, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১; ৯:৫৭ অপরাহ্ণ


ফটো কার্টেসি: ইউটিউব

সম্প্রতি সরকারী সিদ্ধান্তে বদলে দেওয়া হলো পাঁচটি জেলার ইংরেজি নাম এবং সেবাবদে নামের বানান। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল ও বগুড়ার ইংরেজি বানান যথাক্রমে করা হলো Chattogram, Cumilla, Jashore, Barishal এবং Bogura।

এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অনুকরণে বি-উপনিবেশীকরণের চেষ্টা হিসেবে দেখছে এই উদ্যোগকে অনেকে, আবার বানানে হিন্দীরীতি মেনে চলারও অভিযোগ পাওয়া গেছে “বাংলাদেশের জেলার নামের হিন্দি-বিকৃতি রুখে দাঁড়ান!” নামক একটি লেখায়। লেখাটির রচয়িতা জনাব মাসুদ রানা। জেলাগুলোর নামের বানান কী হওয়া উচিত, কিংবা মাসুদ রানার প্রস্তাব বাংলা বানান রীতি সম্মত কিনা সে কথায় আসার আগে আমি এই নামের বানান সংশোধন প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্লেন কুলথার্ড বলেন, “ম্যাটেরিয়াল কন্ডিশনে পরিবর্তন না এনে ডিকলোনাইজেশন হলো আসলে লিবারাল পলিটিক্স যা কলোনাইজারদেরকেই সার্ভ করে।”

আমি তার সঙ্গে একমত। তাই পাবলিকের পয়সা ব্যয় করে এই রকম বানান পরিবর্তন করা আমি তখনই ভালো চোখে দেখি যখন সেই রকম পাবলিক ডিমান্ড থাকে। নাইলে এটা স্রেফ আই ওয়াশ মনে হয়।আবার, মাসুদ রানা প্রস্তাবিত বানানে হিন্দিকরণের গন্ধ পাচ্ছেন। তার অর্থ এক উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আরেক উপনিবেশে যাওয়া। তার স্পিরিটকে সম্মান করি, কিন্তু টেকনিক্যাল বিষয় তিনি উৎরাতে পারেন নাই তার লেখায়। যেমন, তিনি লিখেছেন, “বাংলার প্রতিটি ব্যঞ্জন ধ্বনি শেষ হয় ‘অ’ দিয়ে”। তিনি ধ্বনি আর বর্ণ-তে গোল পাকিয়েছেন। আসল ব্যাপার হলো বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণ ‘অ’ ধ্বনির সহযোগে উচ্চারণ করা হয় প্রথাগতভাবে, এটা ঐ বর্ণের নাম হিসেবেও কাজ করে। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, মানে শব্দের বানানে ঐ ব্যঞ্জনবর্ণ শব্দের উচ্চারণ অনুসারে কোথাও একটি সিলেবল নির্দেশ করে (যেমন, ক্‌+অ কিংবা ক্‌+ও), আবার কোথাও একটি ব্যঞ্জন ধ্বনি নির্দেশ করে, যেমন ক্‌। এই তিনের উদাহরণ একশব্দে দেয়া যায়, যেমন, কলম = ক্‌+অ+ল্‌+ও+ম্‌।

মনে রাখার বিষয়, এটা আসলে শব্দের উচ্চারণের উপর নির্ভর করে, বর্ণের উপর নয়। যাহোক, বাংলা বানানরীতি মেনে নাম পরিবর্তনও সব সময় সমর্থন পায় না যদি না, যা আগেই বলেছি, জনদাবী থাকে। কেননা, পরিশেষে এ বাবদে খরচ হবে জনগণেরই টাকা। তবে, এটা ঠিক যে, বাংলা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলা প্রতিবর্ণিকরণ রীতি প্রমিত করার দরকার আছে।

রাজনৈতিক দাবীর সাপেক্ষে পদক্ষেপ নিতে গেলে যাতে বাংলা বানানরীতি ঘনিষ্ঠ প্রতিবর্ণিকরণ সমাধা করা যায়, সে কারণেও প্রতিবর্ণিকরণ রীতি তৈরি থাকা চাই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই জেলাগুলির নামের ইংরেজি প্রতিবর্ণিকরণের বিষয় আসা যাক।

এখানে সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপার আছে। আমরা আমাদের শব্দে অ, আ ধ্বনি নির্দেশ করার জন্য ইংরেজি a ব্যবহার করি। যেমন, Banani, Ramna ইত্যাদি। এখন আমাদের শব্দস্থিত ও ধ্বনি নির্দেশ করতেও a লিখবো কি না? নাকি o লিখব? সাম্প্রতিক প্রস্তাবে দেখা যাচ্ছে জেলার নামের ও ধ্বনি নির্দেশ করতেও a লেখা সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা বরিশাল, বগুড়া যাদের ব -এর উচ্চারণ প্রমিতে ব্‌+ও (ব্‌+অ নয়)। এখন যদি বাংলা শব্দে অ আ ধ্বনি নির্দেশ করতে ইংরেজি a রেখে দিয়ে, ও ধ্বনি নির্দেশ করতে ইংরেজি o লেখার সিদ্ধান্ত হয় তাহলে নামগুলো হবে, borishal, bogura, এবং cattogram যেটা বগুড়ার ক্ষেত্রে হয়েছে।

লক্ষণীয় যে, চট্টগ্রাম -এর চ উচ্চারণ চ+অ, দ্বিতীয় ট -এর উচ্চারণ ট+ও, তাই বানান হবে cattogram। আবার বলা যাক, বিষয়টি শব্দের উচ্চারণের ভিত্তিতে নির্ধারিত, বর্ণের উচ্চারণের ভিত্তিতে নয়, যদি বর্ণের ভিত্তিতে হয়, যেমনটা মাসুদ সাহেব বলেছেন, তার কথা মত যদি, অ এবং ও ধ্বনি দুটো নির্দেশ করতে ইংরেজি o লেখা সাব্যস্ত হয় তাহলে, bonani, romna লিখতে হয়, যা খটকার বিষয়।

এই বিবেচনায়, বিকল্প হলো, জনদাবী না থাকলে এসব আজারে ব্যয় এড়িয়ে যাওয়া। আর যদি জনদাবী থাকে তাহলে বাংলা শব্দের উচ্চারণের ভিত্তিতে ইংরেজি প্রতিবর্ণিকরণ করা যেতে পারে। উচিত হবে, যেহেতু অ আ স্বরের জন্য প্রথাগতভাবে a লিখে আসছি আমরা সেটায় হাত না দেয়া। তারপর ও স্বর কে a না o দিয়ে লিখবো তা ঠিক করা। আমার পরামর্শ ও এর জন্য o লেখা। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার, এটা প্রমিত বাংলার উচ্চারণকে ভিত্তি করে বলা, প্রতিবর্ণিকরণের প্রমিত রীতি তৈরি করার জন্য।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন