, ১ জানুয়ারি ২০২১; ৩:০৩ অপরাহ্ণ


Photo: Floating Market of Vimruli

‘ফ্লোটিং মার্কেট’ বা ভাসমান বাজার বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ ভারতের কেরালা কিংবা ভূ-স্বর্গ কাশ্মীরের ‘ডাল লেক’ এ অবস্থিত ফ্লোটিং মার্কেট দেখতে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ভীড় জমায় যার মধ্যে বাংলাদেশীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কিন্তু ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত ধান- নদী- খালের বরিশালেই যে অপরূপ ‘ফ্লোটিং মার্কেট’ বা ভাসমান বাজার আছে- সে সম্বন্ধে অধিকাংশে বেখবর। রবীন্দ্রনাথ কি আর সাধে লিখেছিলেন-

‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু/
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু’ 


কিন্তু বিদেশী ফ্লোটিং মার্কেট আর এই স্বদেশী ফ্লোটিং মার্কেটের কিছু তফাৎ আছে: বিদেশের ফ্লোটিং মার্কেটগুলো মূলত পর্যটন আকর্ষণের জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে- খুচরো বিকিকিনি চলে সেখানে। কিন্তু বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, স্বরূপকাঠি ও পিরোজপুরে হাজার হাজার একর জায়গাজুড়ে পেয়ারা বাগান থেকে সংগ্রহ করা পেয়ারার পাইকারি বেচাকেনার জন্য গড়ে উঠা এই ফ্লোটিং মার্কেট অনারোপিত, আদি ও অকৃত্রিম; এই ভেসে বেড়ানো বাজারের উদ্দেশ্য পর্যটন আকর্ষণ নয়- এটি চাষী আর ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন জীবিকা উৎস! 

বরিশালের জন-জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে জল: জলপথ এখানকার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। হাট-বাজার-ঘর-বাড়ি-ব্যবসা-জীবিকা সবকিছু নদী আর খাল নির্ভর। জলে জীবন, জলমগ্ন জীবন। বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ শতাংশই উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলের প্রায় ২৪ হাজার একর জমিতে। সেই জমি আর বাগান আবার ছোট ছোট খালে ঘেরা- বর্ষা মৌসুমে নৌকাই এসব বাগানে একমাত্র প্রবেশ মাধ্যম।

ঝালকাঠির ভিমরুলী আর স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানা গ্রামের খালের জলে বসে বাংলাদেশের বৃহত্তম ভাসমান পেয়ারা বাজার। শুধু কি পেয়ারা? আমড়া, কলা, ডাব, কচু- কী নেই! বরিশালের বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে প্রতি শনি এবং মঙ্গলবার বসে বিশাল ধান আর চালের ভাসমান বাজার। আছে ভাসমান সবজি বাজারও!

ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সারা বছরই বসে এই ভাসমান হাট। তবে পেয়ারার মৌসুমে হয় জমজমাট বাজার। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। পেয়ারা বোঝাই শত শত নৌকা। বিক্রেতারা এখানকার খালে খুঁজে বেড়ায় ক্রেতা। খালের দু’পাশে সবুজের মায়া। ক্রেতাদের বেশিরভাগই হল পাইকার। বড় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে তারা বাজারে আসে। ছোট ছোট নৌকা থেকে পেয়ারা কিনে ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বড় শহরে চালান করে দেয়। ১ মন পেয়ারা পাওয়া যায় মাত্র ২০০-৩০০ টাকায়!

ভাসমান বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের উপরের ছোট একটি সেতু আছে। সেখান থেকে বাজারটি খুব ভালো করে দেখা যায়। চাইলে খালের পাড় থেকে ডিঙ্গি নৌকা বা ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া নিয়ে ঘুরে আসা যায় বিস্তৃত পেয়ারা বাগান আর ভাসমান বাজার। বর্ষার জলে টইটম্বুর খাল, খালের পাড়ে সবুজ প্রকৃতি আর নৌকায় সবুজ-হলুদ পেয়ারা। ছোট্ট নৌকা কিংবা ট্রলারে দুই পাশে পেয়ারা বাগানের মাঝখান দিয়ে খালে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্যটা অসাধারণ মনোরম। ভিমরুলি বাজারের কাছেই কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ – সহজেই দেখে নেওয়া যায়।

কীভাবে যাবেন? 

নানান ভাবে যাওয়া যায়। আমরা যেভাবে গিয়েছি: বরিশাল শহরের রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড হতে বাসে ঝালকাঠি সদর। ৪০ মিনিট সময় লাগে। সেখান থেকে ইজি-বাইক নিয়ে সোজা ভিমরুলী বাজার। এখান থেকে ৪ ঘন্টার জন্য নৌকা ভাড়া করে বাগান ও ফ্লোটিং মার্কেটে ঘুরেছি। ভিমরুলী ফিরে এসে আবার ইজি- বাইক নিয়ে জমিদারবাড়ি- ধানসিঁড়ি নদী- গাবখান সেতু দেখে ঝালকাঠি সদর হয়ে বরিশাল শহরে প্রত্যাবর্তন।

কী বারে কী বাজার? 

– বানারীপাড়ার চালের বাজার : শনিবার এবং মঙ্গলবার
– উজিরপুরের হারতার সবজি বাজার : রবি এবং বুধবার
– নাজিরপুর এর বৈঠাকাঠা সবজি বাজার : শনি এবং মঙ্গলবার
– ঝালকাঠির ভিমরুলির পেয়ারা বাজার : প্রতিদিন (জুলাই থেকে অক্টোবর)

 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন