শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১১:০৬ অপরাহ্ণ


Photo: Bangladesh Women Cricket Team

মেয়েরা ক্রিকেট খেলুক তা বাংলাদেশের ধার্মিক মুসলমান পুরুষ ও তাদের ইসলামপন্থী প্রতিনিধিদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ চায় না। শুধু ক্রিকেট না, ফুটবল বা অন্য কোন খেলা খেলুক তাও চায় না। আসলে নারীরা ঘরের বাইর হউক এইটাই তারা চায় না, বাধ্য হয়ে মেনে নিছে। এখন মাঠে নেমে খেলাধুলা করায় তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। কেউ কেউ আপত্তি জানায়, বাকীরা চুপচাপ থাকে আর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখে, ভাবে – দেখামুনে, ক্ষমতায় গিয়া লই।

ইসলামের ইতিহাস পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, নারী বিদ্বেষ ও পিতৃতান্ত্রিকতা ইসলামে অপরিহার্য নয়। কিন্তু যেহেতু ধর্মটি জন্ম ও বিকাশ লাভ করেছে পিতৃতান্ত্রিক সময় ও সমাজে এবং এর প্রায় নিরানব্বই দশমিক নিরানব্বইভাগ নেতাই ছিলেন পুরুষ, ফলে নারীবিদ্বেষী পুরুষালী মানসিকতা ধর্মটির নিজস্ব নৈতিক ও আইনি ধারণা হিসাবে প্রচার পেয়েছে।

পুরুষালী বিদ্বেষের বিষ থেকে ইসলাম ধর্মকে মুক্ত করার এই কঠিন কাজটি মুসলিম নারীবাদীদের করতে হবে। অনেকেই এই কাজ শুরুও করেছেন। এইদিক থেকে ইবনে রুশদকে প্রথম মুসলিম নারীবাদী বলা যায়। আজ থেকে আটশ বছর আগে তিনি ইসলামের আলোকেই দাবি করে গেছেন যে নারীদের ক্ষমতা আছে পুরুষের মতোই প্রতিটা ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবদান রাখার, এবং তাদেরকে সেই সুযোগ না দিয়ে চলতে অক্ষম উদ্ভিদে পরিণত করার ফলেই একটা সমাজ পিছিয়ে থাকে। হাদিস ঘেটে, উসুল প্রয়োগ করে তিনি দেখিয়েছেন যে ইসলাম নারীদের সমান অধিকারের বিরোধিতা করে না।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যে মুহাম্মদ এবং ঈসা এই দুইজনই তাদের নিজ সময়ের তুলনায় অনেক নারীবাদী লোক ছিলেন। উভয়েই এমন সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন যাতে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।

অন্তত ধর্মের ক্ষেত্রে হলেও নারী ও পুরুষের যে সমতা তাদের আন্দোলনে দেখা যায়, ঐসময়ের হিসাবে তা যথেষ্ট নারীবাদী ছিল। মুহাম্মদকে তার পুরুষ সাহাবীরা বহুবার অনুরোধ করেছে মসজিদে নারীদের সমান অংশগ্রহণ বন্ধ করতে, তিনি তা করেন নাই। মুহাম্মদের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে এই সমান অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্যে। নবীর জীবনতো ছিল নারীময়। বিভিন্নরূপে বিভিন্ন নারীর উপস্থিতি ছিল তার জীবনে, যাদের মাধ্যমে তিনি সমৃদ্ধ হয়েছেন, যাদের প্রতি তিনি সারা জীবন ভালোবাসা ও ভক্তি প্রকাশ করেছেন, এইসব কাহিনী পুরুষ মুসলমানরা বলতে চায় না।

নবী তার জীবনে কোনদিন তার কোন বউয়ের গায়ে হাত তুলেছেন তেমন প্রমাণ নাই, ঝগড়া হলে কথা বলতেন না বড়জোর। তার বউরা যে তার মুখের উপর কথা বলতেন ঢের প্রমাণ আছে। উম্মে সালামা একবার বললেন, আপনার আল্লাহ খালি পুরুষের জন্যে আয়াত পাঠায়, এরপর তিনি ‘মুসলিম নারী ও পুরুষ’ দিয়ে শুরু করা একগাদা আয়াত হাজির করলেন। নবীর সময় ও সমাজ যদি এতোটা পুরুষতান্ত্রিক না হতো, তাইলে হয়তো কোরান আরো নারীময় হইতো।

সুরা ‘আত-তাকবীর’ আমার মতে কোরানের সবচাইতে কাব্যিক সূরাগুলার একটি। সূরাটিতে কেয়ামত ও শেষ বিচারের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই সুরাতেই আছে সেই বিখ্যাত আয়াত – এবং যখন জীবন্ত কবর হওয়া কন্যা শিশুকে জিজ্ঞাস করা হবে, কোন পাপে তোমাকে হত্যা করা হয়েছিল।

কেয়ামত ও শেষ বিচারের দিন নিয়ে অনেক কাব্যিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বর্ণনা থাকলেও আলাদাভাবে শেষ বিচারের এই একটা মামলার কথাই সূরাটিতে উল্লেখ আছে। কন্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেয়ার ঘটনার মধ্যেই যে নবী তার সময়ের চূড়ান্ত অবিচারের রূপ দেখতে পেয়েছিলেন, এই ধরণের ঘটনায় কতোটা আপ্লুত ছিলেন তা এই আয়াত থেকে বুঝা যায়। তিনি এখনকার দিনে বাংলাদেশের মানুষ হইলে হয়তো কোরানের আয়াত থাকতে পারতো – যখন তনুকে জিজ্ঞাস করা হবে। এমন কী, ক্রিকেট খেলতে চাইছে কিন্তু পারে নাই এমন কোন মেয়েকে কোন পাপে ক্রিকেট খেলতে দেয়া হয় নাই সেই ধরণের প্রশ্নের আয়াতও থাকতে পারতো।

আমার ধারণা মুহাম্মদ এই আমলে জন্ম নিলে খুবি র‍্যাডিকাল ধরণের নারীবাদী হইতেন। হেফাজতে ইসলাম তাকে মুরতাদ ঘোষণা করতো, যেমন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মদকে ‘খালি’ ঘোষণা করেছিল।

বাংলাদেশের নারীবিদ্বেষী মুসলমান পুরুষ ও তাদের ইসলামপন্থী প্রতিনিধিরা, যাদের ইসলামপন্থী আন্দোলনের অর্ধেকই হইল নারী বিদ্বেষ, এদেরকে আমার মক্কার কুরাইশ জাহেলদের মতোই মনে হয়। এরা টিকায়া রাখতে চায় পুরাতন অবিচার ও জুলুম। মজলুমের সংগ্রামকে এরা বুঝতে পারে না, আত্মস্থও করতে পারে না, উলটা তার বিরোধিতা করে। হিলফুল ফুজুল থেকে শুরু করে মুহাম্মদের একত্ববাদী আন্দোলন আরবের মরুভুমিতে যে বৈপ্লবিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ হিসাবে হাজির হয়েছিল, ক্ষুদ্র স্বার্থের কারনে সেই বৃহত আন্দোলনের অংশ হতে তারা অপারগ ছিল। শেষে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মানতে বাধ্য হয়েছিল।

এখন যে মুসলমান পুরুষ ও তাদের ইসলামপন্থী প্রতিনিধিরা নারীদের স্বাধীনতা ও উন্নয়নকে মানতে পারে না, ইসলামের নামে তাদের নারী বিদ্বেষ উগরে দেন যত্রতত্র, তাদের এখনো সময় আছে বিদ্বেষ সরিয়ে রেখে ইসলাম নিয়ে কথা বলার। নয়তো মজলুমের আল্লাহ ইসলাম নিয়ে কথা বলার জন্যে তাদের জায়গায় অন্য লোকেদের স্থাপন করবেন।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন