টানা তিনদিন ধরে পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনের পর রবিবার জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ম্যারাথন বৈঠকে বসলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের অঙ্গীকার হলে তাঁর নেতৃত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে জেলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সমস্যা, জনবল ঘাটতি থেকে শুরু করে রোগীদের পরিষেবা—একাধিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র, জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক-সহ স্বাস্থ্য দপ্তরের বিভিন্ন আধিকারিক। তবে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার এবং জনস্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরপর হাসপাতাল পরিদর্শনে উঠে এসেছে একাধিক সমস্যা। চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, টেকনিশিয়ান ও সাফাইকর্মীর অভাব, নিরাপত্তাকর্মীর স্বল্পতা, অপরিচ্ছন্নতা, অগ্নিনিরাপত্তা, অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা, চিকিৎসা যন্ত্রের অপ্রতুলতা এবং কর্মীদের আবাসন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। রবিবারের বৈঠকে দ্রুত কীভাবে সেই সমস্যাগুলির সমাধান করা যায়, তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করা হয়।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, অনেক হাসপাতালের ভিতরের অংশ তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার থাকলেও বাইরের অংশে আবর্জনা জমে থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাই মহকুমা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলিতে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর সাধারণ বর্জ্য ফেলার বিন বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার রাখার জন্য রোগী ও তাঁদের পরিজনদেরও সচেতন হওয়ার আবেদন জানান তিনি।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মী-ঘাটতি
তিনদিনের পরিদর্শনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে জনবল ঘাটতি। চিকিৎসক, নার্সিং স্টাফ, টেকনিশিয়ান, সাফাইকর্মী এবং নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই ঘাটতি পূরণে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যাতে কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার বার্তাও দিয়েছেন তিনি। অতীতের নিয়োগ দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, সেই ‘ভূত’ এখনও মানুষের মনে রয়েছে। তাই নতুন করে কোনও নিয়োগকে ঘিরে প্রশ্ন উঠুক, তা তাঁরা চান না। স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য নিয়োগ ব্যবস্থা তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।
তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের ঘাটতি সামাল দিতে ‘লোকাল ফর লোকাল’ ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। এলাকার বাসিন্দা বা স্থানীয়ভাবে কর্মরত চিকিৎসক ও কনসালট্যান্টদের সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েকদিন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পরিষেবা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। কাটোয়া হাসপাতালে ইতিমধ্যেই তিনজন চিকিৎসকের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। স্থানীয় চিকিৎসকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও সম্মান দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
নার্সিং ঘাটতি মেটাতে বেসরকারি কলেজগুলিকেও আহ্বান
নার্সিং স্টাফের ঘাটতি পূরণে নতুন বেসরকারি নার্সিং কলেজগুলিকে এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারি সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্সিং কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, চিকিৎসা পরিষেবা সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিতে ইতিমধ্যেই চারটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট চালু করা হয়েছে। এই ইউনিটগুলিতে এক্স-রে, ইউএসজি, সেমি-অটো অ্যানালাইজার, ইসিজি, চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফের ব্যবস্থা রয়েছে। আগামী দিনে ডিজিটাল বা হ্যাণ্ডহেল্ড এক্স-রে, ইউএসজি-সহ আরও প্রয়োজনীয় যন্ত্র যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিটি স্ক্যান-মেডিক্যাল পরিষেবায় বাড়তি জোর
জেলা হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজগুলিতে সিটি স্ক্যান ও এমআরআই পরিষেবা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একটি মেডিক্যাল কলেজে মাত্র একটি সিটি স্ক্যান মেশিন দিয়ে রোগীর চাপ সামলানো সম্ভব নয় বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি উদ্যোগে অথবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে নতুন যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
রোগীদের খাবার পরিবেশন নিয়েও একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উন্নতমানের স্টিলের বাসন ব্যবহার এবং কম্পার্টমেন্টাল পদ্ধতিতে খাবার পরিবেশনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই বিছানায় একাধিক রোগী থাকার সমস্যারও সমাধান করতে বলা হয়েছে। সদ্য অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত লোকজন যাতে ওয়ার্ডে না থাকেন, সে বিষয়েও বিধিনিষেধের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।
কর্মীদের আবাসন নিয়েও ক্ষোভ
হাসপাতাল পরিদর্শনে চিকিৎসক ও নার্সিং স্টাফদের আবাসন সমস্যাও সামনে এসেছে। কোথাও জল জমে থাকা, কোথাও সাপের আতঙ্ক, আবার কোথাও অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা কোয়ার্টারের অভিযোগ রয়েছে। এমনও দেখা গিয়েছে, চারজন মেডিক্যাল অফিসারকে একটি ঘর ও একটি বাথরুম ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। কর্মীদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে আবাসন পরিকাঠামোর উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারণে নতুন নীতি
অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবায় স্বচ্ছতা আনতেও নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ ট্রান্সপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, অক্সিজেন ও বেসিক সাপোর্টযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স এবং আইসিইউ সুবিধাযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স—এই তিন ধরনের পরিষেবার জন্য পৃথক ভাড়ার কাঠামো তৈরি করা হবে।
কিলোমিটার অনুযায়ী ভাড়া এবং কলকাতা যাতায়াতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রেট নির্ধারণের দায়িত্ব জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে দেওয়া হয়েছে। রোগীর পরিবার ও অ্যাম্বুলেন্স চালকের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে তৃতীয় কোনও ব্যক্তির হস্তক্ষেপ যাতে না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী।
অগ্নিনিরাপত্তায় কড়া নির্দেশ
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে ফায়ার অডিট বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত না থাকায় রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত মক ড্রিলের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে হাসপাতালের কর্মীদের প্রস্তুত রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অব্যবহৃত পরিকাঠামো এবার কাজে লাগানোর উদ্যোগ
পূর্বস্থলী-১, কাটোয়া, অনাময় ও মেমারি-সহ একাধিক হাসপাতালে এয়ার কন্ডিশনিং পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কিছু হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা ব্যবহার করা হয়নি। একইভাবে ক্যানসার হাসপাতালের কিছু পরিকাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এই অব্যবহৃত পরিকাঠামো দ্রুত রোগীদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, টানা তিনদিনের হাসপাতাল পরিদর্শনের পর রবিবারের বৈঠকে পূর্ব বর্ধমানের স্বাস্থ্য পরিষেবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা থেকে জনবল, চিকিৎসা যন্ত্র থেকে রোগীদের খাবার, কর্মীদের আবাসন থেকে অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা এবং অগ্নিনিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এখন দেখার, বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং তার সুফল কতটা পৌঁছয় জেলার সাধারণ মানুষের কাছে।
তিনদিনের পরিদর্শনের পর স্বাস্থ্য পরিষেবা ঢেলে সাজানোর রূপরেখা, বৈঠকে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর






