঁচতে পারতাম না। কয়েকদিনের জন্য আমি হোটেল পছন্দ করি, বিমান পছন্দ করি এক ঘন্টার জন্য। কিন্তু আমি বনের মধ্যে, গাছপালার সাথে, সাগরের বালু বা পাল তোলা জাহাজের সাথে অনেক সুখি থাকি। আমি আসলে আগুন, মাটি, পানি ও বাতাসের সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকতে চাই।

প্রশ্ন: আপনার কবিতায় কিছু কিছু থিম বারবার ফিরে আসে এবং এগুলো সাগর, মাছ অথবা পাখির আকার নিয়ে থাকে। . . .

নেরুদা: আমি কোন প্রতীকে (সিম্বল) বিশ্বাস করি না। এগুলো শুধু বস্তুগত জিনসপাতিই। সাগর, মাছ, পাখি এগুলো বস্তুগতভাবেই আমার কাছে অস্তিত্বশীল। দিনের আলোকে আমি যেভাবে নিয়ে থাকি সেগুলোকেও আমি একইভাবে নিয়ে থাকি। ব্যাপারটা হচ্ছে আমার কবিতায় কিছু থিম বিশেষভাবে আবির্ভূত হয়। ওই থিমগুলো সবসময়ই বস্তুগত উপস্থিতি হিসেবেই দাড়ায়।

প্রশ্ন: কবুতর এবং গিটার কি বুঝাচ্ছে?

নেরুদা: কবুতর কবুতরকেই বুঝাচ্ছে আর গিটার বলতে একটি গানের যন্ত্রকেই বুঝাচ্ছে।

প্রশ্ন: তাহলে আপনাকে যারা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছে তারা—

নেরুদা: আমি যখন একটা কবুতর দেখি সেটা কবুতর হিসেবেই দেখি। এখন কবুতরটা উপস্থিত থাকুক আর না থাকুক সেটার একটি অস্তিত্ব, একটা আকার আমার কাছে রয়েছে। সেটা সাবজেকটিভ আর অবজেকটিভ যা-ই হোক না কেন এটা কবুতরের বাইরে চলে যায় না।

প্রশ্নকর্তা: আপনি আপনার ‘দুনিয়ায় বসত’ (রেসিডেন্স অন আর্থ) এর কবিতাগুলো নিয়ে বলেছেন যে,“এগুলো একজনকে বাঁচার জন্য সাহায্য করেনা, এগুলো একজনকে মরতে সাহায্য করে

নেরুদা: আমার ‘দুনিয়ায় বসত বইটি আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও বিপজ্জনক সময়কালটা নিয়ে লেখা। এর থেকে যেন বের হওয়ার উপায় ছিলনা। আমাকে প্রায় পুনর্জন্ম নিয়েই এর থেকে বের হতে হয়েছিল। ষ্পেনের গৃহযুদ্ধের কারণে আমার মধ্যে যে হতাশা কাজ করছিল তার গভীরতা জানা ছিল না। অবস্থা এমন ছিল যে আমাকে নড়েচড়ে বসতে হয়েছিল, ভাবিয়ে দিয়েছিলো। একসময় আমি এটা বলেছিলাম যে আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তাহলে আমি এই বইটা পড়তে দিতাম না এবং এটা পুনরায় প্রিন্ট হতে দিতাম না। এখানে জীবনকে একটি যন্ত্রণাক্লিষ্ট বোঝা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি প্রাণঘাতী নির্যাতন হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমি সেটাও জানি যে এটা আমার সেরা বইয়ের একটি কারণ সেখানে আমার মানসিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। তারপরও কেউ যখন কবিতা লিখে তার ভাবা উচিত সেটা কোথায় গিয়ে পৌছে, এটা অন্যদের ব্যাপারে কতটুকু সত্য জানি না। রবার্ট ফ্রস্ট তার একটি প্রবন্ধে বলেছিল যে কবিতায় শুধু দুঃখের কথাই বলা উচিত: “দুঃখকে কবিতার জন্য রেখে দাও

কিন্তু আমি জানি না রবার্ট ফ্রস্টের কেমন লাগতো যদি যদি কোন তরুণ তার বই পড়ে আত্মহত্যা করতো এবং দেখা যেতো বইটি রক্তে রঞ্জিত। আমার সাথে এমন একটা ঘটনাই ঘটেছে। আমার এই দেশে একটা তাজা ছেলে আত্মহত্যা করেছে এবং তার পাশে ছিল আমার বই। তার মৃত্যুর জন্য আমি নিজেকে পুরোপুরি দায়ী মনে করিনা। কিন্তু কবিতার পৃষ্ঠা তো রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, তাই না? এ ব্যাপারটা তো শুধু একজন কবিকেই ভাবিয়ে তুলেনা সব কবিকেই তো ভাবিয়ে তুলে। অবশ্যই আমার বিরোধিরা এর সুযোগ গ্রহণ করেছে। তারা তো আমার সবকিছুকেই গালাগালি করে। আমার বইয়ের বিরুদ্ধে আমার কথাকে নিয়ে তারা রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। তারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে আমি নাকি শুধু সুখী কবিতা, আশাবাদী কবিতা লিখতে চাই।

তারা ওই ঘটনাটি জানতো না। আমি কখনো নি:সঙ্গতা, বেদনা, বিষাদের অনুভূতিকে অস্বীকার করি নাই। কিন্তু আমি টোন পাল্টাতে পছন্দ করি। যাতে সব শব্দ পাই, সব রং পাই, এবং আমি জীবনের সব শক্তিগুলোকে খুঁজি সেগুলো যেখানেই থাকুক-হউক না ধবংসে বা সৃষ্টিতে।

আমার কবিতা আমার জীবনের মতই বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এসেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন নির্জন প্রান্তে আমি আাামার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছি। আমি বিশাল এই মানবগোষ্ঠির অংশ হওয়ার জন্য বেড়িয়ে পড়েছিলাম। এর মাধ্যমেই আমার জীবন পরিপক্ব ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত শতকের কবিদের সিলসিলাই এটা ছিল যে তারা ছিল বেদনার্ত নি:সঙ্গতাবাদী।

কিন্তু তারাও কবি হতে পারবে যারা জীবনকে জেনেছে, এর সমস্যাকে জেনেছে এবং এর স্রোত পার হয়ে বেঁচেছিল। এবং যারা দুঃখ থেকে প্রাপ্তির পথে এগিয়েছে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন