বুধবার, ১৫ জুন ২০২১; ১০:৩৩ অপরাহ্ণ


 

কিছুদিন আগে এক বন্ধু রিসার্চ পেপারের অথরশিপ নিয়ে কিছু লিখতে অনুরোধ করেছিলেন। রাজি হয়েও ভুলে গিয়েছিলাম। আজকে একটা কাজ করতে গিয়ে গত মাসের একটি প্রেজেন্টেশন দেখছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের Centre for Excellence in Teaching & Learning (CETL) রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষকদের জন্য কয়েক দিনের একটি ওয়ার্কশপ আয়োজন করে। সেখানে Best practices in teaching এবং Research integrity নামে দুটো সেশন ছিল। আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে কিছু বলতে হয়েছিল। দ্বিতীয় সেশনটিতে রিসার্চ পেপারের অথরশিপ নিয়ে যা বলছিলাম তার সারমর্ম দাঁড়ায় অনেকটা নিম্মরূপ।

আজকাল সিঙ্গেল অথর পেপার আর দেখা যায় না বললেই চলে। হাই-এনার্জি ফিজিক্সে কোন কোন পেপারে অথরের সংখ্যা শতের উপরে। কৃতিত্ব সবসময় অথরের সংখ্যার উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে কাজের মানের উপর। কাজের মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় সাইটেশনের সংখ্যার উপর। কিছুটা জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের উপরেও। এখানেও অনেক কথা আছে।

নেগেটিভ সাইটেশন অথবা অপ্রাসঙ্গিক সেলফ-সাইটেশন গণনায় আসে না। অত্যন্ত উঁচু ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালে এমন অনেক পেপার প্রকাশিত হয় যা দশ বছরে পাঁচবারও সাইটেড হয় না। এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন কাজের রিসার্চ নয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে এখনকার রিসার্চ পেপারগুলোর গড় অথর সংখ্যা পাঁচের কাছাকাছি। একাধিক অথর যেখানে সেখানেই অথর অর্ডার বা ক্রমের বিষয়টি চলে আসে। কার নাম আগে আসবে, কার নাম পরে। বিজ্ঞানের অল্প কিছু শাখায় অথর ক্রমের ব্যাপারটি অ্যালফাবেটিক্যাল। এখানে ঝামেলা কম। নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ক্রম ঠিক করা হয়। কোন কোন জার্নালে আবার প্রবন্ধের শেষে অথররা কে কোন বিষয়ে কতটুকু কন্ট্রিবিউট করেছে তা উল্লেখ করে দিতে হয়। তবে এই ধারাগুলো এখনও ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ জার্নালে অথরদের নিজেদেরই ঠিক করতে হয় কার নাম আগে আসবে, কার নাম পরে।

অথর-লিস্টে দুটো জায়গা বিশেষ মর্যাদার দাবী রাখে – ফার্স্ট অথর এবং করেস্পন্ডিং অথর। রিসার্চ পেপার হচ্ছে একটি রিসার্চ প্রোজেক্টের ফলাফল। প্রোজেক্টে সবচেয়ে বেশি যার অবদান, পরিশ্রম তার নাম প্রথমে আসা উচিৎ। অবদানের ক্রম অনুসারে অন্যান্য অথরের নাম আসতে হবে।

করেস্পন্ডিং অথরের নাম সাধারণত আসে সবার শেষে। প্রজেক্টটি যিনি পরিচালনা করেন, রিসার্চ গ্রুপের যিনি লিডার, পেপার সাবমিশন থেকে শুরু করে রেফারির রিপোর্টের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে যিনি একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেন, তিনি সাধারণত করেস্পন্ডিং অথর হয়ে থাকেন। পেপারটি ভালো হলে কৃতিত্ব বেশিরভাগটা পায় ফার্স্ট অথর এবং করেস্পন্ডিং অথর। পেপারটি খারাপ হলে তার দায় প্রায় পুরোটাই নিতে হয় করেস্পন্ডিং অথরকে। যেই অবস্থানে কৃতিত্বের সুযোগ বেশি, তার জন্য দায়দায়িত্ব নেওয়ার জায়গাটাও বড়। সহজ হিসাব।

ব্যতিক্রম আছে। ফার্স্ট অথর এবং করেস্পন্ডিং অথর একই ব্যক্তি হতে পারেন। যদি তিনি সেই মাত্রায় দায়দায়িত্ব নিতে পারেন। কেমব্রিজে যে কাজ করেছি তার প্রায় প্রত্যেকটিতে আমি একইসাথে ফার্স্ট এবং করেস্পন্ডিং অথর। এথিক্যালি কোন সমস্যা নেই। যত সমস্যা যেন এই দেশে।

এখানে অনেক সময় অথর-লিস্ট দেখে ভড়কে যেতে হয়। এমন নাম দেখি, তাতে সহজেই বুঝতে পারি নামটি অথর-লিস্টে থাকা সঙ্গত হয় নি। গবেষণা বহির্ভূত কোন ইন্টারেস্ট আছে। শুধুমাত্র যারা রিসার্চের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এবং পেপারটি লেখায় অবদান রেখেছেন তাদের নাম অথর-লিস্টে থাকবে। এছাড়াও যদি কোন পর্যায়ে কেউ রিসার্চ প্রোজেক্টের সাথে সংশ্লিষ্ট না থেকে সহযোগিতা করে থাকেন, তার অবদান Acknowledgement–এ উল্লেখ করতে হবে। এটা অবশ্যই করতে হবে। কারো কোন অবদান অস্বীকার করা যাবে না। বেসিক প্রিন্সিপ্যাল খুব সহজ। যার যতটুকু কৃতিত্ব তাকে ততটুকু অবশ্যই দিতে হবে।

CETL-এর ওয়ার্কশপে একটি কথা নবীন কলিগদের বারবার বলেছি – রিসার্চ চ্যারিটি নয়। অথর-লিস্টে দয়া করে কাউকে স্থান দেওয়া যাবে না। লেনদেনের মানসিকতা নিয়ে তো নয়ই। এগুলো হচ্ছে মিসকন্ড্যাক্ট। বাংলাদেশে খুব চালু। সাধারণত ছাত্ররা যখন থিসিস করে, তখন সেই থিসিস থেকে যে গবেষণা প্রবন্ধ লেখা হয় সেখানে ছাত্র হয় ফার্স্ট অথর এবং সুপারভাইজর করেস্পন্ডিং অথর।

কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রকে প্রতিটি ধাপে হাতে ধরে সুপারভাইজরকে কাজ করিয়ে নিতে হয়। এমন অবস্থায় ছাত্রের নাম ফার্স্ট অথর হিসেবে থাকা সঙ্গত নয়। চ্যারিটির ব্যাপার নয়। উপযুক্ত অবদান রেখে জায়গা করে নিতে হবে, এই শিক্ষাটি ছাত্রকে শুরুতেই দিয়ে দেওয়াটা সুপারভাইজারের একটি কাজ।

এর থেকে বেশি যে ঘটনাটি এখানে ঘটে তা হচ্ছে ছাত্রকে কোন একটা প্রোজেক্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে কোন একটি ইন্সটিট্যুশনে পাঠিয়ে দিয়ে সব কিছু ভুলে যাওয়া। ছাত্র বেচারা সেখানকার কারো সাহায্য নিয়ে কোন রকমে কিছু একটা দাড় করায়, লেখে। কোন রকম খোঁজখবর না নিয়ে সুপারভাইজর সাহেব ফার্স্ট/করেস্পন্ডিং অথরশিপসহ পেপার প্রকাশ করেন। এমন ঘটনা ঘটছে। সম্পূর্ণ আনএথিক্যাল। শাস্তি হওয়া উচিত।

অথরশিপের ব্যাপারটি মোটাদাগে আসলে কমনসেন্স। সুবিচার হতে হবে। সচ্ছতা থাকতে হবে। এই দেশে সুবিচার এবং সচ্ছতার অভাব প্রতিটি ক্ষেত্রে। গবেষণার জায়গাটা তাই রেহাই পায় নি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন