রবিবার, ১৯ জুন ২০২১; ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ


ফুটবল বিশ্বকাপের কল্যাণে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যে দুই বিদেশী দেশের নাম উচ্চারিত হয় তার একটি হল আর্জেন্টিনা এবং আরেকটি ব্রাজিল। ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর এমনকি প্রান্তিক গ্রামেও এই দুই দেশের পতাকার ছড়াছডি দেখা যায়। বাংলাদেশের বাইরে কোন দেশের পতাকা যদি সর্বাধিক জনপ্রিয়তা প্রাপ্ত হয় তা হল ব্রাজেন্টিনার (ব্রাজিল+আর্জেন্টিনা) পতাকা। কেবল সামাজিক পরিসরেই নয়, বাংলাদেশের নাটক-সিনেমা ও শিল্পের পরিমন্ডলেও এই দুই দেশের একটি সিম্বলিক গুরুত্ব আছে।

বাংলাদেশে এই দুই দেশের পতাকা এবং খেলোয়াড়রা জনপ্রিয় হলেও দুঃখজনকভাবে এদের সম্পর্কে জানাশোনা খুবই কম। এই জানাশোনার ঘাটতি পূরণের অংশ হিসেবে এই লেখায় আর্জেন্টিনার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হবে।

দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম, শতভাগ স্পেনিশ ভাষাভাষীর দেশ আর্জেন্টিনাকে স্পেনিশ ভাষায় আরখেনতিনা বলা হয়। বুয়েন্স আয়ার্স দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। আন্দিজ পর্বতমালা ও এর সর্বোচ্চ চূড়া আকোনকাগুয়া আর্জেন্টিনায় অবস্থিত। বেশিরভাগ লোক দেশটির মধ্যভাগে অবস্থিত বিশাল উর্বর প্রেইরি সমভূমি পাম্পাসের শহরগুলিতে বাস করে। পাম্পাসেই দেশটির অধিকাংশ কৃষিসম্পদ উৎপন্ন হয় এবং এখানেই দক্ষিণ আমেরিকার বিখ্যাত কাউবয় ‘গাউচো’-দের আবাসস্থল।

আধুনিক আর্জেন্টিনার ইতিহাস ১৬শ শতকে স্পেনীয় উপনিবেশকরণের মাধ্যমে সূচিত হয়। ১৭৭৬ সালে এখানে স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে অধীনে রিও দে লা প্লাতা উপরাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই উপরাজ্যের উত্তরসূরী রাষ্ট্র হিসেবে আর্জেন্টিনার উত্থান ঘটে। ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৮১৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হয়। এরপরে দেশটিতে অনেকগুলো গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৬১ সালে অনেকগুলি অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেশন হিসেবে দেশটি পুনর্গঠিত হয় যার রাজধানী নির্ধারিত হয় বুয়েন্স আয়ার্স।

এর পরে দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরত আসে এবং ইউরোপ থেকে বিপুলসঙ্খ্যক অভিবাসীর আগমন ঘটে, যার ফলে সাংস্কৃতিক ও জনসংখ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেশটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

১৯শ শতকের শেষ ভাগ থেকে আর্জেন্টিনা প্রচুর পরিমাণে কৃষিদ্রব্য যেমন মাংস, পশম, গম, ইত্যাদি রপ্তানি করা শুরু করে। দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনাতেই প্রথম শিল্পায়ন শুরু হয় এবং এটি বহুদিন ধরে এই মহাদেশের সবচেয়ে ধনী দেশ ছিল। সে সময় এখানকার অধিবাসীরা ইউরোপীয় দেশগুলির সমমানের জীবনযাত্রা নির্বাহ করত।

ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে দেশটি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বের ৭ম ধনী দেশে পরিণত হয়। তবে ১৯৪০-এর দশকের পর থেকে আর্জেন্টিনা ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ বেকারত্ব ও বড় আকারের জাতীয় ঋণের সমস্যায় জর্জরিত।

আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক ইতিহাস সংঘাতময়। দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন শ্রমিক শ্রেণী ও দরিদ্রদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন একজন একনায়ক এবং সমস্ত বিরোধিতা কঠোর হাতে দমন করতেন। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ১৯৫৫ সালে পেরনের পতন ঘটে।

১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত কুখ্যাত সামরিক শাসনের সময় বহু আর্জেন্টিনীয়কে বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছেড়ে দেবার পর আর্জেন্টিনায় আবার গণতন্ত্র স্থাপিত হয় কিন্তু দেশটি অর্থনৈতিক সমস্যায় তখনও হাবুডুবু খেতে থাকে। ২১শ শতকের দ্বিতীয় দশকেও আর্জেন্টিনা তার অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে আর্জেন্টিনাঃ

আর্জেন্টিনা বিশ্ব রাজনীতিতে ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে সামনে চলে আসে যে যুদ্ধে মহাশক্তিধর যুক্তরাজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এটি ছিল দুইটি ব্রিটিশ টেরিটরি ফকল্যান্ড এবং দক্ষিণ জর্জিয়া এবং দক্ষিণ স্যান্ডউইচ আইল্যান্ডের দখলকে কেন্দ্র করে ১০ সপ্তাহের একটি যুদ্ধ। ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা এই দ্বীপগুলো দখল করে নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। ৫ এপ্রিল ব্রিটিশ নৌবাহিনী দ্বীপগুলোতে অভিযান শুরু করে। ৭৪ দিনব্যাপী বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র ব্রিটেনকে প্রতিরোধ করে আর্জেন্টাইনরা। যদিও এ যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়লাভ করে কিন্তু তাদের ২৫৫ জন সৈন্যকে হারাতে হয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সেনা শহীদ হয়।

বাংলাদেশের সাথে আর্জেন্টিনার তুলনামূলক বিশ্লেষণঃ

আর্জেন্টিনার ৭৭.১% জনসংখ্যা রোমান ক্যাথলিক, ১০.৮ প্রোটেস্ট্যান্ট, ১০.১ ধর্মহীন এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশ অন্যান্য  বিশ্বাসে বিশ্বাসী। আর্জেন্টিনার ভুভাগের আয়তন ২৭ লক্ষ ৮০ হাজার ৪০০ বর্গকিমি এবং জনসংখ্যা ৪ কোটি ৩৮ লক্ষ ৪৭ হাজার ৪৩০। বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে আয়তনে আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের চেয়ে ১৮ গুণ বড় এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় চার গুণ বেশি। বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু আয় ১৭৫৪ মার্কিন ডলার। আর্জেন্টিনার মাথাপিছু আয় ১৪০৪৩ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে একজন গড় আর্জেন্টাইনের মাথাপিছু আয় নয়গুণ বেশি। জিডিপির আকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৩ তম বৃহত্তম অর্থনীতি যেখানে আর্জেন্টিনা বিশ্বের ২১তম বৃহত্তম অর্থনীতি।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন