মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ


Photo Courtesy: UNB

– আসলাম হাফিজ*

মাদকের বিস্তার ও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ১৯৯০ সালে প্রণীত হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন। এই আইনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেটি সারা দেশে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে কাজ করে থাকে। একই সঙ্গে এই আইনের মাধ্যমে জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, পদাধিকারবলে যার চেয়ারম্যান হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাজ করে থাকেন।

আইনের ৯ ধারা মোতাবেক অ্যালকোহল ছাড়া অন্যসব ধরনের মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘অ্যালকোহল’ বলতে আইনে বোঝানো হয়েছে স্পিরিট, মদ, ওয়াইন, বিয়ার বা ০.৫% এর বেশি অ্যালকোহলযুক্ত যে কোনো ধরনের তরলকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে অ্যালকোহলের উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রিত বিলি-বণ্টন আইনত বৈধ। তবে এ ছাড়া অন্যান্য মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, মজুদ, বিক্রি কিংবা বিলিবণ্টন আইনে নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন চিকিৎসার কাজে) সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে যেকোনো মাদক উৎপাদন, পরিবহন বা বিলিবণ্টন করা যেতে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রথম তফসিলে মাদকদ্রব্যগুলোকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে- ‘ক’ শ্রেণির মাদকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে পেথিডিন, মরফেন, হেরোইন, কোকেন, মেথাডন, অপিয়াম, ক্যানাবিস রেসিন প্রভৃতি। আর ‘খ’ শ্রেণির মাদকের তালিকায় আছে ইয়াবা, গাঁজা, ভেষজ ক্যানাবিস, ক্যানাবিস গাছ প্রভৃতি আর ‘গ’ শ্রেণির মাদকের মধ্যে রয়েছে তাঁড়ি, পঁচুই, ডিনেচারড স্পিরিট ইত্যাদি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৯ ধারা লঙ্ঘন করে কেউ যদি মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, মজুদ, বিপণন, বিলিবণ্টন, বহন করে তাহলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ।

‘ক’ শ্রেণির মাদকের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মাদকসহ কেউ ধরা পড়লে লঘুতর সাজা এবং সেই নির্দিষ্ট পরিমাণের চাইতে বেশি মাদকসহ ধৃত হলে কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে। পেথিডিন/ মরফেনের ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ১০ গ্রাম, হেরোইন/ কোকেনের ক্ষেত্রে ২৫ গ্রাম, মেথাডনের ক্ষেত্রে ৫০ গ্রাম এবং অপিয়াম/ ক্যানাবিস রেসিনের ক্ষেত্রে ২ কেজি। কারও কাছে এই পরিমাণের চাইতে কম মাদক পাওয়া গেলে তার সাজা ২ থেকে ১০ বছরের কারাণ্ড ও অর্থদণ্ড। এই পরিমাণের চেয়ে বেশি মাদকসহ কেউ ধৃত হলে তার সাজা মৃত্যুদণ্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও একই সঙ্গে অর্থদণ্ড।

‘খ’ শ্রেণির মাদকের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত মাদকসহ কেউ ধরা পড়লে লঘুতর সাজা এবং সেই নির্দিষ্ট পরিমাণের চাইতে বেশি মাদকসহ ধৃত হলে কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে। ইয়াবার ক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ ৫ গ্রাম, গাঁজা/ ভেষজ ক্যানাবিসের ক্ষেত্রে ৫ কেজি এবং ক্যানাবিস গাছের ক্ষেত্রে ২৫টি। কারও কাছে এই পরিমাণের চেয়ে কম মাদক পাওয়া গেলে তার সাজা ৬ মাস থেকে থেকে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। এই পরিমাণের চেয়ে বেশি মাদকসহ কেউ ধৃত হলে তার সাজা ৩ বছর থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড ও একই সঙ্গে অর্থদণ্ড। তবে ইয়াবার ক্ষেত্রে সাজার পরিমাণ ৫ বছর থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

এ আইনের অধীনে বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণের দায় রাষ্ট্রপক্ষের ওপর দেয়া হয়নি। ৩০ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মাদকসহ ধরা পড়বেন, আইন প্রাথমিকভাবে ধরে নেবে যে তিনিই দোষী। ধৃত ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি নির্দোষ সেক্ষেত্রে তিনি ছাড়া পেতে পারেন। উল্লেখ্য, ফেন্সিডিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৮২ এর ৮(২)(গ) ধারা অনুসারে। ফেন্সিডিল ব্যবহার, বিক্রয়, আমদানি বা মজুদ করলে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড হতে পারে।

যাদের ক্ষেত্রে মাদকের বিধান শিথিল

এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মাদকের বিধানে কিছুটা শিথিল। যেমন আইনের ১০(৪) ধারা মতে, বিদেশি নাগরিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারে অ্যালকোহল পান করতে পারে, ১০(৫) ধারা মতে, কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী আমদানি রপ্তানি করতে পারে। আবার মুচি, মেথর, ডোম, কুলি ও উপজাতির লোকজন তাঁড়ি পঁচুই পানে অনুমতিপ্রাপ্ত। এসব স্থানীয় মাদক উৎপাদন বা গ্রহণের কারণে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। ১০(১) ধারা মতে, অ্যালকোহল পানে পারমিট লাগবে। চিকিৎসার প্রয়োজনে কোনো মুসলিম ব্যক্তির প্রয়োজন পড়লে সিভিল সার্জন অথবা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন সহযোগী অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অ্যালকোহল গ্রহণ করতে পারে।

ইয়াবার সাজা অপর্যাপ্ত

বাংলাদেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য ও এর শাস্তির যে তফসিল রয়েছে এতে ইয়াবার কথা উল্লেখ নেই। তবে এমফিটামিন নামক মাদকের উল্লেখ আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবা বড়ির মধ্যে রয়েছে নেথএমফিটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। ইয়াবার মধ্যে এমফিটামিন থাকায় সেটি মাদকদ্রব্য হিসেবে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য।

১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১) ধারায় হেরোইন, কোকেন ও কোকার শ্রেণির মাদকের কথা বলা হয়েছে। ১৯(১)-এর ১(ক) ধারায় এসব মাদকদ্রব্য বহন, পাচার ও দখলের শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব মাদকদ্রব্যের পরিমাণ ২৫ গ্রাম পর্যন্ত কারও কাছে পাওয়া গেলে বা কারও নিয়ন্ত্রণে বা দখলে পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড আর সর্বনিম্ন দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। ২৫ গ্রামের ওপরে পাওয়া গেলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

একই আইনের ১৯(৯)-এর ৯(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ফেনসাইক্লিআইন, মেথাকোয়ালন এলএসডি, বারবিরেটস, এমফিটামিন অথবা এগুলোর যে কোনোটি দ্বারা তৈরি মাদকদব্য কারও কাছে পাঁচ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া যাবে। ১৯(১)-এর ৯(খ) ধারায় পাঁচ গ্রামের বেশি পরিমাণ পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর ও সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া যাবে।

ইয়াবা এমফিটামিনের মিশ্রণে তৈরি বিধায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ও ৯(খ) ধারার অধীনে বিচার্য। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যত পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হোক না কেন এর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভয়াবহ নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ইয়াবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও মারাত্মক। অথচ মাত্র ২৫ গ্রামের ওপরে হেরোইন পাচার বা দখলে রাখার সর্বোচ্চ শাস্তি যেখানে মৃত্যুদণ্ড, সেখানে কোটি কোটি পিস ইয়াবা বহন, চোরাচালান বা দখলে রাখার শাস্তি সর্বোচ্চ ১৫ বছর কারাদণ্ড।

অপরাধ-বিশেষজ্ঞ ও আইন-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনে দুটি ভয়াবহ মাদকদ্রব্য বহন, উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণ ও দখলের শাস্তির এই ফারাকের কারণেই দেশে ইয়াবার প্রসার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। হেরোইনের চেয়ে এখন ইয়াবা চোরাচালানের দিকে ঝুঁকছে মাদক ব্যবসায়ীরা। ইয়াবা দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রাখার শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত করলে যত্রতত্র ইয়াবা পাওয়া যেত না।

যুক্তরাজ্যের ড্রাগ ইনফরমেশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা ট্যাবলেট খেলে সাময়িক উদ্দীপনা বেড়ে যায়। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মরণনেশা হেরোইনের চেয়েও ভয়াবহ। ইয়াবা গ্রহণের ফলে ফুসফুস, বৃক্ক ছাড়াও অনিয়মিত ও দ্রুতগতির হৃদস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা দেয়। ইয়াবা সেবনে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়, স্মরণশক্তি কমে যায়। সিজোফ্রেনিয়া বা মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ বাড়ে, ফলে মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে যায়। অপরাধপ্রবণতাও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়।

আবার ইয়াবার সংস্পর্শ থেকে সরে এলে হঠাৎ পাগল হয়ে যায় সেবনকারীরা। ইয়াবা সেবনকারীরা হেরোইন, কোকেনের মতো ভয়াবহ মাদক সেবনে যেসব প্রতিক্রিয়া হয়, সে রকম প্রতিক্রিয়ায় ভোগে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন।

 

*লেখক বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন