বুধবার, ১৫ জুন ২০২১; ৯:২৬ অপরাহ্ণ


ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সংসদে আক্ষেপ করে বলেছেন কেবল পয়সা ছিল না বলে এমআইটিতে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের তিনি প্রায় বিনা খরচেই পড়াশোনা করিয়ে থাকেন। আসলে তিনি হয়ত বলতে চেয়েছেন বাংলাদেশের সরকার বিনা খরচে পড়িয়ে থাকেন। এ প্রেক্ষাপটে আমরা খুঁজে বের করেছি সম্প্রতি এমআইটি থেকে স্নাতক শেষ করা নাজিয়া চৌধুরীকে যিনি সম্পূর্ণ বিনা খরচে বৃত্তির টাকায় এমআইটিতে পড়াশোনা শেষ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দিতে পারে যে টাকা-পয়সা ছাড়া এমআইটিতে পড়াশোনা করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে নাজিয়া চৌধুরীর উদাহরণটি সামনে নিয়ে আসা হল। এই রিপোর্টটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের সংস্করণ।

 

এমআইটির পরিসংখ্যানটা চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই বটে! ১৯০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৮৯২ জন, তাঁদের মধ্যে ৯১ জন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সাবেক শিক্ষার্থী। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এসেছেন দুনিয়া কাঁপানো অসংখ্য গবেষক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা…। সারা পৃথিবীর কিশোর, তরুণদের কাছে এমআইটি তাই স্বপ্নের শিক্ষাঙ্গন। বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষার্থীও এমআইটিতে পড়েছেন, পড়ছেন। পাস করে কেউ কেউ দেশে-বিদেশে গবেষণা, শিক্ষকতা কিংবা অন্যান্য পেশায় যুক্ত আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন নাজিয়া চৌধুরী।

 নাজিয়ার এমআইটি অভিযানের গল্পটি শোনা যাক তার কাছ থেকেই- 

আমি চট্টগ্রামের মেয়ে। ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল ও চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছি। শুরুর দিকে রেজাল্ট খুব একটা ভালো ছিল না। ২০০৭ সালে গণিত অলম্পিয়াডে প্রথম জাতীয় পর্যায়ে আসি, গণিত ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই। ২০০৭ থেকে ২০০৯, পরপর তিনবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম দুটি ব্রোঞ্জ পদক পেল। একটি ছিল আমার। গণিত অলিম্পিয়াডের পদক পাওয়ার পরই আত্মবিশ্বাস জন্মেছিল, হয়তো ভালো কোথাও পড়তে পারব।

প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ডসহ আরও বেশ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলাম। শেষ পর্যন্ত আমি বেছে নিলাম এমআইটি। স্নাতক শেষ হয়েছে ২০১৪ সালে। জীববিজ্ঞান ছিল আমার মেজর (মূল বিষয়)। এখন ডিউক ইউনিভার্সিটি এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের একটা যৌথ প্রকল্পে ‘ডক্টর অব মেডিসিন’ করছি।

চার বছরের কোর্স, আমার শেষ বর্ষ চলছে। আমার গবেষণার বিষয় কার্ডিওলজি। এর আগে ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করেছি। পড়া শেষ হলেই দেশে ফিরব। মেডিসিন নিয়ে আরও পড়তে চাই। স্বাস্থ্যনীতি নিয়েও আমার আগ্রহ আছে। সরকারি পর্যায়ে দেশে বড় কোনো পদে কাজ করতে হলে বিসিএস দিতে হয়, তাই মা চান আমি বিসিএস দিই।

ক্যাম্পাসজীবন…
শুরুতে খারাপ দিকটা বলি। পড়ার চাপ অনেক বেশি! নিয়মিত হোমওয়ার্ক করতে হয়। একগাদা সমস্যা, সেগুলোর সমাধান করতে লেগে যায় পুরো সপ্তাহ। সুবিধা হলো, চাইলেই শিক্ষক আর সিনিয়রদের সাহায্য পাওয়া যায়। তাঁরা হয়তো সমস্যার সমাধান করে দেবেন না, কিন্তু ধরিয়ে দেবেন। সে জন্য শুধু সাহায্য চাওয়ার ইচ্ছেটা থাকতে হয়। এমআইটিতে পড়ার মজাও আছে অনেক। ওখানে যেহেতু সবাই মোটামুটি সমমনা, তাই বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে না। আমি ডর্মে থেকেছি। রাতে খাবার টেবিলে বসে কত যে গল্প হতো! অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, কিচ্ছু বাদ যেত না। মনে আছে একবার রাত দুইটার সময় আমরা আটলান্টিকের পাড়ে বেড়াতে চলে গিয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে সবাই মিলে গান গাইতাম। হোক সেটা ইংরেজি কিংবা বাংলা। ভাষা না বুঝলেও সবাই তালি তো দিতে পারে!

এমআইটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটা সংগঠন আছে। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য আমরা পুরস্কারও পেয়েছিলাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা লেগো দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়েছি। আমাদের দেখাদেখি বিদেশিরাও বানিয়েছে। রানা প্লাজা ধসের সময় ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার’ চলছিল। তখন আমরা বাংলাদেশি খাবার বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করেছি। আশপাশে যেসব বাংলাদেশি থাকেন, তাঁরা আমাদের খুব ভালোবাসেন। এমআইটিতে বাংলাদেশের একটা সুনাম আছে।

যাঁরা এমআইটিতে স্নাতক করতে চান, তাঁদের জন্য…

এমআইটিতে ভর্তির জন্য দুটো জিনিস লাগে। ভালো একাডেমিক রেজাল্ট আর কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস (সহ-শিক্ষা কার্যক্রম)। আমি যেহেতু এমআইটির অ্যাডমিশন অফিসে কিছুদিন কাজ করেছি, তাই ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা আছে। কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস বলতে এমন নয় যে আপনাকে কোনো না কোনো অলিম্পিয়াডে পদক পেতে হবে। আপনি হয়তো বিতর্ক করেন, ভালো ছবি আঁকেন, গান গাইতে পারেন। ওরা যেটা দেখে সেটা হলো আপনার ‘প্যাশন’ আছে কি না। আপনি আপনার ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় মঞ্চটাতে পৌঁছাতে পেরেছেন কি না। একাডেমিক রেজাল্টের ক্ষেত্রে সর্বশেষ ফলটা দেখালেই হবে না। ওরা বেশ দীর্ঘ সময়ের ফল দেখতে চাইবে। বাংলা মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের জন্য কলেজের প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ, টেস্ট, প্রি-টেস্ট, এসবের রেজাল্টও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আপনাকে একজন শিক্ষকের সুপারিশপত্র (রিকমেন্ডেশন লেটার) জমা দিতে হবে। আর লাগবে স্যাট পরীক্ষায় একটা ভালো স্কোর। স্যাটে গণিত ও ইংরেজির দক্ষতা যাচাই করা হয়।

আমি যত দূর দেখেছি, গণিতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের সমস্যা হয় না। আমাদের দুর্বলতা মূলত ইংরেজিতে। এমআইটিতে ভর্তির জন্য কয়েকটা রচনা লিখতে হয়। স্কুল, কলেজে আমরা যেমন রচনা লিখি, তেমন লিখলে কিন্তু হবে না। গল্পের মতো করে সহজ ভাষায় লিখতে হবে। আমি দেখেছি, আবেদনপ্রক্রিয়ার সময় অন্য কাউকে দিয়ে রচনা লেখালে কীভাবে যেন ওরা বুঝে ফেলে। ভালো রচনা লেখার জন্য ছোটবেলা থেকে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য পড়া উচিত। এতে লেখালেখির অভ্যাস হবে, আবার মনও ভালো থাকবে।

স্নাতকোত্তরের জন্য…

ভালো জিপিএ আর গবেষণার বিকল্প নেই। কোনো শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করতে পারেন। গবেষণা নিবন্ধ কোনো জার্নালে ছাপা হলে কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণা উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা থাকলে খুবই ভালো। এমআইটির সুবিধা হলো, ভর্তিসংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসা থাকলে ওদের ই-মেইল করা যায়। ই-মেইলের উত্তর দেওয়ার জন্য আলাদা একটা দল আছে। তাই যেকোনো প্রশ্ন থাকলে ওদের ই-মেইল ([email protected]) করতে পারেন।

বৃত্তি বা আর্থিক সহযোগিতা…

এমআইটিকে বলা হয় ‘নিড ব্লাইন্ড স্কুল’। যোগ্যতা ও চাহিদা বিবেচনা করে যার যতটুকু দরকার ওরা ততটুকুই আর্থিক সহযোগিতা (ফাইন্যান্সিয়াল এইড) দেবে। বৃত্তির ব্যবস্থা তো আছেই।

কৃতজ্ঞতাঃ প্রথম আলো 

সম্পর্কিত লেখা


আরও পড়ুন