শনিবার, ২ জানুয়ারি ২০২১; ১২:২১ পূর্বাহ্ণ


গ্রীক রূপকথার ট্রয় নগরের রাজপুত্র টিথোনাস যখন দেবী অরোরার প্রেমে পড়ে তখন তাকে উপহার হিসেবে দেয়া হয় ‘অমরত্ব’। একসময় প্রেমিকা অরোরা মারা যায়, অন্যদিকে টিথোনাসের যৌবন যায় ফুরিয়ে, বার্ধক্য তাকে গ্রাস করে। সে প্রার্থনা করতে থাকে মৃত্যুর জন্য কিন্তু দেবতার উপহার তো ফিরিয়ে নেয়ার উপায় নেই। টিথোনাসের মৃত্যু হয় না কিন্তু সে একজন অচল, উপেক্ষিত, অপ্রয়োজনীয় ও অসহায় মানুষে পরিণত হয়। দেবতার উপহার যেন হয়ে পড়ে অভিশাপ!

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে প্রবীণ মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভাঙছে যৌথ পরিবার, কমছে পরিবারের বয়োবৃদ্ধদের কদর ও মর্যাদা, উপেক্ষিত হচ্ছে সন্তানদের কাছ থেকে পিতা-মাতার প্রয়োজনীয় সেবা ও ভালোবাসা প্রাপ্তি। এই নাগরিক বিছিন্নতা, উপেক্ষা আর আত্মসর্বস্ব জীবনে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা যেন আধুনিক কালের টিথোনাসের বাস্তবরূপ! যারা পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্য এবং বৃদ্ধ বাবা- মা কে অবহেলা করে, অশ্রদ্ধা করে, বোঝা মনে করে- তাঁরা কি এটা বুঝেনা যে একদিন তাঁদেরও টিথোনাসের মতোই বার্ধক্য আসবে, শরীর অচল হবে, তাঁরাও উপার্জন অক্ষম হবে এবং তাঁদের সন্তানরা তাঁদের সাথে এই একই আচরণ করবে?

পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাঁদের খোঁজ- খবর, প্রয়োজনের দিকে নজর রাখা– এটি হাজার বছরের অতি পুরাতন সামাজিক প্রথা আর ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে সব সভ্য সমাজে স্বীকৃত, সব ধর্মে প্রতিষ্ঠিত। আর এখন তো পৃথিবীর অনেক দেশে আইন করে পিতামাতার ভরণপোষণ করাকে আইনি কর্তব্য করে দিয়েছে, কর্তব্য পালন না করলে শাস্তির বিধান রেখেছে।

বাংলাদেশেও ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ নামে একটি আইন কার্যকর আছে। এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়, প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য এখানে “ভরণ-পোষণ” অর্থ শুধু খাওয়া-দাওয়া, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের সুবিধা কে বুঝানো হয়নি বরং বাবা- মা কে ‘সঙ্গ’ প্রদান করাও ‘ভরণপোষণ’ এর সংজ্ঞাভূক্ত করা হয়েছে।

কোনো মা-বাবার একাধিক সন্তান থাকলে সে ক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। এই আইনানুযায়ী সন্তান মানে শুধু পুত্র নয়, কন্যারাও অন্তর্ভুক্ত। এই আইনের ধারা ৩ (৭) অনুযায়ী কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে, সেক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাঁর দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করতে হবে।

এ আইনের ৩ ধারায় আরো বলা হয়, কোনো সন্তান তার বাবা বা মাকে অথবা উভয়কে তার বা ক্ষেত্রমতো তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। তা ছাড়া সন্তান তার মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। ৪ ধারা অনুযায়ী, এ আইনের মাধ্যমে বাবার অবর্তমানে দাদা-দাদি এবং মায়ের অবর্তমানে নানা-নানিরও ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

পিতা-মাতার ভরণ পোষণ আইন ২০১৩-এর ৫ ধারার (১) অনুযায়ী, যদি কোন সন্তান এই আইন লংঘন করে তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়- কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, তাঁদের পুত্র- কন্যা কিংবা অন্য কোন নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে ভরণপোষণের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয় তাহলে উক্ত আইনের ধারা ৫(২) অনুযায়ী তারাও একই অপরাধে অপরাধী হবে, ফলে তারাও একই শাস্তির মুখোমুখি হবে।

আইনটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং চমৎকার কিন্তু সন্তানের সাথে পিতা-মাতার স্নেহ- শ্রদ্ধার সম্পর্কটি আসলে আত্মার- বিবেকের- মূল্যবোধের। আইন করে কি আর কাউকে সম্মান করতে বাধ্য করা সম্ভব? এটি হয় সহজাত, নিঃশর্ত।

অমিতাভ বচ্চন আর হেমা মালিনী অভিনীত সেই দারুণ মুভি ‘ভগবান’ এর কথা মনে পড়ে, আর মনে পড়ে নচিকেতার সেই বিখ্যাত ‘বৃদ্ধাশ্রম’ গানটির কথা। এই মুভি প্রত্যেক সন্তানের দেখা উচিত, এই অমর গান প্রত্যেক সন্তানের শোনা উচিত।

মা’র সাথে সন্তানের সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্প মনে পড়লো-

একবার এক ছেলে এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, প্রেমিক ছেলে তার প্রেমিকাকে নানাভাবে ভালোবাসার প্রকাশ করছে। একপর্যায়ে সে বলে উঠে প্রেমের জন্য সে তার জীবন পর্যন্ত দিতে পারে। মেয়েটিকে ছাড়া সে কোনোভাবেই বাঁচবে না। মেয়েটি তখন ছেলেটির ভালোবাসা পরীক্ষা করতে বলে- সে ছেলেটিকে বিয়ে করবে একশর্তে- তা হলো যদি ছেলেটি তার মায়ের কলিজা কেটে এনে তার হাতে দেয়। ভালোবাসার মোহে অন্ধ ছেলে তখন মাকে গিয়ে বলে ওই মেয়ে ছাড়া সে বাঁচবে না। মা তখন বলে, ‘আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি বাছা?’। ছেলেটি তখন তার মাকে বলে তার প্রেমিকা প্রেমের প্রমাণ হিসেবে মায়ের কলিজা দেখতে চায়। মা তখন বলে- ‘আমার জীবনের বিনিময়ে তুমি যদি সুখী হও তবে তাই হোক!’। ছেলে যখন মায়ের কলিজা কেটে দৌড়ে যেতে থাকে প্রেমিকার কাছে, পথে পায়ে হঠাৎ হোঁচট খায়। তখন ছেলেটির হাতে মায়ের কলিজা কথা বলে উঠে– ‘উহ! তুই কি ব্যথা পেয়েছিস বাছা?’

গল্প হলেও সন্তানের প্রতি মায়ের এই দরদ তো নিখাদ সত্যি। হায়! এমন মা- বাবা কে আমরা কিভাবে কষ্ট দেই, নির্যাতন, অবহেলা করি? কিভাবে বৃদ্ধাশ্রমে ছুঁড়ে ফেলে আসি?

প্রশ্ন আসতে পারে যেসব মা-বাবা সন্তান হতে ভরণপোষণ পাচ্ছেন না তাঁরা কী করবেন?

এ বিষয়ে ওই মা-বাবার সংশ্লিষ্ট থানার আমলি আদালতে লিখিত অভিযোগ করলে আদালত তা গ্রহণ করতে পারবেন। এ আইনে সুবিধা হলো আদালত চাইলে এ অভিযোগ আপস নিষ্পত্তির জন্য সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মেয়র বা কমিশনার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার বা যেকোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবেন। এতে উভয় পক্ষকে অবশ্যই শুনানির সুযোগ দিতে হবে।

উপরোক্ত ব্যক্তির কাছে নিষ্পত্তি করা অভিযোগ আদালতের নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। তবে আমরা কেউ নিশ্চয় চাইব না যে, কোনো মা-বাবাকে ভরণপোষণের জন্য তাদের সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হতে হোক।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন