শনিবার, ১৮ জুন ২০২১; ২:১৮ অপরাহ্ণ


১৯১৮ সালের ১০ জুন। রমজান মাস। তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রাবস্থায়ই র‌্যাডিক্যাল মানবতাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বামপন্থী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। চল্লিশের দশকে ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ে স্বাধীনতার সপক্ষে গণজাগরণমূলক কবিতা লিখে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণে বিশ্বাসী। তিনি কবি ফররুখ আহমদ।

খানসাহেব সৈয়দ হাতেম আলী ও রওশন আখতারের দ্বিতীয় ছেলে ফররুখ। কলকাতার বালিগঞ্জ হাইস্কুলের মেধাবী ছাত্র ফররুখ ১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ১৯৩৯ সালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজে ১৯৩৯ সালে দর্শন বিষয়ে, পরে ১৯৪১ সালে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএতে ভর্তি হন। কিন্তু নানাবিধ কারণে এখানেই অ্যাকাডেমিক শিার সমাপ্তি ঘটে। ১৯৪৩ সালে আইজি প্রিজন অফিস ও ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাই অফিসে স্বল্পকাল চাকরি ছাড়াও বিভাগ-পূর্বকালে মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

কবি ফররুখ আহমদ জীবনের দীর্ঘ সময় রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা ও বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান প্রযোজক স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসস্বীকৃত একজন অসাধারণ জননন্দিত কবি ফররুখ আহমদ। স্বপ্নরাজ্যের সিন্দবাদ, ঐতিহ্যের কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যাকাশে এক উজ্জ্বল তারকা। অফুরান সৌন্দর্য, উধাও কল্পনা, রূঢ় বাস্তবতা, প্রদীপ্ত আদর্শ, সমুদ্রবিহার, রোমান্টিকতা, প্রেম প্রভৃতি তার কবিতার এক মৌলিক চরিত্র নির্মাণ করেছে। গানের ভুবনেও তার পদচারণা ছিল সর্বত্র। সর্বোপরি শিশুসাহিত্য, নাটক, অনুবাদ সাহিত্যেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।

তার প্রথম ও সেরা কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া সিরাজাম মুনিরা, নৌফেল ও হাতেম, মুহূর্তের কবিতা, হাতেম তায়ী, হে বন্য স্বপ্নেরা, পাখির বাসা, হরফের ছড়া, নতুন লেখা, ছড়ার আসর, চিড়িয়াখানা, কিস্সা কাহিনী, ফুলের জলসা, ফররুখ আহমদের গল্প প্রভৃতি তার অমর সাহিত্যকীর্তি।
সব্যসাচী লেখক ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছিলেন : ‘ফররুখ আহমদ ছিলেন অফুরানভাবে সৃষ্টিশীল। তার সৃষ্টিধারায় কখনো ছেদ বা বিরতি পড়েনি। সব মিলিয়ে তার সাহিত্য-শস্যের পরিমাণ বিরাট’। ফররুখ আহমদ জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর পর্বে দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত হন।

কবির সাহিত্য জীবনের শুরুতে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ফররুখ সম্পর্কে আবু রুশদ লিখেছেন- ‘ফররুখ আহমদ রোমান্টিক কবি, অর্থাৎ তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব-বোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তার কাব্যে সৌন্দর্য্যরে জয়গান অকুণ্ঠ, সুদূরের প্রতি আকর্ষণও তার কাব্যের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবুও তিনি নিঃসন্দেহে আধুনিক। এমনিভাবে প্রখ্যাত অনেক সমালোচক সাহিত্যিক ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকলেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতি তাঁর অকুন্ঠ সমর্থন ছিল। তিনি তখন ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিনামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে লেখনী পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিও তাঁর অনুরূপ সমর্থন ছিল। তিনি ধর্মকে কখনো রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন না। 

ফররুখ আহমদ ‘তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে খোদার মদদ ছাড়া, দূর দিগন্তের ডাক এলো, ঝড়ের ইশারা ওরা জানে, এমনি অসংখ্য গান-কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে বেঁচে থাকবেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি এ ধরনের বৈরিতার শিকার হন। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনে ইন্তেকাল করেন এ মহান কবি।

বাঙালি মুসলিম গর্বিত কবি ফররুখ আহমদের জন্য। বাঙালি কৃষকের সংগ্রামের ইতিহাস সবসময়ই ধর্মাশ্রিত। তিতুমীর, হাজি শরীয়তুল্লাহ, মাওলানা ভাসানী, আবুল হাশীম এবং আবুল মনসুর আহমেদদের-দের রাজনীতি থেকে ফররুখ আহমদকে আলাদা করে দেখা যাবে না। তিনি আধুনিক কবি বটে, কিন্তু কলোনিয়াল কলকাতার ভাষাকে কিভাবে বদলে দিয়ে বাঙালির জন্য নতুন ভাষার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। সংস্কৃত কিম্বা তৎসম শব্দের পাশাপাশি তিনি আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা প্রমাণ করবার জন্য যে ইসলাম স্রেফ তাঁর ধর্ম বিশ্বাস নয়, তাঁর আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও বটে।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন