, ১৩ জুন ২০২১; ৮:৪৩ অপরাহ্ণ


জিওফ্রে চসার মারা গেছেন বরাবর ১৪০০ সালে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সে বছরের অক্টোবর মাসে। মৃত্যুর মাধ্যমে একটি যুগের ইতি হলো আর শুরু হলো ইংরেজি কবিতা তথা ইংরেজি সাহিত্যের উর্ধ্বযাত্রা। ইংরেজি কবিতার পাঠকেরা সম্মান করে জিওফ্রে চসারকে আধুনিক ইংরেজি কবিতার জনকের অভিধা দিয়েছে। চসারের জীবদ্দশায়, মৃত্যুকালে বা মৃত্যু পরবর্তী বেশ কয়েকবছর চসারের অবস্থানটা এমন ছিল না যেমনটা পরবর্তীতে হয়েছে।

মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্যের কথাই ধরুন। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের যে জায়গাটাতে সমাহিত হয়েছেন সেটা তার কবিকীর্তির জন্য নয়। তার ক্লাসিক ক্যান্টারবেরি টেইলস্ এর জন্যও নয়! রাজার দপ্তরের একজন চাকুরে হিসেবে আর শেষ বছরগুলোতে সে এলাকাতে বসবাস করার সুবাধে ওয়েস্টমিনস্টারে সমাহিত হওয়ার সুযোগ পান। তার চেয়েও আরেকটু বড় কারণ ছিল তার স্ত্রী ফিলিপ্পা দূরবর্তীভাবে রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন।

এদিকে চসারের সমসাময়িক কবি জন গাওয়ার যখন আট বছর পর মারা যান তার নামে বিশাল সমাধিসৌধ উঠে সাউথওয়ার্ক ক্যাথেড্রালে। তার সমাধিসৌধে লেখা হয়, ‘ইংরেজ জাতির সবচেয়ে বিখ্যাত কবি’। তার মাথার সামনে তার তিনটি সেরা কীর্তির নাম লেখা হয়।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় গাওয়ার ও তৎপরবর্তী শতকের কোন কবির সমাধি নয় বরং চসারের সমাধি কবি ও কবিতার পাঠকদের কাছে সমীহের জায়গা হয়ে দাড়ায়। চসারের মৃত্যুর ঠিক ১৫৬ বছর পর ১৫৫৬ সালে নিকোলাস ব্রিগহাম নামে এক সরকারী কর্মকর্তা চসারের সমাধিস্থলে বেশ বড় গোথিক মডেলের সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন। চসারের স্বীকৃতি ও সম্মান উর্ধ্বে উঠতে থাকে। রাণী এলিজাবেথের সময়কালের ইংরেজি ভাষার প্রধান কবি এডমান্ড স্পেন্সার স্বীকৃতি দেন চসার হচ্ছেন ‘কবিতার খাটি সর্দার’।

১৫৯৯ সালে এডমান্ড স্পেন্সার মারা গেলে তাকে সমাহিত করা হয় চসারের পায়ের কাছেই। ‘নিজ সময়ে কবিতার রাজপুত্র’ হিসেবে স্বীকৃত এডমান্ড স্পেন্সার সমাধিস্থ হওয়ার পরবর্তী বছরগুলোতে আরও অনেক রথি মহারথি চসারের আঙ্গিনায় স্থান পেতে শুরু করে। ১৬৩৭ সালে বেন জনসন, ১৬৬৭ তে আব্রাহাম কাউলী এবং ১৭০০ তে জন ড্রাইডেন এমন তিনটি বড় নাম যারা সেখানে সমাধিস্থ হলেন।

আরও ছোটবড় কবি-সাহিত্যিকও সেখানে জায়গা নিয়েছেন তাদের নাম নিয়ে পরিসর বড় করতে চাইনা।

তিন শতকের মধ্যে চসারের পরিবর্তিত অবস্থান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের শক্তিশালী প্রবন্ধকার ও সাহিত্যসমালোচক জোসেফ অ্যাডিসন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের সে অংশটাকে ‘কবিদের কোয়ার্টার’ (দ্য পোয়েটিক্যাল কোয়ার্টার) হিসেবে অভিহিত করেন। ১৭১১ সালে সে সময়ের প্রভাবশালী দ্য স্পেকটেটর পত্রিকায় প্রকাশের পর থেকে সে জায়গাটা কবিদের কোণা হিসেবে জনমনে জায়গা নিতে থাকে। ১৭৩৭ সালে উইলিয়াম বেনসন নামে এক সাহিত্য সমঝদার ও উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তি জন মিল্টনের (১৬৭৪ সালে মারা যান) আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেন। তারও তিনবছর পর অপর এক ব্যক্তি উইলিয়াম শেইক্সপিয়রের আবক্ষ মূর্তি বসান। শেইক্সপিয়র যিনি ১২৪ বছর আগে স্ট্রেটফোর্ডে সমাহিত হয়েছেন ওয়েস্টমিনস্টারে চসারের সমাধির পাশে কবিদের জমায়েতের উৎসবে তাকেও ডেকে পাঠানো হয়! উল্লেখ্য সে সময় জনতার কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেছেন সময়ের শীর্ষ কবি আলেক্সান্ডার পোপ। তবে কবিদের কোণায় (পোয়েটস কর্নার) অনেককে জায়গা দেওয়ার জন্য কাজ করে গেলেও পোপের অবস্থান তেমনটা সম্মানজনক জায়গায় পড়েনি। তাকে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে সমাহিত করা হয়। ১৭৬২ সালে মারা যাওয়া বর্তমানে অখ্যাত কবি জেমস থমসন, ১৭৭১ সালে মারা যাওয়া ‘এলিজি রিটেন ইন কান্ট্রি চার্চইয়ার্ড এর কবি থমাস গ্রে এবং ১৭৭৪ সালে মারা যাওয়া অলিভার গোল্ডস্মিথ বেশ ভালো জায়গায় সমাধীস্থ হন।

আর শেইক্সপিয়রের সমাধিসৌধের পায়ের কাছেই সমাধীস্থ করা হয় ১৭৮৪ সালে মারা যাওয়া স্যামুয়েল জনসন। পোয়েটস্ কর্নার তার অবস্থান একেবারে পাকাপুক্ত করলো বলে।

চসারের সাধারণ সমাধিস্থল থেকে শুরু করে সে জায়গাটা প্রধান ব্রিটিশ কবিদের মৃত্যুপরবর্তী সমাবেশস্থল হয়ে দাড়ায়। জীবিত সকল কবি ও কবিতার পাঠকেরা একসাথে প্রায় সব প্রধান কবিদের সমাধিতে সম্মান জানানোর সুযোগ পেয়ে যায়।

পাঠকের জানতে আগ্রহ জাগতে পারে রোমান্টিক কবিরা কী সেখানে জায়গা পেয়েছেন; বায়রন, কীটস, শেলী, কোলরিড, ওয়ার্ডসওয়ার্থ?

ওয়েস্টমিনস্টারের তৎকালীন ডিন ১৮২৪ সালে মারা যাওয়া লর্ড বায়রনের সমাধি করতে দেয়নি তার লেখালেখিতে ‘অনৈতিকতার উপস্থিতির’ কারণে। কিন্তু এর সাত বছর পর বায়রন ভক্তরা ঠিকই মার্বেল মূর্তি বসিয়ে দেন।

রোমান্টিক যুগের দুই প্রধান কবি জন কীটস ও শেলী দুজনেই ইতালিতে মারা যান। এজন্য তাদেরকে রোমেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তাদের আবক্ষ মূর্তি স্থান পেতে অপেক্ষা করতে হয় বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। অন্যদিকে ১৮৩৪ সালে মারা যাওয়া কোলরিজ, ১৮৪৩ সালে মারা যাওয়া সাউদি এবং ১৮৫০ সালে মারা যাওয়া ওয়ার্ডসওয়ার্থের জায়গা হয় ওয়েস্টমিনস্টারে, শেইক্সপিয়রের ছায়ার নীচে। পোয়েটস্ কর্নারের দক্ষিণ অংশে অনেকটা ব্যতিক্রমভাবেই জায়গা পান চার্লস ডিকেন্স। ১৮৭০ সালে মারা যাওয়া ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ঔপন্যাসিককে সেখানে সমাধিস্থ করার পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন ওয়েস্টমিনস্টারের তৎকালীন ডিন আর্থার স্ট্যানলী। দক্ষিণাংশের এই অংশে যে সমাধিটিতে বেশি মানুষ দেখতে আসেন সেটি চার্লস ডিকেন্সেরই। ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রধান কবিগণ রবার্ট ব্রাউনিং, আলফ্রেড টেনিসন, থমাস হার্ডি থেকে শুরু করে বিশ শতকের রুডইয়ার্ড কিপলিং সবারই জায়গা হয় পোয়েটস্ কর্নারে। ততদিনে ওয়েস্টমিনস্টারের সেই ছোট্ট অংশটা ভরে যায় সমাধিতে। সেই অল্প জায়গাতে যাদের সমাধিচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে তাদের দিকে তাকালেই কোন দর্শনার্থীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে ইংরেজি কবিতার রথি মহারথিরা কারা।

পরবর্তীতে স্যার ওয়াল্টার স্কট ও রবার্ট বার্নসের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়। ম্যুরাল টেবলেট স্থাপন করা হয়েছে রাসকিন, ম্যাথু আরনল্ড ও ক্ল্যায়ারের।

আর গত শতকটিতে হেনরি জেমস, ডিএইচ লরেন্স, ডিলন থমাস, টিএস এলিয়ট, ডব্লিউ এইচ অডেনের সমাধি সেখানে স্থাপনের মাধ্যমে জায়গাটির শান আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইংরেজি কবিতার কোন নবীন পাঠক যদি জানতে চান ইংরেজি কবিতার প্রধান চরিত্রগুলো কারা এবং কোন কোন কবিকে তার পড়তে হবে, কোন কোন কবি ইংরেজি ভাষা, সংস্কৃতি ও তার রাজনীতির অনুষঙ্গ তাকে চলে যেতে হবে ওয়েস্টমিনস্টারের কবিদের কর্নারটিতে। যেখানে চসারের গাম্ভীর্যহীন সমাধি অনুষ্ঠানের পর থেকে ধীরে ধীরে জায়গাটির শান শওকত বাড়তে থাকে। পোয়েটস্ কর্নার বা কবিদের কোণাটি আসলে ইংরেজি কবিতার সিলসিলাকে ধারণ করেছে। ইংরেজ জাতি ও ইংরেজি ভাষাকে বিশ্বে ক্ষমতার আসনে বসানোর ক্ষেত্রে সেসব সাংস্কৃতিক ফিগারগুলো অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে সেটা বলাই বাহুল্য। চসার পরবর্তী ছয়শো বছর ইংরেজি জাতির জন্য আসলে উত্থানেরই কাল। তারা কত কী ই না করেছে এই সময়টাতে। একটি ক্ষুদ্র ভূখণ্ড, দুর্বল জাতি থেকে শুরু করে ইংরেজরা একদিন অর্ধপৃথিবী নিজেদের করায়ত্বে নিয়ে আসে।

পুরো পৃথিবীকে তারা এটাও দেখানোর ও শেখানোর চেষ্টা করে তাদের ভাষা সেরা, তাদের সাহিত্য সেরা এবং তাদের সাহিত্যের নায়কেরা বিশ্বসেরা। বিশ্বব্যাপী এই ইমেজ সওদা করতে কবিদের কোণা ইংরেজ সাম্রাজ্যের জন্য লাভজনক বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

এখন ব্রিটেনের আর আগের অবস্থা নাই। কিন্তু তারপরও পোয়েটস্ কর্নার তার জৌলুস হারানোর কোন কারণ নেই। প্রথমত ইংরেজ জাতির কাছে এ কোণাটি সমৃদ্ধ অতীতের গৌরব হিসেবে থেকে যাবে। এটা তাদের উত্থান পতনে অনুপ্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে। দ্বিতীয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ইংরেজি ভাষাভাষীরাও এক আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করে থাকেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। কারণ তারা যে ভাষায় কথা বলেন বা লিখেন সে ভাষার সেরা শিল্পীরা হচ্ছেন কবিদের কোণায় শায়িতরা।

সর্বোপরি বিশ্বের যেকোন সাহিত্য সমঝদার ও কাব্যামোদি ব্যক্তি কবিদের কোণাতে গেলে শ্রদ্ধায় মাথা না নুইয়ে থাকতে পারবেন না কারণ সেখানে যারা শায়িত আছেন তারা একটি ভাষা ও একটি সভ্যতার প্রধান শিল্পী।

ভাবতে অবাক লাগবেই ছয়শো বছর আগে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে চসার সমাধিস্থ হলেন সেখানে। আর সে জাতির উত্থান, বিকাশ, সভ্যতার নেতা হওয়ার সাথে সাথে সে জায়গাটার কত পালাবর্তন ঘটলো। ইংরেজি কবিতার সকল তারকা কবির সম্মিলনে এক গ্যালাক্সি হয়ে উঠলো কবিদের কোণা বা পোয়েটস্ কর্নার।

 

লেখক : লেখক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও সংগঠক। 

 

তথ্যসূত্র:

দ্য শর্ট অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার, থার্ড এডিশন, এন্ড্রু স্যান্ডার্স

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন