, ১৩ জুন ২০২১; ৮:৪১ অপরাহ্ণ


‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে; 
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’

— বেঁচে থাকার এই আকুতি রবীন্দ্রনাথের একার নয়- আমাদের অধিকাংশের। জীবন সুন্দর। কতভাবে বলি- লাইফ ইজ বিউটিফুল। জীবন বাঁচিয়ে রাখা সবার প্রার্থিত। ‘বেঁচে থাকা’ তাই সব রাষ্ট্রে লাভ করেছে আইনি অধিকারের স্বীকৃতি- ‘Right to Life’।

এই অধিকারের মোদ্দাকথা— আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়া যাবেনা (Murder), স্বেচ্ছায় নিজের জীবনও নাশ করার চেষ্টা করা যাবেনা (Attempt to Suicide), এমনকি খুন করা যাবেনা পৃথিবীর আলো অদেখা গর্ভস্থিত মানব ভ্রূণ পর্যন্ত (Abortion)। প্রতিটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

কিন্তু জীবনের অপর পিঠেই যে ‘মৃত্যু’র আলিঙ্গন। জন্ম জীবনের আগমনী বার্তা নিশ্চিত জানান দেয় আগেই, মৃত্যু অমোঘ- সে আসবেই বটে কিন্তু আসার ক্ষণ জানায় না- সে আসে আচমকা, আকস্মিক। মধুসূদন দত্তের ভাষায়—

‘জন্মিলে মরিতে হবে,
অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?’

কিন্তু সকলের তো রবি ঠাকুরের মতো জীবন কে স্বাভাবিক মৃত্যু অব্দি বয়ে নেওয়ার আকুলতা থাকেনা, কবি জীবনানন্দ দাশ এর মতো কেউ কেউ থাকে যাদের সাধ হয় স্বেচ্ছামৃত্যুর, ইচ্ছের ফুঁৎকারে নির্বাপিত করতে চায় নিজেদের জীবন প্রদীপ—

‘ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে 
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ 
মরিবার হল তার সাধ’।

কিন্তু জীবনের অধিকারের বিপরীতে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ, আইন, সমাজ কিংবা ধর্ম স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার (Right to Die) কে সমর্থন বা অনুমোদন দেয়না; বরং তা বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করে। তাই বিপর্যস্ত জীবনের অধিকারী, আশাহীন, হতাশ বেশিরভাগ মানুষ আত্মহত্যা করে সকলের অগোচরে, অজ্ঞাতে, নিভৃতে। যে গুটিকয়েক দেশ মরণের অধিকার কে মেনে নিয়েছে তারাও ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’ কে স্বীকৃতি দিয়েছে ; ‘আত্মহত্যা’ কে নয়।

আত্মহত্যা (Suicide) এবং স্বেচ্ছামৃত্যু (Euthanasia/Mercy Killing/Assisted Suicide) এক নয়; সূক্ষ্ম তফাৎ আছে:

  • আত্মহত্যা সাধারণত স্বেচ্ছায় সংঘটিত হয় কিন্তু স্বেচ্ছামৃত্যু স্বেচ্ছায় হতে পারে আবার পরিবারের ইচ্ছেয় হতে পারে।
  • আত্মহত্যা নিজের হাতে সংঘটিত হয়; স্বেচ্ছামৃত্যু সংঘটিত হয় কিছু প্রক্রিয়া মেনে, চিকিৎসকের হাতে।
  • যে কোন বয়সের যে কেউ যে কোন সময় আত্মহত্যা করতে পারে কিন্তু স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি সবার জন্য দেওয়া হয়না- বয়স্ক, জীবনের আশা নেই- নিরাময় অযোগ্য এমন রোগীর ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ আর রোগী/রোগীর স্বজনদের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিতে পারে।

বিশ্বের চারটি দেশে ইউথেনেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যু চালু রয়েছে: লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়াম। সর্বপ্রথম ২০০৮ সালে লুক্সেমবার্গ স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে আমেরিকার কয়েকটি রাজ্য, জার্মানি ও জাপান সহায়তা নিয়ে আত্মঘাতি হওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।

গত ৯ মার্চ, ২০১৮ ইং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘কমন কজ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় এক ঐতিহাসিক রায়ে মুমূর্ষু কিংবা মৃতপ্রায় ব্যক্তির পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার (প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া) কে স্বীকৃতি দিয়েছে। ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ বিষয়টা আদতে কী?

এটির অর্থ নিরাময় অযোগ্য, মরণাপন্ন রোগীকে সরাসরি কোন বিষাক্ত ইনজেকশন বা প্রত্যক্ষ পদ্ধতি প্রয়োগে মৃত্যু ঘটানো যাবে না (যা একটিভ ইউথেনেশিয়া) কিন্তু রোগী বা তাঁর স্বজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে মেডিকেল বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে শুধু নিরাময় অযোগ্য, কোমায় চলে যাওয়া মুমূর্ষু রোগী যার বেঁচে উঠার সম্ভাবনা নেই তার শরীর থেকে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম খুলে নিয়ে ‘তরান্বিত মৃত্যু’ ঘটানো যাবে।

‘স্বেচ্ছামৃত্যু আইনসিদ্ধ’ – এই ঘোষণা করার আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন: ‘যে মৃত্যু অনিবার্য তা কি সম্মানজনক হওয়াই বাঞ্ছনীয় নয়? স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন- জীবন হল প্রদীপের মতো যা প্রতি মুহূর্তে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থহীন ভাবে বেঁচে থাকা কি সম্মানজনক? মৃত্যুর অন্ধকার সুড়ঙ্গে মাথা উঁচু করে প্রবেশের অধিকার কি থাকতে নেই?’

সুপ্রীম কোর্টের রায়ে বিচারপতিরা সম্মত হন যে, ‘সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু আসলে জীবনেরই অধিকার, এটি সংবিধানে সন্নিবেশিত Right to Life এর সাংঘর্ষিক নয়; বরং সম্পূরক। এই Right to Die এর স্বীকৃতির কারণ তাঁর শারীরিক যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তাঁকে মর্যাদাময় মৃত্যুলাভের সুযোগ দেওয়া, কোনো ব্যক্তির ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাঁকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রেখে সেই অধিকার খর্ব করা যাবে না’।

ইউথেনেশিয়ার পক্ষে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের এই রায়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছে মূলত ২০১১ সালে অরুণা শানবাগ মামলার প্রেক্ষিতে। ধর্ষণের ফলে ৪২ বছর ধরে কোমায় থাকা মুম্বাইয়ের নার্স অরুণার পক্ষে করা স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন সে বছর সুপ্রীম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছিল ঠিক, কিন্তু উষ্কে দিয়েছিল ইউথেনেশিয়ার পক্ষে- বিপক্ষে তীব্র বিতর্ক। সাম্প্রতিক এই রায়ের ফলে হাসপাতালের মরণাপন্ন রোগীরা ইউথেনেশিয়ার সুযোগ পেলেও যারা অন্য কারনে ইচ্ছেমৃত্যু বরণ করতে চান তারা হতাশ হয়েছেন।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে ‘জীবনের অধিকার’ (Right to Life) কে আইনগত বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ‘Right to Die’ বা স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার কিংবা আত্মহত্যার অধিকার- কোনটাকেই স্বীকৃতি দেয়নি। বরং বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩০৯ ধারায় ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

স্বেচ্ছামৃত্যুর আইনি বিধান না থাকলেও ২০১৭ সালে তোফাজ্জেল হোসেন নামে এক ব্যক্তি ‘ডুশিনি মাসকুলার ডিসট্রফি’ নামের এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তাঁর দুই সন্তান ও নাতির মৃত্যুর অনুমতি চেয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন।

রোগের চিকিৎসায় স্থাবর, অস্থাবর প্রায় সব সম্পদই নিঃশেষ হয়ে গেছে, স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনকারী জানতে পেরেছেন এ রোগের কোনও ওষুধ নেই, নেই কোনও চিকিৎসা, পর্যায়ক্রমে পঙ্গুত্ব বরণ আর সবশেষে মৃত্যুই এই রোগের পরিণতি। তাই তাঁর চাওয়া এদের মৃত্যু ঘটানোর অনুমতি দেওয়া হোক। অনুমতি আইনত গ্রাহ্য হয়নি, তাদের ভারতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আত্মহত্যা কিংবা স্বেচ্ছামৃত্যু ধর্ম এবং সমাজও সমর্থন করেনা। এটি ‘মহাপাপ’ হিসেবে পরিগণিত। দেশের জনগণের বিরাট অংশ মনে করেন, স্বেচ্ছামৃত্যু আসলে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে বা সিদ্ধান্তের বিরোধিতার সমতুল্য, এটি নিষিদ্ধ এবং নিন্দনীয়।

সে যা হোক, আত্মহত্যা বা স্বেচ্ছামৃত্যু কিন্তু থেমে নেই। দেশ-কাল-ধর্ম-আইন নির্বিশেষে জীবনের চেয়ে মৃত্যু যাদের কাছে শ্রেয় তাঁরা ইচ্ছা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। সবশেষ জানা গেলো- ১০৪ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী ড. ডেভিড গুডল স্বেচ্ছামৃত্যু কে আলিঙ্গন করতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। গুড়লের দেশ অস্ট্রেলিয়া একটিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেয়না, ড. গুডল অসুস্থ বা মরণাপন্নও নন- তিনি স্রেফ আর বাঁচতে চাইছেন না, তাঁর ভাষ্য- ‘যথেষ্ট হয়েছে, গুড বাই’! গুডলের স্বেচ্ছামৃত্যু কার্যকর হবে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী নিজ মাতৃভূমি থেকে আট হাজার মাইল দূরে সন্তান, নাতনি, বন্ধু ও আরো কিছু পারিবারিক সদস্যদের উপস্থিতিতে এ মাসের ১০ তারিখ।

আমাদের চারপাশের কত কত জন আইন, ধর্ম, সামাজিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইচ্ছা মৃত্যু বরণ করেছে, কবি তাসমিয়া শান্তা’র যেমন জেগেছিল জীবনানন্দের কবিতার মত ‘মরিবার সাধ’, সে লিখলো:

‘দু’হাতে ইচ্ছা মৃত্যুর তাজাফুল নিয়ে,
প্রতিশ্রুতির স্ট্যাম্প পেপারে আমার একটা জীবন
লিখে দিব- মৃত্যুর নামে…’

এবং একদিন সত্যি সত্যি সেও জীবনানন্দের মতোই ডেকে নিল ইচ্ছামৃত্যু!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন