মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০২১; ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ


ফটো: স্যানিটারি ন্যাপকিন

মেয়েদের পিরিয়ড বা মাসিক চলাকালীন নামাজ ও রোজা প্রযোজ্য হয় না। বলা বাহুল্য যে, পিরিয়ড মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সে একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যা আদর্শ ক্ষেত্রে প্রতি আঠাশ দিনে একবার হয়ে থাকে এবং কয়েকদিন ধরে চলে। সুতরাং রোজার মাসে সাধারণত এমন কয়েকটি দিন আসবেই যখন নারীরা রোজা রাখতে পারবেন না। আল্লাহ্ প্রদত্ত এই সাময়িক ছাড় সানন্দচিত্তেই গ্রহণ করার কথা।

কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়েদের মাসিককে ঘিরে এমনই এক অনর্থক লজ্জা জড়িয়ে আছে যে বলার নয়! তাঁর যে পিরিয়ড হয়েছে, সুতরাং রোজা রাখবেন না, এই বাস্তবতাকে আড়াল করতে সংসারে মেয়েরা কত কীই না করেন! দরকার না থাকলেও পরিবারের অন্যদের সাথে শেষ রাতে সেহরি খাওয়া, নামাজের সময় ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে একটু পরে পড়বেন এমন ধারণার সৃষ্টি করা, প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেলেও আড়াল না জোটা পর্যন্ত মুখে পানি না তোলা, সারাদিন মোটামুটি না খেয়েই থাকা অথবা রান্নাঘরে ঢুকে চোরাগুপ্তা কোনরকমে দু-চার গ্রাস খেয়ে নেয়া, কেউ দেখে ফেললে অসুস্থতার গল্প দেয়া ইত্যাদি। আমার ভাগ্য ভালো যে আমাকে কখনও এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। কিন্তু আত্মীয়দের বাসায় দেখেছি যে তরুণী বোনেরা বাপ-ভাইদের সামনে পুরো তিরিশ দিনই ‘রোজা’ রাখছেন! এ কেমন সংস্কৃতি?!

ইসলামের সাথে এর কোনই সম্পর্ক নেই! রাসুলুল্লাহ্-র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময়ে নারীদের মাসিক থেকে শুরু করে সব ধরণের ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা হতো। আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নিজে মাসিক সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। সুতরাং মাসিক নিয়ে আড়ষ্টতা, লুকোছাপা আমাদের নিজস্ব সামাজিক ট্যাবু ছাড়া কিছুই নয়।

এমন না যে, আপনি আপনার রোজাদার বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন বা ছেলে-মেয়ের সামনে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে গরমাগরম চায়ে বিস্কিট ডুবিয়ে চুকচুক করে খাবেন! কিংবা তীব্র গরমে ফ্যানের হাওয়ায় সবার সামনে পা ছড়িয়ে বসে এক গ্লাস বরফ-শীতল লেবুর সরবত ঢকঢক করে গিলবেন! রোজাদারের সামনে আয়োজন করে কিছু না খেয়ে তাঁর রোজার প্রতি সম্মান দেখানো আমাদের আদবের অংশ। নিজের ঘরে অবশ্যই সাধ্যমত আমরা সেই আদব রক্ষা করবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার নিয়ে আমাকে নিরন্তর লুকোচুরি খেলতে হবে।

রোজাদারের রোজার প্রতি আপনি শ্রদ্ধাশীল হবেন, রোজাদারেরাও আপনার পরিস্থিতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে খাবার সময়টায় ডাইনিং রুমে না এলেই পারেন। ব্যস, হয়ে গেল। ধর্মীয় বিধান মেনে যেমন আপনি রোজা রাখছেন, তেমনি ধর্মীয় বিধানের কারণেই কিছু সময় রোজা রাখছেন না; এই সহজ কথাটা মনে রাখা দরকার। সমাজে বিদ্যমান পিরিয়ড-সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতার আবহ ত্যাগ করে আপনার বাবা, ভাই বা ছেলের জন্য (এবং আপনার মেয়ের জন্যও) পিরিয়ডের স্বাভাবিকত্ব অনুধাবনের সংস্কৃতি একমাত্র আপনিই চালু করতে পারেন।

বলা বাহুল্য হলেও বারংবার বলা দরকার যে পিরিয়ড মেয়েদের নির্দিষ্ট বয়সে একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এতে লজ্জা, আড়ষ্টতা বা লুকোছাপার কোন অবকাশ নেই। তাই বলে জনে জনে বলে বেড়াতে হবে, এমন নয়! মলমূত্র ত্যাগ যেমন প্রাইভেট ব্যাপার, পিরিয়ডও তেমন।

কিন্তু আমাদের দেশে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যেখানে এই সুস্থ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অনাবশ্যক লজ্জা ও স্টিগমার মোড়কে মুড়ে শোচনীয় এক মানসিক শৃঙ্খলের সৃষ্টি করা হয়েছে। এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কিছু সংখ্যক আধুনিক তরুণী পিরিয়ডকে ঘিরে যেরকম “in your face” ধরণের ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন, সেটিও বিতর্কিত রূপ লাভ করেছে।

কিশোরী বেলায় আমার যখন প্রথম পিরিয়ড হয়, তখন আমি আমার আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছিলাম। রক্ত দেখে একেবারে confused হয়ে পড়েছিলাম, মাথাটা অবশ অবশ লাগছিল, ভয় পেয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে অনেক যত্ন করে বাসায় মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আম্মা সবকিছু বুঝিয়ে দিলে তবে ধাতস্থ হয়েছিলাম। আমার ছোট বোনের যখন মাসিক প্রথম শুরু হয়, বেচারী ভয় পেয়ে একা ঘরে কাঁদছিল। বড় বোন হিসেবে তখন আমাকেই ওকে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে শান্ত করতে হয়েছিল। আমি নিশ্চিত, আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিটি মেয়েরই কাছাকাছি ধরণের অভিজ্ঞতা আছে। পিরিয়ড সম্পর্কে মেয়েদেরকে আগে থেকে অবহিত না করলে, হঠাৎ রক্ত দেখে তো কিশোরী মনে ভীষণ ভয় জন্মানোরই কথা। এব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে আমার নিজস্ব মতামত তুলে ধরছি।

মেয়ের বয়স নয় বছর পেরোলেই তাকে পিরিয়ড সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন, যাতে সে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে। মেয়েকে জানাতে হবে এটি একটি সুস্থ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। লজ্জা বা ভয়ের কিছু নেই। আপনার কন্যাকে বুঝতে দিন যে তার শরীর স্রষ্টার অসামান্য দান। শরীর নিয়ে বিব্রত বা আড়ষ্ট হওয়ার একেবারে কিচ্ছুটি নেই।

পিরিয়ডের ব্যাপারে সমাজে বিদ্যমান ট্যাবু সম্পর্কে মেয়েকে অবহিত রাখুন, এতে সে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারবে। মেয়েকে প্যাডের সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে। স্কুল-ব্যাগে প্যাড মজুদ রাখা দরকার যেন প্রয়োজনে হাতের কাছে পায়। পিরিয়ড-সংক্রান্ত হাইজিন সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়া খুব জরুরী। নির্দিষ্ট সময় অন্তর (আনুমানিক চার ঘণ্টা) প্যাড বদলানো এবং মোড়কে মুড়িয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবহৃত প্যাড ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কমোডে বা যেখানে-সেখানে ফেলা যাবে না। আমাদের দেশে এটা খুব সমস্যা, কারণ প্রায়শই মেয়েদের টয়লেটে ঝুড়ি বা বিন থাকে না।

কন্যার মাসিকজনিত ব্যথা-বেদনা ও মানসিক টানাপোড়েনে তার পাশে থেকে আদর ও সাহস দিন। কন্যার বাবাকে আপনার ও তার বন্ধু হিসেবে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করুন। আপনার ছেলে থাকলে তাকেও মাসিক সম্পর্কে সুস্থ ধারণা আপনাকে দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নিজের সংসারে সে সাপোর্টিভ স্বামী ও পিতা হতে পারে। পিরিয়ডকালীন মেয়ের স্কুল কামাই দেয়ার প্রবণতা থাকলে বুঝিয়ে নিরুৎসাহিত করতে হবে। আপনার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো তাকে বলতে পারেন, মায়ের গল্প মেয়েকে আশ্বস্ত ও আত্মবিশ্বাসী করবে। সর্বোপরি মা বা বড় বোন হিসেবে মাসিকের ব্যাপারে নিজের সমস্ত আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠুন।

আমরা নিজেরা যদি সক্রিয় হই, তাহলে নিজেদের ঘরে নিজের বোন, ননদ বা মেয়েকে (গৃহকর্মীকেও) সচেতন করে গড়ে তুলতে পারবো। নিজে অপ্রয়োজনীয় সংস্কারমুক্ত হতে পারলে নিজের বাবা, ভাই বা ছেলেকেও পিরিয়ডের স্বাভাবিকত্ব অনুধাবনে সহায়তা করতে সক্ষম হবো নিশ্চয়ই। আমাদের পরিবার-পরিজন আমাদের দুশমন নন, তাঁরা বহুদিনের লালিত সংস্কারের নিগড়ে বন্দী মাত্র। দৃঢ়তার সাথে, কিন্তু মমতার স্পর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে, আমরাই এই জিঞ্জির ছিন্ন করার ক্ষমতা রাখি।

মেয়েদের পিরিয়ড বা মাসিক নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা জারি থাকা দরকার, তবেই সচেতনতা আসবে। তবে সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙ্গার প্রয়াসে “I am having period” লেখা টি-শার্ট পরে বা ব্যবহৃত রক্তাক্ত প্যাডসহ ফেইসবুকে সেলফি পোস্ট করে কতিপয় আধুনিক তরুণী মানুষকে বড়সড় ধাক্কা দিতে সক্ষম হচ্ছেন নির্ঘাত, কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন আনয়নে এই পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা দুর্বল।

বরং এর ফলে মানুষের সাথে শুধু শুধু পরিণতিহীন অনন্ত তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন তাঁরা। সামাজিক ধারণার সংস্কার সাধনের জন্য তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ন্যায্য। কিন্তু তাঁদের প্রতিবাদের ধরণটি উগ্র ও আক্রমণাত্মক। সফল সামাজিক পরিবর্তনের আহবান আসুক প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি থেকে, প্রতিক্রিয়ার আক্রোশ থেকে নয়!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন