রবিবার, ১২ জুন ২০২১; ৫:৩২ অপরাহ্ণ


ফাইল ফটো

বাংলাদেশে ইসলামের পাবলিক স্পেয়ারে নারীর উপস্থিতি একেবারেই সীমিত। ইদানিং কোথাও কোথাও ব্যতিক্রমভাবে নারীর অংশগ্রহণ লক্ষণীয় হলেও ধর্মের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে সার্বিকভাবে নারী এখনো উপেক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ও অনাকাংখিত।

দেশের বাইরে যতদিন ছিলাম, ইদের নামাজ মসজিদে পড়ার চেষ্টা করেছি। খুব ভালো লাগতো, উৎসবমুখর ও নির্মল পরিবেশ। পশ্চিমা সমাজে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হিসেবে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন একটু বেশিই শক্তিশালী হয়, সেই বন্ধনের আমেজ পুরোপুরি বোঝা যেতো ইদের জামাতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন পরিচয়ের, বিভিন্ন সামাজিক আচার ও সংস্কৃতির মুসলিম, এক মসজিদের ছাদের নিচে এক পরিচয়ে একত্রিত!

মহিলাদের অবাধ অংশগ্রহণের সুবাদে মহিলারা নামাজের আগে ও পরে নিজেদের মধ্যে সামাজিকতা আরও মজবুত করছেন, বাচ্চারা খুশি খুশি মনে খেলাধুলা করছে, নামাজের সময় কেউ মায়ের কাছে, কেউ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। মায়ের হাত ও পা দেখে নিজেরটা ঠিক করার চেষ্টা করছে, কেউ আবার মায়ের সামনে বসে উল্টোমুখে সিজদা দিচ্ছে। মোটকথা, ধর্মীয় আবহে এক অপূর্ব, আন্তরিক সামাজিক পরিবেশ!

দুঃখজনক হলেও সত্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত নিজের দেশে সে সুযোগ পাইনি। বরং বেশ আগের এক বিস্ময়-স্মৃতি মাথায় ঘোরে। এক মসজিদের সাইনবোর্ডে লেখা দেখেছিলাম, “মহিলা ও কুকুরের প্রবেশ নিষেধ”! কী ভয়ংকর! ইসলামের স্পিরিট ও প্র্যাকটিস থেকে কতখানি ব্যত্যয়!

বিশ্বাসী হিসেবে ইসলামে নারী ও পুরুষে কোন ভেদাভেদ নেই, আল্লাহ্‌-র বান্দা হিসেবে নারী-পুরুষ সমান। রাসূলুল্লাহ্‌-র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সময়ে নারীরা নিয়মিত মসজিদে নামাজ পড়েছেন, মসজিদভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। মায়ের সাথে থাকা শিশুর কান্না শুনে আল্লাহ্‌-র নবী (সাঃ) নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছেন এমন নজির আছে।

মেয়েদের নামাজের জন্য নিজের ঘর উত্তম, এমন হাদীস আছে; তার প্রেক্ষিতও আছে। আবার, নারীদেরকে মসজিদে যেতে বাধা না দেয়ার জন্য বলা হয়েছে, এমন সহীহ হাদীস আছে। ইসলামে পুরুষদের মসজিদে নামাজ আদায় করার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে, মহিলাদেরকে ছাড় দেয়া হয়েছে। নারীদের জন্য এটি সম্পূর্ণ ইচ্ছাধীন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মসজিদে দৌঁড়ানোর ধর্মীয় চাপ থাকলে ঘর-সংসার সামলাতে নারীদের অবস্থা কী হতো, বলার অপেক্ষা রাখে না।

মসজিদে বিয়ের অনুষ্ঠান যে কী বাহুল্য-বর্জিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে, অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝানো মুশকিল। বাংলাদেশে এমন বিয়ে দেখার সৌভাগ্য কখনও হবে কিনা, জানি না। এশিয়ার শক্তিধর অর্থনীতি মালয়শিয়ায় বিভিন্ন ত্রাণ কর্মসূচী মসজিদভিত্তিক হয়ে থাকে এবং তাতে প্যাকেজিং, বিতরণ ইত্যাদি সব কাজেই নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন। অথচ আমাদের দেশে মসজিদে মেয়েদের মৌলিক নামাজের ব্যবস্থাটা পর্যন্তই যেন এক বিপ্লবী চিন্তা!

কিছুদিন পূর্বে একজনের অভিজ্ঞতা পড়েছিলাম, তিনি ঢাকার কোন এক ইন্সটিটিউটে ক্লাস করাকালীন নামাজ ক্বাযা হয়ে যাচ্ছে দেখে পাশের এক মসজিদে পুরুষদের জামাত শেষ হবার পর নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। থামের আড়ালের এক কোণায় নামাজ পড়েছিলেন তিনি। পরের দিন আবারও নামাজ পড়তে গেলে মসজিদের দায়িত্বরত ব্যক্তি মসজিদে তালা লাগিয়ে দেন!

আরেক পুরুষ মুসল্লী এর প্রতিবাদ করে কা’বা শরীফের উদাহরণ দিলে, সেই দায়িত্বরত ব্যক্তি বলেন, “কা’বা শরীফে মেয়েরা নামাজ পড়তে পারে, কিন্তু আমার মসজিদে আমি এমনটি হতে দেব না”!

ইগো ও অজ্ঞতা কোন্‌ পর্যায়ে পৌঁছালে এমন মন্তব্য করা যেতে পারে?! দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মসজিদে পড়ে পড়ুক, কিন্তু ‘ওনার মসজিদে’ নামাজ পড়তে দিবেন না! আল্লাহ্‌-র মসজিদ না, ওনার মসজিদ? মসজিদ নিয়ে আমাদের সামাজিক অজাচার আজ এ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের জন্য সব বেলায় ও সব স্থানে মসজিদে গমন করা যে নিরাপদ নয়, তা সহজেই বোধগম্য। সৌদি আরব, মালয়শিয়া বা ইংল্যান্ডে সম্ভব হলেই যে আমাদের দেশে এই মুহূর্তেই সম্ভবপর হয়ে যাবে এমন দাবী অবশ্য কেউ করছে না। ঢাকার কিছু বড় মসজিদে এখন মেয়েদের প্রবেশাধিকার আছে, রাজশাহী ও অন্যান্য জেলাতেও অল্পবিস্তর হচ্ছে। ব্যস্ত বাজার অঞ্চল ও পাবলিক পরিবহণের স্টেশন/স্ট্যান্ডের আশেপাশে যেসব মসজিদ, সেগুলোতে মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা থাকা উচিৎ, যাতে বাজারঘাট করার সময় কিংবা গাড়ির জন্য অপেক্ষারত কেউ চাইলে তাঁর নামাজ ক্বাযা না করে সময়মত পড়ে নিতে পারেন। আর বিশেষত ঈদের নামাজে। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় মসজিদে খুব সহজেই এই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

মসজিদে গমনের ক্ষেত্রে নারীদের তরফ থেকেও পূর্ণ দায়িত্ববোধের প্রয়োজন আছে। মেয়েদের বুঝতে হবে যে মসজিদ আল্লাহ্‌-র ইবাদতের জায়গা, সাজগোজ বা লঘু আলাপের স্থান নয় একেবারেই। ইসলামিক ড্রেস কোড পুরোপুরি মেনে মসজিদে আসা নিতান্তই অপরিহার্য।

মুসলিম নারীদের মসজিদে নামাজের যে অধিকার, সার্বিকভাবে তার স্বীকৃতি আমাদের সমাজে থাকতে হবে। পরিস্থিতি ভেদে, নিরাপত্তার খাতিরে বা স্থান সংকুলানের অভাবে সব সময়ে বা সকল স্থানে এই অধিকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্‌-র ঘরের সামনে “মহিলা ও কুকুরের প্রবেশ নিষেধ” লেখার মতো মূর্খতা কিংবা ধৃষ্টতা যেন আর কারও না হয়!

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন