বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন ২০২১; ৯:৩৭ অপরাহ্ণ


ডেস্ক রিপোর্টঃ বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় নতুন পতাকার, নতুন জার্সি আর নতুন দেশের গালগল্পের। এবারের বিশ্বকাপের আসল বসেছে রাশিয়ায়। এই লেখায় আমরা রাশিয়ার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা করব।

রাশিয়া শুনলেই প্রথমেই মনে আসে মার্কসবাদী বিপ্লবী লেনিন কথা। যিনি ‘অক্টোবর বিপ্লব’র প্রধান হিসেবে ছিলেন। এরপর দেশটির বিশাল আয়তনের চিত্র ফুটে ওঠে। এছাড়া রয়েছে অলিম্পিক গেমসের পদক জয়ের তালিকায় শীর্ষ দেশ হিসেবে তাঁদের নাম। তবে এই জানার বাইরেও রয়েছে রাশিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস।

আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়া। দেশটি সরকারিভাবে রাশিয়ান ফেডারেশন নামে পরিচিত। দেশটির মোট আয়তন ১৭,০৭৫,৪০০ বর্গ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট আবাসযোগ্য জমির এক অষ্টমাংশ। এটি বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ, যেখানে ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী ১৪৭ মিলিয়নের বেশি লোক বসবাস করে।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কো। এটি দেশটির প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশের বেশিরভাগ জনগণ রুশ ভাষায় কথা বলে। এছাড়াও প্রায় ৮০টিরও বেশি ভাষা দেশটিতে প্রচলিত। দেশটির মুদ্রার নাম রুবল।

রাশিয়া একটি অর্ধেক প্রেসিডেন্সিয়াল ফেডারেল প্রজাতন্ত্র, যার সংবিধান ৮৩ টি ফেডারেল বিষয় দ্বারা গঠিত। রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব পর্যন্ত নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড, বেলারুশ, ইউক্রেন, জর্জিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, চীন, মঙ্গোলিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সাথে সীমান্ত আছে। দেশটির অখতস্ক সাগরের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে ও বেরিং প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার সাথে সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে।

রাশিয়া নামটি রুশ নামক মধ্যযুগীয় একটি রাষ্ট্র থেকে এসেছে। যেখানকার অধিকাংশ জনগণই ছিল ইস্ট স্লাভ গোত্রের অন্তর্গত। পরবর্তী ইতিহাসে এই নামটি আরও বিশিষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেশটিকে জনগণ ‘রুশকায়া যেমল্যা’ বলে ডাকতো, যার অর্থ দাড়ায় রুশ ভূমি বা রুশ এর ভূমি। আধুনিক ইতিহাসে একে কিয়েভান রুশ বলে ডাকা হয়।

রাশিয়ার ব্যাপক খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ একে বিশ্বের বৃহত্তম মজুদদার হিসেবে পরিচিত করে। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি পারমাণবিক শক্তি সম্পন্ন পাঁচটি স্বীকৃত দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে রাশিয়ার। রাশিয়া একটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্র, যেটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়াতে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং ১৯৯০ এর দশকে দেশটিতে লাগামহীনভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিস্তার লাভ করে।

পূর্বে রাশিয়ায় রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টধর্ম রাশিয়ার প্রধান ধর্ম। রাশিয়া দেশটি হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বলে এখানে থাকাটা বরং খুবই কষ্টকর। রাশিয়ার অর্থনীতি বিশ্বে দশম বৃহত্তম। রাশিয়া একটি পশ্চাদপদ দেশ হয়েও অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব মুক্ত হয়ে পৃথিবীর একটি প্রথম সারির শিল্পায়িত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে একটি পরিকল্পিত অর্থনীতি গ্রহণ করার কারণেই। তবে এক সময় রাশিয়ার শ্রমিকরা ছিল ভূমিদাস। তাঁরা ছিল অত্যন্ত নিপীড়িত ও দুর্দশাগ্রস্ত।

রাশিয়ান ফেডারেশন ১৪৫ টি জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। রাশিয়া পৃথিবীর দ্বিতীয় শক্তিশালী সেনাবাহিনী। বৃহত্তম অস্ত্র বিক্রেতা। তাছাড়া ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বসবাস এই রাশিয়াতে। এখানকার রুশ মুসলিমদের ইতিহাস প্রায় ১,১০০ বছরের। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতেই কমপক্ষে ২৫-৩৫ লাখ মুসলিমের বসবাস!

মার্কসবাদী বিপ্লবী লেনিন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নায়ক। তাঁর নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের `অক্টোবর বিপ্লব` সংগঠিত হয়। ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলশেভিক নেতা লেনিন দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। বুরিয়াটিয়া প্রজাতন্ত্রের ইভালগিনস্কী বৌদ্ধ মন্দির রাশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অন্যতম একটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। রাশিয়ার প্রধান বৌদ্ধ ভিক্ষুকের বাসভবনও এখানে অবস্থিত।

রাশিয়ায় অনেক উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেশটির কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নগরীর একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যেখানে পড়াশোনা করে রাশিয়া ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা।

রাশিয়ার রয়েছে ২২,৭১০টি সাঁজোয়া ট্যাংক, একটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ, ১৫টি উভচর যুদ্ধজাহাজ, পাঁচটি ক্রুজার, ১৪টি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ, পাঁচটি ফ্রিগেট, ৭০টি করভিট যুদ্ধজাহাজ, ৩৩টি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন, ১৭টি সাবমেরিন, ১,২৬৪টি যুদ্ধবিমান, ১৯৫টি বোমারু বিমান, ১,২৬৭টি জঙ্গি বিমান, ১,৬৫৫টি সাঁজোয়া হেলিকপ্টার এবং ১২ হাজার পরমাণু অস্ত্র।

সর্বকালীন অলিম্পিক গেমসের পদক তালিকায় রাশিয়া দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। ১৯৮০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক ও ২০১৪ শীতকালীন অলিম্পিক রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপ এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা প্রথমবার মত আয়োজন করছে দেশটি ।

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন